খোলা কলাম

ডিসেম্বর ২৮, ২০১৪, ১০:২৮ অপরাহ্ন

রাষ্ট্র পারে না, আবু বকর পারে !

আনোয়ার বারী পিন্টু

গতকাল কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে কুমিল্লায় রওয়ানা হয়ে সকাল সাড়ে ৮ টায় কান্দিরপাড়ে পৌঁছলাম। এরপর ক্যান্টনম্যান্ট হয়ে ঢাকা চট্রগ্রাম বিশ্বরোড হয়ে দুপুর ২ টায় বাড়িতে আসলাম। এই যাত্রা পথে ভাবলাম গাজীপুরের উত্তাপ নিয়ে। এরপর ‘হাইভোল্টেজ দৃষ্টিতে গাজিপুর’ শিরোনামে সংবাদটি তৈরী করে সফট কপি অনলাইন সংস্করনে তুলে দেওয়ার পরই টিভিতে চোখ আটকে গেলো। দেখি এক শ্বাসরুদ্ধকর উদ্ধার অভিযান। রাজধানীর শাহজাহানপুরের এ/৪০ নম্বরের বাড়ির দোতলায় সাবলেট বাসার খাদিজা আক্তারের ছেলে জিহাদ রেল কলোনিতে তিনশ' ফুট গভীর পাইপের মধ্যে পড়ে যায়। জিহাদরা তিন ভাইবোন। বড় স্বর্ণা (১৩), মেজো ঈশান (৬) ও সবার ছোট জিহাদ (৪)।

চার বছরের শিশু জিহাদকে উদ্ধারের চেষ্টা লাইভ সম্প্রচার করছিলো কয়েকটি চ্যানেল। এর পর নানাভাবে ঘটনা জানলাম। ঘণ্টা খানেকের মধ্যে শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। ২৩ ঘন্টা পর শনিবার দুপুর তিনটার দিকে শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পর জিহাদকে মৃত ঘোষণা করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের আবাসিক সার্জন ডাক্তার রিয়াজ মোর্শেদ। উদ্ধারের আগ পর্যন্ত টানান ২৩ ঘণ্টা জিহাদের জন্য রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষায় ছিল সারাদেশের মানুষ। গণমাধ্যম সূত্রে জানতে পারি, এসময় ১৭ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপটির ভেতর থেকে সাড়া দেয় জিহাদ। তার জন্য পাঠানো হয় খাবার ও পানি। পাইপের মধ্যে দেওয়াা হয় অক্সিজেন।

রাত পৌনে ১২টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মী মনির হোসেন জানান, শিশু জিহাদের সঙ্গে তার বেশ কয়েকবার কথা হয়েছে। জুস পাঠানোর পর জিহাদ বলেছিল সে একটুখানি জুস খেয়েছে। উপর থেকে দড়ি ফেলার পর সে বলেছিল, ‘আমি ধরতে পারছি না।’

এরপর আবার জিহাদ বেঁচে আছে কিনা? এমন প্রশ্নের উত্তরে মনির হোসেন জানান, রাত সাড়ে ১১টার দিকে তিনি পাইপের ভেতর থেকে অস্বাভাবিক কান্নার শব্দ শুনতে পেয়েছেন। এ বিষয়ে রাত ২টা ৫৫ মিনিটের দিকে উদ্ধার অভিযান সম্পর্কে কথা বলেন ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক আলী আহমদ খান। তিনি বলেন, ‘ক্যামেরা নামিয়ে পাইপে শিশুটির কোনও সন্ধান তারা পাননি।

এ বিষয়ে রাতে পাইপের মধ্যে কোনও শিশু থাকার বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করেন জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দ সংস্থার (এনএসআই) যুগ্ম-পরিচালক আবু সাঈদ রায়হান। রাত পৌনে তিনটার দিকে বেশ বিরক্তির সঙ্গে পুরো বিষয়টিকে গুজব আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, ‘ক্যামেরা নামানোর পর একেবারে শেষ প্রান্তে তেলাপোকা, টিকিটিকিও দেখা গেছে। কিন্তু শিশুর কোনও শরীর দেখা যায়নি বা শরীরের মতো কিছু দেখা যায়নি। এটা সম্পূর্ণ গুজব।’

ভয়ানক তেজস্বী কর্তাদের দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্র যখন পরাজিত ঠিক তখন রাজধানীর মিরপুর থেকে ঘটনাস্থলে আসা আবু বকর সিদ্দিকের বানানো খাঁচার সাহায্যেই জিহাদকে উদ্ধার করা হয়। আবু বকর সিদ্দিক সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, গণমাধ্যমে শিশুটিকে উদ্ধার করা যাচ্ছে না দেখে গতকাল শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টায় তিনি ঘটনাস্থলে লোহার খাঁচা নিয়ে যান। রাতে একবার খাঁচাটি ভেতরে ঢুকিয়ে উদ্ধারের চেষ্টা করা হয়।

কিন্তু তখন উদ্ধার করা যায়নি। খাঁচাটি কিছুটা ভেঙে যাওয়ায় সারা রাত ধরে তিনি এটি মেরামত করেন। পরে আরও কয়েকজনকে নিয়ে আবু বকর সিদ্দিক দুটি খাঁচা ভেতরে ঢোকান। এরপর তারা দেখেন, খাঁচায় কিছু একটা আটকে গেছে। ধীরে ধীরে খাঁচাটি টেনে তোলা হয়। যে যন্ত্রটির মাধ্যমে জিহাদের দেহ উদ্ধার করা হয় লোহার তৈরি ওই যন্ত্রটির নিচের দিকে তিনটি হুক এবং সুতার তৈরি একটি জাল ছিল। হুক ও জালের মাধ্যমে জিহাদের দেহ খাঁচায় ধরে রেখে উপরে তোলা হয়।

যে ছেলে রাতে কথা বলেছে, জুস খাওয়ানা হয়েছে, যে ছেলের জন্য অক্সিজেন পাঠানো হয়েছে, যে ছেলে দড়ি ধরেছিলো সেই ছেলে সকালে উধাও হয়ে গেলো। এমন সাংঘর্ষিক কৌতুকপ্রদ বক্তব্য মনে ভয় জাগে রাষ্ট্রের স্বক্ষমতা নিয়ে। এই দেশেই আবার ক্ষমতাধররা পরস্পরকে রুখে দিতে সামর্থ প্রকাশ করেন ভীষন ব্যঙ্গ আর নগ্নভবে। আমার লজ্জ্বা হয়। মনে পড়ে, ভারতের এমন একটি ঘটনায় শ্রমিককে তোলার জন্য পাইপের মুখ নিয়ে গবেষনা না করে অন্য জায়গা দিয়ে গর্ত করে সেনাবাহিনী নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁেছ অল্পক্ষনেই আটকে পড়া মানুষটিকে জীবিত উদ্ধার করে।

সেনাদের দিয়ে এই পদ্ধতির সফলতাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। রাষ্ট্র পারেনি আবু বকর পেরেছে। যে রাষ্ট্র এক বছর ধরে পাইপের মুখে ঢাকনা দিতে পারে না, যে রাষ্ট্র পাইপের ব্যাসার্ধ নিয়েও তিন রকম কথা বলেছে, যে রাষ্ট্র একজন শিশুকে ২৩ ঘন্টায় উদ্ধার করতে পারেনি, যে রাষ্ট্র কেউ নেই বলে উদ্ধার ছেড়ে দিয়েছে, শিশুটি পাইপে নেই গুজব ছড়ানো হয়েছে এমন অভিযোগে যে জিহাদের পিতাকে গ্রেফতার করে থানায় আটকে রেখেছে, যে রাষ্ট্রের সর্ব্বোচ্চ গোয়েন্দা সংস্থা বলে পাইপে কেউ নেই, যে রাষ্ট্রের শৃঙ্খলার দায়িত্বে নিয়োজিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পাইপে কেউ নেই বলে ঘোষনা দিয়েছে, সেই রাষ্ট্রযন্ত্র নিয়ে আমার ভয় হয়, রাষ্ট্রযন্ত্রের চালকদের নিয়ে আমার সংশয় জাগে, কেননা ঠিক এভাবেই লুটেপুটে রাষ্ট্রকে ফোকলা করে লেন্দুফ দর্জি স্বাধীন ভূখন্ড সিকিমকে তুলে দিয়েছে হানাদারদের হাতে।

এই লেখাটি যখন লিখছিলাম তখন মোবাইল বেজে উঠলো এক রাষ্ট্র চিন্তকের কলে। রিসিভ করতেই বললো, ‘ভাই- নেড়ি কুত্তার মতো পেটানোর বিশেষজ্ঞ নাজমুল আলমের নেতৃত্বে ছাত্রলীগকে উদ্ধারের দায়িত্ব দেওয়া যেতো না। দেখেননি, রাষ্ট্রের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বৃহত্তম দলের একটি সমাবেশ এরা কিভাবে বন্ধ করে দিয়েছে’।

(লেখক- সাংবাদিক।)


নিউজ পেজ২৪/ইএইচএম