সাক্ষাৎকার

অগাস্ট ৭, ২০১৪, ৪:১৪ অপরাহ্ন

ইসরাইলের টিকে থাকার বৈধ কারণ নেই

নিউজ পেজ ডেস্ক

অবরুদ্ধ গাজায় সেটলার অবৈধ ইসরাইলের যুদ্ধ সম্পূর্ণ অবৈধ এবং হামাসের প্রতিরোধ যুদ্ধ আন্তর্জাতিকভাবে যথার্থ এবং বৈধ। ফলে জায়নিস্ট স্টেট ইসরাইলের টিকে থাকার কোনো বৈধ নৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক কারণ নেই।

একান্ত সাক্ষাৎকারে এমন মন্তব্য করেন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, কলামিস্ট, কবি, মানবাধিকার কর্মী ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার ফরহাদ মজহার।

তিনি বলেন, হামাস যেভাবে কঠিন প্রতিরোধ সংগ্রাম করছে- সুড়ঙ্গ করে ,গর্ত করে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে; আমি বলবো- নির্যাতিত জনগণের এ ধরনের সংগ্রাম করা মানব ইতিহাসে একটা অসামান্য উদাহরণ।

রেডিও তেহরানের সৌজন্যে পুরো সাক্ষাৎকার নিচে দেয়া হলো।

প্রশ্ন: আপনি সম্প্রতি একটি পত্রিকায় ‘সাব্বাশ ফিলিস্তিনি, সাব্বাশ হামাস’ নামে একটি কলাম লিখেছেন। কলামটি ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। যেখানে মানুষ হামাসের পক্ষে কথা বলতে অনেকটা ইতস্তত করে সেখানে আপনি তাদেরকে বাহবা দিলেন; পাশে দাঁড়ালেন। হামাসের প্রতি আপনার এই মমত্ববোধের কারণ কী?

ফরহাদ মজহার:
অবরুদ্ধ গাজার নিরীহ নারী ও শিশুদেরকে যে নৃশংসভাবে হত্যা করা হচ্ছে তার বিরুদ্ধে হামাস যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে এ বিষয়ে ফিলিস্তিনের এবং হামাসের পক্ষে কলম তুলে ধরার ব্যাপারটি শুধু মমত্ববোধের বিষয় নয়, তবে নিঃসন্দেহে একটা নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর প্রতি আমাদের মমত্ববোধ থাকতেই হবে। এছাড়া হামাস যে প্রতিরোধ আন্দোলন করছে জায়ানবাদি ইসরাইলের বিরুদ্ধে সেটি হচ্ছে ‘সেটলার কলোনিয়ালিজম’র বিরুদ্ধে। ‘সেটলার কলোনিয়ালিজম’ এটা আসলে একটি বিশেষ ধরনের ‘কলোনিয়ালিজম’ সাম্রাজ্যবাদী যুগে আমরা দেখছি।

ইহুদিরা জাতীয়তাবাদের কথা বলে অন্যদের ভূ-খণ্ড দখল করে সেখানকার অধিবাসীদের উৎখাত করে থাকে। আর সেভাবেই ইসরাইল ফিলিস্তিনের ভূ-খণ্ড দখল করে নিয়েছে। ফলে স্বভাবতই তাদের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনের মানুষ লড়ছে, এছাড়া তাদের সামনে বিকল্প কোনো পথ নেই। তাদের নিজস্ব ভূমি থেকে যে তাদের উৎখাত করা হয়েছে ও অবিচার করা হয়েছে তার বিরুদ্ধে তারা লড়াই করছে। গাজাবাসীরা যখন এ ধরনের সংগ্রাম করছে তখন আমাদের মধ্যে অনেক ধরণের প্রিজুডিস কাজ করে।

একটা প্রিজুডিস হচ্ছে মুসলমানদের সম্পর্কে। দ্বিতীয় প্রিজুডিস হচ্ছে- যে কোনো ধরনের মজলুম যখন লড়াই করে তখন তারা এটাকে নিন্দা করার জন্য শান্তির কথা এবং অহিংসবাদের কথা বলা শুরু করে। ফলে এখানে একটা বিরাট সমস্যা তৈরি করে। সেই বাধাগুলোর বিরুদ্ধে এর যে নৈতিকতা- যে নৈতিকতার জায়গায় দাঁড়িয়ে লড়াই করছে হামাস, সেটাকে সামনে নিয়ে আসাটা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করি।

আমার কাছে মনে হচ্ছে এটা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণও এই কারণে যে- গাজা আক্ষরিক অর্থে একটি কারাগার। এখানকার জনগণের কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। সেখানে হামাস যে প্রতিরোধ সংগ্রাম করছে- সুড়ঙ্গ করে, গর্তকরে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে; আমি বলবো- নির্যাতিত জনগণের এ ধরনের সংগ্রাম করা মানবেতিহাসে একটা অসামান্য উদাহরণ।

ফলে বাংলাদেশে যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছে, আমরা যারা লড়াই করেছি তাদের এটা মনে রাখা দরকার কিভাবে জুলুম ও নির্যাতনের শিকার মানুষেরা বহুবিধ বাধার পরও; প্রচণ্ড রকম সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও যুদ্ধ করছে। ফলে তাদের বিষয়টি সামনে আনা একান্ত দরকার। আপনারা খেয়াল করে থাকবেন আমার লেখার মধ্যে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সেটি হয়েছে জায়ানবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা। জায়ানবাদ একটি জাতীয়তাবাদী মতাদর্শ। জায়নিস্টরা ইহুদিধর্মাবলম্বী হিসেবে অতি ধার্মিক কেউই নয়। জায়নিস্টদের অধিকাংশই সত্যিকারার্থে নাস্তিক। কিন্তু তারা ইহুদিবাদ বা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদকে ব্যবহার করছে মূলত একটা ‘সেটেলার কলোনিয়ালিজম’ স্থাপনের জন্য।

ইউরোপে ইহুদিদের বিরুদ্ধে যে অত্যাচার নির্যাতন হয়েছে তার সমাধান হিসেবে ইউরোপের বাইরে ফিলিস্তিনীদের ভূ-খণ্ড দখল করে সেখানে ‘সেটলার কলোনিয়ালিজম’ স্থাপন করা। আর সেটলার কলোনিয়ালিজম কিন্তু প্রথাগত কলোনিয়ালিজম অপেক্ষা চরিত্রগত দিক থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। উপনিবেশিক ইংরেজ আমলকে খেয়াল করলে দেখতে পাবেন উপনিবেশিক শক্তি বাইরে থেকে আমাদেরকে শোষণ করেছে, শাসন ও লুণ্ঠন করেছে। তারা নানাভাবে আমাদেরকে নির্যাতন করেছে। কিন্তু তারা এদেশে এসে বসতি স্থাপন করে কাউকে উৎখাত করেনি।

‘সেটলার কলোনিয়ালিজমে’র অত্যন্ত ভালো উদাহরণ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়া। অর্থাৎ আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের সাদা মানুষেরা সেখানে গিয়ে সেটেল করেছে এবং সেখানকার স্থানীয় অধিবাসীদের তারা উৎখাত করেছে। আর তাদের অত্যাচারে বহুজাতি ধ্বংস হয়ে গেছে। বহু জনগোষ্ঠী নিঃশেষ হয়ে গেছে এবং যারা জীবিত আছে তাদেরকে সেটেলার কলোনিয়ালিস্টরা রিজার্ভ করে রেখে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে বা অষ্ট্রেলিয়াতে গেলে দেখতে পাবেন সেখানকার আদিবাসী যারা তাদের রিজার্ভ করে রেখেছে।

আজকে রেড ইন্ডিয়ানদের কথা বলুন বা আফ্রিকার কিছু অধিবাসীদের কথা বলুন- তারা কিন্তু সেখানে নেই। সেখানে যারা আছে তারা সকলেই বিদেশি। বাইরে থেকে এসে তারা মহাদেশ দখল করে নিয়েছে। এটাই ‘সেটলার কলোনিয়ালিজমে’র অত্যন্ত ভয়াবহ এবং নির্মম দিক। অবরুদ্ধ গাজাতে যখন হামাস লড়াই করছে তখন তারা আমাদেরকে মনে করিয়ে দিচ্ছে দীর্ঘ মানব ইতিহাসে ‘সেটলার কলোনিয়ালিস্ট’রা কিভাবে জায়গা দখল করেছে! তারা কিভাবে বিভিন্ন সভ্যতাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। আর সেদিক থেকে হামাসের এই সংগ্রাম ঐতিহাসিকভাবে, নৈতিকতার দিক থেকে, রাজনীতি এমনকি সাংস্কৃতিক দিক থেকে অসম সংগ্রাম। বাংলাদেশের মানুষ যারা মুক্তিযুদ্ধ করে দেশটাকে স্বাধীন করেছে তাদেরকে হামাসের প্রতিরোধ যুদ্ধের এ বিষয়টি মনে করিয়ে দেয়া দরকার।

যখনই কোনো লড়াইয়ের প্রশ্ন আসে তখন মুসলিম বনাম ইহুদি এই দুয়ের মধ্যে রিডিউস করে ফেলা হয়। ইহুদিদের নিয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই। ইহুদিরা হযরত মুসা (আ.) এর অনুসারী। ইহুদি এবং জায়নিজম সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। এ দুয়ের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। বহু ইহুদি আছে যারা জায়ানিজমের বিরুদ্ধে। যেমন ধরুন আব্রাম নোয়াম চমস্কি, থিঙ্কেল স্টাইন। তারা সুস্পষ্টভাবে জায়ানিজমের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে জায়ানিজমের পক্ষে যারা তাদের অধিকাংশই ইহুদি নয়। যুক্তরাষ্ট্রের যাদেরকে আমরা ‘রিডেমটান স্টিশিয়েন’ বলি। তারা ইহুদি না হওয়া সত্ত্বেও ইহুদিবাদের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। ফলে আমি আবারো বলছি ইহুদি এবং জায়ানিজমের মধ্যে যেমন সম্পর্ক নেই।

ইসলাম ইহুদি ধর্ম নিয়েও কোনো কথা বলে না। এখানে অবরুদ্ধ গাজায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে জায়ানিজমের লড়াই চলছে। এ লড়াইয়ে নির্যাতিত মজলুম মানুষের যে পরিচয় তাদেরকে একত্রিত করে, যে পরিচয়ে তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াইয়ে শামিল হতে পারে সেই জায়গা থেকে আমি হামাসের লড়াইকে বিবেচনা করি। আমি পতাকার রং দেখে মজলুমের লড়াইকে সমর্থন করি না।

প্রশ্ন: যে প্রেক্ষাপটে ইসরাইল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে তা কতটা বৈধ ও ন্যায্য ছিল বলে আপনি মনে করেন?

ফরহাদ মজহার:
যে প্রেক্ষাপটে ইসরাইল প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তা মোটেও বৈধ এবং ন্যায্য ছিল না। রুজভেল্ট এবং চার্চিলের মধ্যে যে আটলান্টিক চার্টার সই হয়েছিল সেখানে যেকোনো জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের বিষয়টি স্বীকৃত। শুধু তাই নয় সেখানে উপনিবেশিকরণকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যে কারণে যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এলায়েড (allied force) ফোর্সকে সমর্থন করেছে। ফলে এটা একটা আন্তর্জাতিক বৈধ নীতি যার ভিত্তিতে হামাস যুদ্ধ করছে। হামাসের গুলতি ছোঁড়া থেকে শুরু করে সব কিছুই আন্তর্জাতিক আইনের মধ্যে পড়ে। এখানে ইসরাইলের নিরাপত্তা মোটেও বিঘ্নিত হচ্ছে না। ইসরাইল যে কথা বলছে সেটা তাদের (self defense) এর জন্য। তবে এখানে তাদের self defense এর কিছু নেই। যদি self defense এর কথা বলতে হয় তবে ইসরাইলের চেয়ে বহুগুণ self defense এর অধিকার রয়েছে অবরুদ্ধ গাজার মজলুম জনগণের। ফলে আন্তর্জাতিক আইনেও হামাসের প্রতিরোধ সংগ্রাম বৈধ।

অবরুদ্ধ গাজার নিরীহ মানুষের বিরুদ্ধে ইসরাইলের যুদ্ধ সম্পূর্ণ অবৈধ। যে আটলান্টিক চার্টারের ভিত্তিতে পরবর্তীকালে জাতিসংঘ সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং আন্তর্জাতিক দিক থেকেও ইসরাইলের কাজটি সম্পূর্ণ অবৈধ। ফলে রাষ্ট্র হিসেবে ইসরাইল একটি জায়নিস্ট স্টেট, সেটলার স্টেট- ফলে এই স্টেটটির কোনো লিগ্যাল ভিত্তি আন্তর্জাতিক আইনে নেই। ফলে এই অবৈধ রাষ্ট্রকে রাখার পক্ষে যে যুক্তি দেয়া হয় সেটা কোনো আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষ থেকে দেয়া হয় না। এটি একান্তই বলপ্রয়োগের ক্ষমতা দ্বারা প্রতিষ্ঠিত।

সাম্রাজ্যবাদের শক্তি দ্বারাই ইউরোপীয়ানরা যেহেতু ইহুদিদের চায় না তাই তারা ইহুদিদের এখানে পাঠিয়ে ইসরাইলকে প্রতিষ্ঠা করেছে এবং এবং সামরিক শক্তির ক্ষমতাবলেই তারা ইসরাইলকে টিকিয়ে রেখেছে। জায়নিস্ট স্টেট ইসরাইলের টিকে থাকার কোনো বৈধ নৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক কোনো কারণ নেই।


প্রশ্ন: ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পর সেখানে পিএলও’র জন্ম হয়। কিন্তু ইতিহাস এখানেই থেমে থাকেনি; হামাস সৃষ্টি হয়েছে। তো হামাস সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা এবং তার ঐতিহাসিক বাস্তবতা নিয়ে যদি একটু আলোচনা করেন।

ফরহাদ মজহার:
দেখুন হামাস হচ্ছে ফিলিস্তিনের নির্বাচিত রাজনৈতিক কর্তৃত্ব। ফিলিস্তিনের জনগণ ভোট দিয়ে হামাসকে পার্লামেন্টে এনেছে। যদি বৈধতার প্রশ্ন ওঠে তাহালে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব আকারে হামাস সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এখন ফিলিস্তিনি জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে তারা হামাসের অধীনে থাকবেন না কি ফাতাহ’র অধীনে থাকবেন। ফিলিস্তিনের জনগণ তাদের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব, ‘সেটলার কলোনিয়ালিজমে’র বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রশ্নে কোন সংগঠন সত্যিকার নেতৃত্ব দিতে পারবে সে সিদ্ধান্ত নেয়ার গণতান্ত্রিক অধিকার ফিলিস্তিনিদের।

মূলত ‘অসলো’ চুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে যে ‘টু স্টেট’ থিওরির প্রস্তাব করা হয়েছে তাতে স্পষ্ট এ বিষয়টি বোঝা গেছে যে ফিলিস্তিনি জনগণ তা মেনে নেয়নি। কারণ জায়নিস্ট স্টেটকে মেনে নেয়ার যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ নেই। তারপরও ফিলিস্তিনিরা তাদের সবকিছু ভুলে গিয়েও একটি স্বাধীন রাষ্ট্র নিয়ে, প্রতিবেশি রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকার শর্ত (যার আন্তর্জাতিক আইনের এবং নৈতিকতার বৈধতা না থাকার সত্ত্বেও) ফিলিস্তিনিরা মেনে নেয়ার পরও ইসরাইলের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে যে তারা ফিলিস্তিনিদেরকে তাদের নিজের ভূমি থেকে তাড়িয়ে দিতে চায়। শুধু তাড়িয়েই তারা ক্ষ্যান্ত হতে চায়। অবরুদ্ধ গাজায় ইসরাইলিদের বর্বর হামলা থেকে এটা স্পষ্ট যে তারা ফিলিস্তিনিদের, আরবদের হত্যা করতে চায়।

ইসরাইল থেকে প্রকাশিত হারেৎজ পত্রিকায় জিপি লিভনি পরিস্কারভাবে বলেছেন- ইসরাইলের নীতি হচ্ছে আরবদের হত্যা করা। ফলে সেই নীতির ভিত্তিতে অন্যকোনো আলোচনা তো অর্থহীন। ফলে ফিলিস্তিনের জনগণ স্বভাবত সেই সংগঠনকে সমর্থন করবে যে সংগঠন তাদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য লড়বে। কারণ লড়াই ছাড়া ফিলিস্তিনের সামনে ইসরাইল অন্যকোনো পথ খোলা রাখেনি।


প্রশ্ন: ইসরাইলি বর্বরতার বিরুদ্ধে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করছে কিন্তু ইহুদিবাদী ইসরাইল কিংবা বিশ্বের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণকারী দেশগুলো তাতে কর্ণপাত করছে না। যুগ যুগ ধরে চলে আসছে এই বর্বরতা। তো ইসরাইলের আগ্রাসন বন্ধের জন্য ফিলিস্তিনি জনগণ ও আন্তর্জাতিক সমাজের করণীয় কী ছিল?

ফরহাদ মজহার:
দেখুন জায়নিস্ট স্টেটের প্রশ্নটা ইমপেরিলিজমের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। আমরা যে ক্লাসিক্যাল জাতীয় মুক্তি আন্দোলন বলে থাকি সেটা অনেক বড় আন্দোলন বা লড়াই। এ বিষয়টি খুব লম্বা সংগ্রামের ব্যাপার। কিন্তু এটি যেখান থেকে কঠিন আকার ধারণ করেছে সেটি হচ্ছে মিডিয়া এবং তথাকথিত যারা নিজেদেরকে প্রগতিশীল হিসেবে দাবি করেন তারা ইসলামকে বর্বর ধর্ম আকারে প্রচারের এবং প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছে। এটা এমনভাবে গেঁড়ে বসেছে যে মুসলমানরা যে একটা আন্তর্জাতিক ঐক্য গড়ে তুলবে সেটি সম্ভব হচ্ছে না। জায়ানবাদী ইসরাইলের বিরুদ্ধে মুসলমানদের মধ্যে সেই আন্তর্জাতিক ঐক্য গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাছাড়া ‘ওয়ার অন টেররে’র কারণে আরো বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো নিজেরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। ফলে পথটি অনেক কঠিন বলে আমি মনে করি। তবে এ বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রকে এবং অস্ট্রেলিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। তথাকথিত আধুনিক সভ্যতার অত্যন্ত গোড়ার দিকের যে অন্যায় গলদগুলো রয়ে গেছে তাদের সেই নোংরামী এবং রক্তাক্ত বর্বরতার ইতিহাস আজ সামনে উঠে আসছে।

প্রশ্ন: গাজায় ইসরাইলের অব্যাহত বর্বরতার বিষয়ে মুসলিম বিশ্ব বিশেষ করে আরব দেশগুলো একদম চুপ। এর কারণ কী?

ফরহাদ মজহার:
আপনি অনেক বড় একটি প্রশ্ন করেছেন। এ বিষয়টিকে সরলীকরণ করা উচিত নয়। এটা নিছকই শিয়া-সুন্নি বিরোধ হিসেবে দেখতে চাই না। যদিও নিঃসন্দেহে এখানে একটা ঐতিহাসিক বিরোধ আছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে প্রতিটি রাষ্ট্রের একটা লজিক আছে। বিভিন্ন রাষ্ট্রে স্বার্থাণ্বেষী শ্রেণীর যারা ক্ষমতায় আছে তাদের কারণেও অনেকগুলো দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। আর সেই দ্বন্দ্বের মধ্যে রয়েছে ইরান বনাম মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য সুন্নি প্রধান আরবদেশগুলোর বিভেদ। ফলে আমরা একটা রিফ্লেকশন দেখতে পাই অবরুদ্ধ গাজার হামাস এবং লেবাননের হিজবুল্লাহর ব্যাপারে ইরানের যে পরিমাণ সুদৃষ্টি রয়েছে সুন্নিপ্রধান আরব রাষ্ট্রগুলো সেভাবে দেখছে না। তবে এ বিষয়টির সমাধান আরব এবং ইরানের করা উচিত। তবে বাইরে থেকে বলে হঠাৎ করে এর সমাধান একদিনে হয়ে যাবে এমন আশা করাটা কঠিন।

তাছাড়া সৌদি আরবসহ বেশ কিছু আরব রাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ট। ফলে সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার কথা যখন আমরা বলি সেই ব্যবস্থা তো একইসঙ্গে জায়নিস্ট ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠানগুলো তাই সে যুক্তরাষ্ট্র হোক, সৌদি আরব হোক বা অন্য যেকোনো রাষ্ট্রের কথা বলা হোক না কেন- সেটা এই ব্যবস্থারই অংশ হিসেবে আছে। ফলে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সঙ্গে যারা ঘনিষ্ট তারা স্বভাবতই অবরুদ্ধ গাজার যুদ্ধের পক্ষে থাকবে না; থাকার কথাও না।

আমরা গাজায় ইসরাইলের এতবড় গণহত্যা দেখলাম এবং হামাস গাজাবাসীকে রক্ষার জন্য যে প্রতিরোধ যুদ্ধ করছে সেখানে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলো নীরব থাকছে। তারমানে এখানে একটা বিষয় স্পষ্ট যে- মুসলিম পরিচয়টা এখানে ইরিলিভেন্ট। মুসলিম পরিচয়টা এখানে পোশাকি। মূল প্রশ্নটি হচ্ছে আসলে আপনি মজলুমের পক্ষে নাকি মজলুমের বিপক্ষে? সেখানে যারা জালিম ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে নীরব থাকছে বা জালিমদের পক্ষে সহায়তা করছে তারা তো মজলুমের লড়াইকে সমর্থন করবে না। এতে আমাদের অবাক হওয়ার কিছু নেই। ফলে আমি এটাকে শিয়া-সুন্নির বিরোধ হিসেবে দেখতে চাই না। আমি দেখতে চাই- সত্যিকারার্থে জালিম ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মজলুম কিভাবে লড়াই করছে!

প্রশ্ন: অনেকেই বলে থাকেন ইসরাইল হচ্ছে আমেরিকার একটি এক্সটেনশন রাষ্ট্র। কথাটা কতটা যৌক্তিক?

ফরহাদ মজহার:
ইসরাইল আসলেই যুক্তরাষ্ট্রের একটি এক্সটেনশন রাষ্ট্র। ইসরাইল হচ্ছে সেটলার কলোলিয়ানিস্ট রাষ্ট্র। শুধু আমেরিকা নয়; একটা কথা মনে রাখতে হবে যে ইউরোপে ইহুদিদের ওপর নির্যাতন হয়েছে। ইউরোপ ইহুদিদের চায় না। ইউরোপে এটা সাদাদের স্বভাবগত এবং সাংস্কৃতিক মারাত্মক সমস্যা। ফলে সেখানে ইহুদিদের থাকতে না দিয়ে আরবের ফিলিস্তিনে ইসরাইলকে সেটেল করে দেয়। তারা অন্য যেকোনো জায়গায় যেতে পারতো। উগান্ডায় বা আর্জেন্টিনায় যেতে পারত; কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি আদি জায়নিস্ট লিডারদের দাবি এমন ছিল না যে শুধুমাত্র মধ্যপ্রাচ্যেই যেতে হবে।

এখন ইসরাইলের নেতারা বা ইসরাইল নিজে যেকথাগুলো বলছে যে এটা তাদের ভূমি এবং তাদের ধর্মগ্রন্থে লেখা আছে। এই দাবি কিন্তু আদি জায়নিস্টরা কখনো বলেনি। আর সে কারণেই আমি আগেই বলেছি যে, এটা ইহুদিবাদী বা ধর্মবাদী আন্দোলন ছিল না। এটা তখন ছিল জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। সেখান থেকে সরে এসে এখন তারা ফিলিস্তিনে ‘সেটলার কলোনিয়ালিজম’ গড়ে তুলেছে। ফিলিস্তিনের ভূ-খণ্ডে ইসরাইলিদেরকে সেটেল করার পর মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, তাদের যে অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং তাদের যে সামরিক স্বার্থ সে স্বার্থরক্ষার ক্ষেত্রে ইসরাইল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সেই সামগ্রিক স্বার্থের অংশ হিসেবেই সবাই বলে থাকে ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রেরই সম্প্রসারণ ছাড়া অন্য কিছু নয়। অবশ্যই আমেরিকার এক্সটেনশন রাষ্ট্র হচ্ছে ইসরাইল। আমেরিকা নিজেও একটা সেটলার কলোনিস্ট দেশ এবং ইসরাইলও তাই। ফলে তাদের মধ্যে চরিত্রগত মিল থাকবেই।

নিউজ পেজ২৪/ইএইচ