খোলা কলাম

ফেব্রুয়ারী ৯, ২০১৫, ৭:৫৮ অপরাহ্ন

মোদির পররাষ্ট্রনীতিতে কি বড় পরিবর্তন আসছে?

তারেক শামসুর রেহমান

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার বহুল আলোচিত ভারত সফর এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের বেইজিং সফরের পর যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হচ্ছে মোদি কি পররাষ্ট্রনীতিতে একটি ভারসাম্যমূলক অবস্থান গ্রহণ করতে যাচ্ছেন? এটা ঠিক ওবামার সফরের পরপরই বেইজিং যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল, তাতে চীনের অসন্তুষ্টিই প্রমাণিত হয়েছে। চীনের বক্তব্য থেকে এটা বোঝা গিয়েছিল, চীন ওবামার ভারত সফরে সন্তুষ্ট তো নয়ই, বরং ভারত যুক্তরাষ্ট্রের ফাঁদে পা দিলে তা দেশটির জন্য কোনো মঙ্গল বয়ে আনবে না- এটা জানাতেও ভোলেননি। এখন সুষমা স্বরাজের বেইজিং সফরের পরপরই ঘোষণা করা হয়েছে, নরেন্দ্র মোদি মে মাসে চীন সফর করবেন। ফলে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়- মোদি দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে একই ধরনের সম্পর্ক রেখে তার জাতীয় স্বার্থ কতটুকু অর্জন করতে পারবেন?

ওবামার পরপর দুইবার ভারত সফর, ভারতের সঙ্গে 'যৌথ অংশীদারিত্ব সংলাপ' চুক্তি কিংবা চলতি বছরের জানুয়ারিতে 'ভাইব্রান্ট গুজরাট' শীর্ষ সম্মেলনে জন কেরির যোগদান প্রমাণ করে, ভারতের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ অনেক বেশি। এশীয় প্যাসিফিক অঞ্চলে যে নয়া শক্তির বিন্যাস ঘটেছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে পাশে চায়। অন্যদিকে চীন ভারতের দিকেও হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। সেপ্টেম্বরে চীনের প্রেসিডেন্টের ভারত সফর (২০১৪), আহমেদাবাদ বিমানবন্দরে মোদি নিজে উপস্থিত থেকে চীনা প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানানো প্রমাণ করে, মোদি তার বৈদেশিক নীতিতে চীনকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। এর প্রমাণস্বরূপই তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বেইজিং পাঠালেন এবং নিজে মে মাসে চীনে যাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্ররা জানেন, প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের সঙ্গে তার পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর (ফিলিপাইন, জাপান, ভিয়েতনাম) যে দ্বন্দ্ব, সেই দ্বন্দ্বকে যুক্তরাষ্ট্র তার স্বার্থে ব্যবহার করতে চায়। এক্ষেত্রে ভারতকেও পাশে চায় যুক্তরাষ্ট্র। যাতে করে এশীয় প্যাসিফিক অঞ্চলজুড়ে চীনবিরোধী একটি ঐক্য গড়ে তোলা সম্ভব। কিছুদিন আগে জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতে এসেছিলেন। সেখানে তিনি অরুনাচল রাজ্য যে ভারতের, সে ব্যাপারে বক্তব্য দিয়েছিলেন। ফুমিও কিসিদার ওই বক্তব্যে চীন ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল। চীন অরুনাচল রাজ্যের ওপর তার দাবি পরিত্যাগ করেনি। চীন মনে করে, ভারত জাপানকে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে। এশিয়ায় প্যাসিফিক অঞ্চল তথা ভারত মহাসাগর আগামী দিনে প্রত্যক্ষ করবে এক ধরনের প্রভাব বিস্তার করার প্রতিযোগিতা। এ দুইটি অঞ্চলে সাম্প্রতিক বেশ কিছু 'সামরিক তৎপরতা' লক্ষণীয়। দক্ষিণে চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সমন্বয়ে একটি সামরিক ঐক্য গঠিত হয়েছে। উদ্দেশ্য হচ্ছে, চীনের ওপর 'চাপ' প্রয়োগ করা। অন্যদিকে ভারত মহাসাগর অঞ্চলে চীন তার নৌবাহিনীর তৎপরতা বাড়িয়েছে। দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মালাক্কা প্রণালি হয়ে ভারত মহাসাগর অতিক্রম করে অ্যারাবিয়ান গালফ পর্যন্ত যে সমুদ্রপথ, তার নিয়ন্ত্রণ নিতে চায় চীন। কারণ এ পথ তার জ্বালানি সরবরাহের পথ। চীনের জ্বালানি চাহিদা প্রচুর। এদিকে ভারতও ভারত মহাসাগরে তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ভারতের নৌবাহিনীর 'নিউ ইস্টার্ন ফ্লিট'-এ যুক্ত হয়েছে বিমানবাহী জাহাজ। রয়েছে পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন। আন্দামান ও নিকোবরে রয়েছে তাদের ঘাঁটি। ফলে এক ধরনের প্রতিযোগিতা চীন ও ভারতের মাঝে রয়েছে। এশিয়া প্যাসিফিক ও দক্ষিণ এশিয়ার কর্তৃত্ব নিয়ে চীন ও ভারতের অবস্থান এখন অনেকটা পরস্পরবিরোধী। যেখানে চীনা নের্তৃত্ব একটি নয়া 'মেরিটাইম সিল্ক রুট'-এর কথা বলছে, সেখানে মোদি সরকার বলছে 'ইন্দো-প্যাসিফিক ইকোনমিক করিডোর'। স্বার্থ এক ও অভিন্ন- এ অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। আর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে গিয়েই এশিয়ার এ দুইটি বড় দেশের মধ্যে দ্বন্দ্ব অনিবার্য। এটাকেই কাজে লাগাতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।


একসময় মার্কিনি গবেষকরা একটি সম্ভাব্য চীন-ভারত অ্যালায়েন্সের কথা বলেছিলেন। জনাথন হোলসলাগ ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে লিখিত একটি প্রবন্ধে Chindia (অর্থাৎ চীন-ভারত) এর ধারণা দিয়েছিলেন। নয়া চীনা প্রেসিডেন্টের ভারত সফরের (২০১৪) পর ধারণা করা হচ্ছিল, দেশ দুইটি আরও কাছাকাছি আসবে। কিন্তু শ্রীলঙ্কার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের ভূমিকা, ওবামার ভারত সফর এবং চীনা প্রেসিডেন্টের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হচ্ছে এ সম্ভাবনা এখন ক্ষীণ। নতুন আঙ্গিকে 'ইন্ডিয়া ডকট্রিনের' ধারণা আবার ফিরে এসেছে। এ 'ইন্ডিয়া ডকট্রিন' মনরো ডকট্রিনের দক্ষিণ এশীয় সংস্করণ। অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ায় অন্য কারও কর্তৃত্ব ভারত স্বীকার করে নেবে না। এক সময় ওই এলাকা, অর্থাৎ ভারত মহাসাগরীয় এলাকা ঘিরে 'প্রিমাকভ ডকট্র্রিন' (২০০৭ সালে রচিত। শ্রীলঙ্কা, চীন, ইরান ও রাশিয়ার মধ্যকার ঐক্য) এর যে ধারণা ছিল, শ্রীলঙ্কায় সিরিসেনার বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গে এ ধারণা এখন আর কাজ করবে না। ফলে বাংলাদেশ তার পূর্বমুখী ধারণাকে আরও শক্তিশালী করতে বিসিআইএম (বাংলাদেশ, চীনের ইউনান রাজ্য, ভারতের সাতবোন, মিয়ানমার) যে আগ্রহ দেখিয়েছিল, তাতে তখন শ্লথগতি আসবে। সামরিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্নে ভারত এখন আর বিসিআইএম ধারণাকে 'প্রমোট' করবে না। আর বাংলাদেশের একার পক্ষে চীন ও মিয়ানমারকে সঙ্গে নিয়ে 'সিসিএম' ধারণাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াও সম্ভব হবে না।


তবে এটা স্বীকার করতেই হবে, ওবামার সফরের মধ্য দিয়ে ভারত নানাভাবে লাভবান হয়েছে। 'পাক্কা গুজরাটি' নরেন্দ্র মোদি জাতিগতভাবেই ব্যবসা বোঝেন। যেখানে ভারতের জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩০ ভাগ মানুষ অতি দরিদ্র, অর্ধেক জনগোষ্ঠীর সেখানে স্বাস্থ্যসম্মত কোনো পায়খানা নেই। আর সেখানকার ৩১ ভাগ জনগোষ্ঠীর দৈনিক আয় ১ দশমিক ২৫ সেন্টের নিচে (যা কিনা জাতিসংঘ কর্তৃক নির্ধারিত অতি দরিদ্রের মানদন্ড)। ভারতে প্রতি তিনজনের মধ্যে একজন দরিদ্র। ১২১ কোটি জনসংখ্যার দেশ ভারত। আর প্রতিদিন ভারতে মারা যায় ৫ হাজার শিশু। আর কন্যাশিশুর ভ্রূণ হত্যা করার কাহিনী তো অনেক পুরনো। সংবাদপত্রে ছাপা হওয়া একটি সংবাদে বলা হয়েছিল, ভারতের ১ লাখ ৮৩ হাজার কৃষক ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে গত ১০ বছরে আত্মহত্যা করেছেন। মোদি এখানে পরিবর্তনটি আনতে চাচ্ছেন। তার পররাষ্ট্রনীতির মূল কথা হচ্ছে- বিনিয়োগ বাড়ানো। আর বিনিয়োগ বাড়াতেই তিনি চীনা ও মার্কিন বিনিয়োগকারীদের দিকে হাত বাড়িয়েছেন। স্বভাবতই ভারতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়বে। দারিদ্র্য কমবে। মানুষের মধ্যে যে বৈষম্য তা যদি কমিয়ে আনা যায়, ভারত আরও সামনে এগিয়ে যাবে। মোদির স্বার্থ এখানেই। তবে একটা ভয়ের কারণ আছে। আর তা হচ্ছে, চির বৈরী দুই দেশ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা। ওবামার ভারত সফরের পরপরই ভারত পারমাণবিক বোমা বহনযোগ্য মিসাইল অগ্নি-৫ উৎক্ষেপণ করেছে। এ অগ্নি-৫ এর ব্যাপ্তি সুদূর চীন পর্যন্ত। ভারত এখন আর পাকিস্তানকে বিবেচনায় নিচ্ছে না। ভারতের টার্গেট হচ্ছে চীন। অর্থাৎ চীনের কর্তৃত্ব কমানো। অগ্নি-৫ নিক্ষেপের পরদিনই পাকিস্তান তার পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র 'রাদ' বা 'ব্রজ' এর পরীক্ষা চালিয়েছে। এর আগে পাকিস্তান হাতল নামে পারমাণবিক বোমা বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছিল। ফলে দেশ দুইটি আবারও এক ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষায় নিয়োজিত হলো। মোদির পররাষ্ট্রনীতিতে পাকিস্তানের কোনো জায়গা নেই। যদিও শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে পাকিস্তানি প্রাধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের উপস্থিতি দেখে মনে হয়েছিল, দুই দেশের সম্পর্ক বাড়বে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, মোদির পররাষ্ট্রনীতিতে পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলো গুরুত্ব পাচ্ছে বেশি। এরই মধ্যে তিনি ভুটান, নেপাল সফর করছেন। এ মাসে যাচ্ছেন শ্রীলঙ্কায়। তিনি জাফনাতেও যাবেন। মার্চে বাংলাদেশে আসতে পারেন। চীনের গুরুত্ব দেয়ার পেছনে কাজ করছে তার ব্যবসায়িক নীতি। তিনি চান বিনিয়োগ। তবে চূড়ান্ত বিচারে চীনের সঙ্গে তার সম্পর্ক কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, তা এ মুহূর্তে বোঝা যাচ্ছে না। তবে এ অঞ্চলে চীনের প্রভাব কমানোই হবে মোদি সরকারের এক নম্বর অগ্রাধিকার।


মোদির পররাষ্ট্রনীতি পর্যালোচনা করলে এটা বলা যায়, মোদি একটি ভারসাম্যমূলক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছেন। একদিকে চীন, অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি রাশিয়ার সঙ্গেও সমমর্যাদাভিত্তিক সম্পর্ক রক্ষা করে মোদি তার পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করছেন। রাশিয়া থেকে তিনি অস্ত্র কিনছেন। ইউরোপ ইস্যুতে তিনি রাশিয়ার অবস্থানকে সমর্থন করেছেন (এ প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থানও অনেকটা ভারতের মতো)। রাশিয়া ও চীনকে সঙ্গে নিয়ে ভারত ব্রিকস ব্যাংক গড়ে তুলছে, যা কিনা হবে বিশ্ব ব্যাংকের বিকল্প 'আরেকটি বিশ্বব্যাংক'। বাংলাদেশও এ ব্যাংকের ব্যাপারে আগ্রহী। সুষমা স্বরাজের বেইজিং সফরের সময় সেখানে এ দেশীয় একটি 'মিনি সামিট' হয়েছে। চীন, রাশিয়া ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা সেখানে মিলিত হয়েছেন। ফলে বোঝাই যায়, ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বড় ধরনের ব্যবসায়িক ও পারমাণবিক সম্পর্ক গড়ে তুললেও, চীন ও রাশিয়াকেও কাছে রাখতে চায় ভারত। এখন আগামী দিনগুলোই প্রমাণ করবে এ সম্পর্ক কোন পর্যায়ে গিয়ে উন্নীত হয়।

অনেকেই স্মরণ করতে পারেন, একুশ শতক হবে এশিয়ার। তিনটি বড় অর্থনৈতিক শক্তি- চীন, জাপান ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক একুশ শতকের রাজনীতির গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করবে। সঙ্গত কারণেই বিশ্বের বৃহৎ শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ থাকবে এ অঞ্চলের ব্যাপারে। যদিও জাপানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। জাপানের নিরাপত্তার গ্যারান্টারও যুক্তরাষ্ট্র। জাপানে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি রয়েছে। একই কথা প্রযোজ্য ফিলিপাইনের ক্ষেত্রেও। ফলে এ অঞ্চলে চীনের সঙ্গে যে বিবাদ (জাপান ও ফিলিপাইনের সঙ্গে) তাতে যুক্তরাষ্ট্র একটি পক্ষ নিয়েছে। এদিকে চীনের নয়া প্রেসিডেন্ট শি জেন পিংকে করা সিল্ক রোডের কথা বলছেন, তা 'অন্য চোখে' দেখছে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের ধারণা- এতে করে বিশাল এক এলাকাজুড়ে চীনা কর্তৃত্ব, প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। ইতিহাসের ছাত্ররা অনেকেই জানেন, ২১০০ বছর আগে চীনের হান রাজবংশ এ 'সিল্ক রোড'টি প্রতিষ্ঠা করেছিল। এ 'সিল্ক রোড'র মাধ্যমে চীনের পণ্য (সিল্ক) সদূর পারস্য অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছে যেত। এর মধ্য দিয়ে আজকের যে মধ্যপ্রাচ্য সেখানেও চীনের প্রভাব বেড়েছিল। চীনের নয়া প্রেসিডেন্ট এর নামকরণ করেছেন 'নিউ সিল্ক রোড ইকোনমিক বেল্ট'। এটা চীনের পশ্চিমাঞ্চল থেকে শুরু করে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত সম্প্রসারিত। একইসঙ্গে একটি 'মেরিটাইম সিল্ক রোড' এর কথাও আমরা জানি, যা কিনা চীনের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর একটি যোগসূত্র ঘটিয়েছিল। ইতিহাস থেকে জানা যায়, চীন থেকে সমুদ্রপথে বাণিজ্য করতে চীনারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া, ব্রুনাই ও মালয়েশিয়ায় এসেছিল। পরে তারা স্থায়ী হয়ে যায়। এমন কথাও বলা হয়, ব্রুনাইয়ে ইসলাম প্রচারের ব্যাপারে চীনাদের অবদান ছিল বেশি। ২০১২ সালে আমি তুরস্কে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়ে চীনাদের এ সিল্ক রোডের আগ্রহের কথা জানতে পারি। এ সিল্ক রোডের যে অংশ তুরস্কে পড়েছে, আমি সেই পথ ধরেও বেশ কিছুটা পথ পাড়ি দিয়েছি। ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জেন পিং তার প্রথম সফরে কাজাখস্তানে গিয়ে তার ঐতিহাসিক পরিকল্পনা ব্যক্ত করেন। এর পরের মাসে ইন্দোনেশিয়ার পার্লামেন্টে দেয়া ভাষণে তিনি দ্বিতীয় 'মেরিটাইম সিল্ক রোড'র কথাও বলেন। এতে করে একটা ধারণার জন্ম হয় যে, চীন শুধু মধ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়া, পারস্য উপসাগর এবং মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত বিশাল এক অর্থনৈতিক সংযোগ কাঠামো গড়ে তুলতে চায়। ইরানে যে চীনের বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে, এটা নিশ্চয়ই অনেক পাঠকই জানেন। এখন যে প্রশ্নটি অনেক পর্যবেক্ষকই করেন তা হচ্ছে চীনের এ 'ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড'র নীতি ভারতীয় স্বার্থের সঙ্গে কতটুকু সাংঘর্ষিক। কেননা দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত তার নিজস্ব মডেল 'ভারতীয় মনরো ডকট্রিন'র কাঠামো গড়ে তুলছে। অর্থনৈতিক প্রভাব বলয় বিস্তারের প্রতিযোগিতায় দ্বন্দ্ব তাই অনিবার্য। তার আটলান্টিক ও প্যাসিফিকের ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র এ দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে 'ফায়দা' ওঠাতে চাইবে। আগামী দিনগুলো তাই যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক, অন্যদিকে ভারত-চীন সম্পর্ক এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের রাজনীতিকে কোথায় নিয়ে যায়- সেটাই দেখার বিষয়।-আলোকিত বাংলাদেশ

ড. তারেক শামসুর রেহমান, অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক