সাক্ষাৎকার

জুন ৯, ২০১৪, ৯:৫৭ অপরাহ্ন

ইসলামী ব্যাংকের উদ্দেশ্য মুষ্টিমেয় মানুষের সম্পদ বাড়ানো নয়

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম নেতৃস্থানীয় প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড। যাত্রা শুরু করার পর দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে এ ব্যাংক। দীর্ঘ পথ চলায় বিভিন্ন সময় সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিকে। ব্যাংকটির অতীত বর্তমান আর ভবিষ্যৎ নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আবদুল মান্নান।

প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ভিন্নতা কোথায়?

প্রচলিত ধারার ব্যাংকের মূল কাজ কম দামে টাকা কিনে বেশি দামে বিক্রি করা। টাকা বেচা-কেনাই প্রচলিত ব্যাংকের মূল কাজ। আর শরীয়তভিত্তিক ব্যাংক টাকার বেচা-কেনা করে না। টাকা হচ্ছে বেচা-কেনার মাধ্যম। এর একটা মান আছে। এক কথায় বলা যায়, টাকার বিনিময় মাধ্যম, পরিমাপ, মান, স্টোর ভ্যালু আছে।

টাকাকে পণ্যের মতো বেচা-কেনা করাকে কৃত্রিম জালিয়াতির সঙ্গে তুলনা করেন অনেক মনীষী। কার্ল মার্কস বলেন, এটি হলো সিঁদেল চুরি। ইসলামী ব্যাংকগুলো প্রকৃত সম্পদ নিয়ে বেচা-কেনা করে। ইসলামী ব্যাংক টাকার সঙ্গে ডিল করে না, পণ্য ও সেবা নিয়ে কাজ করে। ন্যাচারাল ইকোনোমিক অ্যাকটিভির মধ্যে একজন মানুষ যে কাজগুলো করেন ইসলামী ব্যাংক তার ব্যাংকিং কার্যক্রমে সেই কাজগুলো করে।

এটিতো পদ্ধতির ব্যাপারে বললাম। বেচা-কেনা, ইজারা, অংশদ্বারীত্ব এই বিষয়গুলোকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় নিয়ে এসেছি। ইসলামী ব্যাংকের উদ্দেশ্য হলো মুষ্টিমেয় মানুষের সম্পদ বাড়ানো নয়, বরং সমাজের বেশিরভাগ মানুষের যে মৌলিক চাহিদা রয়েছে তা পূরণ করার জন্য সম্পদকে বিকেন্দ্রীকরণ করা।

ইসলামী ব্যাংকের বর্তমানে ১ কোটি গ্রাহকের ৫১ হাজার কোটি টাকা রয়েছে। আমাদের লক্ষ্য হলো এই ১ কোটি মানুষের টাকা ১৬ কোটি মানুষের কাছে ছড়িয়ে দেওয়া। আমরা গত ৩১ বছর এক টাকাও তামাকের উৎপাদনে ব্যয় করিনি। যদিও এর একটি আর্থিক ভ্যালু আছে।

খাতভিত্তিক বিনিয়োগ যেমন তৈরি পোশাক, চামড়া, কৃষি ইত্যাদিতে আলাদাভাবে বিনিয়োগের পরিকল্পনা আছে কি না?

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড তার জন্মের শুরু থেকেই বিনিয়োগ কার্যক্রমের একটি অত্যন্ত চমৎকার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। আমাদের শিল্প, কৃষি, আবাসন, তৈরি পোশাক খাতের জন্য আলাদা কমিটি রয়েছে। ব্যাংকের শুরু থেকেই খাতভিত্তিক বিনিয়োগকে উৎসাহিত করে আসছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স ও তৈরি পোশাক খাত- এই দুইটি বিষয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। শিল্প খাতে যেমন বিনিয়োগ আছে তেমনি ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতেও আমাদের বিনিয়োগ রয়েছে। পাট শিল্প বন্ধ হতে চলছিল। আমরা সেই খাতেও বিনিয়োগ করেছি। আমরা আকিজ জুট মিলসের মতো বড় প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছি। আমরা অবকাঠামো, পেট্রোকেমিকেলসহ প্রায় সব সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগ করেছি। আমরাই একমাত্র বাণিজ্যিক ব্যাংক যারা রিটেল পদ্ধতিতে মাইক্রোফাইন্যান্স করছি। আমরা ১৭ হাজার গ্রামে কাজ করছি। প্রায় আট লাখ পরিবার এর উপকারভোগী। যাদের মধ্যে ৮৫ ভাগ নারী। মজার বিষয়, আমাদের লোন রিকভারির হার ৯৯ দশমিক ৬০ শতাংশ।

জঙ্গি অর্থায়ন নিয়ে ইসলামী ব্যাংকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মহল অভিযোগ করে আসছে...

দুর্ভাগ্যবশত এই বিষয়টিকে আমাদের বার বার মোকাবেলা করতে হয়েছে। অনেক সময় দেখা গেছে, বাস্তবতার সঙ্গে সত্যের লেশমাত্র নেই এমন বিষয় নিয়ে গণমাধ্যমে বার বার রিপোর্টিং করা হয়। সেই রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে অনেক কথাবার্তা বলা হয়েছে। কিন্তু যখন তারা আমাদের কাছে এসেছেন তখন এসব তথ্য অসাড় প্রমাণিত হয়েছে। নেতিবাচক প্রচারণার বিষয়ে বলব, যারা আমাদের বিপক্ষে কথা বলেন তাদের জন্য আমাদের ব্যাংকের সকল খাতা খোলা আছে। ভেতর থেকে এসে যদি ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রমকে মূল্যায়ন করেন তখন তারা আমাদের বিপক্ষে না দাঁড়িয়ে ইসলামী ব্যাংকের পক্ষে কথা বলবেন। ইসলামী ব্যাংক মানুষের জন্য ক্ষতিকর এমন কোন কাজ করার বিরোধী। আমরা অপরাধমূলক কোন কাজের শুধু নিন্দাই করি না, একই সঙ্গে ঘৃণাও করি।

আপনাদের সিএসআর (সামাজিক দায়বদ্ধতা কর্মসূচি) কার্যক্রম নিয়ে কিছু বলেন?

সারাদেশে আমাদের সিএসআর কার্যক্রমের অসংখ্য উপকারভোগী রয়েছে। আমাদের ব্যাংকের প্রতিষ্ঠার পর থেকে সিএসআর কাজ করে আসছি। ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর আমরা সাদকাহ’র মাধ্যমে করছি। পরবর্তীতে ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে করেছি। এরপর ২০১০ সালে ইসলামী ব্যাংক সরাসরি সিএসআর কার্যক্রম চালিয়ে আসছি। আইলা ও সিডরের ক্ষেত্রে আমরা আইডিবির (ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক) সঙ্গে কাজ করেছি। সেখানে আমরা চমৎকার সাফল্য অর্জন করেছি। সেখানকার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষরা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আইলা ও সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের যে কর্জ দেওয়া হয়েছে তা তারা ফেরত দিয়েছে- এটা চমৎকার কাজ।

মোবাইল ব্যাংকিং দেশে এক ধরনের বিপ্লব হয়েছে। ইসলামী ব্যাংকের এম ক্যাশের কার্যক্রম সাফল্য কতটুকু?

আমি মনে করি না মোবাইল ব্যাংকিং বিপ্লব হয়ে গেছে। ইসলামী ব্যাংক ফিন্যান্সসিয়াল ইনক্লুশেনে বিশ্বাস করে। যিনি ১০ টাকা নিয়েও ব্যাংকে আসতে পারেন না তাদের কিভাবে ব্যাংকের সাথে সম্পৃক্ত করা যায় সেটা নিয়ে কাজ করছি। এই কারণে আমরা এম ক্যাশ চালু করেছি। আমাদের নেটওয়ার্ক ভালো আছে। আমাদের এমনিতে এক কোটি গ্রাহক আছে। সেই গ্রাহকের মাধ্যমে আরও বহু গ্রাহক যুক্ত হবেন। সেই হিসেবে ইসলামী ব্যাংকের এম ক্যাশ কার্য্ক্রম আরও গতি লাভ করবে।

সরকার ইসলামী ব্যাংক আইন প্রণয়নের কথা ভাবছে, এই বিষয়ে আপনার মতামত কি?

পৃথিবীর যত জায়গায় ইসলামী ব্যাংক চালু হয়েছে সেখানে আগে ইসলামী ব্যাংক অ্যাক্ট চালু করেছে। তার পর ইসলামী ব্যাংকিং চালু করেছে। মালয়েশিয়াতে ইসলামী ব্যাংকিং চালু হয়েছে আমাদের তিন মাস পরে। আমাদের শুরু হয়েছে ১৯৮৩ সালের মার্চে আর মালয়েশিয়ায় চালু হয়েছে জুলাই মাসে। কিন্তু চালু করার আগে তারা ইসলামী ব্যাংক অ্যাক্ট করেছে। তুরস্কে ইসলামী ব্যাংকের নাম দিয়েছে পার্টিসিপেটরি ব্যাংকিং। তারা পার্টিসিপেটরি ব্যাংকিং চালু করার আগে ব্যাংকিং অ্যাক্ট করেছে। এমনকি থাইল্যান্ডের মতো দেশে ইসলামী ব্যাংক চালু করার আগে ইসলামী ব্যাংকটি অ্যাক্ট করেছে। আমরা ১৯৮৩ সাল থেকে ইসলামী ব্যাংকিং অ্যাক্ট করার কথা বলছি। বিভিন্ন সময়ে এই বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানিয়েছে। ২০১১ সালে অর্থ মন্ত্রণালয় বিষয়ক স্থায়ী কমিটি ইসলামী ব্যাংকগুলোর সাথে বৈঠক করেছিল। সেখানে আমরা ইসলামী ব্যাংক অ্যাক্ট করার দাবি জানাই। ইসলামী ব্যাংক অ্যাক্ট চালু না হলেও সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। যার কারণে ইসলামী ব্যাংকগুলো ভালো কাজ করছে।

রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিনিয়োগে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে... এটাকে আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে চালু কল-কারখানাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তেমনিভাবে বিআরএমই কিংবা নতুন প্রজেক্টের মাধ্যমে যারা নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে শিল্পের বিকাশ করে থাকে তাদের এই কাজটিতে কিছুটা বিঘ্ন ঘটেছে। কিন্তু ধীরে ধীরে আমরা স্থিতিশীলতা অর্জন করছি। আশা করছি খুব শিগগিরই আমরা এই পরিস্থিতি থেকে উত্তোরণ করতে পারব।
কারণ বাংলাদেশের মানুষ অনেক বেশি রেসিলিয়্যান্স। বাংলাদেশ ইমারিজং টাইগার হিসেবে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। আশা করি এই দেশের মানুষ সব প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে।

সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ?

এত সুন্দর সুন্দর প্রশ্ন করার জন্য আপনাকেও ধন্যবাদ। এই প্রশ্নগুলো করার জন্য কথা বলার সুযোগ পেলাম।

নিউজপেজ২৪/এন এইচ