সম্পাদকীয়

ডিসেম্বর ২৯, ২০১৪, ১২:৫০ অপরাহ্ন

আর কোনো জিহাদের প্রাণহানি যাতে না ঘটে

নিজস্ব প্রতিবেদক

অবশেষে চার বছরের শিশু জিহাদ উদ্ধার হয়েছে। তবে জীবিত নয়। তার প্রাণহানি হয়েছে। নিঃসন্দেহে এ ঘটনা অত্যন্ত দুঃখের। তাকে উদ্ধার করা হয়েছে স্থানীয়ভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে। তার আগে ফায়ার সার্ভিস এই উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করে। কিন্তু সবার মনেই প্রশ্ন আসে- শিশুটি গেল কই।



শনিবার দুপুর পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে গভীর নলকূপের ১৭ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপের মধ্যে শিশুটির অস্তিত্ব মেলেনি। তাকে উদ্ধারে শুক্রবার বিকেল থেকে টানা অভিযান চলে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের অভিজ্ঞতা, মেধা ও শক্তি এবং সামর্থ্য অনুযায়ী প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু শিশুটিকে পাওয়া যায়নি।



ঘটনার শুরু শুক্রবার বিকেলে। রাজধানীর শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনিতে। স্থানীয়রা জানান, কলোনির মৈত্রী সংঘ মাঠের কাছে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে ওই পাইপের মধ্যে পড়ে যায় মো. জিহাদ। ঘটনাস্থলের কাছেই কলোনির একটি ভবনের দ্বিতীয় তলায় একটি কক্ষে থাকে জিহাদের পরিবার। তার বাবা নাসির উদ্দিন মতিঝিলের একটি বিদ্যালয়ের নিরাপত্তাকর্মী। দুই ভাই, এক বোনের মধ্যে জিহাদ সবার ছোট। জিহাদের মা খাদিজা দুপুরের খাবার খেয়ে দুই ছেলেকে দুই পাশে নিয়ে ঘুমাচ্ছিলেন। বিছানা থেকে জিহাদ উঠে বাইরে যায় বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে।



মঞ্জু নামে জিহাদের এক মামা জানান, ছেলেটি বেলা সাড়ে ৩টার দিকে বাসা থেকে বের হয়। ঘণ্টাখানেক পর তারা জানতে পারেন পাইপের মধ্যে সে পড়ে গেছে। ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হলে তারা এসে উদ্ধারকাজ শুরু করে। এরপর রাতভর চলে উদ্ধার তৎপরতা।



উদ্ধার অভিযানের প্রথম থেকেই আসতে থাকে বিভ্রান্তিকর তথ্য। সন্ধ্যা ৬টার দিকে উদ্ধারকারীদের একজন জানান, পাইপের ভেতরে শিশুটি সাড়া দিচ্ছে। তার জন্য পাঠানো হয় খাবার ও পানি। পাইপের মধ্যে দেওয়া হয় অক্সিজেন। শিশুটির অবস্থান জানার জন্য এতে নামানো হয় ক্যামেরা। রাত পৌনে ৩টার দিকে ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ দেখে উদ্ধারকর্মীরা সংশয় প্রকাশ করেন যে, আদৌ কোনো শিশু পাইপের মধ্যে পড়েছে কি না।



ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা শনিবার বেলা ১১টার দিকে সাংবাদিকদের বলেন, সাধ্যমতো চেষ্টা করা হয়েছে, শিশুটিকে পাওয়া যায়নি। সকালে শক্তিশালী ক্যামেরা দিয়েও দেখা হয়েছে, পাইপের ভেতরে কারো অস্তিত্ব মেলেনি। ক্যাচার দিয়ে চেষ্টা চালানো হয়েছে। কোনো ফল পাওয়া যায়নি।



ফায়ার সার্ভিস উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করার পর স্থানীয় উদ্ধারকর্মীরা শেষমেশ বিশেষভাবে তৈরি একটি খাঁচা পাইপের মধ্যে নামিয়ে জিহাদের অচেতন দেহ তুলে আনেন। পরিসমাপ্তি ঘটে নানা জল্পনা-কল্পনা আর শ্বাসরুদ্ধকর একটি অধ্যায়ের।



জিহাদ চলে গেছে না-ফেরার দেশে। সে পরিত্যক্ত পাইপের মধ্যে পড়েছে- এটা একটা দুর্ঘটনা, তা বলা যাবে না। কারণ, সেই পাইপের মুখ যথাযথভাবে বন্ধ করা থাকলে এটা ঘটত না। যারা গভীর নলকূপের এই পাইপ বসিয়েছেন এবং পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে রেখেছেন, তারা চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছেন।



আমাদের দেশে এখন খাওয়ার পানির উৎস হিসেবে কূপ ও ইন্দিরার ব্যবহার প্রায় উঠেই গেছে। একটা সময় ছিল যখন প্রতিবছর কূপ বা ইন্দিরায় পড়ে বিপুলসংখ্যক শিশুর মৃত্যু হতো। সেপটিক ট্যাংকে পড়ে প্রাণহানির ঘটনা এখনো ঘটে। যারা সেপটিক ট্যাংক তৈরি করান ও করেন, তাদের অসচেতনতা আর দায়িত্বহীনতার কারণেই সেখানে দুর্ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ তারা ঠিকমতো সেপটিক ট্যাংকের ঢাকনা লাগান না এবং এটাকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখেন না। আর আজ পাইপের মুখে শুধু একটি ঢাকনা না থাকার কারণে একটি প্রাণ এমন মর্মান্তিকভাবে ঝরে গেল।



এ দেশে গভীর নলকূপের পাইপে পড়ে প্রাণহানির ঘটনা এই প্রথম। কৃষি সেচসুবিধার জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানেই বসানো হয়েছে গভীর নলকূপ। নানা কারণে অনেক নলকূপ পরিত্যক্তও হয়েছে। অত বড় ব্যাসের বিশাল পাইপ মাটির নিচ থেকে তুলে আনাটা অনেক ব্যয়বহুল বিধায় অনেকে তা তোলেন না। সে ক্ষেত্রে অবশ্যই পাইপের মুখে ঢাকনা যথাযথভাবে লাগানো উচিত, যাতে এ ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটে। একই রকমভাবে সেপটিক ট্যাংকের ঢাকনাও যথাযথভাবে লাগানো উচিত।



শিশুরা খেলবেই, তাদের রুখবে কে? তারা কোথায় গেল, কী করল, সে নজরদারি সবস ময় করা হয়ে ওঠে না। কিন্তু শিশু পড়ে যেতে পারে- এমন কোনো গর্ত, সেপটিক ট্যাংক বা পাইপের মুখ ভালোভাবে বন্ধ করা উচিত, তা নিরাপত্তার স্বার্থেই। এ ব্যাপারে সাবধান হলে এবং দায়িত্বের পরিচয় দেওয়া হলে এভাবে শিশুমৃত্যুর ঘটনা রোধ করা সম্ভব । কথায় আছে, সাবধানের মার নেই।



প্রতিটি প্রাণ অনেক মূল্যবান। এভাবে আর কোনো জিহাদের প্রাণহানি ঘটুক, আমরা তা চাই না।


নিউজ পেজ২৪/ইএইচএম