সাক্ষাৎকার

জুলাই ২৬, ২০১৪, ৮:০৯ অপরাহ্ন

ঢাকা নিয়ে ভাবার কেউ নেই

নিউজ পেজ ডেস্ক

দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় দৈনিকে দেয়া বিশেষ সাক্ষাতকারে নগরবিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান (২০০৭-২০১১) অধ্যাপক নজরুল ইসলাম ঢাকা শহরের বর্তমান অবস্থা নিয়ে কথা বলেছেন খোলামেলাভাবে। নিউজপেজ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল তাঁর অভিমত।

প্রশ্নকর্তা: নানা মহল থেকে এত উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, এর পরও ঢাকা শহরের পরিস্থিতি তো দিনে দিনে শোচনীয়ই হচ্ছে।
নজরুল ইসলাম l ঢাকার বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক অবস্থায় গিয়ে ঠেকেছে। এই শহরটি নিয়ে যে ধরনের চিন্তাভাবনা প্রয়োজন, এর যে ভবিষ্যৎ ভাবনা প্রয়োজন, তার কিছুই চোখে পড়ছে না। সবচেয়ে দুশ্চিন্তার বিষয় হচ্ছে, ঢাকা নিয়ে দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব পর্যায় থেকে যে সচেতনতা ও উৎকণ্ঠা থাকা উচিত, তা দেখছি না। ভাবটা এমন যে ঢাকা তো চলছে।

প্রশ্নকর্তা: সবকিছুর পরও ঢাকা তো চলছে, তা যেভাবেই হোক।
নজরুল ইসলাম l এ কথা ঠিক যে ঢাকা চলছে; নানা অনিয়ম, প্রতিবন্ধকতা ও পরিস্থিতির অবনতি সত্ত্বেও। ঢাকার জনসংখ্যা বাড়ছে, এর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিও হচ্ছে। কিন্তু ঢাকার ব্যাপারে সরকারের যে নির্বিকার ভাব, সেটাই সবচেয়ে বেশি আশঙ্কার। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ নিয়ে, এর ভালোমন্দ নিয়ে ভাবার লোকজন আছে, কিন্তু ঢাকা নিয়ে ভাবার কেউ নেই।

প্রশ্নকর্তা: যাঁরা দেশ চালান, ঢাকাকে দেখার দায়িত্ব তো তাঁদেরই।
নজরুল ইসলাম l দেশ পরিচালনা করেন প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর কেবিনেট। এই যে ঢাকার পরিস্থিতি এত শোচনীয় হয়ে পড়ছে, এর পরও শুধু ঢাকার পরিস্থিতি নিয়ে কোনো কেবিনেট মিটিং হয়েছে কি? এ ধরনের একটি মিটিংয়ে নিশ্চয় পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না, কিন্তু সেখানে আলোচনা হলে কিছু প্রশ্ন উঠত, এর উত্তরও খোঁজার চেষ্টা হতো। একটি কেবিনেট মিটিং হলে আমরা অন্তত বুঝতাম যে সরকার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে।
প্রশ্নকর্তা: কিন্তু ঢাকাকে দেখার তো নানা কর্তৃপক্ষ রয়েছে।

নজরুল ইসলাম l ঢাকার ক্ষেত্রে এই শহরটি উন্নয়নের সবচেয়ে জরুরি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে একসময়ের ডিআইটি ও বর্তমানের রাজউক। এ ধরনের একটি বিশেষায়িত উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানকে যে ধরনের শক্তিশালী, মর্যাদাবান, দায়িত্বশীল ও দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলা উচিত ছিল, তা করা হয়নি। উন্নয়ন নির্ভর করে যথাযথ পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণের ওপর। রাজউকের সেভাবে গড়ে ওঠার বা সে ক্ষমতাও দেওয়া হয়নি। এ জন্য প্রতিষ্ঠানটির যে ব্যবস্থাপনা-কাঠামো বা নেতৃত্বের দরকার ছিল, তা গড়ে তোলা হয়নি। রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই তা করা হয়নি। ফলে দুর্নীতি ও জমি বণ্টনই এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজউকের মূল কাজ। রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের আকাঙ্ক্ষাই প্রতিষ্ঠানটিকে সর্বনাশ করেছে। ভারতে দিল্লির জন্য দিল্লি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কিন্তু আমাদের দেশের মতো রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ নেই।

প্রশ্নকর্তা: ঢাকাকে নিয়ে তো বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পরিকল্পনা হয়েছে, এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে না পারাই কি মূল সমস্যা নয়?
নজরুল ইসলাম l ঢাকা ঐতিহাসিক শহর। নানা পর্ব পার হয়েছে এই শহরটি। যথাযথ পরিকল্পনা ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন দুই ক্ষেত্রেই সমস্যা হয়েছে। একাত্তরে ঢাকা যখন বাংলাদেশের রাজধানী হয়, তখন ঢাকার জনসংখ্যা ৮-১০ লাখের বেশি হবে না। পাকিস্তানের প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে ১৯৬০ সালে ডিআইটি ঢাকার উন্নয়নে ২০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর উচিত ছিল নতুন দেশের রাজধানী হিসেবে ঢাকা কেমন হবে, এর চরিত্র কী হবে, তার একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা। কিন্তু তা হয়নি। বিশেষ করে, আশির দশকে ঢাকাকে কেন্দ্র করে যা হয়েছে তা এক অর্থে বিশৃঙ্খল ও অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন। ঢাকায় একের পর এক গার্মেন্টস তৈরি হয়েছে, লাখ লাখ শ্রমিক এই শহরে এসেছেন। বলা যায়, স্বাধীনতার পর বছর বিশেক ধরে ঢাকায় যে অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন হয়েছে, এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে কিছু করা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। ঢাকা এখন বিশ্বের ১১তম জনবহুল শহরে পরিণত হেয়ছে।

প্রশ্নকর্তা: পরিস্থিতি সামাল দিতে ’৯৭ সালে তো ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান বা ডিএমডিপি নেওয়া হলো। তা ভূমিকা রাখতে পারছে না কেন?
নজরুল ইসলাম l দেখুন পরিকল্পনা করতে হয় সময়ের আগে। শত বছর পর কী হবে সেটা বিবেচনায় থাকতে হয়। তা না হলে অন্তত ৫০ বা কমপক্ষে ২০ বছর মাথায় রাখতে হয়। ’৯৭ সালে ডিএমডিপি হওয়ার পর ড্যাপ করতে আমাদের ১৫ বছর চলে গেছে। এ সময় স্বার্থান্বেষী মহল ও ভূমি ব্যবসায়ীরা অনেক কিছু দখল করে ফেলেছে। জলাশয় বা প্লাবন ভূমি দখল করে ভরাট করে ফেলেছে। এগুলোকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সহজ নয়। ড্যাপ বা এ ধরনের কিছু আরও আগে করা উচিত ছিল। এমন কিছু হলে এখন যে সমস্যায় আমরা পড়ছি তা হতো না।

প্রশ্নকর্তা: ড্যাপ বাস্তবায়ন বর্তমানে আটকে গেছে, ভূমি ব্যবসায়ী ও স্বার্থান্বেষী অনেক গোষ্ঠী এর বিরোধিতায় সোচ্চার। ড্যাপ সংশোধন বা নতুন পরিকল্পনার চিন্তাভাবনা চলছে। ড্যাপ থেকে সরে আসার বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
নজরুল ইসলাম l ড্যাপ অনুমোদিত হতে হতে ভূমি ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন গোষ্ঠী উন্নয়নের নামে এমন অনেক জায়গা ভরাট করে ফেলেছে বা প্রকল্প করেছে যেগুলো ড্যাপের বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল বা জলাশয়ের মধ্যে পড়েছে। এগুলোর কারণে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এগুলোকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া আদৌ সম্ভব কি না? ড্যাপের কারণে যে ভূমি ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন, তাঁরা এর বিরোধিতায় নেমেছেন। শক্তিশালী ও ক্ষমতাধর এই গোষ্ঠী সরকারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। সমস্যা হচ্ছে, অপরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রণহীন উন্নয়নের কারণে প্রকৃতি একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা শোধরানো কঠিন।

প্রশ্নকর্তা: ড্যাপ অনুমোদিত হওয়ার আগে যেসব জায়গা ভরাট হয়েছে বা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, সেগুলো নিয়ে না হয় কিছু বাস্তব সমস্যা দেখা দিয়েছে; কিন্তু সরকার যে নতুন করে ড্যাপ লঙ্ঘন করে প্রকল্প অনুমোদন দিল। আমলা, পুলিশ ও সেনাসদস্যদের আবাসন প্রকল্প তিনটি কি ড্যাপের লঙ্ঘন নয়?
নজরুল ইসলাম l এটা অবশ্যই ড্যাপের লঙ্ঘন, কারণ এই প্রকল্প তিনটি ড্যাপের চিহ্নিত বন্যাপ্রবাহ অঞ্চলের মধ্যে পড়েছে।
প্রশ্নকর্তা: ড্যাপ অনুমোদন করার পর সরকার কেন এ ধরনের প্রকল্পের অনুমোদন দিল?
নজরুল ইসলাম l রাজনৈতিক বিবেচনা ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ রক্ষার জন্য এ কাজটি করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ বা টেকনিক্যাল কমিটির সুপারিশের বাইরে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে যখন এ ধরনের কাজ করা হয়, তখন এই উদ্দেশ্যটি পরিষ্কার। রাজনৈতিক প্রভাবে উন্নয়ন ও পরিকল্পনা ব্যাহত হওয়ার একটি নজির হিসেবেই এই অনুমোদন বিবেচিত হবে। আর সরকার যদি নিজেই রাজনৈতিক স্বার্থে উন্নয়ন ও পরিকল্পনাবিরোধী অবস্থান নেয়, তবে পরিকল্পনা করে কী লাভ!

প্রশ্নকর্তা: এই প্রকল্প তিনটি বাতিল হওয়া উচিত বলে মনে করেন কি?
নজরুল ইসলাম l এটা স্পষ্ট যে প্রকল্প তিনটি ড্যাপের বন্যাপ্রবাহ অঞ্চলকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। বর্তমান ড্যাপ কার্যকর থাকা পর্যন্ত এমন কিছু করা যাবে না, যা ড্যাপকে ক্ষতিগ্রস্ত বা বাধাগ্রস্ত করতে পারে। আমি মনে করি, ২০১৫ সালের মধ্যে দৃঢ়ভাবে বর্তমান ডিএমডিপি বাস্তবায়ন এবং পরবর্তী মহাপরিকল্পনার উদ্যোগ নেওয়া উচিত। এটা নিয়ে জনসচেতনতা তৈরির জন্য ‘ঢাকা ওয়াচ’ ধরনের কিছু করা জরুরি। বর্তমানে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন সংগঠন মিলে মাঠ উদ্ধার বা নদী-খাল দখল, দূষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে, এটা আরও সমন্বিতভাবে হওয়া উচিত। এ ধরনের কিছু সক্রিয় থাকলে কোনো প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর অগণতান্ত্রিক ও বেপরোয়া আচরণ ঠেকানো সম্ভব।

প্রশ্নকর্তা: দিনে দিনে ঢাকায় যে সমস্যা তৈরি হয়েছে তার সমাধানের বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদি। পরিস্থিতি সহনীয় করতে এই মুহূর্তে করণীয় কী?
নজরুল ইসলাম l আমি মনে করি, এই সময়ে ঢাকা শহরের সবচেয়ে বড় সমস্যা পরিবহন। পরিবহন সংকট, যানজট—এসব কারণে শহরের প্রতিটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, এমনকি শিশুরাও। এ কারণে তাদের স্কুলে যাওয়া, পড়াশোনা, স্বাস্থ্য—সবই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ জন্য যে কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তা জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। কিন্তু আমরা দেখছি যে এ ক্ষেত্রেও প্ল্যানবহির্ভূতভাবে অনেক কাজ করা হচ্ছে। বাস র্যাপিড ট্রানজিটের ব্যাপারে সরকারের তেমন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না অথচ এটা জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নেওয়া দরকার।

প্রশ্নকর্তা: আপনি এর আগে এক সাক্ষাৎকারে ঢাকার দেখভালের জন্য একটি কর্তৃপক্ষ গঠনের কথা বলেছিলেন। এখনো কি তাই মনে করেন? সেই কর্তৃপক্ষের ধারণাটি নির্দিষ্ট করবেন কি?
নজরুল ইসলাম l সরকার যদি সত্যিই মনে করে যে ঢাকার জন্য তাদের কিছু করার রয়েছে, তবে অবশ্যই এই শহরটিকে দেখভালের জন্য উচ্চপর্যায়ের একটি উন্নয়ন ও সমন্বয় কর্তৃপক্ষ গঠন করা জরুরি। অতীতে ঢাকাসংক্রান্ত একটি সমন্বয় কমিটি ছিল, এখন সেটাও নেই। আমি মনে করি, পার্লামেন্টে আইন করে এ ধরনের একটি কর্তৃপক্ষ গঠন করা যেতে পারে। ঢাকার উন্নয়ন ও সেবাসংক্রান্ত বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়সাধন যেহেতু এই কর্তৃপক্ষের অন্যতম কাজ হবে, তাই একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীকে এই কর্তৃপক্ষের প্রধান করতে হবে, যিনি রাজউক, রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি, ঢাকা ওয়াসা বা সিটি করপোরেশনের ওপর কর্তৃত্ব করতে পারবেন। আইন করে এ ধরনের একটি কর্তৃপক্ষ করা গেলে এর একটি নির্দিষ্ট কাঠামো থাকবে। তাদের পরামর্শ দেওয়ার জন্য বিশেষজ্ঞ কমিটি, টেকনিক্যাল ও গবেষণা সেল থাকতে পারে।

প্রশ্নকর্তা: আপনাকে ধন্যবাদ
নজরুল ইসলাম l ধন্যবাদ।

পরিচিতি: বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান (২০০৭-২০১১) অধ্যাপক নজরুল ইসলাম নগরবিশেষজ্ঞ হিসেবেও সমধিক পরিচিত। তিনি দীর্ঘ সময় (১৯৬৩-২০০৭) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা করেছেন। ঢাকা নিয়ে তাঁর গবেষণা ও লেখালেখির শুরু ১৯৬১ সাল থেকে। ঢাকার ওপর ইংরেজিতে তাঁর উল্লেখযোগ্য দুটি গ্রন্থ রয়েছে। নগর গবেষণাকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বর্তমানে তিনি এর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মকাণ্ডেও তিনি ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।

নিউজ পেজ২৪/আস