সাক্ষাৎকার

অগাস্ট ২৫, ২০১৪, ৯:১৪ অপরাহ্ন

কর্তৃত্ববাদী শাসন জনগন মানবে না: মনিরুজ্জামান

নিউজ পেজ ডেস্ক

জাতীয় অধ্যাপক ও খ্যাতিমান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী তালুকদার মনিরুজ্জামানের জন্ম ১৯৩৮ সালের ১ জুলাই সিরাজগঞ্জের কাজীপুরে। জগন্নাথ কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পড়াশোনা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে অনার্স এবং তার পরের বছর মাস্টার্স করেন। কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে কানাডা গিয়ে ১৯৬৭ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিএইচডি লাভ করেন। ওই বছর তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হন। ২০০৬ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেন। তিনি ‘মিলিটারি উথড্রল ফ্রম পলিটিকস’, ‘রেডিক্যাল পলিটিক্স অ্যান্ড দ্য ইমার্জেন্সি অব বাংলাদেশ’, ‘দ্য বাংলাদেশ রেভিউলিশন অ্যান্ড ইটস আফটারমাথ’, ‘সিকিউরিটি অব স্মল স্টেটস’সহ অনেকগুলো বইয়ের লেখক।

জাতীয় অধ্যাপক ও খ্যাতিমান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী তালুকদার মনিরুজ্জামান বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন। সাক্ষাতকার নিয়েছেন সাংবাদিক আলফাজ আনাম।


প্রশ্ন: জানুয়ারির ৫ তারিখের নির্বাচনের পর দেশের রাজনীতি এখন কোন গন্তব্যে যাচ্ছে?


তালুকদার মনিরুজ্জামান : দেশ আরো সঙ্কটের দিকে যাচ্ছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ। দেশে ও বিদেশে এই নির্বাচনের কোনা গ্রহণযোগ্যতা নেই। এই নির্বাচন নিয়ে জনগনের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা আছে। তা থেকে আমি সংঘর্ষের আশঙ্কা করছি। সঙ্কট এড়ানোর জন্য দুদলের মধ্যে সমঝোতা হওয়া দরকার। আর সমঝোতার ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব বেশি।



প্রশ্ন : অনুদার গণতন্ত্র থেকে দেশ কী কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে যাচ্ছে?

তালুকদার মনিরুজ্জামান : হ্যা আমারও তো তাই মনে হয়। দেশ কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে যাচ্ছে।



প্রশ্ন : বিএনপি নেতারা বলছেন দেশে এক দলীয় শাসনের চেষ্টা চলছে তাদের এই বক্তব্য কিভাবে দেখেন?

তালুকদার মনিরুজ্জামান : আওয়ামী লীগ একদলীয় শাসনের দিকে যেতে চাইবে। কিন্তু শক্ত বিরোধী দল থাকায় একদলীয় শাসনের দিকে যেতে পারবে না।



প্রশ্ন: কিন্তু অনেকের ধারনা বিএনপি শক্ত বিরোধী দলের ভ’মিকা পালন করতে পারছে না?

তালুকদার মনিরুজ্জামান : এই ধারণা বিএনপিকে দূর করতে হবে। বিএনপিকে একটি শান্তিপূর্ন ও শক্ত আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। জনসম্পৃক্ত আন্দোলন।



প্রশ্ন : সাধারন মানুষ তো আর রাস্তায় নেমে আন্দোলন করবে না?

তালুকদার মনিরুজ্জামান: এটা নির্ভর করবে বিএনপির নেতৃত্বের ওপর। যদি তারা জনগনকে সম্পৃক্ত করতে পারে তাহলে অবশ্যই তারা নামবে। বিএনপির জনসভাগুলোতে প্রচুর লোক সমাগম হয়। বিএনপির ওপর জনগনের সমর্থন আছে।



প্রশ্ন : কিন্তু সংসদেও তো বিরোধী দল আছে

তালুকদার মনিরুজ্জামান : না ওটা কোনো কাজের বিরোধী দল নয়। নামকাওয়াস্তে বিরোধী দল। বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতীয় পার্টির কোনো ভবিষ্যত নেই।



প্রশ্ন : ক্ষমতাসীন দলের অনেক নেতা বলেন এখন গণতন্ত্রের চেয়ে উন্নয়ন বেশি দরকার। আসলে কোনটা বেশি দরকার?

তালুকদার মনিরুজ্জামান : গণতন্ত্র প্রথমে। গণতন্ত্র থাকলে উন্নয়ন হয় না এই ডকট্রিন এখন আর নেই।



প্রশ্ন: মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরের উদহরণ আছে এক দল বার বার ক্ষমতায় আছে, এসব দেশে উন্নয়ন হয়েছে।

তালুকদার মনিরুজ্জামান: এসব দেশে গনতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর আঘাত হানা হয় না। সাংবিধানিক প্রতিষ্টান স্বাধীনভাবে কাজ করে। সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রন করা হয় না। বাংলাদেশের পরিস্থিতিতো সম্পূর্ন ভিন্ন।



প্রশ্ন : বিচারপতিদের অভিসংশনের ক্ষমতা সংসদ পাচ্ছে বিষয়টি কিভাবে দেখেন?

তালুকদার মনিরুজ্জামান : বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব হবে।



প্রশ্ন : কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ আরো অনেক দেশে পার্লামেন্টের এই ক্ষমতা আছে?

তালুকদার মনিরুজ্জামান : বাংলাদেশে পার্লামেন্ট তো সার্বভৌম নয়। আর্টিকেল ৭০ তো এর প্রমান। বিচারপতিদের সামনে তরবারি ঝুলানো হলো আর কি।



প্রশ্ন: নতুন সম্প্রচার নীতিমালা হচ্ছে এ নিয়ে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে আপত্তি আছে এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য জানতে চাই?

তালুকদার মনিরুজ্জামান : এগুলো গনতন্ত্র নিয়ন্ত্রনের চেষ্টা। কর্তৃত্ববাদী সরকার সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রন করতে চায়।



প্রশ্ন : সরকারের এসব উদ্যেগের মধ্যে ১৯৭৪ সালের বাকশালের সাথে অনেকে তুলনা করছেন। কোনো পার্থক্য বা সাযুজ্য দেখেন কি?

তালুকদার মনিরুজ্জামান : সাযুজ্য তো দেখছি। তবে এ দেশের মানুষ এসব মেনে নেবে না।



প্রশ্ন : বিএনপি কী এমন পরিস্থিতি মোকাবেলা করার সামর্থ্য রাখে?

তালুকদার মনিরুজ্জামান : সামর্থ্য না থাকলে অর্জন করার চেষ্টা করতে হবে। জনগন তাদের সাথে থাকবে।



প্রশ্ন: ক্ষমতাসীনরা বলছেন বিএনপি জামায়াতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে আপনি কিভাবে দেখেন?

তালুকদার মনিরুজ্জামান : বিএনপির শক্তি নিজস্ব শক্তি। জামায়াতের শক্তিতে বলিয়ান নয়। বিএনপিকে সেই রুটের দিকে যেতে হবে। মনে রাখতে হবে বিএনপি একটি সমর্থক নির্ভর বড় দল।



প্রশ্ন: জামায়াতের সাথে সরকারের আতাত হচ্ছে এমন গুঞ্জনও আছে আপনি কী মনে করেন?

তালুকদার মনিরুজ্জামান: আমি তা মনে করি না। এখন জামায়াতের সাথে শেখ হাসিনার আতাত করা সম্ভব হবে না। তিনি জামায়াত নেতাদের বিচার করে রাজনৈতিক ফায়দা নেয়ার চেষ্টা করছেন। সেই চেষ্টা তিনি অব্যাহত রাখবেন।



প্রশ্ন : সুশীল সমাজের ভ’মিকা কেমন দেখছেন?

তালুকদার মনিরুজ্জামান : সুশীল সমাজ এখন অনেক সক্রিয়। টকশো, রাউন্ড টেবিলে তারা কথা বলছেন। এর প্রভাব পড়ছে বলে তো সরকার এখন টকশো নিয়ন্ত্রন করতে চাইছে।



প্রশ্ন : সরকারের যে অনমনীয় ও কঠোর অবস্থান নিচ্ছে এই শক্তির উৎস কোথায়?

তালুকদার মনিরুজ্জামান : সরকার বিএনপিকে দূর্বল মনে করে। তারা মনে করে বিএনপি কিছু করতে পারবে না। এই মনোভাব তাদেরকে এ দিকে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এ ধারণা ভুল। সংখ্যাগরিষ্ট জনগনের বিরুদ্ধে গিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকা যায় না।



প্রশ্ন : ভারতের নতুন সরকারের সাথে সর্ম্পক কেমন মনে হচ্ছে?

তালুকদার মনিরুজ্জামান : আওয়ামীলীগের সাথে মোদির সর্ম্পক কংগ্রেসের মতো হবে না। সুষমা স্বরাজ তো ঢাকায় বলেছেন তারা কোনো বিশেষ দল নয় জনগনের সাথে সর্ম্পক চান।



প্রশ্ন : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর সাথে সরকারের এক ধরনের দূরত্ব লক্ষ করা যাচ্ছে এর শেষ কী হতে পারে?

তালুকদার মনিরুজ্জামান : এই সর্ম্পক যে চরম খারাপ পর্যায়ে যাবে তা নয়। ৭৪ সালের মতো হবে না। তবে সরকারের ওপর তাদের চাপ থাকবে।



প্রশ্ন: আফ্রিকার অনেক দেশে তো কর্তৃত্ববাদী সরকার ক্ষমতায় দীর্ঘদিন আছে বাংলাদেশে বাধা কোথায়?

তালুকদার মনিরুজ্জামান : বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ভিন্ন। গনতন্ত্র এ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ। গনতান্ত্রিক শাসনের সুফল তারা পেয়েছে। এখানে শ্রীলংকা বা আফ্রিকার কোনো কোনো দেশের মতো কর্তৃত্বাদী সরকার বহুদিন শাসন করতে পারবে না। জনগন এ ধরনের শাসন মেনে নেবে না।



প্রশ্ন: দেশের এই রাজনৈতিক সঙ্কট থেকে উত্তরনের পথ কী?

তালুকদার মনিরুজ্জামান : সঙ্কট দূর করার একটাই পথ একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সবার অংশগ্রহণমুলক গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। বিএনপিকে এই দাবিতে আন্দোলন করতে হবে। জনগনের সমর্থন যে তাদের প্রতি আছে তা দেখাতে হবে।

নিউজ পেজ২৪/ইএইচ