খোলা কলাম

মার্চ ৮, ২০১৫, ৭:১৫ অপরাহ্ন

খালেদা জিয়াকে অ্যারেস্ট না করার অন্তরালে...

কাজী সিরাজ

সরকারি দলের লোকজনের হাঁকডাক কিছুটা কমতে শুরু করেছে বলে মনে হয়। মন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, শাসক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ এবং লীগ নেতা হাছান মাহমুদ প্রমুখ যাদের কথার বিষে কারও কারও গায়ে জ্বালা ধরত, তারা জিহ্বা অনেকটা সামলে নিয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। কথা একেবারে বন্ধ করেননি, বিষ কমিয়েছেন। তবে চালিয়ে যাচ্ছেন এখনো স্বাস্থ্যমন্ত্রী মো. নাসিম এবং 'কালো বিড়াল বিতর্ক-খ্যাত' সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। সুরঞ্জিত একসময় আওয়ামী লীগের একজন নীতি-নির্ধারক ছিলেন, ছিলেন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য। ওয়ান-ইলেভেনের পর আওয়ামী লীগে যারা সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন, তিনি তাদের অন্যতম। সেই 'অপরাধে' নেত্রীর রোষানলে পড়েছিলেন এবং দলে উচ্চপদ থেকে তাকে বের করে দিয়ে 'নেতায়ে খামাখা' উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য করা হয়েছে। তা-ও নেত্রীর কাছে নতজানু হওয়ার পর। ভাগ্যগুণে মন্ত্রীও হয়েছিলেন ক'মাসের জন্য- রেলমন্ত্রী। বলেছিলেন রেলের 'কালো বিড়াল' তাড়াবেন। টাকার বস্তা নিয়ে তার এপিএস যখন সাবেক বিডিআর গেটে ধরা পড়ল, সে কী কেলেঙ্কারি অবস্থা! রেলের 'কালো বিড়াল' তাড়ানোর কথা মনে হলেই মানুষ সুরঞ্জিত বাবুর সেই 'ঐতিহাসিক' বক্তব্যের কথা স্মরণ করে এবং হাসে। টাকার বস্তা কাহিনীর সূত্র ধরে রেলমন্ত্রীর চাকরিটা হারালেও কিছুদিন তাকে 'উজিরে খামাখা' করে রাখা হয়েছিল। পরে তা-ও গেছে। বোঝা যায়, যা গেছে তা আবার ফেরত পাওয়ার আশায় তিনি নেত্রীর মন জয়ের চেষ্টা করছেন চমকদার-চটকদার কথা বলে। তার ভাষায় ২০১৯ সালের আগে নির্বাচন তো দূরের কথা, সেই ব্যাপারে বিএনপির সঙ্গে কোনো কথাও নাকি হবে না। মো. নাসিমের কথাবার্তার ঝাঁজ বরাবরই এমন। তবে অনেকে বলেন, দলীয় ফোরামে আলোচনায়, মেঠো বক্তৃতায় তিনি যতটা কর্কশ, ব্যক্তিগত আলোচনায় এবং দূতিয়ালি সংলাপে তিনি তেমন নন- অনেকটাই নির্ভরযোগ্য ও কোমল। বাইরে তিনি যা বলেন সব সময় নাকি তা মিন করেন না। তার মানে দাঁড়াল এই যে, বর্তমান জাতীয় সংকট মোকাবিলায় লীগ সরকার তার এতদিনকার কৌশল অর্থাৎ বিরোধী পক্ষকে কঠোরভাবে মোকাবিলার অবস্থান পরিবর্তন করেছে।


দেশে 'ক্ষমতার রাজনীতি'কে কেন্দ্র করে এখন যা চলছে তা রীতিমতো অসহনীয়। দু'মাসের বেশি সময় ধরে চলছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের ডাকা অবরোধ কর্মসূচি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করে রাজধানী ঢাকাসহ কয়েকটি শহরে সরকার যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করলেও মানুষের নিত্যজীবন যেভাবে চলা দরকার সেভাবে কি চলছে? না, চলছে না। স্কুল-কলেজের গেট খোলা থাকছে কিন্তু ছাত্র-ছাত্রী যাচ্ছে না, ক্লাস হচ্ছে না, অফিস-আদালত খোলা থাকছে কিন্তু কাজ যা হচ্ছে তার চেয়ে গসিফ হচ্ছে বেশি। কল-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, উৎপাদিত পণ্য সরবরাহ করা যাচ্ছে না, কৃষকের ফসল ক্ষেতেই পচে যাচ্ছে ক্রেতার অভাবে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ শূন্যের কোঠায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশাল রিজার্ভের কথা বলে ফুটানি দেখিয়ে লাভ কি? রাজধানী কার্যত সারা দেশ থেকে এখনো বিচ্ছিন্নই বলা চলে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, বর্তমান সংকট জাতীয় সংকট। প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, দেশে এ পর্যন্ত দুই মাসে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে।

এহেন সংকটকালীন অবস্থায় দেশের রাজনীতিবহির্ভূত চিন্তাশীল মানুষ, ব্যবসায়ী মহল এবং বিদেশি বন্ধুরাষ্ট্র ও উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও প্রতিষ্ঠানসমূহের পক্ষ থেকে বারবার বিবদমান রাজনৈতিক পক্ষসমূহের মধ্যে সমঝোতার লক্ষ্যে দ্রুত সংলাপে বসার তাগিদ দেওয়া হচ্ছিল। সরকারের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি তাদের আন্দোলন শুরুর আগে থেকেই সংলাপের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বারবার সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতার কথা বলে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করেছেন স্বয়ং জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন। তিনি সংলাপে বসে সমঝোতার জন্য দুই বড় দলের দুই নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে চিঠি পর্যন্ত লিখেছেন। বিএনপি অনুকূল সাড়া দিয়ে চিঠির জবাব দিয়েছে। সরকারের জবাব এখনো গেছে কিনা জানি না, তবে পত্র-পত্রিকায় খবর বেরিয়েছিল, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের চিঠির জবাবের মুসাবিদা চলছে। বিষয়বস্তু সম্পর্কে যা আভাষ পাওয়া গেছে তা হতাশাজনকই ছিল। ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল, এ মুহূর্তে আলোচনার কোনো পরিবেশ নেই বলে মহাসচিবকে জানানো হবে। অর্থাৎ সরকারের মনোভাব এ ব্যাপারে নেতিবাচক।

কিন্তু এর মধ্যেই কিছু তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষকে সংলাপে বসানোর একটি উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার- যিনি একসময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার খুব বিশ্বস্ত ও প্রিয়ভাজন ছিলেন বলে প্রচার আছে, সেই ডক্টর এ. টি. এম. শামসুল হুদাকে প্রধান করে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে একটি কমিটিও করা হয়। তারা সংলাপের আয়োজন করার জন্য প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি চেয়ারপারসনকে চিঠিও লিখেন। সরকারি দলের পক্ষ থেকে এই উদ্যোগ সম্পর্কে নানা কটূক্তি ও টিপ্পনি সত্ত্বেও সচেতন জনগণ এই উদ্যোগকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবেই বিবেচনা করেছে। সবার মধ্যেই একটা বদ্ধমূল ধারণা কাজ করছে যে, এই উদ্যোগের পেছনে দেশি-বিদেশি অনেক গুরুত্বপূর্ণ 'শক্তিকেন্দ্রের' সমর্থন রয়েছে। কেননা, এই উদ্যোগের সঙ্গে, বিশেষ করে কমিটির যারা সদস্য, তারা কেউ আমাদের সমাজের অপরিচিত ও অপাঙ্ক্তেয় ব্যক্তি নন। তারা সবাই বিভিন্ন সময় রাষ্ট্র ও সরকারের বিভিন্ন উচ্চ পর্যায়ে ছিলেন, ফলে 'বিভিন্ন মহলে' তাদের সম্পর্ক সূত্রও বেশ দৃঢ় হওয়া স্বাভাবিক। প্রমাণ পাওয়া গেল প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। দেশের ভিতরে আওয়ামী বলয়ের বাইরের সুধীজন ও শান্তিপ্রিয় মানুষ উদ্যোগটির পক্ষে অনুকূল সাড়াই দিয়েছে বলতে হবে। একই কাছাকাছি সময় ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট নড়েচড়ে ওঠে একই ইস্যুতে। জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত স্টিফেন ফার্দিনান্দ তারানকো এবং মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়ালের বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা, তারই পাশাপাশি জাতিসংঘ মহাসচিবের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে শান্তির অন্বেষা অবশ্যই কাকতালীয় কোনো বিষয় নয়। একটির সঙ্গে অপরটির অবশ্যই একটা যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি ঘটল গত ৩ মার্চ। একসঙ্গে ১৬ কূটনীতিক দেখা করলেন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে। বেশ কিছুদিন ধরেই শোনা যাচ্ছিল, বিদেশি কূটনীতিকরা বেগম জিয়ার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করুক, কথাবার্তা বলুক সরকার তা চায় না। সরকারি তেমন মনোভাবকে উপেক্ষা করেই একসঙ্গে এতজন বিদেশি কূটনীতিক দেখা করলেন বিএনপি নেত্রীর সঙ্গে। যতদূর জানা গেছে, বিএনপি উদ্যোগ নিয়ে বা আমন্ত্রণ জানিয়ে তাদের পার্টি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে নিয়ে যায়নি। তারা গেছেন স্ব-উদ্যোগে। আমাদের জাতীয় ইতিহাসে এটা একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা এ কারণে যে, আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ সংকটে উদ্বেগ প্রকাশ করে তা নিরসনের একটা শক্তিশালী উদ্যোগের অংশ হিসেবে তারা এই উদ্যোগ নিয়েছেন। মিডিয়াতেই এসেছে, তারা বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি সহিংসতা-নাশকতা বন্ধে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন এবং শান্তিপূর্ণ পন্থায় সব সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। এই সাক্ষাৎ সরকারের প্রতিও একটি শক্ত বার্তা বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষক মহল। ধারণা করা হচ্ছে, সরকার বার্তাটি সঠিকভাবেই অনুধাবন করেছে- যার প্রতিফলন আছে তাদের প্রতিক্রিয়ায়। ৬ মার্চ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১১ জন কংগ্রেসম্যান তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরিকে বাংলাদেশ পরিস্থিতিতে ভূমিকা রাখার জন্য যে চিঠি দিয়েছেন আলোচিত প্রসঙ্গে তা-ও খুব গুরুত্বপূর্ণ।

কূটনীতিকরা এমন একটা সময় বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন, পরদিনই ছিল তার আদালতে হাজিরা দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ তারিখ। এর আগের তারিখেই গরহাজির থাকার কারণে তার জামিন বাতিল হয় এবং আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। ওই দিন পর্যন্ত গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর করা না হলেও রটনা ছিল ৪ মার্চ হাজিরা দিয়ে জামিন প্রার্থনা করলেও তা মঞ্জুর করা হবে না, তাকে জেলে পাঠানো হবে; আর তিনি যদি আদালতে হাজিরা দিতে না যান তাহলে তাকে গ্রেফতার করেই আদালতে নেওয়া হবে। বিএনপি থেকেও এমন ধারণা স্পষ্ট করা হয়েছিল যে, বেগম খালেদা জিয়া গ্রেফতার বরণের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন এবং তার গ্রেফতারের পর দলের নেতৃত্ব কাঠামো ও আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচিও নির্ধারণ করে রেখেছিলেন। জানা গেছে, বেগম জিয়ার গ্রেফতারের সঙ্গে সঙ্গেই অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা হবে। পরিস্থিতি আন্দাজ করেই ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ মন্তব্য করেছিল, বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করলে বাংলাদেশ পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়বে। ৪ মার্চ বেগম জিয়া আদালতে হাজিরা দিতে যাননি নিরাপত্তাজনিত কারণে। গ্রেফতারি পরোয়ানা বাতিল করে তার জামিনের জন্য আবেদন করেছেন তার আইনজীবীরা। আদালত তার গ্রেফতারি পরোয়ানা বাতিল না করলেও জামিনের আবেদনটি নাকচ না করে নথিভুক্ত করেছেন। অনেকেই একে আদালতের একটি বিজ্ঞ সিদ্ধান্ত বলে বিবেচনা করছেন। সরকার আদালতের আদেশ অনুযায়ী গ্রেফতারি পরোয়ানা যে কোনো সময় কার্যকর করতে পারে। কিন্তু বলা হচ্ছে এতদিনেও (০৭.০৩.২০১৫ পর্যন্ত) গ্রেফতারি পরোয়ানা সংশ্লিষ্ট থানাসমূহে না পৌছানোর অর্থ সরকার বেগম জিয়ার গ্রেফতার নিয়ে 'সেকেন্ড থট' দিচ্ছে। বেগম খালেদা জিয়ার মামলাসমূহের পরবর্তী তারিখ আগামী ৫ এপ্রিল ধার্য করেছেন আদালত। উদ্বিগ্ন মহলে একটা স্বস্তির সুবাতাস বইছে এই চিন্তায় যে, অন্তত আগামী ৫ এপ্রিল পর্যন্ত খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হবে না। তার গুলশান ৮৬ নম্বর সড়কের ৬ নম্বর বাড়ির কর্মচারীরাও গ্রেফতার আতঙ্কে ছিল। জানা গেছে, তাদের ভিতর থেকেও সেই আতঙ্ক আপাতত কেটে গেছে এবং তারা এখন বেশ খোশ মেজাজেই আছে। এর অর্থ দাঁড়াল এই যে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনাকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। এটা একটা শুভ লক্ষণ। এই যে সামগ্রিক পরিস্থিতি, তা থেকে কারও মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় রাজনৈতিক বিবেচনায় সিদ্ধান্ত গ্রহণকে সরকার প্রাধান্য ও গুরুত্ব দিচ্ছে বলে যে ধারণা সাধারণ্যে জন্মেছে, বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে একসঙ্গে ১৬ কূটনীতিকের সাক্ষাৎ কী তাতে প্রভাব ফেলেছে? কেউ এমনও বলতে চান যে, এই সাক্ষাতের অন্তর্নিহিত কারণ হচ্ছে, সরকারকে এমন একটি বার্তা দেওয়া যে, বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা ঠিক হবে না।

ইতিপূর্বে এই কূটনীতিকরা একত্রিত হয়ে সংকট সমাধানের জন্য চিঠি দিয়েছেন দুই নেত্রীকে। সরকারি তরফ থেকে তাদের নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা হয়েছে এবং বোঝানোর প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী একের পর এক বিদেশ সফর করে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করছেন। সরকারের বক্তব্য স্পষ্ট- বাংলাদেশে রাজনৈতিক কোনো সংকট নেই, যা আছে তা আইন-শৃঙ্খলাজনিত সংকট। দেশে নাকি জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে এবং জঙ্গিরাই গত দু'মাস ধরে সহিংসতা-নাশকতা চালিয়ে যাচ্ছে। আরও গুরুত্ব দিয়ে বোঝানো হচ্ছে যে, বিএনপিই এই জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে এবং বেগম খালেদা জিয়া এই জঙ্গিদের নেত্রী! সরকার জঙ্গি তৎপরতা দমন করছে। যেহেতু বিষয়টা আইন-শৃঙ্খলাজনিত, তাই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণটাই বড়, মুখ্য; সংলাপ-টংলাপের বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ নয়। এ ছাড়া জঙ্গিদের সঙ্গে কীসের আলোচনা? মজার ব্যাপার হচ্ছে, বিএনপিকে জঙ্গি সংগঠন এবং খালেদা জিয়াকে জঙ্গি নেত্রী হিসেবে যে 'ট্যাবলেট' সরকার বিদেশিদের গেলাতে চাচ্ছে, সেই ট্যাবলেট বিদেশিদের কেউ গিলেছেন এখনো তেমন কথা শোনা যায়নি। বরং উল্টা বিএনপির সঙ্গেই সংলাপ ও সমঝোতার তাগিদ দিচ্ছেন সবাই। জাতিসংঘের মহাসচিব থেকে শুরু করে বিদেশি কূটনীতিক এবং দেশের সুশীল সমাজ থেকে ব্যবসায়ী সমাজ সবাই শান্তি ও সমঝোতায় পেঁৗছানোর জন্য চিঠি চালাচালি করছেন হাসিনা-খালেদা- এই দুইজনের কাছেই। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থানকে কেউই আমলে নিচ্ছেন না। অপরদিকে বিএনপি শুরু থেকেই শান্তি-সমঝোতার অন্বেষায় লীগ সরকারের সঙ্গে আলোচনার পুনঃপুনঃ প্রস্তাব দিয়ে চলেছে- যদিও তারা এ সরকারকে একটি 'অবৈধ' সরকার হিসেবে চিত্রিত করার প্রয়াস পাচ্ছে। তাদের যুক্তি বেশ সবলই বলতে হবে। তারা বলছেন, গণতন্ত্রে উত্তরণের জন্য যদি অবৈধ ক্ষমতাদখলকারী সামরিক জান্তার সঙ্গে আলোচনা করা যায়, সত্তরের নির্বাচনী রায় বাস্তবায়ন করে পাকিস্তানের শাসনক্ষমতা বিজয়ী আওয়ামী লীগের হাতে অর্পণের জন্য যদি মুজিব-ইয়াহিয়া-ভুট্টো আলোচনা হতে পারে, গণতন্ত্রের শর্ত পূরণের জন্য লীগ সরকারের সঙ্গে আলোচনায় আপত্তি কিসের? কোনো প্রকার সংলাপ-সমঝোতায় সরকারের অসম্মতির অবস্থান ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্তও অনড় ছিল বলে মনে হয়েছে। কিন্তু তারপর থেকেই বরফ গলতে শুরু করেছে। সরকারের জন্য রাষ্ট্র পরিচালনা সত্যিই দুরূহ করে তুলেছে প্রধানত বিএনপি। বাংলাদেশ ব্যাংকে রিজার্ভের স্ফীতি আসলে স্বাভাবিক শরীরের তুলনায় অস্বাভাবিক টিউমারের বোঝা। দেশে বিনিয়োগ, বাণিজ্য এবং টাকার স্বাভাবিক চলাচল থাকলে এমন হওয়ার কথা নয়। সরকার আদতেই সংকটে আছে। সরকারের মধ্যে এই উপলব্ধি হয়তো এসেছে যে, রাজনৈতিক সংকটকে অস্বীকার করে কোনো লাভ নেই। অস্ত্র দিয়ে রাজনৈতিক সংকট সমাধান করা যায় না। অস্ত্রের রাজনীতি তো যুদ্ধের রাজনীতি। এই রাজনীতি দেশ ও একটি জাতিকে ধ্বংস করে। অন্যদিকে অস্ত্র ও যুদ্ধহীন রাজনীতি হচ্ছে গণতন্ত্রের রাজনীতি। এ রাজনীতি দেশকে এগিয়ে নেয় সামনে। দেশ-বিদেশের উদ্বিগ্ন সব মহলই বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বিজয় চায়। গণতন্ত্রের জয় কোনো ব্যক্তি বা দলের পরাজয় নয়। গণতন্ত্রের অভিযাত্রায় সব অংশীজনই বিজয়ী। আভাস যা মিলছে তাতে বোঝা যায়, সমগ্র বিষয়টা এমনভাবেই ভাবা হচ্ছে যে, সংলাপ-সমঝোতা কোনো ব্যক্তি, দল বা জোটের সঙ্গে নয়, সমঝোতা গণতন্ত্রের সঙ্গে। বিএনপি চেয়ারপারসনের অ্যারেস্ট না হওয়ার পেছনে সংবেদনশীল এই বিবেচনাই মুখ্য ভূমিকা পালন করছে বলে মনে হয়। এতে কেউ হারছেন না, কেউ জিতছেন না। জিতছে গণতন্ত্র।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

ই-মেইল : kazi.shiraz@yahoo.com


নিউজ পেজ২৪/অারএস