সাক্ষাৎকার

মে ৮, ২০১৫, ৭:৪৭ অপরাহ্ন

‘বাংলাদেশের সম্ভাবনা আটকে যেতে পারে’

নিউজপেজ ডেস্ক

‘প্রতিনিয়ত ব্রিটিশ পার্লামেন্ট, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে, ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে বাংলাদেশের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। এটি একটি রাষ্ট্রের জন্য সম্মানজনক নয়। আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে অন্যরা পার্লামেন্টে সমালোচনা করলে বিশ্বমহলে নিজেদের অবস্থান সংকুচিত হয়ে পড়বে।’ বলছিলেন, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে উপলক্ষ করে সম্প্রতি রাজনীতি, অর্থনীতির নানা বিষয় নিয়ে মুখোমুখি হন ‘সাপ্তাহিক’-এর।

সাপ্তাহিক : সংকটের আবর্তে রাজনীতি। তিন সিটি করপোরেশনের নির্বাচন, নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে কী বলবেন? রাজনীতিতেই বা কী প্রভাব ফেলবে এই নির্বাচন?
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য : জাতীয় রাজনীতিতে স্থানীয় নির্বাচনের ফলাফল বিশেষ কোনো প্রভাব ফেলার কথা নয়। কিন্তু নানা কারণেই অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের বিষয়টি জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে মিলিয়ে অনেকেই মূল্যায়ন করার প্রয়াস চালিয়েছেন। এর কারণও ছিল বেশ।
অনেকেই মনে করেছিল, এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ধ্বংসাত্মক রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার একটি সুযোগ তৈরি হতে পারে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনীতির হিংসা যে চরম মাত্রায় পৌঁছে, তা নিরসনে এই নির্বাচন অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন কেউ কেউ। কিন্তু এই ধারণা অমূলকই থেকে যায়।
সুতরাং এই নির্বাচনে যারা বিজয় লাভ করেছেন তারা খুব একটা আত্মতৃপ্তি দেখাতে পারছেন না। আবার যারা এই নির্বাচনে হেরে গিয়ে সাংগঠনিক শক্তির মধ্য দিয়ে নির্বাচনের বিপক্ষে অবস্থান নেবেন, তা-ও তারা দেখাতে পারছেন না। যদিও বিরোধী জোট নানা চাপের মধ্যে ছিল। কিন্তু এরপরেও নেতা-কর্মীদের সরব উপস্থিতি নিয়ে চাপ মোকাবিলার কোনো দৃষ্টান্ত আমরা লক্ষ করতে পারিনি। পরাজয় জেনেও যে রাজনৈতিক কৌশলে বিজয়ী হওয়া যায়, তাতেও বিরোধী জোট ব্যর্থ হয়েছে। নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে এটি শক্তিশালীভাবে প্রমাণ হয় তখন, যখন পরাজিতরা সাধারণ মানুষকে মাঠে নামাতে পারেনি। বিএনপি জোট এই প্রশ্নে সুবিধা করতে পারেনি।
এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ভয়ঙ্কর যে বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে তা হচ্ছে, দেশের নাগরিকের অধিকার রক্ষা করার জন্য যে প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করার কথা তা দিনকে দিন আরও দুর্বল হচ্ছে। জনস্বার্থের রক্ষাকবচগুলো অনেকটাই অস্তিত্বহীন, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিপরীতমুখী কাজ করছে।
সাপ্তাহিক : বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে, পরিবর্তন ঘটছে চিন্তা-চেতনার। আমরা, আমাদের রাজনীতি কেন পশ্চাৎমুখী?
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য : আমরা এগিয়ে যাচ্ছি না, তা বলব না। সাধারণ মানুষ তো এগিয়ে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ এমন নির্বাচনের ধার ধারে না। তারা নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনে নিজেরাই সচেষ্ট। সে তার আগামী দিনের জীবন উন্নততর করার জন্য নিজেই চেষ্টা করে যাচ্ছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, পরিবর্তনশীল পৃথিবীর সঙ্গে আমরা তাল মেলাতে পারছি কি না। পৃথিবী যে জায়গায় যাচ্ছে, তার সঙ্গে যদি সামঞ্জস্য রাখতে চাই তাহলে যে ধরনের প্রতিষ্ঠান, আচরণ, সংস্কৃতি দরকার, আমাদের মধ্যে তা হচ্ছে না। এটিই হচ্ছে মৌলিক সমস্যা। যেমন, পৃথিবী রপ্তানি পণ্যের মধ্যে যদি শিশুশ্রম দেখতে না চায়, শ্রমিকের অধিকার রক্ষিত হয়েছে, এমন যদি দেখতে চায় এবং আমরা যদি তা নিশ্চিত করতে না পারি তাহলে পৃথিবীর সম্পূর্ণ সুযোগ নিতে পারব না।
যেকোনো অপরাধী বিচার পাবার অধিকার রাখে। কিন্তু এখানে বিচারহীনভাবে অবিরত মানুষ নিহত হচ্ছে। এই বিচারহীনতা আন্তর্জাতিক মহল ভালোভাবে নেবে না, এটাই স্বাভাবিক। নারীর ওপর সহিংসতা বাড়ছে। এ নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলছে। দুর্নীতি জাতীয় সমস্যায় রূপ নিচ্ছে। এতে করে বিদেশিরা বিনিয়োগে ভরসা পাচ্ছে না।
একটি ছোট, মুক্ত অর্থনীতির দেশ পৃথিবীকে অবজ্ঞা করে চলতে পারবে বলে আমার মনে হয় না। আমাদের বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়, শান্তি মিশনে সেনাবাহিনীকে পাঠাতে হয়। আমরা অন্যের ওপর নির্ভরশীল। অবজ্ঞা করার কোনো সুযোগ নেই।
সাপ্তাহিক : সাধারণ মানুষ নিজেরাই তাদের ভাগ্য পরিবর্তনে সচেষ্ট, বলছিলেন। পরিবর্তন করে চলছেও বটে। তাহলে সরকারগুলোর আসা-যাওয়ার কী গুরুত্ব থাকতে পারে?
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য : যে সূচকগুলোর কথা বললাম, তার ইতিবাচক অনুঘটকের জন্য একটি গণতান্ত্রিক, সুষ্ঠুধারার সরকার দরকার। জনস্বার্থে সরকারগুলোই পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে, ধরে রাখে। সরকার যদি তার নীতি এবং আদর্শ দিয়ে অন্য দেশের সঙ্গে বৈরী সম্পর্কে চলে যায়, তাহলে দেশ, মানুষ কারও জন্যই মঙ্গল নয়।
সাপ্তাহিক : উন্নয়ন প্রশ্নে সরকারগুলোর স্থায়িত্বেরও ব্যাপার থাকে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোনো কোনো দেশ স্থায়িত্বের প্রশ্নে কিছুটা স্বৈরাচারী হলেও বেশ ভালোভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে। চীন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, তাওয়ান তো পৃথিবীকে চ্যালেঞ্জ করছে। বাংলাদেশ সে পথে হাঁটতে পারে কি না?
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য : আপনি ১৯৮০ সালের গল্প ২০১৫ সালে এসে বলতে পারেন না। আপনার কাছে মোবাইল ফোন রয়েছে। এটিই এখন আপনার কাছে মিনি পৃথিবী। এটি তো পরিবর্তন বটে। প্রযুক্তির পরিবর্তনে রাষ্ট্র কাঠামোরও পরিবর্তন ঘটছে সারা দুনিয়ায়। এটি মাথায় রাখতে হবে।
নির্বাচন ব্যতিরেকে, গণতন্ত্র পায়ে মাড়িয়ে এই সময়ে কি এগিয়ে যাওয়া সম্ভব? আপনিই বলুন। পৃথিবী তো দিন দিন বোকা হচ্ছে না। নিত্যদিন পরিবর্তন ঘটছে। এটি যদি বাঙালি মানত তাহলে স্বৈর সরকারের বিরুদ্ধে মানুষ আন্দোলন করল কেন? এই আন্দোলন তো নব্বইয়ের দশকের।
এক সময় নারীর অধিকার নিয়ে কথা বল হতো না। আজ কিছু ঘটলে অন্তত সরব প্রতিবাদ হয়। তখন শিশুশ্রম কোনো বিষয়ই নয়। এখন এ ব্যাপারে সবাই সোচ্চার। অবাস্তব উদাহরণ তথা অর্ধপক্ক কথা না বলাই ভালো।
সরকার পরিবর্তন বিষয় নয়, বিষয় হচ্ছে নাগরিক তার অধিকার ভোগ করতে পারছে কি না? সে তার স্বাধীনতা ভোগ করতে পারছে কি না? আমি আপনার সঙ্গে একমত না-ও হতে পারি। তাই বলে আমাকে দ্বিমত পোষণ করার অধিকার দেবেন না? প্রতিবার ভোট দিয়েছি। কিন্তু প্রতিবারই তো আমার পছন্দের প্রার্থী বিজয়ী হয়নি। তাই বলে আমি আমার ভোটাধিকার প্রয়োগ করব না? রাষ্ট্র আমার এই অধিকারের স্পেসটুকু রক্ষা করবে। এটি হলেই আমরা আমাদের দেশ, সমাজ নিয়ে একসঙ্গে কথা বলতে পারব, এগিয়ে যেতে পারব। আধুনিক পৃথিবী তা-ই বলে। আমাকে যদি রাষ্ট্র স্পেস না দেয় তাহলে কোথায় দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র নিয়ে আলোচনা করব? শেষ বিচারে তো সবাই দেশেরই উন্নতি চান, অন্তত মৌখিকভাবে। মানুষ নির্বাচন, ভোটের মাধ্যমে মৌখিক কথা বলার প্রায়োগিক অধিকার ভোগ করে থাকে। তবেই না বিচারিক, প্রশাসনিক অধিকার ভোগ করবে। গণমাধ্যমে কথা বলার সুযোগ পাবে।
আলোচনার বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশ আগামী দিনে এগুবে তার পরিপূরক রাজনীতি পাচ্ছি কি না। পরিপূরক রাজনীতি পেলেই তো পরিপূরক অর্থনীতি পাব। প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ব, কিন্তু প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতি থাকবে না, তা হয় না। জনসাধারণের জন্য আপনি সবচেয়ে ভালো উদ্যোক্তার কাছ থেকে সবচেয়ে কম মূল্যে ভালো সেবা এনে দিতে চান অথচ রাজনীতিতে জনসাধারণের অংশগ্রহণ থাকবে না, তা হতে পারে না। মুক্ত অর্থনীতি গড়তে হলে মুক্ত মতকে প্রাধান্য দিতেই হবে। এই মত প্রকাশ সংকুচিত হয়ে পড়লে বিশ্ব অর্থনীতিতেও আপনার জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়বে।
প্রতিনিয়ত ব্রিটিশ পার্লামেন্ট, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে, ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে বাংলাদেশের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। এটি একটি রাষ্ট্রের জন্য সম্মানজনক নয়। আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে অন্যরা পার্লামেন্টে সমালোচনা করলে বিশ্বমহলে নিজেদের অবস্থান সংকুচিত হয়ে পড়বে। এটি জাতির জন্য লজ্জা এবং বিব্রতকর বলেই মনে করি।
সাপ্তাহিক : শঙ্কা প্রকাশ করলেন। তাহলে নাগরিক অধিকার হরণ করে সরকার জাতিকে কোথায় নিয়ে যেতে চাইছে?
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য : আমি কোনো গুণগত পরিবর্তন দেখতে পারছি না। পরিবর্তন দেখতে পারছি না বলেই আমরা প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশ অতিক্রম করতে পারছি না। অর্থনৈতিক ঐকমত্য থাকলেও রাজনৈতিক ঐকমত্য না থাকার কারণে অর্থনীতি এগুচ্ছে না। রাষ্ট্রীয় শিল্পকারখানা নিয়ে সবাই ভাবনা করছে। কিন্তু এর কার্যকর উন্নয়ন নেই। ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা তছরুপ হয়ে গেছে। শেয়ারবাজারে দুর্বৃত্তরা প্রবেশ করে সবারই ক্ষতি করেছে। সব দলের লোকেরাই শেয়ারবাজারের সর্বনাশের শিকার হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সবারই রাস্তায় নামার কথা ছিল। কেউ নামেনি, নামতে পারেনি। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি)-এর মাধ্যমে বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা। গত বছরও তিন হাজার কোটি টাকা এই খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়। কই? কোনো আলোচনা নেই। প্রাইভেটাইজেশন কমিশন এখন কী করছে তার খবর কেউ জানে না। দ্বান্দ্বিক রাজনীতির কারণেই এসব ক্ষেত্রে সংস্কারমূলক কাজ সম্ভব হচ্ছে না। সংস্কারে ঐকমত্য হতে পারিনি বলে প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশই রয়ে গেছে। গত কয়েক বছর ধরে রাজনীতির সঙ্গে অর্থনীতির এই সম্পর্কটি খুব স্পষ্ট লক্ষ্য করছি।
সাপ্তাহিক : এমন রাজনৈতিক শক্তিরও বিনাশ হয়। পরিণতি আছে বটে?
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য : ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, বিশেষ করে গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় ক্ষমতার পালাবদল হবেই। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য আছে।
সাপ্তাহিক : আদৌ কি বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য ছিল?
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য : স্বাধীনতাযুদ্ধই তো হয়েছে গণতন্ত্র সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য। ১৯৭০ সালের নির্বাচন মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার মাইলফলক। বাঙালি তার মতের বিকাশ ঘটাতে পেরেছিল। সেই মতের অধিকার হরণ করা হয়েছিল বলেই মুক্তিযুদ্ধ।
সাপ্তাহিক : ’৭০ নির্বাচনে বাঙালি মত প্রকাশ করেছিল ঠিক, কিন্তু আর কী পেরেছে। ভোট ডাকাতির অভিযোগ তো ১৯৭০ সালের নির্বাচনেও ওঠে। আজও নির্বাচনে সূক্ষ্ম, স্থূল কারচুপি নিয়ে হানাহানি?
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য : আপনি ১৯৭৩ সালের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন করছেন, এটিও তো মত প্রকাশের স্বাধীনতা। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য আছে।
সে দিন একজন বললেন, বাঙালির রক্তে গণতন্ত্রের ডিএনএ আছে। বাঙালির রক্তে গণতন্ত্রের ডিএনএ আছে বলেই আমি ভরসা রাখি, বাংলাদেশে কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, তাইওয়ানের রাজনীতির ভর করবে না। গণতন্ত্র আর স্বৈরতন্ত্র ভিন্ন বিষয়। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে উন্নয়নের সম্ভাবনা তুলনীয় যেকোনো উন্নয়নশীল দেশ থেকে এগিয়ে।
সাপ্তাহিক : উন্নয়ন, গণতন্ত্র তো পরিপূরক। চলমান রাজনৈতিক সংকটে উন্নয়নের সম্ভাবনা ম্লান হয়ে যেতে পারে কি না?
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য : সমস্যা তো এখানেই। যে গণতন্ত্র উন্নয়নকে সমর্থন দেবে, সেই গণতন্ত্র না থাকার কারণে উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো আটকে যাবে।
সাপ্তাহিক : এর দায় কি শুধু সরকারের? গণতন্ত্রে বিরোধী দলেরও তো ভূমিকা আছে?
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য : অবশ্যই। বাংলাদেশে বিরোধী দল এখন অক্ষম। কোনো ইস্যু নিয়ে বিরোধী দলের নীতিগত সমালোচনা, পর্যালোচনা এবং উপস্থাপনা নেই। কী ধরনের বিরোধী দল আপনি কল্পনা করতে পারেন? কোনো বিকল্প রাজনীতি, অর্থনীতির কথা না বলে শুধু আন্দোলনের কথা বলে। নির্বাচন নিয়েই তারা ব্যস্ত।
সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আমি কোন আস্থার ভিত্তিতে বিরোধীজোটকে সমর্থন করব বলুন? তারা ব্যাংক খাত নিয়ে আমাকে কী স্বপ্ন দেখাতে পেরেছে। শেয়ারবাজার নিয়ে কী পরিকল্পনা আছে তাদের। দুর্নীতিরোধে কোনো বিকল্প দেখাতে পারছে।
এই নির্বাচনে তাদের অনেক প্রতিশ্রুতি ছিল। হেরে গেছেন বলেই কি দায় শেষ! প্রতিশ্রুতি নিয়ে তাদের কোনো পর্যালোচনা আছে? যেভাবেই হোক প্রতিশ্রুতি দিয়ে যারা মেয়র নির্বাচিত হলেন তাদের কাজ কি বিরোধীরা সঠিকভাবে মনিটরিং করবেন। নির্বাচন নির্বাচন করে শুধু ভোট চাইবেন কিন্তু বিকল্প কোনো উপায় দেখাবেন না, তা হতে পারে না।
জ্বালাও পোড়াও করার যে অভিযোগ উঠেছে তার যদি কিছুটাও বিরোধী দলের ব্যাপারে সত্য হয়, তবে সেটাও ভয়ঙ্কর। এটি কোনো দায়িত্বশীল কাজ হতে পারে না। হিংসা, ধ্বংসাত্মক কাজ বাদ দিয়ে বিরোধী পক্ষ বলতে পারে যে, তিনজন মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন, আমরা আগামী এক বছর তাদের কাজ পর্যবেক্ষণ করব। আমি হলফ করে বলতে পারি তারা এটি করবে না।
আমাদের দুর্ভাগ্য হচ্ছে সরকার জনভাবনা আমলে নেয় না আবার জনগণের সামনে বিকল্প কোনো রাস্তাও নেই। ভয় হচ্ছে, বাংলাদেশের সম্ভাবনা যেকোনো সময় আটকে যাবে।
সাপ্তাহিক : আটকে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কেন? স্বাধীনতার পর থেকে তো ঠেকে ঠেকেই চলছি?
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য : হ্যাঁ, ঠেকে ঠেকেই স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। নব্বইয়ের পর সরকার বদলের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের পথ সুগম হচ্ছে।
সাপ্তাহিক : তাহলে আটকে যাওয়ার ভয় কেন?
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য : রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছালেই সম্ভাবনা আটকে যাবে। নৈতিক প্রশ্নে দ্বন্দ্ব এখন চরমে। শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে উচ্চবর্গের রাজনৈতিক শ্রেণি ক্ষমতা হস্তান্তর করতে পারছে না। ক্ষমতা পরিবর্তনের শান্তিপূর্ণ পথ যদি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে তাহলে বাংলাদেশ অবশ্যই আটকে যাবে। ১/১১ তার উদাহরণ। এতে নাগরিকের অধিকার ক্ষুণœ হয়, রাষ্ট্রযন্ত্রে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটে। রাজনীতিকরা অনেক কিছুই প্রশমিত করতে পারছে ঠিক, কিন্তু বিকাশমান অর্থনীতিতে মানুষের যে আকাক্সক্ষা তা যদি মেটাতে না পারে তাহলে বিপদ অনিবার্য হয়ে আসবে।
সাপ্তাহিক : সাধারণ মানুষও তো চিন্তার পরিবর্তনে সক্রিয় নয়। এত পোড় খাওয়ার পরও মানুষ আওয়ামী লীগ-বিএনপিতেই আস্থা রাখছে, তিন সিটি নির্বাচন তা-ই প্রমাণ করে। অন্য প্রার্থীদের জামানত বাজেয়াপ্ত হলো।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য : তৃতীয় মতের ধারকেরা যখন পর্যন্ত ন্যূনতম নিজেদের সমর্থন প্রকাশ করতে না পারছে ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষ তাদের ক্ষমতার পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে বিবেচনা করবে না। তাদের বিদ্রোহী বা বিকল্প শক্তি হিসেবে চিনতে পারে কিন্তু কার্যকর শক্তি হিসেবে ভরসা রাখতে পারে না। মাঠের রাজনীতিতে তাদের মানুষ শক্ত প্রতিপক্ষ মনে করে না। তবে কোনো দিন তারা শক্ত প্রতিপক্ষ হবে না, তা মনে করছি না। তারাও তো নির্বাচন করে হেরে গিয়ে একেবারে পাঁচ বছরের জন্য হারিয়ে যান।
আমি বিএনপির জন্য যে কথা বললাম, একই কথা বাম নেতাদের জন্যও প্রযোজ্য। তারা যদি মানুষের আবেগকে জাগ্রত করে নিজেদের পক্ষে নিতে পারেন তাহলে সারা দেশে না হলেও অন্তত ঢাকা শহরে জেতাটা স্বাভাবিক। দিল্লির মেয়র নির্বাচন তাই বলে।
বিকাশমান শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত শ্রেণির চিন্তা-চেতনাকে যে ধারণ করতে পারবে, সে-ই পরিবর্তনের এজেন্ট হতে পারে। বামদের এখন আর মানুষ পরিবর্তনের এজেন্ট হিসেবে দেখছে না।
সাপ্তাহিক : নেতৃত্বের কথা বললেন। সাধারণ মানুষও তো পরিবর্তনের চিন্তায় অভ্যস্ত নয়?
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য : নেতৃত্বকেই পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে মানুষ দেখতে চায়। নেতারা ধারাবাহিক প্রচার-প্রচারণায় অংশ নিলেই মানুষ তাতে সায় দেয়। ষাটের দশকের রাজনীতি তো এভাবেই হয়েছে। সকলেই ইন্সট্যান্ট কফি হলে হবে না। ধারাবাহিকতা নেই।
সাপ্তাহিক : চলমান রাজনীতি সমাজকেও নাড়া দিচ্ছে।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য : মানুষের একাত্মবোধের জায়গাগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ক্রিকেটে জয় এলে সবাই একাত্ম হচ্ছি। কিন্তু রাজনীতি, অর্থনীতির স্বার্থে একাত্ম হচ্ছি না। দ্বিতীয়ত সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে বল প্রয়োগের মাত্রা অনেক বেড়ে গেছে। এতে মানুষ বিচার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলছে। এটি সমাজের জন্য বড় পরিবর্তন ঘটাতে পারে। মানুষ নিজেরাই বল প্রয়োগে অভ্যস্ত হতে পারে, অন্যথায় চরম কোনো শক্তির ওপর নির্ভর করতে পারে। তৃতীয়ত, এই অবস্থা বিরাজ করলে বিদেশি বিনিয়োগ অনেক কমে যাবে। বিচার বিভাগের ওপর, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আস্থা না এলে বাইরের মানুষ এখানে আসবে কেন?
সাপ্তাহিক : সমাজ কাঠামো ভেঙে যেতে পারে কি না?
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য : সমাজ একেবারে ভেঙে যাবে, তা মনি করি না। এভাবেই সমাজ এগিয়ে যাবে। তবে সমাজের যে ইতিবাচক পরিবর্তন হওয়ার কথা, সেই সুযোগ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। আক্ষেপ এখানেই।
সাপ্তাহিক : এই আক্ষেপ ক্ষোভে পরিণত হতে পারে কি না?
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য : পুরো ক্ষোভ প্রকাশ পাবে না। দেশ যদি একেবারে থেমে যেত, কৃষক যদি ফসলের দাম একবারেই না পায়, তাহলে মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ত। টাকা বিদেশে যাচ্ছে ঠিক, কিন্তু সম্পূর্র্ণ টাকা যখন চলে যাবে, তখনই ক্ষোভ দেখা দেবে। মধ্যবিত্ত এখন সুবিধার মধ্যেই আছে। তারাও নির্বাচনে অংশ নেয়। এ কারণেই পূর্ণ ক্ষোভ দেখা যাবে না। পূর্ণ ক্ষোভ দেখা দিলে তাকে অনেক কিছু হারাতে হবে। এ কারণেই এত কিছুর পর নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করে তারা। সে চায় এর মধ্য দিয়েই ভালো থাকতে। অন্য কিছু এলে তাকেই বিপদে পড়তে হবে।
সাপ্তাহিক : চলমান সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে চরমপন্থা আসতেই পারে। আর সেটা যেকোনো চরমপন্থাই হতে পারে?
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য : মধ্যপন্থার রাজনীতি বন্ধ হলে চরমপন্থার উত্থান সময়ের ব্যাপার মাত্র। প্রগতিশীল বামকে বাদ দিয়ে যদি অতিবামের দিকে মানুষ ধাবিত হয় তা হলে চরমপন্থারই জয় হবে, যারা র‌্যাডিকেল পরিবর্তন চায়।
এ কারণেই আমি বলি চরমপন্থা ঠেকাতে হলে মধ্যপন্থিদের এখনই সমঝোতায় আসতে হবে। না হলে বিপদ আর ঠেকানো যাবে না। অনেক বিষয়ে হানাহানি হতেই পারে। কিন্তু রাষ্ট্র, সমাজের মৌলিক বিষয়ে এক হতেই হবে। অনেক দেশেই এমন সমঝোতা হয়েছে। পাশের দেশ ভারতের কথা যদি বলি, সাম্প্রদায়িকতা রোধ করার জন্য আগামী দিনে অভিন্ন মতে আসতেই হবে ভারতকে।
সাপ্তাহিক : ভারত তো এখন রীতিমতো ধর্ম রাষ্ট্র?
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য : এ কারণেই তো এক হতে হবে। সাম্প্রদায়িকতা ব্যাপক আকার ধারণ করলে ভারত রাষ্ট্রটি থেমে যাবে, এটাই স্বাভাবিক।
সাপ্তাহিক : আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কী বলবেন?
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য : বিরোধী মতের জায়গা দিতে হবে। নির্বাচনে জয়লাভ করা যেমন গণতন্ত্রের অংশ, তেমনি বিরোধী মতের জায়গা দেয়াও গণতন্ত্রের অংশ। দ্বিতীয়ত বিরোধী দলকে ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম পরিহার করে বিকল্প নীতির প্রচারণায় জোর দিতে হবে। হতে পারে সেটা নগর অর্থনীতিকে কেন্দ্র করেই। স্বল্পমেয়াদের জন্য জনস্বার্থে দীর্ঘমেয়াদে সমঝোতা করতেই হবে।
সাপ্তাহিক : সেই সমঝোতায় মানুষ ভরসা পায়?
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য : ভরসা রাখতেই হয়। আগালাম তো। আপনার সঙ্গে আলাপ করছি, বাংলাদেশের অর্জনকে স্বীকার করেই, তা করছি। আমাদের যে সুযোগ আছে, তা অনেক দেশেই নেই। ভূ-রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ এগিয়ে। এখানে সম্পদ আছে, মানবসম্পদ আছে, নেতৃত্ব দেয়ার জন্য তরুণেরা আছে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল, বাধা শুধু রাজনীতি।

নিউজ পেজ২৪/আরএস