সাক্ষাৎকার

জুন ২৪, ২০১৫, ২:৩৫ অপরাহ্ন

'বাঙালি জাতীয়তাবাদের এখন আর দেওয়ার কিছু নেই'

নিউজ পেজ ডেস্ক

৮০ বছরে পা দিলেন বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। ভাষা আন্দোলনের মিছিলে যেমন ছিলেন, আজও তেমনি জাতীয় স্বার্থ রক্ষার লড়াইয়ে আছেন। তের বছর ধরে নতুন দিগন্ত পত্রিকা সম্পাদনা করছেন। প্রবাদপ্রতীম এই ব্যক্তিত্বের জন্মদিনে সাক্ষাতকার নিয়েছে আলোকিত বাংলাদেশ

প্রশ্ন : আশিতম জন্মদিনের শুভেচ্ছা। আপনার লেখা থেকে জেনেছি, সেইন্ট গ্রেগরিজ-এ যখন পড়ছেন তখনই প্রথমবারের মতো একা-একা মিছিলে চলে গেছিলেন। পরে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি আজিমপুর কলোনি থেকে বন্ধুরা মিলে গেছিলেন একুশে ফেব্রুয়ারির মিছিলে। অর্থাৎ রাজনৈতিক দল বা মতাদর্শের ঠেলায় এই মিছিলগুলো করেননি। তাহলে মিছিলে যাওয়ার মতো একটা রাজনৈতিক কর্তব্যের তাগিদ কোত্থেকে আসত? এই মিছিলটাই যে সঠিক মিছিল সেই বোধটা আসছে কীভাবে?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : আমাদের সময়ে আমরা খুব রাজনীতি-সচেতন ছিলাম, স্কুল-কলেজের সময় থেকেই। ব্রিটিশ ভারতে আমাদের জন্ম, ব্রিটিশ-বিরোধী লড়াই, পাকিস্তান আন্দোলন দেখে বড় হচ্ছি। ফলে, বেড়ে ওঠার মধ্যেই একটা রাজনীতি সচেতনতা ছিল।

প্রশ্ন : এই চেতনাটা কি পারিবারিক আবহ না স্কুল থেকে আসত? অথবা পাবলিক স্পেসের মধ্যেই ছিল ব্যপারটা?

সিরাজুল : সবখানেই। নতুন যে মুসলমান মধ্যবিত্ত গড়ে উঠছে, যারা শহরে থাকে, অফিসে করে, তাদের মধ্যে রাজনীতি নিয়ে খুব সচেতনতা ছিল। দেশভাগের ব্যাপারটাই ছিল একটা বড় ধাক্কা। এরপর প্রথম বড় আঘাতটা আসে ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ রেসকোর্সের মাঠে জিন্নাহ সাহেবের বক্তৃতা থেকে। সেখানে সবার সাথে আমিও গেছি। ক্লাস নাইনে পড়ি। সেদিন তার বক্তৃতা শুনে সবাই যেন একটা হতাশা নিয়ে বেরিয়ে এল। সেই সঙ্গে দেখ, পোস্টঅফিসের নানারকম ফর্মে : মানি-অর্ডার ফর্ম, ডাকটিকেট, এমনকি টাকা- এগুলোর কোথাও বাংলা থাকছে না; ইংরেজি আর উর্দু থাকছে। এগুলো খুব ধাক্কা দিয়েছিল। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ভেতর দিয়ে যে পাকিস্তান হল সেখানে যে বাঙালি মধ্যবিত্তের আকাক্সক্ষা পূরণ হবে না সেটা পরিষ্কার হয়ে গেল।

পাশাপাশি আরেকটা আন্দোলন তো চলছিল- কমিউনিস্ট পার্টির তৎপরতা। রাজশাহীতে দেখতাম কমিউনিস্ট পার্টির অফিস, কলকাতায় ট্রামলাইনে ধর্মঘট। আমাদের স্কুলেও তাদের ইশতেহার পেতাম। এগুলো আমাদের কৌতূহল সৃষ্টি করেছিল। কমিউনিস্টদের ওপর সরকারি দমন-পীড়ন চলত। ভিক্টোরিয়া পার্কে কমিউনিস্টদের একটা সভা হচ্ছিল। দেখলাম মুসলিম লীগের সমর্থকরা সেটা ভেঙে দিল। এটা উনপঞ্চাশ সালের কথা।

এরমধ্যে ভাষা আন্দোলন শুরু হলো। আমরা কিন্তু ইংরেজিতে অভ্যস্ত হয়ে এসেছি। এখন আবার উর্দু হয়ে যাবে রাষ্ট্রভাষা। তাহলে স্বাধীনতার মানে কী হলো? আমরা ইংরেজিটাকেই গ্রহণ করতে চাই নাই। এখন আবার তার জায়গায় উর্দু চলে আসছে। উর্দুঅলারা এখন সুযোগ-সুবিধা পাবে, আমরা পাবো না। এই সূত্রেই পাকিস্তানী জাতীয়তাবাদের বিপরীতে বাঙালি জাতীয়তাবাদের যাত্রা শুরু হলো। আমরা জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে ওর মধ্যেই আছি। ফলে, নানাভাবে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হচ্ছিল।

প্রশ্ন : স্যার, আপনার কিশোর মনের কাছে একটা প্রশ্ন রাখতে চাই। তখনকার সময়ে একদিকে কমিউনিস্ট-মতাদর্শ আপনাদের প্রভাবিত করছিল, অন্যদিকে নতুন একটা বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্ফূরণ হচ্ছিল, যার পেছনে ছিল বাংলা ভাষার প্রতি ভালবাসা এবং এই ভাষার সাথে যুক্ত মধ্যবিত্তের শ্রেণী অ্যাসপিরেশন। এই দুটো স্পিরিটকে কীভাবে মেলাইতেন আপনারা?

সিরাজুল : না, এই দুটোর মধ্যে কোনো বিরোধ আমরা দেখতাম না। পাকিস্তান রাষ্ট্র যে আমাদের জাতীয়তাবাদী আকাক্সক্ষা পূরণ করবে না সেটা জিন্নাহ সাহেবের ওই বক্তৃতা থেকেই পরিষ্কার। আবার, আমাদের যে বিকশিত হওয়ার আকাক্সক্ষা কমিউনিস্টরা তো সেটাকেই সমর্থন করছে। ফলে, দুটো বিষয় এক হয়ে গেছিল। ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যাবে, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে কিন্তু বামপন্থী ছেলেরাই প্রধান ভূমিকা পালন করেছে।

প্রশ্ন : কমিউনিস্টরা কেন বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠা কিংবা মধ্যবিত্তের অ্যাসপিরেশনের লড়াইটাকেই তখন সবচে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছিল?

সিরাজুল : কমিউনিস্ট পার্টি কিন্তু মধ্যবিত্তেরই পার্টি আসলে। কমিউনিস্ট পার্টির এখানে প্রধান দুর্বলতা হলো, তারা কৃষকের কাছে যেতে পারে নাই। এই জন্য দেশে বিপ্লব হয়নি। শ্রমিক এবং কৃষক এই দুইয়ের মধ্যে কেবল শহরকেন্দ্রিক শ্রমিকের ওপর নির্ভর করেছে। কিন্তু শ্রমিক তো তেমন নাই। কাজেই মধ্যবিত্ত তরুণদের মধ্যেই কমিউনিস্ট পার্টির মূল তৎপরতা ছিল। পাকিস্তান হওয়ার পরে কমিউনিস্ট পার্টির জন্য দুটো বিষয় খুব তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। একটা হলো, অনেক নেতা-কর্মী দেশ ছেড়ে চলে গেল। দ্বিতীয় হচ্ছে, পাকিস্তান রাষ্ট্রও কমিউনিস্টদের খুব অত্যাচার করতে শুরু করল। সবাইকে ধরে ধরে জেলে দিচ্ছে। যেমন সরদার ফজলুল করিম। উনি তো রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন দেখতেই পারেন নাই। কারণ উনি তখন জেলে। তাকে জেলে নেওয়া হয়েছে ১৯৪৯ সালে। ছাড়া পেলেন ১৯৫৬ সালে। ফলে, কমিউনিস্ট পার্টি কিন্তু রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের কারণেই রাষ্ট্রের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেছিল। রাষ্ট্র কিন্তু কংগ্রেসের ওপর ঝাপায় নাই।

প্রশ্ন : বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রসঙ্গে একটু আসি। যখন রাষ্ট্রভাষার দাবিতে আন্দোলন হচ্ছে, তখন ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগানের ভিড়ে কেউ কেউ এরম শ্লোগানও তুলত যে, ‘বাংলা ভাষার রাষ্ট্র চাই’। ফলে, নতুন যে রাষ্ট্রটি তৈরি হবে সেটা যে একান্তভাবে বাঙালিদের হবে, এবং নিরঙ্কুশভাবে বাঙালির দাপট স্বাধীন বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা হবে, এই পরিণতির বীজ কি সেই বায়ান্নোতেই রোপিত হয়ে গেছিল?

সিরাজুল : হ্যাঁ, সেটাই তো হয়েছিল। দেখতে হবে, জাতীয়তাবাদের ভিত্তিটা কী ছিল? পাকিস্তানি জাতীয়তার ভিত্তি ছিল ধর্ম। বাঙালিরা যে পাকিস্তান চেয়েছে সেটা ধর্মরাষ্ট্র হবে এমন কিন্তু তারা চায়নি। তারা একটা রাষ্ট্র চেয়েছে যেখানে তারা মুক্ত হতে পারবে। তারা অর্থনৈতিক স্বাধীনতা চেয়েছে। জমিদার হিন্দু, মহাজন হিন্দু, চাকরি-বাকরিতে হিন্দু, ব্যবসা-বাণিজ্যে হিন্দু- ওদের হাত থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য পাকিস্তান দরকার। সেই অর্থনৈতিক মুক্তি তো পাকিস্তান দিচ্ছে না। চাকরি-বাকরিতে অবাঙালিরা চলে এসেছে। উচ্চপদে বাঙালি মুসলমানদের কেউ নেই। ফলে একটি বাঙালি জাতীয়তাবাদী আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছিল। সেই আকাক্সক্ষাটাই পরে ধীরে ধীরে বাংলাদেশের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। যাত্রা শুরু ওই ’৪৮ সাল থেকে।

প্রশ্ন : আমি ঠিক যাত্রা শুরুর কথা বলি নাই। ওইটা নিয়ে আসলে তর্কও নাই। আমার প্রশ্নটা ছিল, বাংলাদেশ রাষ্ট্র এখন অবাঙালিদের জন্য একটি নিপীড়নযন্ত্র হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে।

সিরাজুল : নিপীড়ন জিনিসটা আসলে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র এই দিক থেকে দেখতে হবে। এটা একটা ভুল কনসেপ্ট তৈরি হয়েছে যে, বাংলাদেশ একটা জাতিরাষ্ট্র। বাংলাদেশ কোনো জাতিরাষ্ট্র নয়। আজকের পৃথিবীতে জাতিরাষ্ট্র বলে কোনো রাষ্ট্র নেই। এখানে একটা জাতি প্রধান আছে বটে, কিন্তু অন্য জাতিগোষ্ঠীও আছে। রাষ্ট্র এবং জাতি এক না। একটা রাষ্ট্রে একাধিক জাতি থাকতে পারে। রাষ্ট্র হচ্ছে একটা রাজনৈতিক প্রপঞ্চ, আর জাতি হচ্ছে নৃতাত্ত্বিক বর্গ। বাংলাদেশকে আমরা জাতিরাষ্ট্র বলবো না। এখানে বাঙালি ছাড়াও নানা জাতিগোষ্ঠীর মানুষ থাকে। আধুনিক বিশ্বে এখন এটাই সত্যি। আমেরিকানরা একসময় বলত এখানে সবাই আমেরিকান। এখন তাদের মানতে হচ্ছে যে, সকলেই অ্যামেরিকান না, নানা জাতি আছে তার মধ্যে। অ্যাংলো-স্যাক্সন ছাড়াও তো ওখানে স্প্যানিশ আছে, পর্তুগিজ আছে, বাঙালি আছে। তাই, জাতিরাষ্ট্র নয়, আমরা চেয়েছি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এটা জাতিরাষ্ট্র হওয়ার কথা ছিল না, যদিও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে।

প্রশ্ন : বাংলাদেশ পুঁজিবাদী রাষ্ট্র তাতে সন্দেহ নেই। আমি বলতে চাচ্ছিলাম, এই রাষ্ট্রের একটা ‘মুসলিম’ চরিত্র আছে, এবং একটা ‘বাঙালি’ চরিত্র আছে। পুঁজিবাদী চরিত্র এই রাষ্ট্রের আছে, এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে পুঁজিবাদ যেভাবে কাজ করে সেটা বাংলাদেশ রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হবে তার অনেকখানি নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু, একই সঙ্গে, রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারণের ক্ষেত্রে এটা যে একটা মুসলিম রাষ্ট্র...

সিরাজুল : না, মুসলিম রাষ্ট্র আমরা বলি না তো...

প্রশ্ন : এই অর্থে মুসলিম রাষ্ট্র যে এই রাষ্ট্রের একটা মুসলিম ক্যারেক্টার আছে। রাষ্ট্র যখন হিন্দুকে ট্রিট করে তার মধ্যে এই ব্যাপারটা থাকে...

সিরাজুল : এই ক্যারেক্টারটা দেওয়া হয়েছে। আমরা যখন ’৭১ সালে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলাম সেটা তো একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। ধর্মনিরপেক্ষ হবে যে রাষ্ট্রটা।

প্রশ্ন : সেরম একটা রাষ্ট্র হয়ত হতে পারত, কিন্তু আমরা এখন যে রাষ্ট্রটা পাচ্ছি...

সিরাজুল : সেটা হয় নাই, কারণ পুঁজিবাদের চরিত্রই হচ্ছে বৈষম্যমূলক, এবং সেখানে যাদের ক্ষমতা আছে তারা অন্যদের কন্ট্রোল করবে। এখানে মুসলমানদের হাতে ক্ষমতা বেশি, তারা সংখ্যায় বেশি বলে। কাজেই তারা হিন্দুদের মাইনরিটি বলে ট্রিট করে, তাদের সম্পত্তি দখল করার চেষ্টা করে। আসলে রুলিং ক্লাসটাই কন্ট্রোল করছে সব কিছু। ইকনমিক টার্মস ছাড়া এটাকে ব্যাখ্যা করা যাবে না। নৃতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়ে এর সুবিধা হবে না।

প্রশ্ন : সেটা একটা লম্বা তর্কের বিষয়। মার্ক্সিস্ট যারা তারা মনে করবেন যে মূলত ইকনমিক টার্মসেই এটাকে ব্যাখ্যা করতে হবে। কিন্তু মার্ক্সিজমের যারা ক্রিটিক করে তারা অন্য কতগুলো বৈশিষ্ট্যের ওপর গুরুত্ব দেবেন...

সিরাজুল : অন্যান্য বৈশিষ্ট্যগুলো আছে, কিন্তু সেগুলোকে আমরা কেন খামাখা প্রাধান্য দেব?

প্রশ্ন : একটু পেছনে ফিরি। পূর্ববঙ্গে সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনে একটা বাঁকবদল আছে। তরুণ বয়সে আপনাদের পছন্দ ছিল মানিক-জীবনানন্দ-সুধীন-বুদ্ধদেবরা। অথচ ওই সময়েই পূর্ব পাকিস্তানে একটা ভিন্ন সংস্কৃতি জারি ছিল, যেটা কতগুলো সংবাদপত্রের নাম থেকেই বোঝা যাবে- আজাদ, ইনসাফ, মাহে নও, মোহাম্মদী। এই যে একটা ভিন্ন ধারা, যেটি মূলত পাকিস্তান আন্দোলনের লিগ্যাসি ধরেই বাহিত হচ্ছিল, এটা কোনোভাবেই আপনাদের ওপর আছর ফেলতে পারে নাই। একটা নতুন এসথেটিকস নিয়ে আপনারা আবির্ভূত হচ্ছেন। এটা কীভাবে সম্ভব হলো?

সিরাজুল : পত্রিকাগুলোর নাম থেকেই বোঝা যায় সেটা ছিল মুসলিম ধারা। এই নামগুলো আধুনকি না, সামন্তবাদী গন্ধ আছে এর মধ্যে। এটা পুরাতন এবং আগের জামানার। কিন্তু নতুন শিক্ষিত হচ্ছে যে তরুণ সে নিজেকে আধুনিক মনে করছে। আধুনিক তরুণ-তরুণী তো ওই নামে সন্তুষ্ট হবে না। আমরা যখন পত্রিকা বার করছি তখন নাম দিচ্ছি আগামী, দেয়াল পত্রিকা করছি নাম দিচ্ছি ঝামেলা। রক্ষণশীল ধারাটাও একই সাথে চলছে। ফররুখ আহমেদ, মোফাখখর হোসেনরা ওই ধারায় কবিতা লেখেন। তারা ওই ধারাটা পাকিস্তান আমল থেকে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু ওই ধারা তো আর চলবে না। আধুনিকতা আসছে, ইউরোপের প্রভাব পড়ছে, তারা এখন তো ওই ধর্মীয় বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসবে। সেই সাথে বাঙালি জাতীয়তাবাদ তো আছেই। একদিকে আধুনিকতা, আরেকদিকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ; দুটো মিলে যাচ্ছে। মিলে যাওয়ার ফলে একটা উদারনৈতিক চিন্তা চলে আসছে। এখন আর মোহাম্মদী আর মাহে নও তো আমাদের সন্তুষ্ট করবে না।

প্রশ্ন : আগের প্রজন্মের সাথে আপনাদের হিসটোরিক্যাল লিংকটা বুঝতে চাই। আপনারা বাঙালি মুসলমান সমাজের একটা নতুন প্রজন্ম। যে প্রজন্ম আধুনিকতাকে গ্রহণ করছে এবং পুরনো রক্ষণশীলতাকে পরিত্যাগ করছে। কোনো পূর্বসূরী প্রজন্মের সাথে আপনাদের হিসটোরিক্যালি লিংক করা যায়?

সিরাজুল : ধারা দুটোই ছিল। আমাদের সাহিত্য রুচি তো গড়ে উঠছে বাংলা সাহিত্য থেকে। আমরা বঙ্কিম-শরৎ-মধূসূদন পড়ে বড় হচ্ছি, বাঙালির যে ঐতিহ্য সেটা তো আমরা ধারণ করছি। বাঙালির ঐতিহ্যের সাথে পাকিস্তান আন্দোলন পর্বে একটি নতুন বিষয় যুক্ত হলো : মুসলমানত্ব। পাকিস্তান তো এই মুসলমানত্বেরই প্রতীক। এই ইতিহাসটা খুব কৌতূহলউদ্দীপক। মীর মশাররফ হোসেন যখন সাহিত্যচর্চা করেন তার মধ্যে কিন্তু এই মুসলমানত্ব নাই। সাম্প্রদায়িকতাটা তৈরি করছে হিন্দু মধ্যবিত্ত। মূল অপরাধী হচ্ছে ব্রিটিশ, তারা উস্কানি দিয়েছে। মুসলমান মধ্যবিত্তের চেয়ে অন্তত পঞ্চাশ বছর এগিয়ে থাকা হিন্দু মধ্যবিত্তের এটা পছন্দ হচ্ছে না যে মুসলমান সমাজ বিকশিত হচ্ছে। সংকটটা হচ্ছে এখানে যে, মুসলমানরা ইতিমধ্যে সংখ্যায় বেড়ে গেছে। ১৯৩৫ সালের পর থেকে বাংলা প্রদেশে যে মন্ত্রীসভাগুলো গঠিত হচ্ছে তার সবগুলোতেই নেতৃত্ব দিচ্ছে মুসলমানরা। এটার ফলে হিন্দু মধ্যবিত্তের বিক্ষোভ বাড়ছে। সাম্প্রদায়িকতা এভাবে তৈরি হচ্ছে। পানি এবং জল নিয়ে প্রচ- বিরোধ হচ্ছে। ব্রাহ্মণ্যবাদীত্ব ছিল, ছোঁয়াছুঁয়ির বাছবিচার ছিল। জসীমউদ্্দীনের মতো কবি, তাকে বন্ধুর বাড়িতে গেলে অন্য থালায় খেতে দেওয়া হত।

প্রশ্ন : মৃণাল সেনের কথা বলছেন বোধহয়?

সিরাজুল : হ্যাঁ, তুমি পড়েছ ওইটা? খাবার দিচ্ছে অন্য থালায়, সেই থালা ধুতে হচ্ছে। নজরুলকেও মেসে শৈলজানন্দ একইভাবে ট্রিট করেছেন। সাম্প্রদায়িকতার জন্য তাই মুসলমানের চাইতে হিন্দুর দায় বেশি। সেজন্যই পাকিস্তান হয়েছে। নইলে তো পাকিস্তান হওয়ার কথা ছিল না।

প্রশ্ন : স্যার, আপনাদের এই যে আধুনিকতা, এর সাথে কি শিখাগোষ্ঠীর লেখালেখি বা রুচির সাথে কোনোভাবে মেলাতে পারতেন?

সিরাজুল : না, শিখাগোষ্ঠীর অসুবিধাটা ছিল, তারা নাম দিচ্ছে মুসলিম সাহিত্য সংসদ। তার মানে মুসলমানত্ব তাদের মধ্যে আছে। তারা রাজনীতিকে গুরুত্ব দেন নাই। আমাদের জেনারেশন কিন্তু রাজনীতিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছে। নতুন প্রজন্ম হয় কমিউনিস্ট পার্টিতে যাচ্ছে, নাহয় মুসলিম লীগে যাচ্ছে।

প্রশ্ন : সেক্ষেত্রে কি বলতে হবে আপনারাই প্রথম প্রজন্ম যারা মুসলমানিত্বের বাইরে একটা নতুন পরিচয়, রুচি বা এসথেটিক্্স তৈরি করছিল?

সিরাজুল : আমাদের আগে যারা সাহিত্যচর্চা করেছেন তারা এটা করেছেন। যেমন, আহসান হাবীব এবং ফররুখ আহমদ এই দুজন দুই ধারায় কবিতার চর্চা করেছেন। আহসান হাবীব উদারনৈতিকতার ধারা, আর ফররুখ আহমদ মুসলমানিত্বের এবং পাকিস্তানি ধারা। অথবা ধরো, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ উপন্যাস লিখছেন, উনি তো উপন্যাসের মধ্যে ধর্ম যে পীড়নমূলক হবে সেটা দেখতে পাচ্ছেন। শামসুদ্দীন আবুল কালামের উপন্যাসে মুসলমান-হিন্দুর কোনো ব্যাপার থাকছে না। মোহাম্মদী-সওগাতের মধ্যেও দূরত্ব হচ্ছে। মোহাম্মদী রক্ষণশীল, সওগাত কিছুটা প্রগতিশীল।

প্রশ্ন : আরেকটা বইয়ের প্রসঙ্গে আসি। উনিশ শতকের বাংলা গদ্যের সামাজিক ব্যাকরণ বইতে আপনি দেখিয়েছেন, তখন গদ্যে যেসব পরিবর্তন হচ্ছিল সেগুলো সরাসরি সামাজিক পরিবর্তনগুলোর সাথে যুক্ত। এখন আবার দেখতে পাচ্ছি, গত দশ-পনের বছর ধরে বাংলা গদ্য লেখার ক্ষেত্রে একটা পরিবর্তন হচ্ছে। তরুণদের লেখায় দেখতে পাচ্ছি। যারা মূলত সোশাল মিডিয়াতে লেখালেখি করছেন- লেখার জন্য যে মান বাংলা এতদিন আদর্শ ছিল সেই মান বাংলা এখন তারা পরিহার করছেন। একটা ভিন্ন রকম বাংলা তারা লেখেন। ফলে, বাংলা গদ্যে একটা পরিবর্তন হচ্ছে। এই পরিবর্তনটাকে কি সমাজ রূপান্তরের নিরিখে ব্যাখ্যা করা যায়?

সিরাজুল : হ্যাঁ, সমাজ পরিবর্তনের সাথে সম্পর্ক তো আছেই। এখনকার যে তরুণ সাহিত্যচর্চা করছে সে কেন করছে এটা? সে একটা নিজস্বতা দেখানোর চেষ্টা করছে। এটা বোধহয় উত্তরাধুনিকতা যাকে বলা হয় তার প্রভাব হতে পারে। এখন সব কিছু ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র হয়ে গেছে, বড় যে একটা ম্যাক্রো সংগ্রাম সেই সংগ্রামটা নাই। ম্যাক্রো সংগ্রাম হলে কিন্তু তোমাকে ওই উত্তরাধিকার বহন করতে হবে। একই ধারায় আগাতে হবে।

প্রশ্ন : উত্তরাধিকার তারা যে পরিহার করছেন এরম দাবি ঠিক তাদের চর্চার মধ্যে নাই। তারা যেটা করছে সেটা হচ্ছে ভাষার যে মান রূপটা ছিল সেটা নিয়ে নিরীক্ষা।

সিরাজুল : নিরীক্ষা করা তো ঠিকই আছে। একজন ব্যক্তিগতভাবে নিরীক্ষা করতেই পারেন।

প্রশ্ন : কিন্তু এটা এখন আর কতগুলো ব্যক্তির নিজস্বতা প্রকাশের ঝোঁকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাই। এখন ইয়াংদের মধ্যে যারাই লেখালেখি করছে তাদের প্রায় সবার মধ্যে এই ভাষার একটা প্রভাব পড়ছে।

সিরাজুল : তারা কি ঐক্যবদ্ধভাবে, সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে করছে? না ব্যক্তিগতভাবে করছে?

প্রশ্ন : সে কীভাবে করছে সেটা নিয়ে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ হতে পারে, কিন্তু আমরা যেটাকে ম্যাটার-অব-ফ্যাক্ট দেখছি সেটা হলো, প্রচুর ছেলেমেয়ে মান বাংলার বদলে এই ভাষাটাকে গ্রহণ করেছে।

সিরাজুল : আমি তো মান বাংলার পক্ষে। এখন একটা ছোট্ট ফুটনোট দেই, প্রমিত বাংলা বলে এক জিনিস চালু হয়েছে। এই প্রমিত বাংলা দিয়ে বানান সংস্কার করছে, দীর্ঘ ই-কারগুলো তুলে দিচ্ছে...

প্রশ্ন : বাংলা একাডেমি এই কাজটা করছে।

সিরাজুল : শ্রেণী, দাবী, গ্রন্থাবলীতে হ্রস্ব-ই-কার নিয়ে আসছে। তারা এটা খারাপ কাজ করছে। আমি মনে করি অত্যন্ত অপ্রয়োজনীয় এবং অপচয়মূলক। এক্কেবারে বেহুদা কাজ। মান বাংলা কিন্তু তারাও ভাঙছে। প্রমিত বলে যে উত্তরাধিকার আমরা বহন করে আসছিলাম সেটার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করছে। এই বিচ্ছেদটা তারা কেন করছে আমি জানি না। বাংলা ভাষার ওপর অনেক অত্যাচার হয়েছে, নিরীক্ষণ হয়েছে। তরুণরাও নানাভাবে ভাষা নিয়ে নিরীক্ষা করে। কেউ গ্রাম্যভাষা ব্যবহার করে, কেউ অতি-আধুনিক ভাষা ব্যবহার করে। এগুলো আমি মনে করি, সমাজে যে বিশৃঙ্খলা চলছে, নৈরাজ্য চলছে, তার প্রতিফলন। যেমন করে আমাদের নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, সেখানে যেমন ¯্রােত নাই, সাহিত্যের মধ্যে তারই প্রতিফলন ঘটছে। ছোট-খাটো চমক দেওয়ার চেষ্টা, এখানে ডোবা, ওখানে পুকুর- এরকম বিক্ষিপ্ত ভাবে হচ্ছে। সেটা করুক। কিন্তু আমি মনে করি, মান ভাষাকে রক্ষা করতে হবে। আমি ওই বইতে দেখানোর চেষ্টা করেছি, ভাষার মধ্যে পরিবর্তনগুলো আসছে, কিন্তু বিচ্ছেদ হয় নাই। সাহিত্যে বিষয়বস্তু হলো বড় কথা। বিষয়বস্তুর প্রয়োজনে ভাষা বদলাবে, বিষয়বস্তু যখন বড় হয়ে যাবে পুরনো ভাষায় তো কুলাবে না। দেখতে হবে বিষয়বস্তু মহৎ বা উদ্দীপক কিনা। বিষয়বস্তুর মূল্য, রবীন্দ্রনাথ যাকে বলেছেন সত্যমূল্য, সেই মূল্য কতটা? সেটার নিরিখে তো ভাষা বদলাবেই। সাহিত্যে জোর দিতে হবে বিষয়বস্তুর ওপর।

প্রশ্ন : আপনি বোধহয় বলতে চাচ্ছেন বিষয়বস্তু এবং ভাষা আসলে মূলগতভাবে আলাদা?

সিরাজুল : না, আলাদা না। বিষয়বস্তু এবং ভাষা এক। আমি প্রাধান্য দেব বিষয়বস্তুকে। ভাষা যে একটা পোশাক সেটা বলছি না। ভাষাও আমার চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে। আমি ভাষা দিয়েই চিন্তা করি। ভাষা এবং বক্তব্যকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। কিন্তু বক্তব্যটাই প্রধান হওয়া উচিৎ। বক্তব্যের প্রয়োজনে আমার ভাষা বদলাবে, অন্যরূপ নেবে। নতুন শব্দ প্রয়োজন হবে, বাক্যরীতি প্রয়োজন হবে। শেকসপিয়র যখন এলেন, ইংরেজি সাহিত্যের ভাষা একেবারে আগাগোড়া বদলে গেল। তার কাব্য, তার নাটকের বিষয়বস্তুই বদলে দিল ভাষা। কিন্তু বিষয়বস্তুর দিকে আমরা জোর দিচ্ছি না। বানান সংস্কার করছি। আরেকটা ছোট জিনিস, ধরো খবরের কাগজে একজন দুর্বৃত্তের সম্পর্কে লিখতে গিয়েও আমরা ‘করেছেন’ লিখছি। এই বাড়তি দন্ত-ন’টা তো বাদ হওয়ার কথা ছিল। ‘তিনি বলেন’, ‘তার সাক্ষ্যতে জানান’- এভাবে লেখা হচ্ছে। ভাষার পরিবর্তন আনতে হবে তো এসব জায়গায়।

প্রশ্ন : এর অবশ্য একটা কারণ আছে। সংবাদের মধ্যে একটা দাবি আছে একে নিরপেক্ষ বা বস্তুনিষ্ঠ হতে হবে। ফলে, আমার নিজস্ব নৈতিকতার প্রভাব থেকে সংবাদকে দূরে রাখতে হবে। আমরা যখন অপরাধীকে যিনি নিরপরাধ তার থেকে আলাদাভাবে ট্রিট করি আমাদের ভাষা দিয়ে, তখন আসলে ভাষার ওপর আমরা নৈতিকতা আরোপ করি। সেটা যখন সংবাদের ভেতরে করি তখন সংবাদ নৈতিকতাদুষ্ট হয়ে পড়ে।

সিরাজুল : সংবাদে তুমি তো নৈতিকতা আরোপ করতে পারো, কারণ সে তো খারাপ লোক।

প্রশ্ন : কিন্তু নৈতিকতা আরোপ করা যাবে না এরম একটা দাবি সংবাদের ধারণার মধ্যে আছে।

সিরাজুল : তুমি তো নৈতিকতা আরোপ করছো না, তার পরিচয় উন্মোচন করছো। যে দুর্বৃত্ত, ভীষণ দুর্বৃত্ত, তাকে আমি ওই মর্যাদা দেব না। যাই হোক, এগুলো হচ্ছে আমার কাছে সমস্যাজনক।

প্রশ্ন: অন্য প্রসঙ্গে যাই। আপনি নিজে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, সাম্প্রদায়িকতা এসব নিয়ে বিস্তর লেখালেখি করেছেন। এখনকার বাংলাদেশে দেখতে পাচ্ছি পলিটিক্যাল আর্টিকুলেশনের ক্ষেত্রে আইডেনটিটি দিন-দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ, বা বাঙালি মুসলিম জাতীয়তাবাদ- সোজা কথায় তার যে রাজনৈতিক ভোকাবুলারি সেটা অনেক বেশি ডমিনেটেড হচ্ছে আইডেনটিটি পলিটিক্স দিয়ে। ২০১৩ সালের গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন এবং তার অ্যান্টি-থিসিস হিসাবে হেফাজতে ইসলামের উত্থানের মধ্যে আইডেনটিটি পলিটিক্সের রবরবা’র একটা চেহারা পাওয়া যাবে। ফলে, আত্মপরিচয় রাজনীতির মাঠে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। আত্মপরিচয়ের রাজনীতিকে কীভাবে দেখেন আপনি?

সিরাজুল : শাহবাগ আন্দোলন পর্বে আত্মপরিচয়ের রাজনীতির চেয়ে আমার কাছে বড় দিক মনে হয়েছে শ্রেণী পরিচয়। শ্রেণী-বিভাজনটাই সেখানে ছিল প্রধান ইস্যু। হেফাজতের সঙ্গে গণজাগরণের যে দূরত্ব সেটা আসলে শ্রেণীদূরত্ব। গ্রামে মাদ্রাসাগুলোতে যারা পড়ছে তারা দরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত। আমরা এখানে যারা পড়ছি তারা সুবিধাপ্রাপ্ত। এখানে দূরত্ব আছে। গণজাগরণ মঞ্চে তুমি কিন্তু শ্রমজীবীকে টানতে পারছ না। যে রিকশাঅলা তোমাকে ওখানে পৌছে দিয়ে যায় সে কিন্তু মঞ্চে যাচ্ছে না। রাস্তায় যেসব শ্রমিকরা আছে তারাও কিন্তু আসছে না। এমনকি তোমরা ভদ্রলোকরা যে সভা করছে সে তার বিরুদ্ধেও দাঁড়িয়ে যেতে পারে। যে ওটা বড়লোকদের ব্যাপার, নাচানাচি করতেছে, গান বাজনা করতেছে। শ্রেণীর সমস্যাটাই হচ্ছে প্রধান সমস্যা। শ্রেণীর দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখলে এগুলো ব্যাখ্যা করা যাবে না।

প্রশ্ন: শ্রেণীটাকেই যদি প্রধান সমস্যা হিসেবে আমরা দেখি সেক্ষেত্রে বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে কতগুলো নতুন প্রশ্ন তোলার দরকার হয়ে পড়বে।

সিরাজুল : বাঙালি জাতীয়তাবাদের পর্যায় শেষ হয়ে গেছে। আমি এবিষয়ে বই লিখেছি, যার চতুর্থ সংস্করণ চলছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রয়োজন ছিল ১৯৭১ সালে। জাতীয়তাবাদের মাধ্যমে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করল এবং একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হল। কিন্তু এর পরে তো আমরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র চাই। জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র চাই না। জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র এখন দাঁড়িয়েছে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র, এই রাষ্ট্র তো চাই না। একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র চাই যেখানে বাঙালি-অবাঙালি সকলের সমান অধিকার থাকবে। বৈষম্যই হচ্ছে প্রধান শত্রু।

প্রশ্ন : অর্থাৎ আপনি বলছেন, বাঙালি জাতীয়তাবাদ এখন আর প্রয়োজনীয় না?

সিরাজুল : বাঙালি জাতীয়তাবাদ আছে, কিন্তু তার এখন আর দেওয়ার কিছু নাই। আমার রাষ্ট্রের প্রধান সমস্যা কী? একটা হলো নদীর সমস্যা। আমাদের চুয়ান্নোটি অভিন্ন নদীর প্রবাহ যে শুকিয়ে আসছে সেটা নিয়ে কি জাতীয়তাবাদীরা কথা বলছে? হিন্দির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কি তারা কথা বলছে? নরেন্দ্র মোদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হিন্দিতে বক্তৃতা দিয়ে গেলেন। পাকিস্তানের কেউ যদি উর্দুতে বক্তৃতা দিত আমরা মানতাম? অথচ মোদিকে আমরা হাততালি দিলাম। জাতীয়তাবাদের কথা বললে। জাতীয়তাবাদের প্রধান উপাদান তো ভাষা।

প্রশ্ন : আমাদের এখানে ভাষা। কিন্তু বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন চেহারা নিতে পারে। ন্যাশনালিজমের আলোচনাতে একটা সময় মনে করে হত, কতগুলো গিভেন, এসেনশিয়াল বৈশিষ্ট্য জাতি বাঁধিয়ে তোলার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে। কিন্তু আশির দশকে বেনেডিক্ট অ্যানডারসনের যে বিখ্যাত বইটা বেরিয়েছে সেখানে স্ট্রংলি আরগিউ করা হয়েছে যে, নেশন শেষ পর্যন্ত একটা ইমাজিনড কমিউনিটি। কোনো এসেনশিয়াল বৈশিষ্ট্য যে থাকতেই হবে তার আবশ্যিকতা নাই। এখন আর ন্যাশনালিজমের আলোচনার ক্ষেত্রে কেউই এটা মনে করেন না যে...

সিরাজুল : উনি ওনার কথা বলেছেন। ন্যাশনালিজম তো সত্য। আজকে পৃথিবীতে ক্যাপিটালিজম কী চাচ্ছে? ন্যাশনাল আইডেনটিটিগুলো নিশ্চিহ্ন করে দেবে, সকলে ভোগবাদী হয়ে যাবে। এটা ন্যাশনালিজম না, এটা বিশ্বায়ন। সারা পৃথিবীতে বাঙালিরা একটা জাতি, ফরাসিরা একটা জাতি, ইংরেজরা একটা জাতি, আমেরিকানরা আরেকটা জাতি, অস্ট্রেলিয়ানরা একটা জাতি। এখানে প্রধান উপাদান হচ্ছে ভাষা। তার পরে জিওগ্রাফি, ইকনমি, রিলিজিওন নানারকম উপাদান আছে।

প্রশ্ন : আপনি দেশের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতে ভূমিকা পালন করেছেন। যেমন আড়িয়ল খাঁয় যখন কৃষকের জমি দখল করে বিমানবন্দর তৈরি করবে আপনি প্রতিবাদ করেছেন। তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ বন্দর-রক্ষার আন্দোলনে নেমেছেন। ওসমানী উদ্যান রক্ষা করেছেন আপনারাই। এরকম অনেক ঘটনার কথা বলা যাবে। এর নিরিখে জিজ্ঞেস করছি, এখন বাংলাদেশে যে পরিস্থিতি সেখানে বুদ্ধিজীবীর আসলে ভূমিকা কী বলে মনে করেন?

সিরাজুল : বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা তো এটাই যে সে মানুষের পক্ষে দাঁড়াবে। কিন্তু বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের এরকম হতাশাজনক অবস্থান আমি আগে কখনও দেখি নাই। সব বুদ্ধিজীবী দুই দলে বিভক্ত। একদল শত নাগরিক কমিটি বানাচ্ছে, আরেকদল সহস্র নাগরিক কমিটি বানাচ্ছে। মূল কাজ হচ্ছে, ক্ষমতার কাছে থাকা। জনগণের সমস্যাগুলো নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই। নদীগুলো মরে যাচ্ছে, বেকারত্বের সমস্যা, কাজ নেই সবাই ঘুরে বেড়াচ্ছে, জনসংখ্যার আধিক্য- এসব বিষয় নিয়ে কেউ বলছে?

প্রশ্ন : বাঙালি জাতীয়তাবাদী ভেটেরান বুদ্ধিজীবীদের তো শুধুমাত্র সেকুলারিজম, মৌলবাদ এবং সংখ্যালঘু নির্যাতনের বাইরে অন্য কোনো বিষয়ে আগ্রহী দেখা যায় না।

সিরাজুল : বাংলাদেশ এখন সস্তা শ্রম উৎপাদনের কারখানা। তারা গার্মেন্টসে কাজ করবে, গৃহভৃত্যের কাজ করবে, এবং এরা সমুদ্রের মধ্যে ঝাপিয়ে পড়বে, একদল চলে যাবে বিদেশে, রেমিট্যান্স পাঠাবে। সেই রেমিট্যান্স আমরা এখানে ভোগ করবো, বিদেশে পাঠাবো, সুইস ব্যাংকে আমাদের টাকা জমতে থাকবে। এই ভয়াবহ বিষয়গুলো নিয়ে তো বুদ্ধিজীবীরা কিছু বলছে না। তারা কেবল মৌলবাদ, জঙ্গীবাদ নিয়ে আছেন।

নিউজ পেজ২৪/আরএ.