সাক্ষাৎকার

জুন ৩০, ২০১৫, ৯:৩৫ অপরাহ্ন

’বিএনপি ভাঙবে ভেবে আহ্লাদের কিছু নেই’

নিউজ পেজ ডেস্ক

প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সভাপতি বদরুদ্দীন উমর বলেছেন, বিএনপি ভেঙে যাবে-এই ভাবনায় সরকারি মহলে খুব উৎসাহ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সরকারের নিজের মধ্যেই যে কতখানি শৃঙ্খলা আছে এবং সরকারি দলের মধ্যেও যে কত ভাগাভাগি-দলাদলি আছে, সেটা তাদের বিবেচনায় নেই। আমি তো মনে করি, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ভিতর থেকে আওয়ামী লীগ ভাঙারই আশঙ্কা আছে। সে ক্ষেত্রে সরকার যত বেশি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে, এই আশঙ্কা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে। কাজেই এই পরিস্থিতিতে ক্ষমতায় বসে থেকে আওয়ামী লীগের আহ্লাদে আটখানা হওয়ার কিছু নেই।

বাংলাদেশ প্রতিদিনের সঙ্গে রোববার দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বদরুদ্দীন উমর এই সমাজ বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। এই সমাজ গবেষক ও রাজনীতিবিদ মনে করেন, কোনো ব্যক্তি বা দল যদি সম্পূর্ণভাবে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে শুধু অস্ত্রের জোরে নিজেকে টিকিয়ে রাখার অবস্থায় যায়, দুর্নীতির কারণে যদি সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত শাসকেরা শাসন ক্ষেত্রে অকেজো হয়ে যায়। শাসকেরা এভাবে অকেজো হয়ে গেলে বাইরের কোনো শক্তিও তাকে টিকিয়ে রাখার প্রয়োজন বোধ করে না। বরং এমন পরিস্থিতিতে তাকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করতেও দ্বিধা করে না। ইতিহাসে এমন নজির ভূরি ভূরি।

দক্ষিণ ভিয়েতনামের মার্কিন মিত্র ডিয়েম, ইরানের রেজা শাহ পাহলভী ও ফিলিপাইনের মার্কোসের পরিণতি এক্ষেত্রে বিশ্বের সামনে রয়েছে। এক প্রশ্নের জাবাবে বদরুদ্দীন উমর বলেন, অস্থিরতা কোন জায়গায় নেই। পেশাজীবী থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সমাজের সর্বত্র অস্থিরতা বিরাজ করছে। মানুষ যখন প্রতিবাদ ও প্রতিকারের কোনো উপায় খুঁজে পায় না, তখন সমাজে অস্থিরতার প্রকাশ ঘটে। মানুষ এখন নিজের ক্ষোভটা প্রকাশ করতে পারছে না। প্রতিবাদ করতে পারছে না। একের পর এক সংকট তৈরি হচ্ছে, কিন্তু এর থেকে উত্তরণের কোনো উপায় দেখা যাচ্ছে না। এমন অবস্থায় মানুষ নিজেকে শৃঙ্খলবদ্ধ মনে করে। এ শৃঙ্খল ভাঙার উপায় নেই। মানুষের এই অসহায় অবস্থাটাই সমাজে অস্থিরতা তৈরির জন্য কাজ করে। প্রবীণ এই বামতাত্ত্বিক সমাজে বিরাজমান সামাজিক অস্থিরতাকে ’৭৫ পূর্ব অবস্থার সঙ্গে তুলনা করে বলেন, আজ দেশে যে মারাত্মক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তার একটি দৃষ্টান্ত হলো সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলা বা ভারতের বিরুদ্ধে কথা বলাকে দেশদ্রোহিতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভারতের বিরুদ্ধে কথা বলা মানে তো ভারতের জনগণের বিরুদ্ধে কথা বলা নয়। সরকারের নীতির সমালোচনা করে ভারতের জনগণ যদি শাসক শ্রেণিকে জনগণের শক্র ঘোষণা করতে পারে আমার বলতে বাধা কোথায়?


জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সভাপতি আরও বলেন, পত্রিকায় দেখলাম আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলছেন, ‘ভারতের বিরুদ্ধে যারা বলে বাংলাদেশে তাদের ঠাঁই নেই’। আমি জানতে চাই, কেন কথা বলা যাবে না? কোন আইনে, সংবিধানের কোন বিধি অনুয়ায়ী তিনি এই কথা বললেন? আজ রাজনীতির নামে এ ধরনের বাড়াবাড়ি চলছে অহরহ। সংসদে দাঁড়িয়ে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলে দিলেন, খালেদা জিয়া নির্বাচন করতে পারবে না। কেন পারবে না? এ ঘোষণা দেওয়ার আপনি কে? আসলে দেশে এমন একটা অবস্থার সৃষ্টি করা হয়েছে, সরকারের কোনো সমালোচনা, কোনো রকম বিরোধিতা তারা সহ্য করতে পারছে না। বদরুদ্দীন উমর বলেন, আওয়ামী লীগ ৫ জানুয়ারির নির্বাচন করে সরকার দখল করল। কিন্তু তারপরও তারা স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে গুটিকয়েক বিরোধী শিবিরের লোককেও সহ্য করতে পারছে না। কয়েকটি সিটি করপোরেশন ও পৌর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের হারিয়ে জনগণের ভোটে যারা নির্বাচিত হলো, আজ একে একে তাদের সবাইকে উৎখাত করা হচ্ছে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত বিরোধী মতের উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যানদেরও কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। কাউকে কোথাও সহ্য করা হচ্ছে না। কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে না। সর্বশেষ ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনের নামে যা হলো, এ তো জনগণের সঙ্গে প্রতারণা। এ কাজগুলো সরকার করছে নিজেদের ক্ষমতার স্থায়িত্বের জন্য। কিন্তু এভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকা যায় না। দুনিয়াতে কোনো রিজিম এভাবে বেশি দিন টিকে থাকতে পারেনি।

তাদের জন্যও সম্ভব হবে না। তবে কীভাবে তারা (সরকার) যাবে, জনগণ তাদের কীভাবে বিদায় করবে, সেটা আমরা বলতে পারি না। তবে এটা বলতে পারি, অবশ্যই তাদেরকে যেতে হবে। ক্ষমতা থেকে যাওয়ার জন্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানের যেসব শর্ত রয়েছে, দুর্নীতি, শোষণ, নির্যাতন, বৈষম্য ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নিজেদের বিদায় হওয়ার সেসব শর্তের উপযুক্ততা নিজেরাই তৈরি করছে।প্রবীণ এই বাম রাজনীতিক বলেন, আজ সম্পূর্ণ ফ্যাসিস্ট কায়দায় দেশ চলছে। নির্যাতন, নিপীড়ন, শোষণ, বঞ্চনার মধ্যে দিয়ে সমাজের মধ্যবিত্ত, নিু মধ্যবিত্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে যেতে হচ্ছে। প্রতিবাদ করার উপায় নেই। প্রতিকার পাওয়ার জায়গা নেই। আজ রিকশাওয়ালা, সবজিওয়ালা, ফেরিওয়ালা, বাস শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক থেকে শুরু করে এমন কোনো পেশা নেই, যেখানে অস্থিরতা নেই। যেহেতু পেশাজীবীরা আমাদের সমাজেরই অংশ, বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপের বাসিন্দা নয়, তাই সমাজের প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি অন্যায় তাকে নাড়া দিচ্ছে। কিন্তু সে কিছু করতে পারছে না।বলতে পারছে না। ফলে সমাজে অস্থিরতা বাড়ছে। বাড়তে বাড়তে এই অস্থিরতা এক সময় বিস্ফোরিত হবে। দেশে সে রকম রাজনৈতিক দল থাকলে তাদের মাধ্যমে এসব সামাজিক অন্যায় অবিচার শোষণ ও নিপীড়নের প্রতিবাদ হতে পারত। কিন্তু সেটা নেই। বাম রাজনীতিকরা এসবের প্রতিবাদ করতে পারতেন কিন্তু তারা সরকারের সঙ্গেই আছেন। যারা সরকারবিরোধী অবস্থানে আছেন, তাদের কার্যকর প্রতিবাদ করার সামাজিক শক্তি নেই। ডানপন্থিরা তো এখন নিজেদের টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে লিপ্ত। এমতাবস্থায় সমাজে বিরাজমান অস্থিরতার বহির্প্রকাশ আজকে ঘটছে না বলে কাল যে ঘটবে না-এ নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। কারণ মনে রাখতে হবে সামাজিক অস্থিরতাকে যখন সমাধান না করে দমন করা হয়, তখন এক সময়ে তা বিস্ফোরিত হয়। তখন তা রাজনৈতিক হতে বাধ্য হয়।