শিল্প সাহিত্য

মার্চ ৩০, ২০১৫, ১২:০৮ অপরাহ্ন

ছোটগল্প : ছবি মা

শাহ সোহাগ ফকির

মৃদু জানালা খুলে দাঁড়াল। বাবা অফিসে যাচ্ছেন। গেট পেরুনোর আগে একবার পেছন ফিরে চাইলেন। আর তখনই বাবার সঙ্গে ওর দৃষ্টি বিনিময় হলো। হাত নাড়ল মৃদু। বাবাও নিচ থেকে ওর দিকে তাকিয়ে হাত নাড়াল। মৃদুর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। মিষ্টি হাসি!
বাবা, আজ কিন্তু বারবি ডল আনতে ভুলো না। মৃদু চিৎকার করে বাবাকে শেষবারের মতো স্মরণ করিয়ে দিল।
ঠিক আছে মা। আজ আর ভুল হবে না বলে ইয়াসিন সাহেব গেট পার হয়ে গেলেন। দারোয়ান উঠে এসে গেট লাগিয়ে আবার টুলের উপর গিয়ে বসল। মৃদু বাবার পথের দিকে তাকিয়ে রইল।

জানালা দিয়ে রোদ ঢুকছে ঘরে। বাবা অফিসে গেলে বড় একা হয়ে পড়ে সে। মা-হারা পাঁচ বছরের মৃদুর ছোট্ট বুকে অনেক কষ্ট জমা হয়ে আছে। আজ খালামণির আসার কথা। গতকাল আসার কথা ছিল, আসেনি। পরীক্ষা ছিল বোধ হয়- মৃদু ভাবে। খালামণি চারুকলার ছাত্রী। মৃদুকে ছবি আঁকা শেখান। মৃদু তাকে ‘ম্যাডাম’ বলে ডাকে না। মায়ের মত দেখতে তাই খালা বলে ডাকে। এতে অবশ্য বাড়ির কেউ কিছু মনে করে না।

মৃদু সোফায় বসে টেলিভিশন অন করল। ওর দিনের বড় একটা অংশ কার্টুন দেখে আর পুতুল খেলে কাটে। গত মাসে জন্মদিন ছিল। সেদিন মৃদু অনেক পুতুল উপহার পেয়েছে। খালামণিও দিয়েছে একটা। পিংক কালারের জামা পরানো সাদা চুলের পুতুল। বড্ড পছন্দ হয়েছে ওর!

টেলিভিশনে কার্টুন ছবি দেখছিল মৃদু। হঠাৎ কলিংবেল বেজে উঠল টুং টাং শব্দে- মিষ্টি আওয়াজ! নিশ্চয়ই খালামণি এসেছে। দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলল মৃদু। দরজার ওপাশে তখন তরু দাঁড়িয়ে।
গুড মর্নিং বলে তরু ঘরে ঢুকেই সোফায় বসে পড়ে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমা হয়ে আছে।
মৃদু ফ্যানটা বাড়িয়ে দিয়ে বলে, অনেক ঘেমে গেছ!
হ্যাঁ রে মা।
দাঁড়াও তোয়ালে এনে দেই।
লাগবে না রে মা, রুমাল আছে। ব্যাগ থেকে রুমাল বের করে ঘাম মোছে তরু।
কোল ঘেঁষে মৃদু পাসে এসে বসে। হেঁটে এসেছ বুঝি?
হ্যাঁ।
রিকশা পাওনি?
পেয়েছিলাম, কিন্তু খুব জ্যাম!

ফ্যান ঘুরছে মাথার উপর বোঁ বোঁ শব্দে। বাতাস ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে। ওদের চুল উড়ছে বাতাসে। নড়ে চড়ে বসে মৃদু। আজ কিন্তু তোমায় ছাড়ছি না।
কেন?
মাকে খুব মনে পড়ছে, কান্না আসছে।
তরু ছোট মেয়েটার কথায় চমকে ওঠে। মনটা নরম হয়। মায়া লাগে মেয়েটার জন্য। খুব মায়া। হঠাৎ মৃদু তরুর হাত ধরে বলে, খালামণি প্রমিজ কর আজ যাবে না।
মৃদুর চুলে আদর মাখা আঙুল বুলিয়ে দেয় তরু। তারপর বলে, না যাব না। সারা দিন থাকব। গল্প করব তোমার সাথে।

চোখদুটো যেন আনন্দে নেচে ওঠে। মৃদুর ফর্সা মুখে হাসির ঢেউ খেলে যায়। স্বচ্ছ পুকুরের বালু যেমন তেমনি মনে লুকানো সব খুশি মুখে ভাসে।
জানো খালামণি আমার ভূতের গল্প ভালো লাগে। হাসি মুখে বলে মৃদু।
ভয় লাগে না?
না।
কেন?
বাবা বলেছে, ভূত বাস্তবে নেই।
তরু হেসে দেয় ছোট মেয়েটা এত কিছু জানে দেখে। একটু অবাকও হয় সে।
আজ তোমাকে পাখি আঁকা শেখাব।
উঁহু বলেই মৃদু তরুর হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় পাশের ঘরে।

তরু অবাক হয়ে বলে, কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?
শোবার ঘরে।
কেন?
শুয়ে শুয়ে গল্প শুনতে হয়।
তাই!
হ্যাঁ, মা আমাকে এভাবে গল্প শোনাত। আমি আজ তোমার হাতের উপর মাথা রেখে শুয়ে শুয়ে গল্প শুনব।
এরপর আর তরু বাধা দিতে পারে না। বুকের ভেতর কষ্টটা নড়ে ওঠে। এতটুকু মেয়েকে সে কীভাবে ফাঁকি দেবে?

তরু বিছানায় উঠে বসতেই মৃদু ওকে জোড় করে শুইয়ে দিল। তারপর পাশে সেও শুয়ে পড়ে তরুর হাতের ওপর মাথা রেখে। তরুর ততক্ষণে দুচোখে পানি এসে জড়ো হয়েছে। মৃদু সেটা বুঝতে পেরে বলল, তুমি কাঁদছ কেন?
কই না তো!
মিথ্যে বলছ, বাবা বলেছে মিথ্যা বলা মহা পাপ।
তরু আড়ালে চোখ মুছে মৃদুর দিকে পাশ ফেরে।
খালামণি, আমাকে তুমি অনেক ভালবাস তাই না?
হ্যাঁ, খুব ভালবাসি মামণি।
আমার অনেক কষ্ট হয় জানো, তুমি আমার মা হবে?
ছি! এ কথা বলতে নেই। বলেই তরু দ্রুত প্রসঙ্গ পাল্টায়। সুন্দর একটা গল্প বলতে শুরু করে সে। এভাবেই কেটে যায় বেশ কিছুক্ষণ। এক সময় তরু খেয়াল করে মৃদু তার হাতের ওপর ঘুমিয়ে পড়েছে। সে আস্তে মৃদুর মাথাটা বিছানায় নামিয়ে উঠে বসে। তারপর কাজের বুয়াকে ডেকে মৃদুর দিকে খেয়াল রাখতে বলে বাসা থেকে বেরিয়ে আসে।

মৃদুর ঘুম ভাঙতেই বুঝতে পারে বাবা বাড়িতে। তার পাশে বারবি ডল দেখে সে খুশিতে বিছানায় উঠে বসে। আর তখনই বাবা ঘরে ঢোকে।
বারবি ডল পছন্দ হয়েছে মা?
হ্যাঁ, খুব।
মৃদু হঠাৎ বাবার কোলে উঠে বসে। বাবা, আমাকে একটা মা এনে দাও না। জানো, আজ খালামণিকে ‘মা’ বলে ডেকেছি। তুমি বলে দাও না খালামণিকে আমার মা হতে। তাহলে খালামণি আমাকে ছেড়ে আর কোথাও যেতে পারবে না।

ইয়াসিন সাহেব খুব অবাক হন মেয়ের কথায়। একটু পরেই সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ে তরুর ওপর। নিশ্চয়ই সে মেয়েটার মাথা খেয়েছে! পরদিন সময় হয়ে গেলেও অফিসে যান না তিনি। ড্রইংরুমে বসে অপেক্ষা করেন তরুর জন্য। তরু আসতেই তার মুখোমুখি হন।
মৃদুর মায়ের জায়গায় আমি কখনও কাউকে কল্পনা করিনি। এটা অবশ্য আপনার জানার কথা নয়। তবে আজ আপনাকে জানিয়ে দিচ্ছি, সে জায়গায় আমি কখনও কাউকে ঠাঁই দেব না। এ মাসের টাকা নিয়ে চলে যাবেন। মৃদুকে আর পড়াতে আসতে হবে না।
মানিব্যাগ থেকে হাজার টাকার তিনটি নোট তরুর দিকে এগিয়ে দেন ইয়াসিন সাহেব। এতে অবশ্য তরু খুব একটা অবাক হয় না। বড়লোকদের তার চেনা আছে। কিন্তু মৃদুর জন্য কষ্ট হয়। সে টাকাগুলো ফিরিয়ে দিয়ে বলে, আমি এমনিতেই আর আসব না। টাকাগুলো রাখুন। মৃদুকে পুতুল কিনে দিবেন।

দুচোখের জল আড়াল করে তরু দ্রুত পায়ে মৃদুদের বাড়ি থেকে বের হয়ে আসে। ইয়াসিন সাহেব ফিরে আসেন মৃদুর ঘরে। মৃদু ঘুমাচ্ছে। তার কোলে একটা ছবি। মৃদু কল্পনায় তার মাকে এঁকেছে সেখানে। তারপর সেই ছবি বুকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়েছে। এ দৃশ্য দেখে ইয়াসিন সাহেবের মনটা বেদনায় ছেয়ে যায়। তিনি পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে তরুকে কল দেন।
তরু ওপাশ থেকে একটি পুরুষ কণ্ঠের কান্না শুনতে পায়, প্লিজ আপনি ফিরে আসুন। তরুর জন্য হলেও ফিরে আসুন প্লিজ।


নিউজ পেজ২৪/আরএস