সাক্ষাৎকার

সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৪, ৫:৪৪ অপরাহ্ন

বাঘ রক্ষা পেলে সুন্দরবন রক্ষা পাবে : ড. মনিরুল

নিউজ পেজ ডেস্ক

ড. এম মনিরুল এইচ খান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক। বাঘ নিয়ে গবেষণার আগ্রহ ছাত্রজীবন থেকে। ২০০০ সালে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে গিয়ে বাঘের ওপর একাডেমিক গবেষণা শুরু করেন। কাজ করেছেন সুন্দরবনে। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে বাঘ গবেষণায় আছেন। লন্ডনের জ্যুয়োলজিক্যাল সোসাইটির সহযোগিতায় ছবি তোলার মাধ্যমে তিনি ২০০৬ সালে সুন্দরবনে বাঘ গণনার কাজটি করেন। এম মনিরুল এইচ খান জানান, বর্তমানে পৃথিবীর ১৩টি দেশে বুনো বাঘের বিচরণ রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এক সময় গাজীপুর, সিলেট, চট্টগ্রাম, রংপুর, যশোর, খুলনা ও বরিশালসহ বাংলাদেশের ১৭টি জেলায় বুনো বাঘের বিচরণ ছিল। এখন আছে শুধু সুন্দরবনে।

বিলুপ্তপ্রায় বিরল প্রজাতির এই প্রাণীটির অস্তিত্ব রক্ষায় বাংলাদেশ যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে। গত ১৪ থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে হয়ে যাওয়া দ্বিতীয় বাঘ সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন ড. এম মনিরুল এইচ খান। নিচে তার সাক্ষাৎকার তুলে ধরা হলো-

প্রশ্নকারী : সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অস্তিত্ব রক্ষায় বাংলাদেশ খুবই গুরুত্ব দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। এই গুরুত্বের কারণ কী?

ড. মনিরুল : বর্তমান পৃথিবীর যে সব বন্যপ্রাণীর অস্তিত্ব প্রায় বিলীন হতে চলেছে তার মধ্যে বাঘ অন্যতম। সৌভাগ্যের বিষয় হলো দেরিতে হলেও বাংলাদেশ বাঘ রক্ষায় এখন যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক টাইগার স্টকটেকিং সম্মেলন ঢাকায় আয়োজন করাতে সেই গুরুত্ব আরও বেড়েছে। ২০১০ সালের জুলাই মাসে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে হওয়া প্রথম টাইগার সামিটেও আমাদের প্রধানমন্ত্রী অংশগ্রহণ করেছিলেন।
বাঘ রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে, পরিবেশবান্ধব পর্যটনের কথা যদি চিন্তা করেন তাহলে দেখবেন বাঘ থাকার কারণেই দেশী-বিদেশী বিপুলসংখ্যক পর্যটক সুন্দরবন ভ্রমণ করতে যান।

দ্বিতীয়ত, সুন্দরবনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বন রক্ষায় বাঘের অনেক ভূমিকা আছে। একটা বাগানে মালির যে ভূমিকা বাঘও সেই ভূমিকা পালন করে।

প্রশ্নকারী : যেমন?

ড. মনিরুল : বাঘ বনের মধ্যে তার শিকার প্রাণীকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখে। বাঘ এ সব প্রাণী শিকার করে জীবনধারণ করে। আবার ওই সব প্রাণী (যেমন, হরিণ) বনের গাছ-গাছড়া খেয়ে জীবনধারণ করে। বনের গাছ খেয়ে যে সব প্রাণী জীবনধারণ করে সেগুলো যদি নিয়ন্ত্রণে না থাকে তাহলে বন টিকবে না। এভাবে বাঘ বনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখে।

আমাদের জাতীয় প্রাণী হিসেবেও বাঘের গুরুত্ব আছে। বিশ্ব দরবারে বাঘকে আমরা ব্র্যান্ড হিসেবে ব্যবহার করি। ফলে প্রাণীটি আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের অংশীদার। আমাদের রূপকথার অনেক গল্পের মূল উপজীব্য বাঘ। অর্থাৎ আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে বাঘের বসবাস।


একই সঙ্গে বাঘকে রক্ষা করতে পারলে আমরা আমাদের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের অন্য অনেক প্রাণীকে রক্ষা করতে পারি। যেমন- বাঘকে কেন্দ্র করে সুন্দরবনের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা থাকলে বিশাল এই ম্যানগ্রোভ বনটি সুরক্ষিত হবে। এখানে হাজার ধরনের অন্যান্য প্রাণী আছে সেগুলো রক্ষা পাবে। এর গুরুত্ব তাই বহুমুখী। বাঘ রক্ষা পেলে সুন্দরবনও রক্ষা পাবে। সুন্দরবন আমাদের কীভাবে সুরক্ষা দেয় তার প্রমাণ বড় ঝড়গুলোতে পেয়েছি।

প্রশ্নকারী : বিশ্ব প্রেক্ষাপটে গত একশ’ বছরের হিসেবে ৯৭ শতাংশ বাঘ বিলীন হয়েছে বলে রিপোর্টে প্রকাশ। এদিক থেকে বর্তমানে বাংলাদেশে বাঘের সংখ্যা কত?

ড. মনিরুল : ৭০-৮০ বছর আগেও দেশের বিভিন্ন জঙ্গলে বাঘ ছিল। মধুপুর, ভাওয়াল, সিলেট ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন জঙ্গলে বাঘ ছিল। এমনকি বর্তমান শাহজালাল (র.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশে থাকা জঙ্গলেও বাঘ ছিল পঞ্চাশের দশকে। কিন্তু এখন এসব এলাকার অনেক জায়গায় জঙ্গলই নেই। তাই বিশ্ব প্রেক্ষাপটে যে প্রতিবেদন বেরিয়েছে তা কমবেশি আমাদের দেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

প্রশ্নকারী : ঠিক কতগুলো বাঘ বাংলাদেশে আছে এ রকম কোনো গ্রহণযোগ্য হিসেব আছে?

ড. মনিরুল : বাংলাদেশে বিদ্যমান বাঘের সঠিক বা গ্রহণযোগ্য পরিসংখ্যান এখনও অজানা। জাতিসংঘ ও বাংলাদেশের বন বিভাগের যৌথ উদ্যোগে করা এক জরিপে ২০০৪ সালে বাংলাদেশের সুন্দরবনে ৪৪০টি বাঘ আছে বলে জানানো হয়েছিল। জরিপটি করা হয়েছিল বাঘের পায়ের ছাপের ভিত্তিতে। কিন্তু বাঘ গণনার এই পদ্ধতিতে অনেক দুর্বলতা আছে।

লন্ডনের জ্যুয়োলজিক্যাল সোসাইটির সহযোগিতায় ছবি তোলার মাধ্যমে ২০০৬ সালে আমি একটি জরিপ করেছিলাম। তাতে বাঘের সংখ্যা পাওয়া গেছে ২০০টি।

বর্তমানে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন ও ভারতের বন বিভাগের সহায়তায় আমাদের বন বিভাগ ক্যামেরা পদ্ধতিতে নতুন জরিপ শুরু করেছে গত জুন মাস থেকে। এই জরিপটি শেষ হলে গ্রহণযোগ্য একটি প্রতিবেদন পাওয়া যাবে বলে আশা করি।

প্রশ্নকারী : বাংলাদেশ বাঘ সংরক্ষণে যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে কথা বলছে, অনুষ্ঠান-পরিকল্পনা করছে, বাস্তবায়ন হচ্ছে কতটুকু?

ড. মনিরুল : বাঘ রক্ষায় যে দেশগুলো নেতৃস্থানীয় অবস্থানে আছে, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রথম সারিতে আছে ‘আনুষ্ঠানিকতার’দিক থেকে। কিন্তু বাংলাদেশে জরুরি হচ্ছে বাঘ রক্ষায় নেওয়া পরিকল্পনাগুলো মাঠ পর্যায়ে সুষ্ঠু বাস্তবায়ন।

প্রশ্নকারী : বাস্তবায়নের অবস্থা কী?

ড. মনিরুল : এক্ষেত্রে অনেক ঘাটতি আছে আমাদের। যেমন পর্যাপ্ত সংখ্যক পেট্রোল পোস্ট, অধিক জনবল, আধুনিক প্রশিক্ষণের পুরোপুরি বাংলাদেশ করতে পারছে না।

এর বাইরে আরও কিছু উদ্যোগ আছে। যেমন- বাঘ রক্ষায় শুধু বাঘকে গুরুত্ব দিলে হবে না। এর সঙ্গে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে পার্টনারশিপের ভিত্তিতে সহযোগিতার নীতিতে এগুতে হবে। কারণ শুধু বাঘ ও বন রক্ষায় কাজ করলে স্থানীয়রা বঞ্চিত হয়ে অসহযোগিতা করবে। ফলে মূল কাজটি বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না।

প্রশ্নকারী : স্থানীয়দের সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়টি যদি একটু ব্যাখ্যা করে বলেন ...

ড. মনিরুল : সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে অনেক মানুষের জীবন-জীবিকা চলে। বন ও বাঘ রক্ষায় স্থানীয়দের বিশাল ভূমিকা রয়েছে। কারণ তারা যদি স্বাভাবিক জীবন-জীবিকা নির্বাহ করতে না পারেন তাহলে বাঘ ও বনের ক্ষতি করে হলেও জীবনধারণ করতে চাইবেন। এটাই মানুষের বৈশিষ্ট্য।


এর জন্য সরকার একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে। সবগুলো এখনও কার্যকর পর্যায়ে যায়নি। তবে কিছু কিছু কাজ হচ্ছে। যেমন- বাঘের কবলে পড়ে মানুষ বা গবাদি পশুর ক্ষতি হলে কোনো ক্ষতিপূরণ ছিল না। এখন সেটা সীমিত আকারে হলেও চালু হয়েছে।
এ ছাড়া পর্যটকদের এন্ট্রি ফির অর্ধেক অংশ স্থানীয়দের উন্নয়নে ব্যয় করার বিষয়টি সুন্দরবনে এখনও চালু হয়নি। এ সব বিষয় চালু হলে পারস্পরিক স্বার্থে স্থানীয়রা বন ও বাঘ রক্ষায় কাজ করবেন। তাই এই বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশ্নকারী : অতি সম্প্রতি বাংলাদেশে সেকেন্ড গ্লোবাল টাইগার স্টকটেকিং সম্মেলন-২০১৪ হয়ে গেল। এই সম্মেলন সুন্দরবনের বাঘ রক্ষায় কতটা গুরুত্ব বহন করবে?

ড. মনিরুল : আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে এর গুরুত্ব অনেক। এতে জাতীয়ভাবে নীতি-নির্ধারণ পর্যায়ে বাঘ রক্ষায় যেমন প্রভাব ফেলবে তেমনি স্থানীয় জনমানুষের মধ্যে এই সম্মেলন ইতিবাচক প্রভাব রাখবে।


নিউজ পেজ২৪/ইএইচ