খোলা কলাম

জুন ১৬, ২০১৫, ৮:২০ অপরাহ্ন

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সেশনজট মুক্ত হবে কবে?

আবুল কাশেম চৌধুরী

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে প্রায় তিন যুগ ধরে। এটি সে অর্থে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নয়, এটি মূলত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধিদপ্তর। দেশের সরকারি- বেসরকারি কলেজের অনার্স, মাস্টার্সে শিক্ষার্থী ভর্তি করা, পরীক্ষা নেয়া, সনদ প্রদান করা এর কাজ। এ কাজ করতে গিয়ে তারা চার বছরের অনার্স কোর্স অনেক সময় আট বছরে শেষ করে! এতে শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে অহেতুক চার বছর নষ্ট হয়। একদিন যারা দেশের হাল ধরবে সেইসব তরুণ শিক্ষার্থীদের জীবনের মূল্যবান সময়ের এমন অপচয় কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাজ হতে পারে না।

যে শিক্ষার্থী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে না, অথবা যাদের প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়া আর্থিক কারণে সম্ভব নয়, তারাই মূলত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পড়াশোনা করে। যারা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, তারা সময় মতো পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করে। অথচ একই বছর একসঙ্গে পাস করেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সেশন জটে আটকে থাকে। অনেকের তো পরীক্ষা শেষ করে ফল পেতে সরকারি চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা শেষ হয়ে যায়। পৃথিবীর কোনো দেশে শিক্ষার্থীদের জীবন নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অন্তত ছিনিমিনি খেলে না। এখানে একমাত্র ব্যতিক্রম জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। তাদের এই ব্যর্থতা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলোর রমরমা ব্যবসার একটি কারণ।

দেশের সরকারি-বেসরকারি কলেজের প্রায় বিশ লাখ শিক্ষার্থী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে বিড়ম্বনার শিকার। সব দেখেশুনে মনে হয়, দেশে উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠী যেন গড়ে না ওঠে এটাই প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য! একটি স্বাধীন দেশের শিক্ষাব্যবস্থা তো এমন হবার কথা ছিল না! কেন এমন হলো ভেবে দেখা দরকার। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত সেশন জট কমাতে পারেনি বরং বাড়িয়েছে। আমার কাছে মনে হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি দায়িত্ব পালনে সক্ষম নয়। সুতরাং তাদের দায়িত্ব কমিয়ে আনা উচিৎ। সরকারি কলেজগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা জরুরি।

ভাবতে অবাক লাগে, দেশে এখন নৈতিকতা ও বিবেকহীন মানুষের সংখ্যা বেশি, অন্তত চারপাশটা দেখেশুনে তাই মনে হয়। নইলে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীও দুর্নীতিতে এভাবে জড়িয়ে পড়বে কেন? কেন তারা দায়িত্বজ্ঞানহীন কাণ্ড করবে? সরকারি কলেজের শিক্ষকরা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেন না- এমন অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। এসব কলেজের অধিকাংশ শিক্ষার্থী জানে না তাদের ক্লাস রুটিন ঠিকভাবে অনুসরণ করা হবে কিনা? যথাসময়ে ক্লাসে শিক্ষক আসবেন কিনা বা ক্লাস হবে কিনা? অনেক শিক্ষার্থী মাসে একবারও কলেজে যায় না, কারণ ক্লাস হয় না। এ অবস্থায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একার পক্ষে দেশের এতগুলো সরকারি-বেসরকারি কলেজ সামাল দেয়া সম্ভব নয়। আর দায়িত্ব পালন করতে না পারার অর্থ ব্যর্থতা। যার খেসারত দিতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।

এ অবস্থা নিরসনে সরকারি কলেজগুলোকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করার জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়। এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় একমত হয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু বাদ সাধে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। কারণ এতে অনেকের দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জনের পথ সংকুচিত হবে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের রমরমা ব্যবসা কমে যাবে। অথচ স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীরও এ চক্র ভাঙার সদিচ্ছা ছিল। অভিযোগ আছে, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকেরা এ বিষয়ে বেশ তৎপর যাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই সদিচ্ছা কার্যকর না হয়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকের সঙ্গে কথা হলো। কথা প্রসঙ্গে তিনি বললেন, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এ দায়িত্ব নিতে পারবে না, জনবল নেই।’ এ কথা বলার অধিকার তিনি রাখেন কিনা আমি জানি না। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকবল দরকার হলে কর্তৃপক্ষ ও সরকার নিশ্চয়ই বুঝবে। শিক্ষার্থীরা এ দেশের সন্তান, আগামী দিনে তারাই দেশের নেতৃত্ব দেবে। আমাদের সন্তানদের অঙ্কুরে বিনষ্ট করে দেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ হতে পারে না। হাজার হাজার বাবা-মা অনেক কষ্টে সন্তানকে লেখাপড়া করান। তারা এক বুক স্বপ্ন লালন করেন সন্তানদের নিয়ে। তাদের সেই স্বপ্ন এভাবে সেশন জটে শেষ হয়ে যেতে পারে না। তাছাড়া মানুষ বা প্রতিষ্ঠান- সক্ষমতার মধ্যেই দায়িত্ব পালন করা উচিৎ। সামর্থের বাইরে হলে সেই দায়িত্ব ছেড়ে দেয়া উচিৎ। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় যেহেতু সক্ষমতার পরিচয় দিতে পারেনি সেহেতু কিছু দায়িত্ব তারা ছেড়ে দিতে পারে। এতে তারাও বাঁচবে, শিক্ষার্থীরাও বাঁচবে।

অনেকেই দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এক মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে। আমার প্রশ্ন হলো, তারা সেই উদ্দেশ্য কতটা সফল করতে পেরেছে? এখন পর্যন্ত তারা কোন কোর্স বা পরীক্ষা সময় মতো সমাপ্ত করতে পেরেছে? কোন পরীক্ষার ফল তারা সময় মতো প্রকাশ করতে পেরেছে? এমন নজির তো নেই। যারা দায়িত্ব পালন করতে পারেন নি, তারা কি বেতন ভাতাসহ সুযোগ-সুবিধা নেয়া থেকে বিরত ছিলেন? এই ব্যর্থতায় বিবেকের দংশন থেকে মুক্তি পেতে কেউ কি পদত্যাগ করেছিলেন? শিক্ষক অথবা ভিসি তারা তাদের সন্তানকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কোন কলেজে পড়াচ্ছেন? এমন অনেক প্রশ্ন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালকে ঘিরে রয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো মহৎ উদাহরণ নেই। এমতাবস্থায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব ও কর্মকাণ্ড সংকুচিত করা প্রয়োজন। মহৎ কাজের কথা যখন এলো তখন একটি উদাহরণ উল্লেখ করা প্রয়োজন বোধ করছি।

১৯৭২ সালে মহৎ উদ্দেশ্যে জাসদ গঠন করা হয়েছিল। উচ্চশিক্ষিত, মেধাবী যুবক ছিল সেই দলে। ত্যাগের মহিমায় তারা মহৎ ছিলেন। দেশ ও জাতির কল্যাণে জাসদ নামক সেই রাজনৈতিক দল কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো মহৎ কাজই করতে পারেনি। জাসদের প্রায় ত্রিশ হাজার উচ্চশিক্ষিত ত্যাগী কর্মীবাহিনী জীবন দিয়েছিল সরকারি বাহিনীর বুলেটে। অনেক মহৎ প্রতিষ্ঠান যথাসময়ে মহৎ কাজটি করতে পারে না। যারা এর মহৎ উদ্দেশ্যের কথা বলেন তাদের জানা উচিত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সে রকম একটি প্রতিষ্ঠান।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতার অভাব নেই শিক্ষার্থীদের জন্য। তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব কর্তন করে সকল শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা ও সময় মতো কোর্স এবং পরীক্ষা সমাপ্ত করার প্রয়োজনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। মন্ত্রণালয়কে সেই চিঠির গুরুত্ব বুঝতে হবে এবং সে অনুয়ায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এভাবে পিছিয়ে পড়লে শিক্ষার্থীরা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়মুখী হবে। প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলোও যে সব মানসম্পন্ন তা নয়। তাহলে শিক্ষার্থীরা যাবে কোথায়? জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক দায়িত্বে অবহেলা করে অনৈতিকভাবে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করছেন। এতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রত্যেক মানুষকে সৃষ্টিকর্তা বিবেক দিয়ে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। শিক্ষিত এই মানুষগুলো বিবেক কাজে লাগিয়ে জাতিকে আলোর পথ দেখাবেন ও আলোর পথে পরিচালিত করবেন এটা প্রত্যাশা।

শিক্ষার মাধ্যমে আমাদের প্রজন্মকে মানব সম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আমাদের একমাত্র সম্পদ জনসম্পদ। জনসম্পদকে সুশিক্ষা ও নৈতিকতাসম্পন্ন শিক্ষিত জনগোষ্ঠী হিসেবে তৈরি করে জাতির ভবিষ্যত গড়ে তুলতে হবে। নৈতিকতাহীন ও পরীক্ষা পাসের শিক্ষা দেশবাসীর জন্য অভিশাপ ছাড়া কিছু নয়। শিক্ষার্থীদের মূল বই পাঠ ও পাঠাগারমুখী করতে হবে। গাইড, নোটবই, কোচিং ব্যবস্থা থেকে মুক্ত করতে হবে শিক্ষার্থীদের। টকশোতে শিক্ষা সচিব বলেছেন, গাইড, নোটবই পড়লে ক্ষতি কী? শিক্ষা সচিবের কথা অনুযায়ী গাইড, নোটবই পড়লে দোষ হবে না ঠিকই কিন্তু এতে পরীক্ষায় পাস করা যাবে কিন্তু বিদ্যা অর্জন হবে না- এই সহজ সত্য যত দ্রুত উপলব্ধি করা যাবে তত মঙ্গল।

গত ১ জুন ‘দেনিক ইত্তেফাক’-এ মতামত লিখে ইকবাল হুসাইন নামক এক অধ্যাপক জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতারা গোলটেবিল আলোচনা, টিভি টকশো থেকে শুরু করে নানাভাবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন। এক সময় দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি করতেন দেশের বিত্তবানেরা নিজেদের অর্থে নিজেদের জায়গায়। এর মূল লক্ষ্য ছিল শিক্ষার বিস্তার, অর্থ উপার্জন নয়। যে কোনো ধর্মের ও বর্ণের, গরিব-আমির সকলের জন্য সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দরজা উন্মুক্ত ছিল। আজ এমনটা চোখে পড়ে না। জগোবাবুর পাঠশালা আজ মহীরুহ হয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে। এটি এক হিন্দু ভদ্রলোকের অবদান। অথচ সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে দান করা জায়গা এক শ্রেণির প্রভাবশালীরা ভোগ দখলের চেষ্টায় লিপ্ত। এতেই মানসিকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

২০১৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় গড়ে ৮ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছিল। এটা কখনও কাম্য হতে পারে না। আজকে আমরা অবাক হয়ে দেখি, এ প্লাস পাওয়া অনেক শিক্ষার্থী শুদ্ধভাবে দরখাস্ত লিখতে পারে না। এটা মেনে নেয়া যায় না। সুশিক্ষায় গড়ে ওঠে ভবিষ্যত প্রজন্ম। এই প্রজন্ম গড়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে কী শিখছে আমাদের সন্তানেরা? শিক্ষার মূল লক্ষ্য যখন হয় অর্থ উপার্জন তখন তো মেধাহীনদের দৌরাত্ম বাড়বেই। শিক্ষাব্যবস্থায়ও যখন দুর্নীতি বাসা বাঁধে তখন সেখানে ধস নামতে বাধ্য। যে কারণে শিক্ষা এখন নিম্নগামী। ফলে সবার অজান্তে গড়ে উঠছে অনৈতিক আধাশিক্ষিত এক প্রজন্ম। এখন সময় এসেছে শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর। শুরুটা করতে হবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে।


লেখক : প্রতিষ্ঠাতা, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল


নিউজ পেজ২৪/ইএইচএম