সাক্ষাৎকার

সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৪, ১০:১২ পূর্বাহ্ন

বিএনপি ভাঙার সুযোগ নেই দল থেকেও অবসর নয়

নিউজ পেজ ডেস্ক

‘বইটি না পড়ে যারা আমার সমালোচনা করছেন তারা দলের মঙ্গল চান না’- এমন মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ।

তিনি বলেন, ‘তারা আমার সম্পর্কে যে রূঢ় মন্তব্য করছেন বইটি পড়ার পর তারা একদিন অনুতপ্ত হবেন।’ বইটি প্রকাশের পর এ নিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে কোনো কথা হয়নি জানিয়ে প্রবীণ এই আইনজীবী বলেন, ‘তিন সপ্তাহ আগে এ বইয়ের প্রথম কপিটি আমি ম্যাডামকে দিয়েছিলাম। আমার মনে হয়, আমার দলেরই কেউ আমার বইটি না পড়ে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে ম্যাডামকে ভুল বুঝিয়েছেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এ বইটির যখন সঠিক মূল্যায়ন হবে তখন আর কোনো ভুল বোঝাবুঝি থাকবে না। ম্যাডামের সঙ্গে কোনো মাধ্যমেও আলাপ-আলোচনা হয়নি। তবে ম্যাডামের প্রতি আমার অকুণ্ঠ আস্থা আছে। উনি যদি বইটি সম্পর্কে কোনো কিছু জানতে চান তাহলে অবশ্য আমি সানন্দে তাকে জানাব। আশা করি, কোনো ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ থাকবে না।’

গতকাল সন্ধ্যায় গুলশানের নিজ বাসায় খোলামেলা আলাপকালে এসব কথা বলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র এই সদস্য। এ সময় তিনি তার স্মৃতিপটে আসা বইটি লেখার প্রেক্ষাপট ও ওয়ান-ইলেভেনের ঘটনাগুলো বর্ণনা করেন।বইটি প্রকাশের পর বিএনপিতে ভাঙনের সৃষ্টি হতে পারে- সমালোচকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ৭৭ বছর বয়সী এই রাজনীতিবিদ বলেন, বিএনপিতে ভাঙনের কোনো সুযোগ নেই। এ দলটি বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের সুদৃঢ় নেতৃত্বে এগিয়ে চলছে। ভাঙনের কোনো অবকাশ নেই। দল থেকে অবসর নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই জানিয়ে ব্যারিস্টার মওদুদ বলেন, ‘আমি দল থেকে অবসরের কোনো চিন্তা করছি না। এ ধরনের কোনো প্রশ্নই আসে না। দলে যদি কেউ আমাকে নিয়ে কোনো মন্তব্য করে থাকেন তা তিনি ব্যক্তিগতভাবে করেছেন। চেয়ারপারসন এ নিয়ে আমাকে কোনো কথা বলেননি।’

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের লেখা ‘বাংলাদেশ : ইমারজেন্সি অ্যান্ড দি আফটারম্যাথ : ২০০৭-২০০৮’ বইয়ে ২০০৮ সালের নির্বাচনে ফখরুদ্দীন-মইন উদ্দিন সরকারের নানা ঘটনাবলি, বিএনপির পরাজয়ের কারণসহ নানা ভুলত্রুটি তুলে ধরা হয়।

গত শনিবার সুপ্রিম কোর্ট বার মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বইটির মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এরপর বিএনপিতে এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে।

ব্যারিস্টার মওদুদ বলেন, ‘আমি দলীয়ভাবে বইটি লিখিনি। দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখা হয়নি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমি একজন নির্মোহ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হিসেবে বইটি লিখেছি। এখানে আমি আমার নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করেছি। বইটি লেখার একপর্যায়ে আমাকে আমার দলের পরাজয়ের কারণগুলো বিশ্লেষণ করতে হয়। সে ব্যাপারে কারও দ্বিমত থাকতেই পারে।’তিনি বলেন, ‘আমি এগুলো উল্লেখ করেছি এই চিন্তা করে, যে ভুল আমরা করেছি সেগুলো যেন সংশোধর করতে পারি। তাহলে জনগণের ভোটে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে আমরা আবারও সরকার গঠন করতে পারব।’ তিনি বলেন, ‘আমি বিএনপির একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ২০০৮ সালে আমরা যে কঠিন পরিস্থিতিতে নির্বাচন করেছি এবং নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার যে কারণগুলো উল্লেখ করেছি সেগুলো দলের মঙ্গলের জন্যই করেছি।’

সাবেক এই আইনমন্ত্রী দাবি করেন, ‘বইটি পুরোটাই না পড়ে আমাদের দফতর সম্পাদক রুহুল কবীর রিজভী যে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন সে ধরনের প্রতিক্রিয়া তার দিক থেকে আসা ঠিক হয়নি। আমাকে টেলিফোন করলে আমি তাকে বিষয়টি বোঝাতে পারতাম। সারা বই থেকে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু কথা তুলে এনে এ মূল্যবান বইটির মূল বিষয়বস্তু থেকে সরে যাওয়া হয়েছে। আমার মনে ভয় ছিল, বইটি ছাপালে বর্তমান সরকার আমার ওপর অসন্তুষ্ট হবে। আমাকে আবার জেলে যেতে হবে। এও ভেবেছিলাম, আমার এ বইটি লেখার জন্য দলের তরফ থেকে সাধুবাদ জানানো হবে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে দেখলাম, বইটি সম্পূর্ণভাবে মূল্যায়ন না করে আমার সম্পর্কে অনেক সমালোচনা করা হয়েছে।’

ব্যারিস্টার মওদুদ বলেন, ‘একটি বই লেখা অত্যন্ত কঠিন কাজ। এটা হঠাৎ করেও ছাপা যায় না। বই লিখতে ও ছাপাতে অনেক সময় লাগে। অনেক দিনের কঠোর ফসল একটি বই। এটা প্রকাশে আমার ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থও জড়িত নয়। সুতরাং বই ছাপাতে বিশেষ সময় বা বিশেষ পরিস্থিতি নির্ধারণ করা সম্ভবপর নয়। এটা স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া।’ বইটি প্রকাশের পর সমগ্র বাংলাদেশের জেলা পর্যায়, ঢাকার আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষকসহ বিভিন্ন মহল থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে বলেও জানান তিনি।

প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ বলেন, ‘এ বইটি আমি লিখেছিলাম কারাগারে বসে ২০০৭-০৮ সালে। ওই সময় তিনটি বই লিখেছিলাম। এটি ছিল শেষের দিকে লেখা তৃতীয় বই, যা সম্পন্ন করা হয় ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নতুন সরকার গঠনের পরপরই। এ বইয়ের মুখবন্ধে আমার অন্যান্য বইয়ের মতো স্পষ্টভাবে লেখা আছে যে, বইয়ে যদি কোনো ভুল থাকে তার পুরো দায়িত্ব আমার। যেসব অভিব্যক্তি এ বইয়ে প্রকাশ করা হয়েছে তা নিতান্তই আমার ব্যক্তিগত। আমার রাজনৈতিক দলের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হিসেবে অনেক পরিশ্রম এবং গবেষণা করে এ ধরনের বস্তুনিষ্ঠ বই লেখার চেষ্টা করি।’ তিনি বলেন, ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি আইনের আবরণে মূলত এটাই ছিল একটি সেনা অভ্যুত্থান। এ অভ্যুত্থানে সেনাবাহিনী সম্পৃক্ত ছিল না।

সেনাপ্রধানের ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার জন্য তার অনুগত অল্প কিছু জেনারেল এবং সামরিক কর্মকর্তা এ প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিলেন।বইয়ের বিষয়বস্তু তুলে ধরে বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘আমাদের ইতিহাসে ২০০৭-০৮ সালের সরকারটি ছিল একটি অসাংবিধানিক সরকার। এটি ছিল একটি কলঙ্কিত অধ্যায়। বাংলাদেশের মানুষের জন্য ছিল একটি অভিশাপ। এ সরকারের কর্মকাণ্ড এবং সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাদের ভূমিকা এ বইতে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। এ সময়কালে দেশের সব প্রতিষ্ঠানের ওপর আঘাত হানা হয়। রাজনীতি, রাজনৈতিক দল, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতাসহ সব ক্ষেত্রে ওই সরকারের স্বৈরাচারী হস্তক্ষেপের কারণে দেশের যে অবর্ণনীয় ক্ষতি তারা করে গেছেন তারও বিস্তারিত বিবরণ এ বইতে আলোচনা করা হয়েছে।’

ব্যারিস্টার মওদুদ বলেন, সেনাপ্রধান নিজে রাষ্ট্রপতির আসন দখল করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সে আকাক্সক্ষা পূরণ করার মতো তার সুনির্দিষ্ট কোনো রোডম্যাপ ছিল না। দিগিন্তদিকশূন্যভাবে বিভিন্ন পথে তিনি এগিয়েছিলেন। প্রথমে শুরু করলেন দুই নেত্রীর চরিত্রহনন করে রাজনীতি থেকে তাদের বিতাড়িত করার চেষ্টা। বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা হয়। সেখানে বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন ও বলিষ্ঠ অবস্থানের কারণে এবং বিদেশ গমনে তার দৃঢ় অনিচ্ছা সে প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দেয়। এরপর তারা চেষ্টা করেছেন দুই নেত্রীর সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতায় আসতে। যাকে বলা হয়েছিল প্লাস টু থিওরি। সেখানে সেনাবাহিনীর তরফে সাংবিধানিক সংস্কারের ওপর যেসব প্রস্তাব আনা হয়েছিল সেগুলো বিএনপি চেয়ারপারসন সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন।

ব্যারিস্টার মওদুদ বলেন, বইটির ১২ অধ্যায়ে দুই নেত্রীর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা এবং শেখ হাসিনার সঙ্গে সমঝোতার বিষয়টি বিস্তারিত বলা হয়েছে। ২০০৮ সালের মে মাসে হাসিনার সঙ্গে সমঝোতা হয়ে যায়। যে কারণে হাসিনাকে সুপ্রিম কোর্ট দ্বারা তার জামিন না মঞ্জুর হওয়া সত্ত্বেও সরকার প্রশাসনিক আদেশবলে তাকে মুক্তি দেয়। চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দেয়।

তিনি বলেন, শুধু তাই নয়, প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন টেলিফোনে হাসিনার সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং শুভযাত্রা কামনা করেন। একইভাবে চার উপদেষ্টা তার বাড়িতে গিয়ে তাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে আসেন। শুধু তাই নয়, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে যে ১৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল রাতারাতি সমঝোতা করে তাকে ২০০৮ সালের ১১ জুন প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে লোগান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সেখানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানান। অর্থাৎ তখন থেকেই ধরে নেওয়া হয়, শেখ হাসিনাকে সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হয়। সেই সময় আরও ধরে নেওয়া হয়, বাংলাদেশের পরবর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হবেন শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত সরকারের প্রধান হবেন হাসিনা।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র এই আইনজীবী বলেন, ১১ মার্চ বিদেশ যাওয়ার সময় শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি ক্ষমতায় গেলে ফখরুদ্দীন-মইন উদ্দিন সরকারের বৈধতা দেবেন। পরে তা-ই দিয়েছিলেন। নির্বাচনের পর তিনি সেই সমঝোতা অনুযায়ী তাদের শাসনামলকে বৈধতা দিয়েছিলেন। ফখরুদ্দীন-মইন উদ্দিনকে দেশ থেকে প্রস্থানের একটি সহজ ব্যবস্থা করে দেন।

বিএনপির এই নেতা বলেন, বইটিতে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। এ নির্বাচনের অবাধ, সুষ্ঠু ও স্বতঃস্ফূর্ত কোনো পরিবেশ ছিল না। নির্বাচনের মাত্র ১১ দিন আগে জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করা হয়। যদিও নির্বাচনের দিনটি ছিল শান্তিপূর্ণ। কিন্তু পরে দেখা গেছে, সেই নির্বাচনে চরম অনৈতিকতা, অনিয়ম ও কারচুপি করা হয়েছিল। যেমন ভোট পড়েছিল ৮৭ শতাংশ। ৮৫টি নির্বাচনী এলাকায় ভোট পড়েছিল ৯০ থেকে ৯৬ শতাংশ। কোনো কোনো কেন্দ্রে ১০২ ভাগও ভোট পড়ে। ১ লাখ ৭৭ হাজার ২৭৭টি কেন্দ্রে প্রতি মিনিটে ১টি করে ভোট পড়ে, যা ছিল সম্পূর্ণ অবাস্তব। ব্যালট পেপারের কিছু অংশ সেনাদের ছাপাখানায় ছাপানো হয়। অনেক ব্যালট বাক্স ভর্তি করা অবস্থায় আগে থেকেই প্রিসাইডিং অফিসারদের কাছে রেখে দেওয়া হয়। এ ধরনের আরও অনেক তথ্য বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নির্বাচনটি কোনোভাবেই সুষ্ঠু হয়নি। মওদুদ আহমদ বলেন, জরুরি আইন প্রত্যাহার না করলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন না বলেও ঘোষণা দিয়েছিলেন বেগম জিয়া। কিন্তু নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য জামায়াত প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছিল, যার কারণে শেষ পর্যন্ত নিজেদের দলের নানা অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও দেশে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার স্বার্থে তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। যদিও আওয়ামী লীগ আগেই ঘোষণা করেছিল, জরুরি আইনের অধীনে তারা নির্বাচনে যাবে না। কিন্তু তারা সেই অবস্থান থেকে ফিরে এসে জরুরি আইনের মধ্যেই নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তখন ভারতের হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী প্রকাশ্যে বলেছিলেন, জরুরি আইনের অধীনেও নির্বাচন হতে পারে। তখন বুঝতে আর বাকি থাকে না, আওয়ামী লীগ পরবর্তী সরকার গঠন করছে।

নিউজ পেজ২৪/এইচএস