সাক্ষাৎকার

অক্টোবর ২২, ২০১৪, ৩:৫৪ অপরাহ্ন

দুর্ঘটনা রোধে কোনো সরকারই আন্তরিক নয় : ইলিয়াস কাঞ্চন

নিউজ পেজ ডেস্ক

তাকে নায়ক থেকে জননায়ক বলা যেতে পারে। নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় এই চলচ্চিত্র অভিনেতা এখন পর্যন্ত প্রায় ২৫০টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। তার অভিনীত বেদের মেয়ে জোছনা চলচ্চিত্রটি এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সর্বাধিক ব্যবসা সফল ও জনপ্রিয় চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃত। অভিনয় কমিয়ে দিলেও এখনো ইলিয়াস কাঞ্চন আলোচিত তার সামাজিক আন্দোলনের জন্য।

দেশব্যাপী ক্রমবর্ধমান সড়ক দুর্ঘটনা নিরসনে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির প্রয়োজনে এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবিতে ১৯৯৩ সালে তার নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)’ শীর্ষক একটি সংগঠন। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সংগঠনটি দেশের মানুষের সমর্থন পেয়ে আসছে। ২২ অক্টোবর ইলিয়াস কাঞ্চনের সংগঠন থেকে পালিত হচ্ছে নিরাপদ সড়ক দিবস। দিবসটি উপলক্ষে এই জননায়কের সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো।


প্রশ্ন : আপনি নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করছেন। এর সূচনা কীভাবে হয়েছিল?

ইলিয়াস কাঞ্চন : ১৯৯৩ সালের আজকের এই দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় আমার স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চন নিহত হন। এরপর আমি চলচ্চিত্র ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবতে থাকি। অথচ তখন আমার জনপ্রিয়তা প্রথম সারিতে। সে সময় একদিন এক সাংবাদিক আমাকে বললেন, ‘আপনার স্ত্রী যেমন আপনাকে ভালোবাসত, তেমন এ দেশের অসংখ্য মানুষ আপনাকে ভালোবাসে। স্ত্রীকে আপনি বাঁচাতে পারেননি, এখন ভাবছেন চলচ্চিত্র থেকেও বিদায় নেবেন। অথচ আপনার অনেক ভক্ত, শুভাকাঙ্ক্ষী রয়েছে- তাদের কী আপনি সড়ক দুর্ঘটনা থেকে বাঁচানোর জন্য কোনো উদ্যোগ নিতে পারেন না।’ এই কথাটি আমাকে খুব নাড়া দেয়। আমি সাত দিন ধরে ভাবতে থাকি এবং অবশেষে সিদ্ধান্ত নিই, হ্যাঁ, এই বিষয়টি নিয়ে আমাকে কাজ করতে হবে। গড়ে তুলতে হবে সামাজিক আন্দোলন।

প্রশ্ন : যত দূর মনে পড়ছে তখন আপনি জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। এমন একটা সময়ে এ ধরনের আন্দোলন কিন্তু সাহসী পদক্ষেপ ছিল।

ইলিয়াস কাঞ্চন : আমি আসলে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলাম। আমি যখন আমার পরিচিতদের কথাটি বললাম। তখন তাদের অনেকেই বলল, কাজটি ঠিক হবে না। কারণ চলচ্চিত্রের মানুষ হিসেবে আমি যদি আন্দোলনে নামি তাহলে আমার পপুলারিটি কমে যেতে পারে। আমি বললাম, যাদের কারণে আমি আজ ইলিয়াস কাঞ্চন হয়েছি, তাদের সচেতন করতে গিয়ে যদি আমার পপুলারিটি কমে যায় তাহলে আমার দুঃখ নেই। আজ যদি আমি মারা যাই তাহলে আর কী থাকবে? তখন তো সবই চলে যাবে।


প্রশ্ন : এরপর শুরুটা হলো কীভাবে?

ইলিয়াস কাঞ্চন : আমার ভক্তরা ফ্যান ক্লাব, জাহানারা স্মৃতি সংসদ গঠন করতে চাইল। আমি বললাম, এটা হবে না। কারণ সড়ক দুর্ঘটনা শুধু একজন ব্যক্তির বিষয় নয়, যে কেউ যেকোনো সময় সড়ক দুর্ঘটনায় পতিত হতে পারে। সুতরাং সবার জন্য ভাবতে হবে। আর এ কারণেই আমি সবার কথা ভেবে এই আন্দোলনের নাম দিলাম ‘নিরাপদ সড়ক চাই’।


প্রশ্ন : সংগঠন থেকে নিরাপদ সড়কের জন্য সচেতনতা বাড়াতে এখন পর্যন্ত কী কী কাজ করা হয়েছে?

ইলিয়াস কাঞ্চন : আমরা ২১ বছর ধরে নিরলসভাবে কাজ করছি। আমাদের কিছু মোটিভেশনাল কর্মসূচি রয়েছে। সভা, সেমিনার এগুলো তো রয়েছেই। স্কুলের বাচ্চাদের এ বিষয়ে সচেতন করতেও আমরা কাজ করছি। আমাদের ড্রাইভিং ট্রেনিং ইনস্টিটিউট রয়েছে। ওয়ালটন এটার জন্য সহায়তা দিচ্ছে। ২০১০ সাল থেকে যারা শিক্ষিত বেকার যুবক, আমরা এই ইনস্টিটিউট থেকে তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। এভাবে এখন পর্যন্ত আমরা ৪০০ এর বেশি প্রশিক্ষিত ড্রাইভার তৈরি করেছি। তারা এ পেশায় স্বীকৃত। শুধু তাই নয়, যারা প্রফেশনাল ড্রাইভার তাদের দক্ষতা বাড়ানোর জন্যও আমরা প্রশিক্ষণ দিই। এখন পর্যন্ত এমন ৫ হাজার ড্রাইভারকে আমরা প্রশিক্ষণ দিয়েছি। আজ এই দিবসটি আমরা পালন করছি। আসলে তার মৃত্যুর জন্যই তো এই আন্দোলনের সূচনা। সুতরাং তাকে স্মরণ করার বিষয় তো রয়েছেই। কিন্তু এ দিনটিতে তাকে স্মরণ করার জন্য আমরা যে কর্মসূচিগুলো পালন করি, এতেও কিন্তু অনেক মানুষ এই ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন সম্পর্কে জানতে পারে। তারা এ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়। তারা সচেতন হওয়ার সুযোগ পায়।


প্রশ্ন : আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনার কারণগুলো কী বলে আপনি মনে করেন?

ইলিয়াস কাঞ্চন : উন্নত দেশগুলোতে দেখা যায় ৫-৬টি কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। আমাদের এখানে তা নয়। আমরা অন্তত ৪৫টি কারণ নির্ধারণ করে সরকারকে জানিয়েছি। রাস্তা নির্মাণে ত্রুটি, আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা, আইন প্রয়োগের অভাব তো আছেই, সাধারণ মানুষের অসচেতনতাও এ জন্য সমানভাবে দায়ী। আমাদের দেশে রাস্তার পাশেই হাট-বাজার গড়ে উঠছে। ভটভটি, নছিমন, করিমন চলছে যত্রতত্র। ছোট ছোট রাস্তাগুলো হুট করেই যেন বড় রাস্তায় উঠে আসছে। বিদেশে কিন্তু তা নয়, সেখানে ছোট রাস্তাগুলো বড় রাস্তার সমান্তরালে এনে তারপর সংযোগ করা হয়। এমনকি পেট্রলপাম্পও হাইওয়ে থেকে বেশ দূরে স্থাপন করা হয়। আর হাইওয়ের পাশেই বাড়িঘর- এ তো কল্পনা করা যায় না। আমাদের দেশে পথচারীরা তো বটেই, যাত্রীরাও অসচেতন। তারা ড্রাইভারকে জোরে গাড়ি চালাতে উৎসাহ দেয়। একটু এদিক-ওদিক হলেই ড্রইভারকে গালি দেয়। ড্রাইভিং লাইসেন্সের কথা কী বলব? এই পদ্ধতিটা ত্রুটিমুক্ত নয়। অনেকে তো অবৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে গাড়ি চালায়, অনেকের তো লাইসেন্সই নেই। এটা পৃথিবীর আর কোথাও আছে কি না আমার জানা নেই। অথচ সরকার থেকে এগুলো দূর করার জন্য বড় কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ে না।


প্রশ্ন : সরকার কেন এগুলো করে না বলে মনে করেন?

ইলিয়াস কাঞ্চন : আমি জানি না, তবে ধারণা করতে পারি। সড়ক দুর্ঘটনা বিষয়টিতে যতটা প্রাধান্য দেওয়া দরকার কোনো সরকারই তা দেয় না। তাদের হয়তো ভয় কাজ করে, আইন কঠোর করলে যদি ভোট কমে যায়। নছিমন, ভটভটি রাস্তায় চলে, এগুলো তো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। তারা দলের রাজনীতি করে সুতরাং সহজেই বোঝা যায় এর সঙ্গে ভোটের রাজনীতি জড়িত।

প্রশ্ন : এই মহৎ আন্দোলনে সরকারিভাবে আপনারা কতটুকু সহযোগিতা পাচ্ছেন?

ইলিয়াস কাঞ্চন : দুঃখজনক হলেও সত্যি, আমরা সেভাবে সাড়া পাচ্ছি না। অনেক আগে থেকেই বলে আসছি দিনটি সরকারিভাবে পালন করার জন্য। কিন্তু হচ্ছে না। আমরা জাতিসংঘেও আবেদন জানিয়ে রেখেছি যাতে দিনটি আন্তর্জাতিকভাবে পালন করা হয়। কারণ কম হোক, বেশি হোক এটি কিন্তু প্রতিটি দেশেরই সমস্যা। সরকার আমাকে যদি সহযোগী হিসেবে গ্রহণ করে পৃষ্ঠপোষকতা করত, তাহলে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা অনেক কমে যেত। অথচ কেন জানি কোনো সরকারকে এ ব্যাপারে আন্তরিক দেখি না। ড্রাইভারদের প্রশিক্ষণ, স্বল্পশিক্ষিত বেকারদের ড্রাইভার হিসেবে তৈরি করা, আইন তৈরি করা, সঠিকভাবে আইন প্রয়োগ করা, দেশের সড়কগুলো প্রকৌশলগত দিক বজায় রেখে তৈরি করা, এগুলো তো আমাদের কাজ নয়। আমরা মানুষকে বলতে পারি। সচেতন করতে পারি। কিছু ক্ষেত্রে হয়তো উন্নত প্রশিক্ষণও দিতে পারি। কিন্তু বাকি কাজ তো সরকারকেই করতে হবে।


প্রশ্ন : আপনি চলচ্চিত্রের মানুষ। চলচ্চিত্রের মাধ্যমেও তো মানুষকে বার্তা পৌঁছে দেওয়া যায়। আপনি চেষ্টা করেছেন কখনো?

ইলিয়াস কাঞ্চন : হ্যাঁ করেছি। এ বিষয়ে আমি ৫-৬টি শর্টফিল্ম নির্মাণ করেছি। নাকফুল তেমনই একটি কাজ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় এটি তৈরি করেছিলাম। এখানে দুর্ঘটনার কারণগুলো তুলে ধরা হয়েছে। এগুলো বিভিন্ন চ্যানেলে প্রদর্শন করা হয়েছে। কিন্তু যাদের জন্য এটা করেছি তারা কিন্তু দেখতে পারছে না। আমার ইচ্ছা ছিল বাস-ট্রাক টার্মিনালে এগুলো প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা। কিন্তু নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে সেটা সম্ভব হচ্ছে না। তবে বিআরটিএ তাদের ট্রেনিং সেশনগুলোতে এগুলো দেখায়। তারা এসব কাজের যথেষ্ট প্রশংসা করেছে। শুধু তাই নয়, গ্রামে, মফস্বল এলাকাগুলোতে কী কারণে দুর্ঘটনা ঘটে সেগুলো চিহ্নিত করে এ ধরনের ৯টি বিষয় নিয়ে আমি নাটিকা বানিয়েছি। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে তারপরও কিছুতেই কিছু হচ্ছে না।


প্রশ্ন : কেন হচ্ছে না?

ইলিয়াস কাঞ্চন : ওই যে বললাম, ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আমরা অনেক কিছু পারি না। সরকারকেই সেগুলোর বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যতম বিষয় হচ্ছে মানসম্মত প্রশিক্ষণ- এটাই তো হচ্ছে না। বিদেশে অধিকাংশ মানুষ শিক্ষিত। তারা নিজেদের গাড়ি নিজেরাই চালায়। কিন্তু এখানে তো পরিস্থিতি তেমন না। খুব সহজেই ড্রাইভার পাওয়া যায়। অনেক সময় আমরা খোঁজও নিই না সেই ড্রাইভার কতটুকু প্রশিক্ষিত।


প্রশ্ন : এই কাজে চলচ্চিত্রজগতের মানুষের সহযোগিতা কতটুকু পাচ্ছেন?

ইলিয়াস কাঞ্চন : একসময় তো ঢাকার চলচ্চিত্রে আমি সর্বেসর্বা ছিলাম। তখন আমার সঙ্গে অনেকেই ছিলেন। তারা তাদের প্রয়োজনেই আমার এ আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন। এখন আমি চলচ্চিত্র থেকে অনেকটাই দূরে সরে এসেছি। ফলে তাদের আর পাশে পাই না। তবে নাটক, গান, খেলাধুলার জগতের মানুষ খোঁজখবর রাখেন। অনেকেই দেখা হলে উৎসাহে বলেন, ‘ভাই, আপনি ভালো একটি কাজ করছেন। আমাকে ডাকবেন।’ তাদের কথা শুনে আমি আসলে অবাক না হয়ে পারি না। আমি একা কতজনকে ডাকব? আমি তো আমার দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে কাজটি করছি। তারা কেন নিজেদের মধ্যে সেই দায়িত্ববোধ উপলব্ধি করেন না?


প্রশ্ন : আজকের এই ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ দিবসে দেশের মানুষের উদ্দেশে আপনি কী বলবেন?

ইলিয়াস কাঞ্চন : বিআরটিএ সূত্রমতে দেশে ৭ লাখ মোটরসাইকেল, ১৪ লাখ গাড়ি আছে। এর মধ্যে ৫-৬ লাখ গণপরিবহণ। গণপরিবহণগুলোই কিন্তু সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনার শিকার হয়। যাত্রী হিসেবেও কিন্তু দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য আমাদের কিছু দায়িত্ব রয়েছে। একটু খেয়াল করলে দেখবেন অধিকাংশ দুর্ঘটনার পর বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা বলেন, ‘ড্রাইভার বেপরোয়া গাড়ি চালাচ্ছিল’। এখানে আমার কথা হলো, তখন আপনি তাকে সাবধানে গাড়ি চালাতে বলেন নাই কেন? আসলে আমাদের দেশের যাত্রীরা মনে করেন, যে ড্রাইভার যত দ্রুত গাড়ি চালিয়ে তাকে গন্তব্যে পৌঁছে দেবে সে তত দক্ষ। এ ক্ষেত্রে যাত্রীরাই ড্রাইভারকে তাড়াতাড়ি গাড়ি চালানোর পরামর্শ দেন। আমার একটাই নিবেদন, আপনারা দয়া করে চালকদের ‘তাড়াতাড়ি যাও’ না বলে আজ থেকে বলবেন, ‘সাবধানে যাও’। কথা না শুনলে তাকে ভালোভাবে বলবেন, ‘ভাই, সাবধানে যাও’।


নিউজ পেজ২৪/ইএইচ