সম্পাদকীয়

জানুয়ারী ১, ১৯৭০, ৬:০০ পূর্বাহ্ন

হরতাল সংস্কৃতির অবসান চাই

নিউজ পেজ ডেস্ক

হরতাল এখন আমাদের রাজনীতির একটি প্রধান অনুষঙ্গ। হরতাল এলেই বুঝা যায় রাজনীতির মাঠ গরম হচ্ছে। হরতাল রাজনৈতিক দলগুলোর একটি গণতান্ত্রিক অধিকারও বটে! কিন্তু সাম্প্রতিক কালের হরতালগুলোতে জনভোগান্তি আর সহিংসতা বেড়ে চলেছে। একদিকে হরতাল প্রতিহতের নামে রাজপথে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করে সরকার সমর্থকরা। অন্যদিকে পুলিশের কড়া নজরদারী এড়িয়ে বিক্ষোভ ও পিকেটিং করার চেষ্টা চালায় হরতালকারীরা। ফলে সাধারণ নাগরিকরা এক ধরনের অজানা আশংকায় নিমজ্জিত হয়। হরতাল দাবী আদায়ের সবশেষ অস্ত্র হিসেবে ব্যাবহার হলেও বর্তমানে এর যৌক্তিকতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তাই দিন দিন রাজনৈতিক গুরুত্ব হারাচ্ছে হরতাল। এবারের ঈদের ছুটির পরও বিরোধী একটি রাজনৈতিক দল তাদের দাবি দাওয়া নিয়ে হরতাল ডেকেছে। এমন অবস্থায় হরতাল নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

হরতালের বিষয়ে অনেকের মতামত হচ্ছে তা আইন করে নিষিদ্ধ করা হোক। এবিষয়ে চলতি সংসদে একটি বিল উত্থাপিত হলেও তা পাস হয়নি। অবশ্য একটি গণতান্ত্রিক দেশে এই ধরনের আইন তৈরি করার অর্থ জনগণের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে গলাটিপে হত্যা করা। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোকে চিন্তা করতে হবে তারা তাদের এই অধিকারটিকে কীভাবে প্রয়োগ করবেন। রাজনৈতিক দলগুলোকে ভাবতে হবে কীভাবে জনকল্যাণে হরতালের মত কর্মসূচিগুলোকে ব্যবহার করা যায়।

হরতালের প্রধান বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে তা কেন ডাকা হচ্ছে। আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে ডাকা অধিকাংশ হরতাল হচ্ছে নিছক দলীয় কোনো ইস্যু থেকে, যার সাথে সাধারণ জনগণের সম্পর্ক থাকে কম। কোনো নেতার কারামুক্তি বা সরকারী কোন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সাধারণত হরতাল ডাকা হয়। বেশিরভাগ হরতালেই সাধারণ মানুষের কোনো আগ্রহ থাকে না।

সে কারণেই জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণের দায়িত্বটিও রাজনৈতিক দলটিকে নিতে হয়। সে উদ্দেশ্যে আগামীকাল যে হরতাল তা মনে করিয়ে দেয়ার জন্য আগের রাতে রাজধানী জুড়ে গাড়িতে আগুন দেয়া হয়। মাঝখান দিয়ে ঝরে যায় কয়েকটি নিরীহ প্রাণ।

সাম্প্রতিককালে যত হরতাল ডাকা হয়েছে, তার কোনোটিতেই বিরোধী দল তাদের দাবি আদায় করে নিতে পারেনি।নিয়মটি হয়ে গেছে এমন- বিরোধীদল হরতাল ডাকবে আর সরকার সেই হরতাল প্রত্যাখ্যান করবে। এসব হরতালের ফলাফল সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

সে ক্ষেত্রে চিন্তা করা দরকার শুধুমাত্র দলীয় বিষয়গুলো নিয়ে হরতাল ডাকাটা কতটা যু্ক্তিসঙ্গত। সাথে সাথে দলীয় কর্মীদের ওপর ভিত্তি করে হরতালের মত কর্মসূচি দিয়ে ধ্বংসাত্মক আন্দোলন করার বদলে কীভাবে সাধারণ জনগণকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করা যায় তাও রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মপরিকল্পনায় থাকা দরকার।

আমাদের মত মধ্য আয়ের দেশের সাধারণ জনগণকে জীবনে প্রতিনিয়ত হাজারো সংকটের মোকাবেলা করতে হয়। সেই সংকটময় জীবনকে আরো দুর্বিসহ করে তোলে আমাদের ধ্বংসাত্মক রাজনৈতিক সংস্কৃতি।

আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত জনজীবনের সঙ্কট, অভাব, অভিযোগগুলোকে জাতীয় ইস্যু হিসেবে তুলে ধরে জনগণকে রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত করে আন্দোলনকে গণমুখী করে তোলা। তবেই আসবে রাজনীতির স্বার্থকতা।