শিল্প সাহিত্য

জুন ১৩, ২০১৫, ৬:৪৬ অপরাহ্ন

পাথর

জয়দীপ দে

চেহারাটা ঠিক বোঝা যায় না। ঘষতি খাওয়া কাচের মধ্য দিয়ে দেখার মতো অস্বচ্ছ। স্পষ্ট কেবল দুটো চোখ। অগ্নিগর্ভের মতো দাউ দাউ করছে। এখনই যেন ছিটকে পড়বে আগুনের গোলা। যাওয়ার আগে একটা মেঘমন্দ্রধ্বনিতে চারিপাশ কাঁপিয়ে গেল: পাথর। অমনি যেন পাথর হতে শুরু করল তার দেহখানি। ধীরে ধীরে নিচ থেকে অসাড় হওয়া।

শাহেদ ভয়ে লাফিয়ে ওঠে। বুকটা ধড়ফড় করে। চোখের সামনে খোলা জানালা। ক্ষয়েটে আলোয় অলস মনে দুলছে নারকেলের পাতা। ঘরের ভেতরে আলো-আঁধারির খেলা। জানালা দিয়ে উড়ে আসছে মশার ঝাঁক। ভনভন করছে চারপাশে। শাহেদ মর্মর-মূর্তির মতো চেয়ে থাকে জানালার দিকে। একটা সুস্থসবল মানুষ। পেট ভরে খেতে পারে। ভাবতে পারে আকাশপাতাল। মীরাক্কেল দেখে প্রাণভরে হাসতে পারে। কোনো ব্যথা নেই, বেদনা নেই। নেই কোনো অনুযোগ। অথচ উঠে দাঁড়ানোর শক্তিটা তার নেই। পারার মধ্যে যা পারে কতগুলো জড়ানো শব্দ চারদিকে ছড়িয়ে দিতে। এখন এটাই তার ভাষা। তার নিজের ভাষা শুনে ভয় লাগে নিজেরই। তাই শব্দ করে না সে। নিজের মধ্যে ডুব দিয়ে কেবল অনাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবে।

ইদানীং এই স্বপ্নটা ঘন ঘন দেখছে ও। ইদানীং বলতে মাস তিনেক হবে। ইন্ডিয়া থেকে ফিরে আসার পর থেকে। ছোট্ট একটা সমস্যা নিয়ে ইন্ডিয়া যাওয়া। গলাটা কিছুদিন হয় বসে গিয়েছিল। তারপর এমবিবিএস থেকে স্পেশালিস্ট। বঙ্গবন্ধু থেকে সিআরপি। থেরাপি ওষুধ কিছুতেই যখন আর কাজ হচ্ছে না ডাক্তারই বলল, ‘যান না, একবার ঘুরে আসেন ওপার। গলাটাও দেখালেন, সঙ্গে পুরো শরীর চেকআপ।’

জুন-জুলাইয়ের চাপ শেষে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল। পুরো ব্রাঞ্চের চার্জ তার মাথায়। এজিএম ব্রাঞ্চ। আপাতত এসপিও দিয়ে চলছে। সব সময় প্রেশার। তার ওপর মিড ইয়ারের ধাক্কা। কিন্তু দ্রুতই পরিস্থিতি পাল্টে যেতে লাগল। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে হাতের মুঠোয় ব্রাশটা থাকছে না। মনের ভেতরে কু ডেকে উঠল। সেদিনই সার্কেল অফিসে গিয়ে ডিজিএমকে পুরো ব্যাপারটা খুলে বলল। ডিজিএম খিটমিটে মেজাজের লোক। কিন্তু কেন জানি সেদিন খুব আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন। তাঁর সহযোগিতায় দিন দশেকের মধ্যে চলে যাওয়া। ডাইরেক্ট এয়ার। একজন প্রফেশনাল পেশেন্ট গাইডকে দেওয়া হলো তাঁর সঙ্গে।

নিমহানসে দিন কুড়ি ছিল। চেকআপের সব রিপোর্ট আসার পর ডাক্তার বেশ ইতস্ততার মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে একজন নিকটাত্মীয়কে চাইছিল বারবার। শেষমেশ শাহেদ শক্ত হয়ে বলল, ‘প্লিজ টেল মি, আই এম রেডি ফর অল।’ ডাক্তার মিনমিন করে বলল, ‘মটর নিউরন ডিজিস।’ কথার ফাঁকে মুচকি হেসে, ‘রোগটা এই গ্রহের সবচেয়ে মেধাবী মানুষটার হয়েছে। তাঁর নাম জানেন—স্টিফেন হকিংস। কেন এমনটা হয়, আমাদের জানা নেই। এটা প্রগ্রেসিভ ডিজিস। কিউরেবল নয়। কেবল ঠেকিয়ে রাখা যায়।’

আর কিছু তার মাথায় ঢুকছিল না। মাথাটা পাক খাচ্ছিল অদৃশ্য কোনো অক্ষের ওপর। যত দিন অফিসে যাওয়া-আসা ছিল, গুগলে সার্চ দিয়ে দিয়ে দেখত। কোথাও কোনো আশার আলো নেই। রুরিল নামে একটা ওষুধ দিয়েছিল ডাক্তার, তিন মাসের মধ্যে কাজ দেওয়ার কথা। কিছুদিনের জন্য অবসন্নতার আগ্রাসন থমকে যাবে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না। এখন হাঁটুর নিচে কিছু আছে বলে মনে হয় না।

অন্ধকার আরও ঘনীভূত হয়েছে। মশার ঝাঁক তার নিশ্চল হাতে-পায়ে রিগ গাড়ছে। বাপেক্সের ইঞ্জিনিয়ারও এত ক্ষিপ্রতায় কাজ করতে পারে না। শাহেদ অন্ধকারে বসে বসে মশাদের তামশা দেখে। তার অনুভূতির দরজায় তালা দেওয়া। অতএব ব্যথা-বেদনার বালাই নেই। এই সময় রাহেলার আসার কথা। কিন্তু চারপাশে কোনো সাড়াশব্দ নেই। মনে মনে ভীষণ রাগ হয়। ইচ্ছা করে জান্তব আওয়াজগুলো ছড়িয়ে একবার প্রতিবাদ জানাতে। এই অবহেলা তার প্রাপ্য নয়। এই ঘরবাড়ি আসবাব সব তার রক্ত-ঘামে গড়া। এখনো সে বেঁচে আছে। এখনো সে পাথর হয়ে যায়নি। তাকে ইগনোর করার সাহস পায় কী করে এরা? আবার মনের ভেতরের মনটা সরব হয়ে ওঠে। আর কত। আর কত জ্বালাবি এই মহিলাকে।

নারকেলের পাতার ফাঁকে ফাঁকে সন্ধ্যাপ্রদীপের মতো তারারা জ্বলে। ধূপছায়া আকাশ। আসন্ন পূর্ণিমার আলোয় ঝলমল করছে দূরের গাছগুলো। এমন সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে দলেবলে ছাদে চলে যেত শাহেদ। রাহেলা খালি গলায় ‘আজি জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে...’ গাইত। রাহেলা হুমায়ূনভক্ত। সে পূর্ণিমা উপভোগ করে। সে এইসব দিনরাত্রির টুনির মা হতে চেয়েছিল কৈশোরে। ওপরওয়ালা তার সেই ইচ্ছা পূরণ করেন হয়তো—প্রথম সন্তান হয় কন্যা। পরেরটি পুত্র। রাহেলার সন্তানভাগ্যে তার বোনেরা হিংসায় পুড়ে খাক। ফিজিকসের ছাত্রী রাহেলা ট্রপিক্যাল টুনির মা হতে গিয়ে আর চাকরি-বাকরির ধারেকাছে যায়নি।

যে রাহেলা হুমায়ূনের দুঃখবিলাসী উপন্যাস পড়ে রাতদুপুরে কাঁদত, আজ হাজার দুঃখেও নির্বিকার সে; সেকেন্ড-মিনিট-ঘণ্টা-দিন—এভাবে তার স্বামীর মৃত্যুর প্রহর গুনছে। মন শক্ত করে স্বামীর সঞ্চয় স্থিতি বুঝে নিচ্ছে। ভাবছে, কোথাও একটা চাকরি ধরবে। সেটা যে ধরনের চাকরিই হোক। মাটির সঙ্গে গড়াগড়ি খাওয়া দুটো বাচ্চার জীবন তাকেই সাজিয়ে দিতে হবে।
হঠাৎ ঘরটা আলোকিত হয়ে উঠল। তীব্র আলোয় চোখ দুটো কিছুক্ষণের জন্য ব্ল্যাক আউট হয়ে গেল। রাহেলা দৌড়ে গিয়ে জানালা লাগাল।
‘সরি, দেরি হয়ে গেল।’

নিউজ পেজ২৪/আরএস