সাক্ষাৎকার

মার্চ ১৮, ২০১৫, ৭:৩১ অপরাহ্ন

কখনও স্বপ্ন ছিল না মেয়র প্রার্থী হবো

একান্ত সাক্ষাৎকারে আনিসুল হক

বলা হয়ে থাকে ‘ঢাকা সিটি করপোরেশন ৫৬ পিতার এক সন্তান’। কারণ ডিসিসিকে শাসন করেন ৫৬ জন কর্তা। এদের মধ্যে কখনও পিডিবি, কখনো ডেসা, কখনও ওয়াসা, কখনো বিটিআরসি, কখনো ট্রাফিক, কখনোবা পুলিশ। ফলে জনপ্রতিনিধির হাতে খুব বেশি কিছু করার থাকে না। তবে জনপ্রতিনিধিরা যা করতে পারেন তা হলো এই ৫৬ পিতার মধ্যে সমন্বয় করা। আর এর মধ্য দিয়ে বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে সুষম সমন্বয়ের মাধ্যমে ডিসিসিকে একটি আইডল সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সম্ভব।

একান্ত সাক্ষাৎকারে এভাবেই কথা শুরু করেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আওয়ামী লীগ সমর্থিত পদপ্রার্থী ব্যবসায়ী নেতা আনিসুল হক। তিনি গড়তে চান স্বচ্ছ, সবুজ ঢাকা।

আপনি একজন ব্যবসায়ী নেতা থেকে ঢাকা সিটির জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতে চাচ্ছেন। ব্যবসা থেকে রাজনীতিতে আসাটা কীভাবে দেখছেন?

আমি বলবো এটা আমার জন্য বড় সুযোগ। আর আমার সুযোগগুলো হঠাৎ করেই আসে। আমার কখনও স্বপ্ন ছিল না যে মেয়র পদে প্রার্থী হবো। এর আগে এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, সার্ক চেম্বারে কাজ করেছি। এগুলোও হঠাৎ করেই এসেছে অমার জীবনে। তবে সেগুলো হঠাৎ করে হলেও তো ভালো কাজ করতে পেরেছি। আর এ সমাজের যদি দশ জন লোকও বলেন যে, দায়িত্বশীল জায়গাগুলোতে কাজ করেছি ভালোভাবে, তাহলেই হবে। এখানেও পারবো। এটা আমার জন্য বড় সুযোগ।

সব মিলিয়ে টিকে থাকটা কি বড় চ্যালেঞ্জ মনে হচ্ছে আপনার?

আমি হয়ত আর ৫ থেকে ১০ বছর কাজ করতে পারবো। আমি সব সময় সমাজকে উপলব্ধি করছি। সমাজটাকে কাছ থেকে দেখি। সমস্যাগুলো জানি। তাই সুযোগ যেহেতু এসেছে সেহেতু আমার দিক থেকে দায়িত্বশীলভাবেই কাজ করতে হবে। আর সেভাবেই বিষয়টিকে নিয়েছি আমি।

হঠাৎ আপনি রাজনীতিতে আসা নিয়ে মানুষের মধ্যে অনেক আলোচনা সমালোচনা রয়েছে। বিষয়টি একটু খোলাখুলি বলবেন?

আসলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চেয়েছেন যে সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না কিন্তু তার রাজনীতির আদর্শকে বিশ্বাস করেন, সমর্থন করেন এমন কেউ একজনকে তিনি সমর্থন দিবেন। সে দিক বিবেচনায় আমাকে সমর্থন করেছেন তিনি।


প্রধানমন্ত্রী তো সমর্থন করেছেন, তৃণমূল আওয়ামী লীগ কি মেনে নেবে আপনাকে?

কাজ করতে পারবো এমন বিশ্বাস থেকেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে সমর্থন দিয়েছেন। আর তিনি যেহেতু রাজি, আশা করি তৃণমূল আওয়ামী লীগও আমার পাশেই থাকবে। কারণ তারা তো তার কথা শুনবেন।


তৃণমূল আওয়ামী লীগ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হলে আপনি কীভাবে মোকাবেলা করবেন?
দেখুন, যে কেউ-ই ইচ্ছে করলে প্রার্থী হতে পারে। আওয়ামী লীগ থেকেও প্রার্থী আসতে পারে- এটাই স্বাভাবিক। কারণ তারাও তো রাজনীতি করছেন। এটা কোনো অন্যায় না। তবে আরেকটা দিক দেখার আছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন, সাথে দলও। তার ওপর একটি বড় দায়িত্ব ছিল সিলেকশনের বিষয়ে। রাজনৈতিক প্রবাহে দেখেছি, দলের যিনি নেতা তিনি সিদ্ধান্ত নেন। সুতরাং রাজনৈতিক কর্মী ও নেতা তারা তাদের মতো করে ভাববেন। আর সরকার প্রধান তার মতো করে ভাববেন। এ দুটো জায়গায় মিল হবে, এটাই স্বাভাবিক। সেভাবে কাজ এগুবে। সুতরাং যার যার দায়িত্ব তিনি পালন করছেন।

অনেকদিন ধরেই সিটি নির্বাচন হচ্ছে না। আবার এমন একটা সময়ে নির্বাচনের আলোচনা হচ্ছে যখন কিনা পুরো দেশ সঙ্কটময় সময় পার করছে। এ পরিস্থিতিতে নির্বাচনের বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?

আমি মনে করি, ঢাকা একটা বড় ঘর। একটা ছোট ঘরে অনেক সদস্য থাকে। তাদের মধ্যে ঝগড়া হলেও সংসার চলে। তেমনি ঢাকার মতো বড় ঘরেও হচ্ছে। আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় তেমনি গত ২০ বছর ধরে ঝগড়াঝাটি চলেই আসছিল। প্রত্যেকটা নির্বাচন নিয়ে ঝগড়া হয়েছে। তারপরও সব চলছে। যাদের মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে তারা নিজেদের মধ্যে থেকে তা দূর করবেন। বড় ঘরের মধ্যে ছোট একটি জায়গা হলো ডিসিসি। ডিসিসি তো চলবেই।

আপনি বলতে চাচ্ছেন নির্বাচন হবেই?

আমি অংশগ্রহণ করি বা না করি, নির্বাচন সরকার চায়। সুতরাং আমার দৃষ্টিতে এই নির্বাচন হবেই।


ডিসিসি নির্বাচন থেকেই সঙ্কট সমাধানের শুরুটা আসতে পারে বলে মনে করেন?

সঙ্কটকে সমাধান করবে কি না জানি না। যেহেতু নির্বাচিত প্রতিনিধি নেই তাই দীর্ঘদিন ধরে মানুষ তাদের সেবা পাচ্ছে না। নির্বাচিত প্রতিনিধি থাকলে মানুষ বেশি সেবা পায়। তবে সঙ্কটবিহীন অবস্থায় নির্বাচন হলে খুবই ভালো হতো। যেহেতু এটি কোনো রাজনৈতিক নির্বাচন নয়।


যদি মেয়র নির্বাচিত হন, নগরবাসীর সমস্যাগুলো কীভাবে সমাধান করার চেষ্টা করবেন। প্রথম কোন সমস্যা নিয়ে কাজ করবেন?

ঢাকা একটি পুরাতন নগরী, অনেক বছরের ঐতিহাসিক নগরী। এটাকে নতুন বধূর মতো তিলোত্তমা করে সাজানো এতো সহজ কাজ না। তবে এটাকে স্বাস্থ্যবান করা, বিশেষ করে স্বাস্থ্যসম্মত সুন্দর নগরী হিসেবে গড়ে তোলা হবে আমার কাজ।


কিছু সমস্যা রয়েছে নিত্যদিনের, এরমধ্যে কিছু রয়েছে নাগরিকদের বিরক্তিকর সমস্যা। আর এসব সমস্যা সমাধান সিটি করপোরেশন নিজে করতে পারে। তার মধ্যে রয়েছে রাস্তাঘাট সংস্কার ও পরিষ্কার করা, বর্জ্য সামলানো। তবে এটাও মুশকিল কারন বর্জ্যকে রাখার জন্য ডিসিসির বড় জায়গা নেই ।

প্রথম কোনটা করবেন?

প্রথম প্রাইওরিটি দিবো একটি ক্লিন ঢাকা, বর্জ্যমুক্ত ঢাকা। একটি মানবিক শহর ঢাকা। ডিসিসির মেয়র বা কমিশনার তার মানবিক দিক কি? যেমন মেয়রের হাতে ২০০ স্কুল করার বিষয়টি সংজ্ঞায় পড়ে না। তবে মেয়র চাইলে নগরীতে ২০০ স্কুল করতে পারে। চাইলে সে ১০ হাজার লোকের চাকরি দিতে পারে। আমি আগেও দিয়েছি, এখনো পারবো। মানুষের জন্য বিশেষ করে শ্রমিকদের মানবিক কল্যানের জন্য কাজ করেছি, করবো।

সুতরাং আমার এ অভিজ্ঞতা আছে। সেজন্য আমি বলছি মানবিক ঢাকা। ক্লিন ঢাকা সরকারেরও একটি প্রকল্প আছে। তেমনি আমার মাথায় কিছু পরিকল্পনা আছে। এর মধ্যে একটি হলো সবুজ ঢাকা করা। মেয়র নির্বাচিত হলে ৫ বছরে প্রায় প্রতিটি বাড়িকে সবুজ করে দেয়া যাবে। নারীদের জন্য ট্রান্সপোর্ট, আবাসনের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনাও আমার রয়েছে। করতে পারবো কি না জানি না, তবে সময় বলবে।


আপনার নির্বাচনী প্রচারণায় কী ভিন্নতা থাকছে? আর কী দিতে চান ঢাকাবাসীকে?

দেখুন উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত যেকোনো মানুষই তাদের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সুবিধা পেলে বেশি খুশি হয়। এই এলাকার (উত্তরের) মানুষের প্রত্যাশা একটা নিরাপদ ঢাকা, পরিচ্ছন্ন ঢাকা। এছাড়া কারো প্রত্যাশা একটু ভালো আয় হোক, এলাকায় বাজার থাকুক, গ্যাস, বিদ্যুৎ থাকুক। স্কুলের সামনের এলাকার জনগণের প্রত্যাশা যেন স্কুলের এলাকায় কোনো যানজট না থাকে। কোনো ধরনের ইভটিজিং যাতে না হয়। আসলে একেক এলাকার জনগণের একেক রকমের প্রত্যাশা ও চাহিদা থাকে।

আর প্রচারণা?

আমাদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে তুলে আনার চেষ্টা করছি নাগরিকদের সমস্যাগুলো। এটা প্রচারণার একটি বড় অংশ। ইতিমধ্যে আমাদের ২০০ প্রতিনিধি বিভিন্ন ওয়ার্ডে কাজ শুরু করেছে। তারা প্রত্যেক এলাকার সমস্যা, প্রত্যাশা তুলে আনবে। যেটা দেখেই আমি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হবো, তাদের কী দেব।

এছাড়া কলসেন্টার, ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নগরীর সমস্যা জানানোর জন্য জনগণকে সচেতন করছি। সেই সঙ্গে নগরীর সমস্যা জানানো জন্য অ্যাপস তৈরির কাজ চলছে। সনাতনী পদ্ধতির পাশাপাশি আধুনিক পদ্ধতিতে নগরবাসীর সমস্যা জানার চেষ্টা করছি। সুতরাং ৫ বছরের এজেন্ডা নেয়ার চেষ্টা করছি। হাজারটা কাজ করা সম্ভব না। এরমধ্যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়তো ২০টা কাজ করবো।


উত্তর সিটি করপোরেশনের জনবল, অবকাঠামো সবকিছুই নতুন। নির্বাচিত হলে এদের নিয়ে কাজ করতে কোনো অসুবিধায় পড়বেন বলে মনে হয়?

নতুন হলে অনেক কাজ করার সুবিধা থাকে। সব কিছু ভেঙে কাজ করা যায়। আইডিয়া কাজে লাগানো যায়। আমি শুনেছি উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৮শ জনবলের প্রয়োজন। রয়েছে মাত্র ১২শ জনবল। সুতরাং দায়িত্ব পেলে কাজ করার জন্য ৫ বছর সময় পাব। যা কাজ করার জন্য অনেক সময়। যদি টার্গেট থাকে, মন ঠিক থাকে, সচেতনতা থাকে, সততা থাকে তাহলে নতুনদের নিয়ে আরও বেশি কাজ করা সম্ভব।

যুগ যুগ ধরেই সিটি করপোরেশনের নিজস্ব বাজার বা মার্কেটগুলোতে দোকান বরাদ্দে অনিয়ম হচ্ছে । এটাকে কীভাবে মোকাবেলা করবেন। নগরীতে ভাড়াটিয়ার সংখ্যা বেশি। কিন্তু প্রতিবছর বাড়িভাড়া বাড়ানোর কারণে ভাড়াটিয়া নাগরিকরা সমস্যায় পড়ছে। কীভাবে এ সমস্যার সমাধান করবেন?


আমি মেয়র নির্বাচিত হলে সিটি করপোরেশন থেকে দোকান বরাদ্দের ক্ষেত্রে অনিয়ম হবে না বলতে পারি। তবে বাড়িভাড়ার বিষয়টি ডিসিসির দায়িত্ব নয়। এটা মার্কেট ইকোনমির উপর ভিত্তি করে। এক সময় বাড়ি কেনার জন্য খুঁজে পাওয়া যেতো না। এখন বাড়ি বিক্রি হয় না। আগের চেয়ে বাড়িভাড়া অনেকটা কমেছে। যদি বাড়িভাড়া বেড়ে মানুষের সহ্যের বাইরে চলে যায় তাহলে রাজনৈতিক নীতি নির্ধারকরা এ বিষয়ে কী করা যায় সে সিদ্ধান্ত নিবেন। এ ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধি হিসেবে যতটুকু করার প্রয়োজন সেটা করবো।
নিউজ পেজ২৪/ইএইচএম