খোলা কলাম

জানুয়ারী ২২, ২০১৫, ৪:০১ অপরাহ্ন

ভাসানীকে কি প্রাপ্য মর্যাদা দিতে পেরেছি ?

এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া


স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, উপমহাদেশের মেহনতী মানুষের কণ্ঠস্বর, মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ারম্যানমজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ছিলেন এ অঞ্চলের সকল নির্যাতিত মানুষের অবিসংবাদিত নেতা। উপমহাদেশের ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রনায়ক।

১৯৭১ সালের ৯ই মার্চ পল্টনের জনসভায় মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী জনসম্মুক্ষে বলিষ্ঠ কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, “সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর মুক্তি ও স্বাধীনতা সংগ্রামকে কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবে না এবং এ ব্যাপারে কোনো আপোষ সম্ভব নয়, আপোষ চলবে না।” সেদিন তাঁরই কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রিয় মানুষ ও ভাসানী অনুসারীরা স্বাধীনতার জন্য দেশবাসীকে প্রস্তুতি নিতে অনুপ্রাণিত করছিল। সেদিনের জনসভায় মওলানা ভাসানীর “পূর্ব পাকিস্তানের আজাদী ও মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়–ন”— শীর্ষক একটি প্রচারপত্র বিলি করা হয়েছিল। তখন থেকেই বাংলাদেশের জনগণ স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুতি শুরু করেন। অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবে সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর আলোচনা চলতে থাকে। এরই মধ্যে হঠাৎ করেই ২৫ মার্চ ’৭১-এর কালো রাত্রিতে পাকিস্তানের সামরিকজান্তা ইয়াহিয়ার নির্দেশে নিরস্ত্র বাঙালীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী। নির্মমভাবে হত্যা করা হয় হাজার হাজার নারী-পুরুষকে। এর পরপরই ২৬ই মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাটে প্রতিষ্ঠিত হয় “স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র”।

২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী বাঙ্গালীদের উপর যখন সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তখন মওলানা ভাসানী অবস্থান করছিল টাঙ্গাইলের সন্তোষে। সে সময় টাঙ্গাইলে সন্তোষ ছিল পাকিস্তান বাহিনীর আক্রমণের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। এ সম্পর্কে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম লিখেছেন, “৩রা এপ্রিল হানাদার টাঙ্গাইলে এলে আমরা মাটিয়াচরায় বাঁধা দিলাম। মুক্তিবাহিনীর অতর্কীত আক্রমণে ওদের তিন/সাড়ে তিন শত সৈন্য আহত-নিহত হলেও ঠেকিয়ে রাখতে পারলাম না। মুক্তিবাহিনী ও আমাদের পক্ষীয় ইপিআর-এর ১৬জন শাহাদাৎ-বরণ করল। হানাদাররা টাঙ্গাইলে ঢুকেই বদিউজ্জামান খান, আসাদুজ্জামান ও আমাদের আকুর টাকুর পাড়ায় বাড়ী ধ্বংস করল। পরদিন গেল সন্তোষে, মজলুম জননেতা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীকে গ্রেফতার অথবা হত্যা করতে চেয়েছিল।

হুজুর তখন সন্তোষে ছিলেন না, ছিলেন সন্তোষ থেকে মাইল দুই উত্তর পশ্চিমে বিন্যাফৈরে। হানাদাররা ও বিন্যাফৈরে ছুটল। এলোপাথাড়ী গোলাগুলি চালিয়ে বিন্যাফৈরে যাওয়ায় হুজুর জানতে পারে দু’তিনজন মুরীদদের সঙ্গে এক কাপড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পোড়াবাড়ীর দিকে চলে গিয়েছিলেন। নরপশু পাকিস্তান বাহিনী বিন্যাফৈরে বাজার থেকে শতেক গজ দূরে খালের উল্টো পাড়ে মওলানা ভাসানীর বাড়ীতে ভীষণভাবে গোলাগুলি করে এক সময় ষ্ট্রেচার বুলেট দিয়ে দূর থেকেই আগুন ধরিয়ে দেয়। হাজারো স্মৃতি বিজরিত বাড়ীটি দাউ দাউ করে জ্বলতে বৃদ্ধ নেতা নিজের চোখে দেখে গিয়েছিলেন। তারপর নদী পথে প্রথমে সিরাজগঞ্জ যান। সেখান থেকে তাঁর একজন যুবক-সহকর্মী সাইফুল ইসলাম ও মীর্জা মুরাদুজ্জামানকে নৌকায় তুলে নিয়ে ভারতে ছোটেন।”

টাঙ্গাইল থেকে হানাদার বাহিনী এবং তাদের দোসরদের দৃষ্টি এড়িয়ে নানা কৌশলে মওলানা ভাসানী সিরাজগঞ্জ পৌঁছেন। বহু ঝুঁকি পার হয়ে মওলানা ভাসানী ও তার দুই সহযোগী ১৫/১৬ এপ্রিল ’৭১ এ সীমান্ত অতিক্রম করে ভারত পৌঁছেন। ভারত পৌঁছার সপ্তাহ খানেক পর মওলানা ভাসানীর এক সুদীর্ঘ বিবৃতি প্রকাশিত হয় ভারতীয় পত্রপত্রিকায়। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার মাত্র তিন সপ্তাহ পরে তাঁর এই বিবৃতি মুক্তযোদ্ধা ও ভারতের নাগরিকদের কাছে অসামান্য আবেদন সৃষ্টি করে। সীমান্ত অতিক্রম পরে হলদীগঞ্জ বিএসএফ ক্যাম্পে একদিন থাকার পর মওলানা ভাসানী তাঁর দুই সফর সঙ্গীকে নিয়ে কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিল ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। ওই দিনই মেহেরপুর জেলার মুজিব নগরে (বৈদ্যনাথতলায়) শপথ নিয়েছিল প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার। ভারতে অবস্থানকালে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় মাঝে মাঝে ভাসানীর বিবৃতি যখন প্রকাশিত হচ্ছিল তখন স্বাধীনতা সংগ্রামী উজ্জীবিত হতো। তবে মওলানা ভাসানীর বিবৃতি প্রচারিত হলে ও কলকাতায় কেউ তাঁকে স্বশরীরে দেখতে না পাওয়ায় সন্দেহের সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে প্রচারিত হয় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে হত্যা করেছে কিংবা বন্ধী করে রেখেছে। দেশ-বিদেশে খবরটি আলোড়ন সৃষ্টি করে। সেই সময় বাধ্য হয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মইনুল হক চৌধুরী এক সাংবাদিক সম্মেলন করে ঘোষণা করতে বাধ্য হন, “মওলানা ভাসানী যেকোনো মুহূর্তে দিল্লী আসতে পারেন।” ভারতে অবস্থানকালে মওলানা ভাসানী দীর্ঘ সময় কখনো এক স্থানে ছিলেন না।

কখনো কলকাতা, পুণ্ডিবাড়ী, দিল্লী, দেরাদুন কখনো রাণীক্ষেত, আলমোড়া, আসামের ভাসানচর প্রভৃতি স্থানে ছিলেন। তিনি যদিও নজরবন্দী ছিলেন, কিন্তু ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে জাতীয় নেতার মর্যাদা দিতে ভুল করেনি। তাঁর স্বাধীনভাবে চলাফেরা, সকলের সঙ্গে দেখা সাক্ষাতের অধিকার ছিল না।

সেই সময় মওলানা ভাসানীর নজরবন্দীর বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গড়ায়। ’৭১-এর ২ জুনে ‘দি টাইমস’-এর সংবাদদাতা পিটার হেজেরসাষ্ট এক সংবাদ পাঠান এই মর্মে যে, “মওলানা ভাসানী ভারত সরকার কর্তৃক অন্তরীণ।” এমনকি এই সংবাদকে কেন্দ্র করে লন্ডনে তাঁর মুক্তির জন্য কমিটি গঠিত হয়। জুন মাস থেকেই মওলানা ভাসানীকে নিয়ে ব্রিটেনে উদ্বেগ উত্তেজনা দেখা দেয়। মওলানা ভাসানীর অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট বক্তব্য না থাকায় সেখানকার বাঙ্গালীরা শুধু নয়, আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান প্রতিষ্ঠান ও সেগুলোর সাথে জড়িত বিখ্যাত নেতারাও ভারত সরকারের উপর তাঁর নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার জন্য চাপ প্রয়োগ করতে থাকে।

এভাবেই মওলানা ভাসানী ভারতের মাটিতে থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করেন। এরপর প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযুদ্ধকে একটি সর্বদলীয় চরিত্র দেওয়ার জন্য ৯ই সেপ্টেম্বর ’৭১-এ গঠন করেন উপদেষ্টা পরিষদ। যে পরিষদে চেয়ারম্যান মনোনীত করা হয়েছিল সর্বজন শ্রদ্ধেয় জাতীয় নেতা মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীকে। যদিও এক পর্যায়ে এই কমিটি একটি নাম সর্বস্ব ব্যাপারে পরিণত হয়। মওলানা ভাসানী চেয়েছিলেন এই কমিটিকে আরও একটু বড় ও বিস্তৃত আকারে দেওয়ার জন্য, বিশেষ করে বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির প্রতিনিধি রাখার পক্ষপাতি ছিলেন তিনি। মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর মতো রাজনৈতিক নেতা, যিনি ছিলেন দীর্ঘ কর্মময় ও বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী। একটি লেখায় অর্থাৎ ক্ষুদ্র পরিসরে এই অবিসংবাদিত নেতাকে পূর্ণরূপে উপস্থাপন করা সম্ভব নয়। তা ছাড়া এই লেখা মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মওলানা ভাসানীর ভারতে অবস্থানের পর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের কিছু ঘটনা সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরার চেষ্টা মাত্র।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ১২ দিন পর যখন ঢাকায় পত্রপত্রিকায় মওলানা ভাসানীকে নিয়ে নানা ধরনের লেখালেখি শুরু হয়েছে, তখন ভারতে সরকার মওলানা ভাসানীকে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করেন। তখন তাঁর স্বাস্থ্য বিশেষ ভাল ছিল না। দিল্লী থেকে দেশে ফেরার আগে তিনি আসাম যান। সেখানে তাঁর পরিচিতজনদের সাথে দেখা করার অনুমতি চেয়েছিলেন ভারত সরকারের কাছে। ভারত সরকার তাতে সম্মত হয়েছিলেন। ২১ই জানুয়ারি ১৯৭২ আসামের ফরিগঞ্জে তিনি এক জনসভায় ভাষণ দেন, সেখানে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে দীর্ঘ ইতিহাস, পাকিস্তানের বর্বরতা ও ২৩ বছরের শোষণের একটি চিত্র তুলে ধরেছিলেন। ২২ই জানুয়ারি মেঘালয় থেকে তিনি ভারত সরকারের একটি জীপে বাংলাদেশের হালুয়াঘাটে পৌঁছেন। তাঁর সঙ্গে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন চিকিৎসক ছিলেন। হালুয়াঘাটে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা মহান এই জাতীয় নেতা মওলানা ভাসানীকে অভ্যর্থনা জানিয়ে ছিল ময়মনসিংহের তৎকালীন জেলা প্রশাসক খসরুজ্জামান চৌধুরী ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও তাঁর ভক্তমণ্ডলী।

সড়কপথে ক্লান্তশ্রান্ত দেহে ২২ জানুয়ারি ৭২-এ মেষ রাতে তিনি পৌঁছেন টাঙ্গাইলে। রাতে সার্কিট হাউসেই রইলেন তিনি। কারণ, মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই পাকিস্তানী সেনারা তাঁর সন্তোষের বাড়ীটি পুড়িয়ে দিয়েছিল। পরদিন অর্থাৎ ২৩ জানুয়ারি সকালে মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা, স্থানীয় আওয়ামী লীগ, ন্যাপসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা তাঁকে দেখতে সমাবেত হন সার্কিট হাউসে। বহুদিন পর পরিচিত মানুষ ও সহকর্মীদের সঙ্গে দেখা পাওয়ায় উৎফুল্ল হয়ে উঠেন মজলুম জননেতা। পকেট থেকে ১০ টাকা বের করে একজনকে দিয়ে বললেন, সন্দেশ নিয়ে এসো। ওই ১০ টাকার সাথে আরও টাকা যোগ করে আনা হল সন্দেশ। সকলকেই মিষ্টিমুখ করালেন তিনি।

দেখতে দেখতে অসংখ্য মানুষ জড় হল, যেন ছোট-খাটো জনসমাবেশ। ফুটপাতের এক দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে নাতিদীর্ঘ স্বভাবসুলভ ভাষণ দেন তিনি। বহুদিন পর টাঙ্গাইলবাসী শুনতে পায় তাঁদের পরিচিত কণ্ঠ। আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ে উপস্থিত জনতা। এরপর তিনি টাঙ্গাইল থেকে গেলেন সন্তোষের নিজ বাড়ীতে। তাঁর অঞ্চলের মানুষের স্বাধীনতা যুদ্ধে ক্ষয়-ক্ষতি ও দুঃখ-দুর্দশা দেখে তিনি আপসোস করলেন, সমাবেদনা জানালেন। তাঁর গভীর অথচ চাপা দীর্ঘ নিঃশ্বাস গোপন থাকল না উপস্থিত শ্রোতাদের কাছে। প্রত্যক্ষদর্শনীদের বিবরণ : “দলে দলে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে ভক্তরা এসে পা ছুঁয়ে সালাম করতে লাগল তাঁদের প্রিয় হুজুর বা পীরবাবাকে। যেন মাটিরই পৃথিবীতে এই সদ্য এসেছেন পথ ভুলে এক মহামানব মাটির মানুষের পরমাত্মীয়। এলাকার কে কোথায় মারা গেছেন, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বা কেমন আছে সে খবর নিলেন তিনি। ঘনিষ্ঠ কারো কারো নিহত হবার কথা শুনে তাঁর চোখ অশ্রুসিক্ত ও কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হল।”

মওলানা ভাসানীর প্রতিষ্ঠিত তাঁরই স্বপ্নের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরানো দালানের একটি কক্ষে তাঁর থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল। ইতোমধ্যেই যথাপূর্ব খিচুরী রান্না শুরু হয়ে গিয়েছিল সেখানে। কলার পাতায় যাঁর যেমন খুশী খাচ্ছেন। সকলের সঙ্গে মওলানা ভাসানীও খেলেন বেশ পরিতৃপ্তি সহকারে। শীতের ছোট দিন, তাড়াতাড়ি সন্ধ্যা এল, দর্শনার্থীদের ভীড় কমল কিছু।

ঘরের যাবতীয় আসবাবপত্র বিছানা, মলিন কাথা-বালিশ পর্যন্ত ভষ্ম করে দিয়েছিল ইয়াহিয়ার ফৌজ। তীব্র শীত পড়েছিল সেদিন। নেতার বিছানাপত্রের ব্যাপারে ভক্তেরা পুরু করে নাড়া বিছিয়ে তার ওপরে একটি চট দিয়ে বিছানা করে দিলেন তাঁকে। আশপাশের কারো বাড়ি থেকে জোগাড় হয়েছিল একটি জীর্ণ কাথা, অপেক্ষাকৃত তাড়াতাড়িই সেদিন শুয়ে পড়লেন মওলানা। স্বাধীন দেশে ফিরে এসে মাটির শয্যায় প্রথমবার স্বাধীনভাবে পরম শান্তিতে ঘুমালেন এ মাটির এক উচু-মানব। পরদিন অবশ্য তার ভক্তরা একটি লেপ ও একটি তোষক তৈরী করে দেন।

প্রত্যাবর্তনের দু’দিন পর স্বাধীনদেশে প্রথম সাংবাদিক সাক্ষাৎকারে তিনি দেশবাসীকে আহ্বান জানান সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দেবার। তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য যতদিন কাজ করবে এবং দেশের ও জনগণের কল্যাণের জন্য বাস্তব পদক্ষেপ নেবে ততদিন তিনি সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে যাবেন। এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে, অতীতের স্বৈরাচারী সরকারগুলোর মতো তাঁর সরকারেরও পতন অনিবার্য।”

মজলুম জনগণের স্বপ্ন বাস্তবায়িত করার জন্য অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী। মওলানা ভাসানী আছেন এবং থাকবেন। যতদিন মেহনতী মানুষের সংগ্রাম চলবে ততদিন মওলানা ভাসানী বেঁচে থাকবেন। মওলানা ভাসানী ক্ষমতায় যাননি বটে, তবে তিনি ছিলেন ক্ষমতার পালাবদলের অনুঘটক।

মওলানা ভাসানী ছিলেন একজন দূরদর্শী রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রনায়ক। আর এ কারণেই ১৯৫৬ সালেই পাকিস্তানীদের প্রতি সালাম জানিয়েছিলেন— যার বাস্তব রূপই হচ্ছে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। ক্ষমতায় না গিয়েও কীভাবে দেশ-জাতির কল্যাণ করা যায় মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক জীবন তার প্রমাণ বহন করে। তাঁকে শুধুমাত্র মহাত্মা গান্ধীর সাথে তুলনা করা যায়। বাংলাদেশের কৃষক-শ্রমিক, কামার-কুমার, তাঁতী-জেলে চিরকাল স্মরণ রাখবে তাঁদের এই আপন মানুষটির কথা। তাঁদের মুক্তির জন্যে উৎসর্গীকৃত ছিল যাঁর গোটা জীবন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণ এবং দরিদ্র জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য মওলানা ভাসানী যে ঐক্যের বাণী রেখে গেছেন তা আজও আমাদের কাছে অবশ্যই স্মরণীয়। মওলানা ভাসানী আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় স্বাধীনতার পতাকা সমুন্নত রাখার দায়িত্বের কথা, বঞ্চিত জনগণের দারিদ্র্যের অন্ধকার থেকে তুলে এনে সমৃদ্ধির আলোকবৃত্তে প্রতিষ্ঠত করার কাজের কথা।

পরিতাপের বিষয়, স্বাধীনতার ৪৪ বছরের সরকারগুলো তাঁকে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। যেমন ব্যর্থ হয়েছে তাঁর হাতে প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগ, আবার তাঁর রাজনৈতিক দর্শন অনেকাংশে লালনকারী বিএনপি এমনকি নিদর্লীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারগুলোও। অবাক হওয়ার মতো বিষয় হলেও এটাই বাস্তবতা যে— আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের প্রয়োজনে মওলানা ভাসানীকে ব্যবহার করলেও প্রকৃত অর্থে তাঁকে তাঁর যথাযোগ্য মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করার কোনো কর্মসূচীই গ্রহণ করেনি। - দ্য রিপোর্ট

লেখক : মহাসচিব, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (বাংলাদেশ ন্যাপ)


নিউজপেজ২৪/টিএম