শিল্প সাহিত্য

এপ্রিল ১৪, ২০১৫, ১০:০৫ পূর্বাহ্ন

ছাঁয়ানটে সুরের মূর্ছনায় বর্ষবরণ

নিজস্ব প্রতিবেদক

নতুন সূর্য দিয়ে শুরু হয় নতুন সকাল। নতুন দিন, নতুন বছর। আর এই সূর্যই এনে দেয় ১৪২২ বঙ্গাব্দ। তাইতো নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে সুন্দর আগামীর প্রত্যয়ে রমনার বটমূলে প্রতিবারের মতো এবারও শুরু হয় অসুর বিনাশী ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান।

সেতার বাদন, সমবেত ও একক গান, কবিতা আবৃত্তি পরিবেশনের মধ্য দিয়ে তারা উপস্থিত দর্শক স্রোতাদের আন্দোলিত করেন। শিল্পী এবাদুল হক সৈকতের সেতার বাদনদের মধ্য দিয়ে মঙ্গলবার সূর্য উঠার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় এই অনুষ্ঠান। এতে তিনি সেতারে রাগ পরমেশ্বরী পরিবেশন করেন।

এর পর গান। ছায়ানটের শিল্পীরা ‘ধ্বনিল আহবান মধুর গম্ভীর’ গানটি পরিবেশন করেন। শিল্পীদের সুরের মূর্চ্ছণা ও সেতারের স্নিগ্ধ পরিবেশনা উপস্থিত দর্শক স্রোতাদের কাছে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।

পরিবেশনার ধারাবাহিকতায় শিল্পী লাইসা আহমেদ লিসা পরিবেশন করেন ‘নিশিদিন মোর প্রাণে’ গানটি। ছোটদের দল পরিবেশন করে ওঠো ওঠো রে...। ফারহানা আক্তার শ্যার্লি পরিবেশন করেন ‘ভোরের হাওয়ায় এসে’, খায়রুল আনাম শাকিল পরিবেশন করেন জাগো অরুণ ভৈরব, বড়দের দল পরিবেশন করে ‘শুভ্র সমুজ্জ্বল হে চির নির্মল, আব্দুস সবুর খান চৌধুরী পাঠ করেন ‘চিরযাত্রী’ কবিতাটি।

এর পর একে একে তানিয়া মান্নান পরিবেশন করেন ‘আমি তোমারি মাটির কন্যা’, বড় ও ছোটরা এক হয়ে পরিবেশন করেন ‘মোরা সত্যের পরে মন, ছোটদের দল আবার পরিবেশন করে ‘জয় হোক জয় হোক’ একক ও সমবেত পরিবেশনায় গানে কবিতায় আরও অংশ নেন শিল্পী মিতা হক, দেওয়ান সাইদুল হাসান, নাসিমা শাহিন ফ্যান্সি, সিফায়েত উল্লাহ্ মুকুল, মাহমুদুল হাসান, মোহিত খান, বিজনচন্দ্র মিস্ত্রী, চন্দনা মজুমদার, লিয়াকত খান প্রমূখ।

জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে ছায়ানটের বর্ষবরণের আয়োজন শেষ হওয়ার আগে ছায়ানট সভাপতি সংগীতজ্ঞ সনজীদা খাতুন বলেন, ‘নীতিবিহীন আচরণ সম্প্রীতির প্রতিবন্ধক। সুখে, দুখে মানবিক অধিকার চাই। সবক্ষেত্রে চাই অধিকারের সুরক্ষা। আমরা চাই সকল গ্লানি মুছে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে। পয়লা বৈশাখ নিয়ে আসুক শান্ত জীবনের প্রতিশ্রুতি। পরবর্তী প্র্রজন্মর জন্য একটি সুন্দর আগামী তৈরি হোক। কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মকে জাগিয়ে তোলার দায়িত্ব কারও একার নয়; আপনার আমার সকলের। তাই সব কালিমা মুছে মানবজাতিকে ন্যায় ও কল্যাণের পথে চলে শপৎ নেওয়ার দিন আজ।’

১৯৬১ সালে রবীন্দ্র-জন্মশতবার্ষিকী উৎযাপনের পর একটি প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন কয়েকজন সংগঠক। তাদের মধ্যে মোখলেসুর রহমান (সিধু ভাই নামে পরিচিত), শামসুন্নাহার রহমান, সুফিয়া কামাল, ওয়াহিদুল হক অন্যতম। সাঈদুল হাসানের প্রস্তাবে সংঠনটির নামকরণ করা হয় ছায়ানট।

১৯৬১ সালে সুফিয়া কামালকে সভাপতি আর ফরিদা হাসানকে সম্পাদক করে প্রথম কমিটি গঠিত হয়। সহ-সভাপতি জহুর হোসেন চৌধুরী, সাঈদুল হাসান। সহ-সম্পাদক সাইফুদ্দীন আহমদ মানিক, মিজানুর রহমান ছানা। কোষাধ্যক্ষ পদে মোখলেসুর রহমান ও সদস্যরা ছিলেন কামাল লোহানী, ওয়াহিদুল হক, সনজীদা খাতুন, আহমেদুর রহমান প্রমুখ।

১৯৬১ সালে ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউট মিলনায়তনে ছায়ানটের প্রথম অনুষ্ঠান হয়। ১৯৬৩ সালে সনজীদা খাতুনের উদ্যোগে বাংলা একাডেমীর বারান্দায় সঙ্গীত শেখার ক্লাস শুরু হয়। সনজীদা খাতুন ও ফরিদা মালিক রবীন্দ্র সঙ্গীত, বজলুল করিম তবলা, মতি মিয়া বেহালা ও সেতার এবং সোহরাব হোসেন নজরুল গীতি শেখাতেন। ওই সালেই ছায়ানট সঙ্গীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। পয়লা বৈশাখ, ১৩৭০ বঙ্গাব্দে ওস্তাদ আয়েত আলী খান এই ছায়ানটের প্রাথমিক কার্যক্রম ইংলিশ প্রিপারোটরি স্কুলে শুরু হয়। কিন্তু সরকারি বাধার কারণে কার্যক্রম অগ্রণী বালিকা বিদ্যালয়ে স্থানান্তরিত হয়। সেখানেও সরকারের ভয় ভীতির কারণে লেক সার্কাস গার্লস স্কুলে ছায়ানট আশ্রয় নেয়। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ছায়ানট এখানেই ছিল। স্বাধীনতার পর গভঃ ল্যাবরেটরি স্কুলের অধ্যক্ষ ড. নূরুন নাহার ফয়জুন্নেসা তার স্কুলে ছায়ানটকে কার্যক্রম চালানোর অনুমতি দেন। বিষয়টি তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ চৌধুরী অনুমোদন করেন।

১৯৬৪ সাল, বাংলা ১৩৭১ সালের পয়লা বৈশাখ রমনার বটমূলে ছায়ানট বাংলা নববর্ষ পালন শুরু করে। কালক্রমে এই নববর্ষ পালন জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়। এ ছাড়াও ছায়ানট ২৫ বৈশাখ, ২২ শ্রাবণ, শারদোৎসব ও বসন্তোৎসব গুরুত্বের সাথে পালন করে।

প্রসঙ্গত, ছায়ানট বাংলাদেশের অন্যতম সংস্কৃতিক সংগঠন। ১৯৬১ সালে এই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও উৎসব পালন করা ছাড়াও এই সংগঠন বাদ্যযন্ত্র, সঙ্গীত, নৃত্য প্রভৃতি বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান ও সঙ্গীত বিদ্যালয় পরিচালনা করে থাকে। পয়লা বৈশাখের অন্যতম আকর্ষণ রমনার বটমূলে ছায়ানটের পরিবেশনায় অনুষ্ঠিত বর্ষবরণ অনুষ্ঠান।

নিউজ পেজ২৪/আরএস