সাক্ষাৎকার

অক্টোবর ১৩, ২০১৪, ৫:২২ অপরাহ্ন

বিএনপির আন্দোলনে হতাশ হওয়ার কারণ আছে: পিয়াস করিম

নিউজ পেজ ডেস্ক

বাংলাদেশের ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও টেলিভিশন টক শোর পরিচিত মুখ পিয়াস করিম হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন। সোমবার ভোররাতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে পরিবারের সদস্যরা রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে খবর দেন। অ্যাম্বুলেন্সে করে ধানমন্ডির বাসা থেকে হাসপাতালে নেয়ার পর ভোর সাড়ে ৫টার দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করেন কর্তব্যরত চিকিৎসক।



গত আগস্ট মাসে রেডিও তেহরানকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে পিয়াস করিম বিএনপির সরকার বিরোধী আন্দোলনের ব্যাপারে হতাশা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, বিএনপির নরম কর্মসূচির নেতিবাচক ব্যাখ্যা হচ্ছে তারা শক্ত কর্মসূচি দিতে ব্যর্থ। আর ইতিবাচকভাবে ব্যাখ্যা হচ্ছে তারা সরকারকে টেস্ট করতে চাচ্ছে। বিএনপি আসলে ধাপে ধাপে তাদের কর্মসূচি দিয়ে দেখতে চাচ্ছে সরকারের প্রতিক্রিয়াটা কেমন হয়! তবে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন থেকে ৮ মাস অপেক্ষার পরও কেন এরকম নরম কর্মসূচি দেয়া হলো যে বিষয়ে যৌক্তিক প্রশ্ন উঠতেই পারে।



তার পুরো সাক্ষাৎকারটি নিউজ পেজের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো:



প্রশ্ন :: বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট সম্প্রতি নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। তবে, এসব কর্মসূচিকে নরম কর্মসূচি বলা হচ্ছে। সরকার পতন আন্দোলনের নামে এমন কর্মসূচিতে দল ও জোটের তৃণমূল কর্মীরা খুব একটা খুশি নয়। তাহলে জোট কেন এমন কর্মসূচি দিল বলে মনে হয় আপনার?



অধ্যাপক পিয়াস করিম:
দেখুন এর দু'ধরণের ব্যাখ্যা হতে পারে। এটাকে একটু নেতিবাচক হিসেবে বিএনপির দিক থেকে দেখলে ব্যাখ্যাটা এমন হতে পারে যে- বিএনপি শক্ত কর্মসূচি দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। তাদের আরো শক্ত কর্মসূচি দেয়া উচিত ছিল কিন্তু তারা সেটা দিতে পারছে না, এটা তাদের ব্যর্থতা।



আর বিষয়টি যদি ইতিবাচকভাবে দেখার চেষ্টা করি তাহলে তার ব্যাখ্যাটা হচ্ছে- বিএনপি আন্দোলন নিয়ে মাঠে নামলে সরকার কতোটা নিপীড়ক হয়ে উঠবে সেটা টেস্ট বা পরীক্ষা করতে চাচ্ছে বিএনপি। গাজায় ইসরাইলি হামলার বিরুদ্ধে কালো পতাকা মিছিলের কর্মসূচিটি আপাতদৃষ্টিতে বাংলাদেশের সবচেয়ে নিরাপদ ইস্যু। এই কর্মসূচিটি হয়ে গেছে। এখন তারা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে বলে আমার ধারণা। বিএনপি আসলে ধাপে ধাপে তাদের কর্মসূচি দিয়ে দেখতে চাচ্ছে সরকারের প্রতিক্রিয়াটা কেমন হয়! তো ৫ জানুয়ারির পর ৮ মাস অপেক্ষার কেন এরকম নরম কর্মসূচি দেয়া হলো যে বিষয়ে যৌক্তিক প্রশ্ন উঠতেই পারে। বিএনপি যদি তাদের আন্দোলনকে এই ধাপ থেকে পরবর্তী শক্ত ধাপে নিয়ে যেতে না পারে তাহলে বিএনপিকে একধরণের জবাবদিহি করতে হবে। বিএনপির কর্মীদের সঙ্গে জবাবদিহি করতে হবে, জনগণের সঙ্গে জবাবদিহি করতে হবে। কারণ নাগরিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে, তাদের মধ্যে গণতান্ত্রিক আকাঙ্খা আছে। বিএনপি যদি জনগণের আশা এবং গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে ভাষা দিতে না পারে তাহলে দলটি তাদের প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলবে।



প্রশ্ন :: বিএনপির বর্তমান অবস্থা এবং কর্মসূচি দেখে অনেকে বড় আন্দোলন গড়ে তোলার বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন। কিন্তু বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে ভিন্ন কথা। সার্বিক পরিস্থিতিতে কি মনে হয় ২০ দলীয় জোট বড় কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবে?



অধ্যাপক পিয়াস করিম:
দেখুন আন্দোলনের ইতিহাসের মধ্যে একধরণের আনপ্রিডেকটিবিলিটি থাকে। ১৯৭১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি কিন্তু বোঝা যায় নি ২৬ দিনের মধ্যে একটা মুক্তিযুদ্ধ হবে বাংলাদেশে। ফলে বিএনপির আন্দোলন নিয়ে এই মুহুর্তে সবকিছু বলা যাচ্ছে না। তবে গত ৮ মাসে বিএনপির যে পারফর্মেন্স তাতে হতাশ হওয়ার কারণ আছে। বিএনপির শুভাকাঙ্ক্ষীরাই হতাশ হচ্ছেন। বিএনপির যে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আমি তাদের কথা বলছি না। যারা বিএনপির শুভাকাঙ্ক্ষী, যারা প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে বিএনপির পক্ষে কথা বলেছেন গত ৮ মাসে দলের অবস্থানে তাদের মধ্যেই হতাশা রয়েছে। এই হতাশা কাটবে কি না, বিএনপি একটা ক্রেডিবেল রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে নিজেদের উপস্থাপন করতে পারবে কি না সেটা নির্ভর করবে আগামী কয়েক মাসে বিএনপির কর্মসূচির ওপরে। তারা সেটাকে কতোটা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে সেটাই দেখার বিষয়। আর আন্দোলনটিকে যদি বিএনপি এগিয়ে নিতে যেতে পারে তাহলে সুফলটাও বিএনপি পাবে। আর যদি না পারে তাহলে তার ব্যর্থতার দায়ভারও বিএনপিকে নিতে হবে। আমার ধারণা যে এই মুহুর্তে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে রূপায়িত করার জন্য যদি আন্দোলন করা না যায় তাহলে শুধু বিএনপি যে ক্ষতিগ্রস্ত হবে তাই নয় গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সমস্ত দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।



প্রশ্ন :: সরকার বিরোধী আন্দোলন হলে মাঠে দেখে নেয়ার হুমকি দিয়েছেন সরকারি দলের কোনো কোনো নেতা। বিএনপির পক্ষ থেকেও কেউ কেউ বলেছেন, ঠিক আছে মাঠেই দেখা হবে। অবস্থা দেখে কি মনে হয় আরেকবার বড় ধরনের সহিংসতার মধ্যে পড়তে যাচ্ছে দেশ?



অধ্যাপক পিয়াস করিম:
দেখুন আমি সবসময় একটা কথা বলে এসেছি সেটি হচ্ছে সহিংসতা আসলে মূল ব্যাধি না। সহিংসতা হচ্ছে মূল ব্যাধির একটা সিমটম। আমরা ব্যাধির মূল চরিত্রটা না বুঝে যদি সিমটম নিয়ে কথা বলি তাহলে আমরা সমস্যার সমাধান করতে পারবো না। মৌলিক ব্যাধিটা আসলে কোথায়! মৌলিক ব্যাধিটা হচ্ছে বাংলাদেশে সকলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য এবং নির্ভরযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়া। ব্যাধিটা হচ্ছে বাংলাদেশে এইমুহুর্তে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র কাজ করছে না। যে নির্বাচনে ১৫৩/১৫৪ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়, যে নির্বাচনে শতকরা ৫/৭ জন নাগরিক ভোট দেয়নি বা দিতে পারে নি সে নির্বাচনকে তো গ্রহণযোগ্য নির্বাচন বলা যাবে না।



মূল ব্যাধিটা হচ্ছে দেশের প্রধান দুটো রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতা হস্তান্তেরের প্রক্রিয়া সম্পর্কে একমত হতে পারেনি। ফলে আসল ব্যাধিটা বুঝে সমস্যার সমাধান করতে হবে। যদি এই সমস্যার সমধান করা না যায় তাহলে দেয়ালে মাথা ঠুঁকলেও সহিংসতা বন্ধ হবে না। ব্যাধির মূল চরিত্রটাকে এড্রেস করতে না পারলে সিমটমটাকে বন্ধ করা যাবে না।



প্রশ্ন :: বিদেশিদের পক্ষ থেকে অহিংস আন্দোলনের চাপ আছে। কিন্তু কিভাবে সেটা করা যায়?



অধ্যাপক পিয়াস করিম:
দেখুন আন্দোলন অহিংস হবে কি সহিংস হবে সেটা শুধুমাত্র বিরোধী পক্ষের ওপরই নির্ভর করছে না। সেখানে সরকারের কি ভূমিকা হবে তার ওপরও নির্ভর করে। রাষ্ট্রযন্ত্রের ভূমিকাটা তীব্র হবে কি হবে না, আইন শঙ্খলাবাহিনী আন্দোলনকারীদের ওপর কতোটা চড়াও হবে সেটার ওপর নির্ভর করে। ২৯ ডিসেম্বর আমরা দেখেছি যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগের কর্মীরা যেভাবে রাস্তায় নেমে এসেছিল লাঠিসোটা হাতে- সেটা হবে কি না! আসলে এসবের ওপর নির্ভর করছে আন্দোলন সহিংস হবে কি না! এটা আসলে একটা পক্ষের ব্যাপার না। এখানে যাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন এবং যারা আন্দোলনকারী এ দুয়ের মধ্যকার সম্পর্কের বিন্যাসটা কিরকম হবে তারওপর নির্ভর করছে আন্দোলন সহিংস হবে না কি অহিংস থাকবে।



এই মুহুর্তে সহিংস আন্দোলনের কথা বলে আমরা কতোটা স্বস্তি পেতে পারব তা আমি জানি না। তবে সহিংস আন্দোলনের বিরুদ্ধে বিদেশিদের চাপ আছে। তারা বলছে আন্দোলন হবে অহিংস। আমরাও তো অহিংস আন্দোলন চাই, আমরা তো কেউ সহিংস আন্দোলন চাই না। কিন্তু এটি নির্ভর করছে একইসাথে বিরোধী দলের ওপর এবং যাদের হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আছে তাদের ওপরও অনেকটা দায় দায়িত্ব চলে আসে।



প্রশ্ন :: বাংলাদেশে সব দলের অংশগ্রহণে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সংলাপের ওপর তাগিদ দিচ্ছে বিদেশি শক্তিগুলো এবং দেশের নাগরিকদের একটা বড় অংশ। কিন্তু সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি এবং এই চাওয়ার মধ্যে ব্যাপক ব্যবধান রয়েছে। এর সম্মিলন কিভাবে ঘটনা যায় আর তা কি ঘটবে বলে মনে হয় আপনার?



অধ্যাপক পিয়াস করিম:
আমার ধারণা হচ্ছে এখন যারা ক্ষমতায় আছেন তারা আপোশে কম্প্রোমাইজ করবেন না। আমি বলতে চাইছি আপোশে তারা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করবেন না। আর এটা শুধু আজকের সরকারের বেলায় শুধু প্রযোজ্য তাই নয়, পুরো বাংলাদেশের ইতিহাসে আমরা দেখেছি কোনো সরকার ক্ষমতা ছেড়ে যায় নি, কোনো সরকার গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে মেনে নেয় নি যতক্ষণ পর্যন্ত না তার ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। এখন শান্তিপূর্ণ কোনো রেভ্যুলেশন সম্ভব কি না সেটা একটি বড় প্রশ্ন। দুপক্ষ টেবিলে বসে আলোচনার মধ্য দিয়ে সমাধানে পৌঁছতে পারবে কি না সেটাও বলা সম্ভব না। সংলাপ বা আলোচনার ঐহিত্যটা আমাদের দেশে আসলে গড়ে ওঠেনি। এ ধরনের সমস্যার সমাধান বারবারই রাজপথে হয়েছে। ফলে এই মুহুর্তে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি একটা শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সমাধানে পৌঁছে যাবে বলে আমি আশাবাদী হতে পারছি না। আমরা যদি আলটিমেটলি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সকলের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য একটা নির্বাচন চাই তার জন্য আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আন্দোলন করে সরকারকে বাধ্য করতে হবে নির্বাচন দিতে। আর আন্দোলন যদি গড়ে না ওঠে সেটা ভিন্ন ব্যাপার। তাছাড়া আমরা যদি সেরকম নির্বাচন না চাই সেটাও ভিন্ন ব্যাপার। কিন্তু আমরা যদি সকলের অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চাই তাহলে আমাদের প্রত্যাশা করতে হবে যেন আন্দোলন গড়ে ওঠে। কারণ আন্দোলন ছাড়া আমি আর কোনো সমধানের পথ দেখছি না।

সৌজন্যে : রেডিও তেহরান।

নিউজ পেজ২৪/ইএইচ