সাক্ষাৎকার

অক্টোবর ২৯, ২০১৪, ১১:১৩ পূর্বাহ্ন

প্রধানমন্ত্রীই বলুন, নির্বাচন কবে হবে : ড. কামাল

নিউজ পেজ ডেস্ক

ড. কামাল হোসেন বলেছেন, ‘গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন এই নির্বাচন নিয়মরক্ষার নির্বাচন। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার নির্বাচন। এখন প্রধানমন্ত্রীই বলুন, কবে নির্বাচন হবে। তিন মাস, ছয় মাস অথবা ৯ মাস পর। ’

বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতা ও আইনজ্ঞ ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘দেশ ও জনগণ চাইলে চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট উত্তরণের জন্য জাতীয় সংলাপের উদ্যোগও নেব।’

সম্প্রতি রাজধানীর বেইলি রোডের বাসায় ড. কামাল হোসেন আলাপচারিতায় এ সব কথা বলেন।



প্রশ্ন : বর্তমান সরকারকে কি গণতান্ত্রিক বলা যায় ?

ড. কামাল : ‘বর্তমানে যা চলছে তাকে তো আর গণতন্ত্র বলা যায় না। তোমরাই বল, তোমরা কি ভোট দিতে পেরেছ? আমি ভোট দিতে পারিনি। তাহলে কিসের গণতন্ত্র? এখন যা চলছে তার সংজ্ঞা আমি নিজেও জানি না।’

তাহলে কেমন শাসন চলছে ?

ড. কামাল হোসেন: ‘চিন্তা করা যায় দেশে কথা বলা যাবে না। কথা বলা না কি দেশদ্রোহিতা। এই যে সংবিধানের সংশোধনী আনা হয়েছে এটার ব্যাপারে তো মুখ খুললে দেশদ্রোহিতা হবে। কেউ কি এটা কল্পনা করতে পারে? সংবিধান তো পরিবর্তন হবেই, আধুনিকায়ন করলে তো সমালোচনা হবে এরপর সবাই মেনে নেবে। কিন্তু এখন কী করা হচ্ছে।’

প্রশ্ন : সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানকে প্রধানমন্ত্রীর দূত করা হয়েছে। বিষয়টাকে আপনার দৃষ্টিতে কেমন মনে হচ্ছে ?

ড. কামাল : ‘প্রধানমন্ত্রী তার বাবার খুনীর সহায়তাকারীদের নিজের বিশেষ দূত বানিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর কন্যা এটা কীভাবে করলেন? এমন একজন ব্যক্তিকে নিজের বিশেষ দূত বানালেন যিনি বঙ্গবন্ধুর খুনী ফারুককে দেশে এনে এমপি বানিয়েছিলেন। পরে এই ফারুক বিরোধী দলের নেতাও হয়েছিলেন। বাবার খুনীর সহায়তাকারীকে এভাবে পুরস্কৃত করা হচ্ছে। এটা বলতেও পারছি না, মেলাতেও পারছি না। একি বিশ্বাস করা যায়।’

প্রশ্ন : কিন্তু ২০০৮ সালে নির্বাচনের সময় তো আপনি শেখ হাসিনার পক্ষে ভোট চেয়েছেন?

ড. কামাল : ‘এটিই আমার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। যে দিনবদলের সনদ দিয়েছিল আওয়ামী লীগ, সেটি কিন্তু অনেক ভাল ছিল। আমি নিজেও মঞ্চে উঠে বলেছি, ওনাকে ভোট দিবেন। কিন্তু উনি কথা রাখেননি।’

প্রশ্ন : অনেকে বর্তমান শাসনামলকে বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে জারি করা বাকশালের সঙ্গে তুলনা করছেন। তখনকার বাকশাল ও বর্তমান সরকারের মধ্যে গুণগত মিল বা পার্থক্য কোথায়?

ড. কামাল হোসেন: ‘পার্থক্য তো অনেক। এ সরকার তো আত্মঘাতী। ২০০৮ সালে এতবড় মেজরিটি নিয়ে ক্ষমতায় আসা সত্ত্বেও কেন একটার পর একটা বড় পরিবর্তন ঘটাতে হয়েছে তাদের। ৪ মিনিটে ঢাকা ভাগ করা হল। পঞ্চদশ সংশোধনী করা হল। এক মিনিটও আলোচনা করা হল না। কেন। শুধু তাই নয়, বড় বড় দুর্নীতিগুলো ঘটে গেল। হলমার্ক, শেয়ারবাজার ইত্যাদি। বাকশালের সময় এমন ছিল না। আর ৫ জানুয়ারিতে তো নির্বাচন ছাড়াই সরকার গঠন করল। কিন্তু বাকশাল ৭৩ সালের নির্বাচনের জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল। কিন্তু আমি বাকশালের পক্ষে ছিলাম না। আমি বঙ্গবন্ধুকে বাকশাল গঠন করতে না করেছিলাম।’


প্রশ্ন : তাহলে কাদের পরামর্শে তিনি বাকশাল গঠন করলেন?

ড. কামাল হোসেন: ‘এটি পরিষ্কার নয়, কেউ না জেনে বুঝে বঙ্গবন্ধুকে এমনটি বুঝিয়েছে, অথবা পরিকল্পিতভাবে একটি চক্র এটি করিয়েছে। এটি নিয়ে আজ পর্যন্ত কোনো গবেষণা হল না। কেন হল না।?’

প্রশ্ন : ‘তাহলে কি বঙ্গবন্ধুর বাকশাল ভুল ছিল?

ড. কামাল : ‘৭৩ এ সাধারণ নির্বাচনে জনগণ বিপুলভাবে বঙ্গবন্ধুর দলকে সরকারে বসানোর পর ম্যান্ডেট দেয়। কিন্তু ওয়ানমেন কনসেপ্টটা ভুল ছিল। আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলেই এর বিরোধিতা করে দেশ ত্যাগ করেছিলাম।’

৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধুর ‘জয় পাকিস্তান’ বলেছেন ?

ড. কামাল : ‘এটা খামাখা বিতর্ক। ওই সময়ে বঙ্গবন্ধুর বক্তব্যের রেকর্ড দেশে নেই। বিদেশ থেকে আনা হলে তখন দেখা যাবে।’

প্রশ্ন : তাহলে নতুন রাজনৈতিক জোট হচ্ছে ?

ড. কামাল : ‘কাজ চলছে ধাপে ধাপে। আমরা জনগণের কাছে একটি লিফলেট ছেড়েছি। আমরা কথা বলছি অসাম্প্রদায়িক শক্তিগুলোর সঙ্গে। দেশের গণতন্ত্রের পক্ষের ব্যক্তিদের সঙ্গে। জনগণ চাইলে একটি রাজনৈতিক বিকল্প শক্তি গড়ে উঠবে। আমাদের জোট হবে গণতন্ত্রকে রাহুমুক্ত করার জোট।’

প্রশ্ন : তাহলে কি এটি তৃতীয় শক্তি হচ্ছে?

ড. কামাল হোসেন: ‘না। তৃতীয় শক্তি হবে কেন। আমি জনগণের শক্তির কথা বলছি। আমি যতবারই কাজ করার চেষ্টা করি, কিছু মানুষ থাকে আমার কাজকে বিতর্কিত করার জন্য। এরাই বলে বেড়ায় তৃতীয় শক্তি। ২০০৮ সালেও জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ছিলাম। এবার গণতন্ত্র হুমকির মুখে। এবারও জনগণের সঙ্গেই থাকব। তৃতীয় শক্তি নয়, বরং জনগণের শক্তি। এবার ব্যতিক্রম হবে না। জনগণ যা চাইবে সেটিই করব।’

প্রশ্ন : মধ্যবর্তী নির্বাচনের সম্ভাবনা দেখছেন ?

ড. কামাল হোসেন: ‘এটি ঠিক কতটা বাস্তব, সেটি জানি না। তবে সরকার মধ্যবর্তী নির্বাচন দেবে না। আদায় করতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন দেবেন বলে মনে হয় না। কীভাবে দেবেন জানি না। চাপ প্রয়োগ করে, জাতীয় ঐক্য গড়ে আদায় করতে হবে। এ ঐক্য হবে জনগণের শক্তির ভিত্তিতে। যে নির্বাচন হবে অবাধ ও নিরপেক্ষ।’

প্রশ্নকারী : আপনাকে ধন্যবাদ।

ড. কামাল : আপনাকে এবং পাঠককেও ধন্যবাদ।