খোলা কলাম

মে ২৫, ২০১৫, ৩:১৯ অপরাহ্ন

দৃষ্টিভঙ্গি বদলান সমাজ বদলে যাবে

লেখক: শেখ জাহিদুজ্জামান

ইসলাম ধর্মে যেনাকে বেদআত বলা হয়েছে। আমরা জানি, বেদআত আল্লাহর সান্নিধ্যে ক্ষমার যোগ্য নয়। বিধায় আমাদের যেনা থেকে বিরত থাকা উচিত। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। বিধাতার সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে মানুষকে সেরা উপাধীর খেতাব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিধাতার সেই মর্যাদা আমরা কি রক্ষা করতে পারছি। আমরা কি পেরেছি নারীর সম্মান দিতে? যদি সম্মান দিতে পারতাম? তাহলে আজ কেনো দিনের পর দিন মায়ের জাতি অর্থাৎ ‘নারী’ কেনো ধর্ষণের শিকার হবে? কেনো তাদের সম্ভ্রম নিয়ে খেলা করা হবে? আর কেন-ই বা নারীর সঙ্গে করা হবে পশুর মতো আচরণ? এই প্রশ্ন আমাদের সুশীল সমাজের।


আমরা তো সবাই মানুষ, পশু তো আর নয়! যে নারীর সঙ্গে পশুর মতো ব্যবহার করতে হবে। পশুরও একটা ধর্ম আছে? কিন্তু মানুষের মধ্যে কি সেই ধর্ম নেই? আমি সবাইকে পশু বলছি না। আমি তাদেরকে পশু বলছি, যারা মানুষ নামে পশু হায়েনার মত নারীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর বলী খেলার মত মেতে উঠে নারীর দেহ নিয়ে।


তথা যে নারী আমাকে দশ মাস দশ দিন গর্ভেধারণ করলো সেই নারী অর্থাৎ মা জাতি আজ বড়ই অসহায়। বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, “দৃষ্টি ভঙ্গি বদলান সমাজ বদলে যাবে”।


কিন্তু আমরা আমাদের দৃষ্টি ভঙ্গি বদলাতে পারেনী। যদি আমাদের দৃষ্টি ভঙ্গি বদলাতো তাহলে আজ আমাদের সমাজ বদলে যেত।


আসলে ধর্ষণ বলতে আমরা কি বুঝি, বেআইনী ভাবে কারো ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার শরীরের যৌনঅঙ্গ সমূহের ব্যবহার। যদিও ধর্ষণের সাথে জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক যুক্ত, ধর্ষণ মানে প্রচণ্ড আবেগ কিংবা অন্তরঙ্গ শারীরিক মিলন নয়। ধর্ষণ হচ্ছে একপ্রকার আগ্রাসন এবং সহিংস মনোভাব। তবে নারীই কি সবসময় ধর্ষিত হয়? না! পুরুষও ধর্ষনের শিকার হয়ে থাকে। তবে সেটি সবার অগোচরেই থেকে যায়।


বাংলাদেশ দন্ডবিধির ৩৭৫ ধারায় ‘ধর্ষণ’-কে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে তা হলোঃ


যদি কোন পুরুষ নিম্নবর্ণিত পাঁচ প্রকারের যে কোন অবস্থায় কোন নারীর সাথে যৌন সহবাস করে তবে সে ব্যক্তি নারী ধর্ষণ করেছে বলে গণ্য হবে-


‘কোনো নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে অথবা কোনো নারীর সম্মতি ছাড়া অথবা কোনো নারীকে মৃত্যু বা শারীরিক আঘাতের ভয় দেখিয়ে সম্মতি দিতে বাধ্য করলে অথবা নাবালিকা অর্থাৎ ১৬ বছরের কম বয়স্ক শিশু সম্মতি দিলে কিংবা না দিলে (সে যদি নিজ স্ত্রীও হয়) অথবা কোনো নারীকে বিয়ে না করেই ব্যক্তিটি তার আইনসঙ্গত স্বামী এই বিশ্বাস দিয়ে যদি কোনো পুরুষ যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে তাকে আইনের ভাষায় ধর্ষণ বলা হবে’।


তিনটি বর্ণমালার সমন্বয়ে গঠিত ছোট্ট একটি শব্দ কিন্তু যার ফলাফল খুবই ভয়ংঙ্কার এবং আমাদের সমাজে ঘৃণিত । ছেলে-মেয়ে যে কেও এবং যে কোন বয়সের ব্যক্তি ধর্ষণের শিকার হতে পারেন। কিন্তু আমাদের সমাজের মেয়েরা সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের শিকার হন।


৬ বছরের শিশু থেকে শুরু করে ৫০ মহিলারাও বাদ পড়েনি এই ধর্ষণ থেকে। দিন যতই বাড়ছে ততই বেড়ে চলেছে এই ধর্ষণের মাত্রা।

এদিকে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নারী লাঞ্ছনার ঘটনায় বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ কর্মসূচি চলার মধ্যেই বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় বাসের জন্য অপেক্ষারত একটি গারো (চাকমা) মেয়েকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে পাঁচ ব্যক্তি দেড়ঘণ্টা ধরে গণধর্ষণ করে। পরে তারা মেয়েটিকে উত্তরার জসিম উদ্দিন রোডে ফেলে রেখে যায়।


এ ঘটনার পর শুক্রবার ভাটারা থানায় মামলা করে ধর্ষণের শিকার মেয়েটির পরিবার। ২১ বছর বয়সী ওই তরুণী যমুনা ফিউচার পার্কের একটি পোশাকের দোকানে বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করতেন।


অন্যদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ঢাকায় এই ধরনের ঘটনা আগে সংঘটিত হয়নি। কিন্তু ঢাকায় এর আগে ২০১৪ সালে উত্তরা থেকে এক তরুণীকে বাসে তুলে নিয়ে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল এবং সেসময় একজন নিরাপত্তাকর্মীও নিহত হয়েছিলেন। আর এ ঘটনা বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিলো।


এদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ধর্ষণ হওয়া গারো মেয়েটি সুস্থ হয়ে উঠছেন। রোববার সকালে মেয়েটির বাবা ও স্বজনরা তার সঙ্গে দেখা করেছেন বলে জানা যায়।


পুলিশ জানিয়েছে, আরো কিছুটা সুস্থ হলে অপরাধীদের সম্পর্কে জানতে মেয়েটির সঙ্গে তারা কথা বলবেন। এরমধ্যে মেয়েটি ধর্ষণকারীদের মধ্যে যে একজনের নাম বলেছেন, তাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। বিশেষ কারণে বা তদন্তের স্বার্থে সেই ধর্ষকের নাম প্রকাশ করেনী পুলিশ। শারীরিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠলে মেয়েটিকে পুলিশের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে নেয়া হবে বলে জানা গেছে।


এদিকে মাইক্রোবাসে গারো তরুণী ধর্ষণের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।


অপরদিকে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ মার্স পর্যন্ত তিন মাসে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে ১২৩ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ২১ জনের বয়স ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৫ জনকে। এ ১৫ জনের মধ্যে আবার ৭ জনের বয়স ৬ বছরের নিচে। গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩৪ জন।


চলতি বছরের এপ্রিল ও মে মাসেও প্রায় সমানুপাতিক হারেই চলছে ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনা। মানবাধিকার সংগঠন অধিকার বলছে, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে মোট ১৫৮টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে জানুয়ারি মাসে ৩৩, ফেব্রুয়ারি মাসে ৪৪, মার্চ মাসে ৪০ ও এপ্রিল মাসে ৪১ জন নারী ধর্ষণের শিকার হন।


এ ছাড়া এ চার মাসে ৫৩টি যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইমিস সেন্টারে (ওসিসি) রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশ থেকে প্রায় প্রতিদিনই ২-৩ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়ে চিকিৎসা নিতে আসেন। সে হিসেবে প্রতি মাসে ৬০ জনের বেশি নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন।


জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির হিসাব অনুযায়ী, ২০১১ সালে সারা দেশে ৬২০, ২০১২ সালে ৮৩৬, ২০১৩ সালে ৭১৯ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।


বিশ্বের কয়েকটি দেশের ধর্ষণের চিত্র তুলে ধরা হলো....


যুক্তরাষ্ট্র : বিশ্বের সুপার পাওয়ার যুক্তরাষ্ট্রে ধর্ষণের দিক দিয়েও প্রথম। ৯৯ ভাগ ধর্ষকই পুরুষ। যারা শিকার তাদের মধ্যে ৯১ ভাগ নারী এবং ৯ ভাগ পুরুষ। ব্যুরো অব জাস্টিস স্ট্যাটিস্টিক্স এর তথ্য এগুলো।


সাউথ আফ্রিকা: ২০১২ সালে ৬৫ হাজার ধর্ষণ এবং আরো অনেক যৌন হয়রানির অভিযোগ দাখিল করা হয়। শিশু ধর্ষণে অন্যতম সাউথ আফ্রিকা। সেদেশের আইন অনুযায়ী ধর্ষণের অপরাধে সাজা হয় মাত্র দুইবছর।


সুইডেন: ইউরোপে সবচেয়ে বেশি ধর্ষণ রিপোর্ট করা হয় সুইডেনে। এখানে প্রতি ৪ জন নারীর ১ জন ধর্ষণের শিকার হয়। ২০১০ সালের মধ্যে সুইডিশ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী প্রতি ১ লাখ অধিবাসীদের মধ্যে ৬৩ ভাগ ধর্ষণের শিকার হয়। ২০০৯ সালে ১৫,৭০০ রেপ কেস রিপোর্ট করা হয় যা ২০০৮ সালের চেয়ে ৮ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ৫,৯৪০টি ছিল ধর্ষণ এবং ৭,৫৯০টি যৌন হয়রানি যার ভেতরে গোপন চিত্র প্রকাশ করে দেয়া অন্তর্ভুক্ত।


ভারত: ভারতে প্রতিদিন অন্তত ৯২ জন নারী ধর্ষণের শিকার হন৷ ভারতে যৌন হয়রানি ক্রমশ বাড়ছে। নারীর প্রতি সংঘটিত অপরাধের মধ্যে ধর্ষণ সেখানে অন্যতম। ন্যাশনাল ক্রাইম রিপোর্টস ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী ২০১২ সালে ২৪,৯২৩টি রেপ কেস রিপোর্ট করা হয়, কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে অলিখিত কেসগুলো মিলিয়ে হিসাব করলে এই সংখ্যা অনেক বেড়ে যাবে। এর মধ্যে ২৪,৮৭০টি ধর্ষণ সংঘটিত হয়েছে অভিভাবক/পরিবার, আত্মীয়, প্রতিবেশি ও পরিচিত মানুষ দ্বারা, ৯৮ ভাগ ধর্ষকই ছিল ধর্ষিতার পরিচিত। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী প্রতি ২২ মিনিটে ভারতে একটি করে নতুন রেপ কেস রিপোর্ট করা হয়। ‘দ্য হিন্দুস্তান টাইমস’।


যুক্তরাজ্য: অনেকেই একটি উন্নত দেশ হিসেবে যুক্তরাজ্যে থাকতে চায়, অন্তত বেড়ানোর জন্য হলেও যেতে চায়। কিন্তু তারা হয়ত অবগত না যে ধর্ষণের মতো অপরাধে সাংঘাতিকভাবে ডুবে আছে এই দেশ। ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে দেশটির মিনিস্ট্রি অব জাস্টিস, অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিক্স এবং হোম অফিস যুক্তরাজ্য ও ওয়েলসে সংঘটিত যৌন সহিংসতার ওপর একটি বুলেটিন একসঙ্গে প্রকাশ করে। রিপোর্টে বলা হয়- প্রতি বছর গড়ে ৮৫,০০০ নারী ধর্ষিত হয়। ৪ লাখের ওপরে নারী শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হয়।


কিন্তু একটি বিষয় খুবই জানতে ইচ্ছে করে, মেয়েরা জিন্স পরুক আর স্কার্ট পরুক তাতে কি নারীরা বলে তোমরা আসো আমায় ধর্ষণ করো? অনেক হিজাব পড়া মহিলা,মেয়েরা যাদের সারা শরীর বোরখায় আবরিত থাকে তবে কেন তারা ধর্ষণের শিকার হন? তারাতো আর ছোট ছোট কাপড় পরেনি। আসলে ধর্ষণ করার জন্য একটা মেয়ে ছোট কাপড় পরলো নাকি বোরখা পরলো সেটার প্রয়োজন হয়না। প্রয়োজন হয় একটি ধর্ষণ করার বিকৃত মানসিকতা।


এখন ভাবার বিষয় মানুষ হিসেবে আমরা কতটুকু সভ্য। কিন্তু এটা মাপার জন্য কোন মাপকাঠি তৈরি হয় নি পৃথিবীতে। একটি মানুষ তখনি সভ্য, যখন তার কাছে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে পৃথিবীর সকল মানুষ সম্পূর্ণ নিরাপদ। ধর্ষণের মতো পাশবিক, অন্যায় ও নৃশংস অপরাধ আর নেই। যা খুনের চেয়েও জঘন্য বলে বিবেচিত।

আর একটি ব্যাপার, আমার কাছে মন হয় আমরা সাধারণ মানুষেরা এখনো খুবই অসচেতন। কারণ, যে কোন সামাজিক ভায়্যালেন্টে রাজনৈতিক দলগুলো ছাড়া এখন পর্যন্ত দেশের সাধারণ নাগরিকরা রাস্তায় নামতে পারিনি। দিল্লিতে ধর্ষণের ঘটনায় হাজার হাজার সাধারণ নাগরিক নেমে এসেছিল রাস্তায়। তার একটি ফল পেয়েছে সেই দেশের নাগরিক। কিন্তু পরিতাপের সঙ্গে বলতে হয়, আমাদের দেশে ধর্ষণের যেগুলো ঘটনা সংঘঠিত হয় সেগুলো কেবল মিডিয়াতেই সরব থাকে। আর মিডিয়া যখন ধর্ষণ নিয়ে লেখা বন্ধ করে দেয় তখন এই ধর্ষণের ঘটনা গহীন অন্ধকারে নিমজ্জিত থেকে যায়।


তাই ধর্ষণ নিয়ে শুধু মিডিয়া কেনো সরব হবে। ধর্ম,বর্ণ, গোত্র, নির্বিশেষে আমাদের সকলকে ধর্ষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।

সাংবাদিক এবং কলামিস্ট




নিউজ পেজ২৪/ইএইচএম