শিল্প সাহিত্য

জুলাই ৬, ২০১৫, ৬:২৩ অপরাহ্ন

মরা ক্ষেতের গল্প

আশরাফ উদ্দীন আহমদ

মরা ক্ষেতের কাছে আলোর বুকে পা রেখে মনটা কেমন মুষড়ে যায় জয়নাল মণ্ডলের। নিজের চোখকে শত্রু মনে হয় এখন। বিরান জমিন খাঁ-খাঁ করছে, কাঠফাটা গরমে শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়, জয়নাল মণ্ডলের বুক হাপড়ের মতো ওঠানামা করে। আগুন ঝরা রোদে পুড়ে-পুড়ে অঙ্গার হচ্ছে জগতের মাটি, বাতাসে বইছে যেন আগুনের ফুলকি।
জয়নাল মণ্ডলের মনে শান্তি নেই, পুড়ছে ক্ষেতের মাটি, পুড়ছে বুকের ভেতরের রক্ত, পুড়ছে তাবৎ শরীর। চোখের মধ্যে রাজ্যের হাহাকার, স্বপ্নগুলো কেমন পানসে হয়ে গেল, কোথায় গেল সেসব রাঙানো দিনগুলো, তীব্র দহনে মন-শরীর জ্বলে-পুড়ে যাচ্ছে, এমনভাবে ক’দিন আর যাবে ভেবে কুল কিনারা পায় না।
কী শুখা মাটি রে বাবা, কী শুখা...
জয়নাল মণ্ডলের কথা শুনে সাইকেল থামিয়ে নেমে পড়ে জমির মুন্সি। কালিগঞ্জের হাট থেকে মুরগি বিক্রি সেরে খালি ঝাঁকা নিয়ে বাড়ি ফিরছে জমির।
আর কী হবে মণ্ডল, মাটি পুড়ে অঙ্গার হয়ে ফসল ফলবে কিভাবে!
ফসল হায় রে ফসল, কৃষকের মাটি পুড়লে প্রাণ কি বেঁচে থাকে বাবা!
জমির মুন্সি আর থামে না, প্যাডেলে পা উচিয়ে সাইকেল চালিয়ে যায় গন্তব্যে।
জয়নাল মণ্ডল অনেক দূর অবধি তাকিয়ে থাকে অবাক চোখে, দুপুর পার হয়ে আসছে, ওপাশের খাড়ি জমিটুকুও পুড়ে ফেটে চৌচির, আকাল নেমে আসছে, মঙ্গার দেশে আর কোনো প্রাণ বাঁচবে না। বাড়ির চৌহদ্দিতে এসে গোয়ালের দিকে তাকিয়ে বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে, অবলা গরু দুটো না খেতে পেয়ে শুকিয়ে হাড্ডিসার হচ্ছে জমিনের মতো।
জয়নাল মণ্ডল ঘরের দাওয়ায় পা না রেখে চিৎকার করে বলে ওঠে, এভাবে পড়ে না মরে চলো আমরা শহরে যাই... কিন্তু হায় কষ্ট তার কথা মর্জিনা বা মেয়ে দুটো অথবা গরু দুটো কারো কানে পৌঁছে না অর্থাৎ মাটি ছেড়ে কেউই যাবে না। মাটির সাথে এ যেন জনম-জনমের দোস্তি, কেউ কাউকে ছাড়া বাঁচবে না। বুক ভেঙে গেলেও কেউ পরাজিত নয়, শুধুই তাকিয়ে থাকা আর পানির জন্য প্রার্থনা করা, শরীরের মধ্যে যে আগুন, চোখে আগুন, আগুন নিয়ে সারা দেশ পুড়ে-পুড়ে মরে, কিন্তু কে দেখে কাকে, দূরের আকাশটাকে মনে হয় চিতা, সেই চিতায় ভষ্ম হচ্ছে সে নিজেই।
দেশগ্রামের মানুষজন ছুটছে শহরমুখো, কেউ কেউ বলছে, ওই ফারাক্কার ফল এই পানির আকাল... সবুজ বৃক্ষসারি পুড়ে ঝলছে যাচ্ছে, ফুলের আগা কেমন পোড়া, জয়নাল মণ্ডল আকাশের দিকে তাকিয়ে পানি-পানি করে চিৎকার জুড়ে দেয়, বিশাল আকাশ নির্বাক, কার কথা সে শুনবে, মাটি ফাটা-ফাটা, যেন বা আগুনের আঁচে তামাটে রূপ পেয়েছে। এই মাটি কবে যে আবার কাদা-কাদা হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। জয়নাল মণ্ডল নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।
কাঁকনহাটের ফজল সেদিন হাটবারে জানালো, কী করব ভাই, শহরে গিয়ে দুটো কামাই করে আনি বলে, দুটো ভাত মুখে তুলে দিতে পারি বউ, ছেলেমেয়ের...
জয়নালের বুকে কথাটা খুব লেগেছিল।
বেঞ্চের ওপাশে বসা মালঞ্চির কুতুব বলে উঠল, পানি কি তাহলে ছাড়বে না ভারত, এ দিকে তো বৃষ্টিবাদলের নামগন্ধ নেই।
জয়নাল চেপে বসল খানিক, দেশের মানুষ মরছে ছাতি ফেটে ওদিকে ক্ষমতাবানরা দেখো দিব্বি বসে দেখছে রঙ্গ।
কুতুব বলল, তোমার-আমার কষ্ট দেখে কে, ওরা সব একই জাত শোষক...
জয়নাল বলে ওঠে, শাসক বা শোষক তো বুঝি না ভাই, কার কথায় যে কী হয়ে গেল, ফারাক্কা বাঁধ হলো আর আমাদের নদীগুলো শুকিয়ে গেল, এখন পানি-পানি করে মরছি...
কুতুব আচমকা বলে ওঠে, এক কাজ করো মণ্ডল ভাই, ভালো দাম দেখে তোমার জমি বিক্রি করে দাও!
কী বললে, জমি বিক্রি করে করব কী?
কী করবে তা তো জানি না, জমি রেখে লাভটা কী বল দেখি, দেশে তো আর ফসল-আবাদ হবে না।
এটা আবার কেমন ধারা কথা, ফসল-আবাদ হবে না তো মানুষজন খাবে কী!
কেন বিদেশী চাল-গম কিনে খাবে, দেশে তো এখন শুধু বিনিয়োগ আসছে, তার মানে দেশে কলকারখানা হতে তাই জমি দরকার, ফসলের চেয়েও ফ্যাক্টরি-কারখানা করলে উৎপাদন খরচে লাভ।
জয়নাল আর কথা বলে না, কুতুবকে অনেক দিন ধরে দেখে আসছে, দিনে দিনে কী যে হলো মানুষজনের স্বভাব-চরিত্র সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, আগে খ্যাতির-সম্মান করে কথা বলত আর এখন কি না ক্রেতার মতো কথা বলে, যেন বা কত বড় জমিদার মানুষ হয়ে গেছে। জয়নাল উঠে যায়, ফালতু মানুষের কাছে বসতে তার এখন আর সময় নেই, কুতুব ডাক দিয়ে বলল, মণ্ডল ভাই জমি বেচতে চাইলে আমাকে জানালে হবে, শহরের মোটা অঙ্কের সাহেব আছে, এ দিকে তিনি জমি কিনে রাখবেন, আগামীতে মোটা কোনো কারখানা করবে হয়তো।
জয়নাল ওর কথা শুনতে চায় না, জমি যে কী জিনিস তা শুধু কৃষকই বোঝে, তার কষ্টের কথা তো কাউকে বোঝানো যাবে না। অনাহার-অভাব কষ্ট যা থাকুক না কেন, নিজের একখণ্ড জমি যে কত আনন্দের কত তৃপ্তির তা তো সে জানে।
সেদিন কাকডাকা সাতসকালে কুতুব তার সঙ্গী-সাথী নিয়ে জয়নাল মণ্ডলের বাড়ি ছুটে আসে, মর্জিনা কুতুবকে দেখে চমকে ওঠে, বিহানবেলায় হাতির পা তাদের বাড়ি, তারপর আবার এ সে হাতি নয়, একেবারে পায়ে গোদওয়ালা হাতি, মণ্ডল গোয়ালে ছিল, চিৎকার দিয়ে বলল, কুতুব তুমি কেন এসেছো আমার বাড়ি?
কেউ কারো বাড়ি কি আসতে নেই ভাই? একই গ্রামে থাকি আমরা, সবাই তো সবার আত্মীয়, সুখ-দুঃখের কথা যদি কেউ কারোটা না শোনে তবে কিসের...
ঠিক আছে, কী বলতে চাও সেটা আগে বলো?
না বলছিলাম কী, আপনি কি ভাবীকে সেদিনের কথাটা জানিয়েছেন? একটা মস্ত বড়লোক অনেক জমি কিনবে কি না, অনেকে দিচ্ছে...
তোমাকে তো বলেছিই, আমি জামি বেচব না, আবার কী জন্য এসেছো।
এসেছি আপনার ভালোর জন্যই, আপনার জমির পাশের জমিগুলো প্রায় বিক্রি হয়ে গেছে, এখন আপানি আছেন।
আমি আছি থাকব, সবার হোক আমি বেচব না।
জমি শুকিয়ে যাচ্ছে, পানি আর আসবে না, ফসল ফলবে না, চোখ যত দূর যায় সব জমি বিক্রি হবে, এখানে একদিন কলকারখানা শহর হবে, বড়-বড় রাস্তা হবে...
জয়নাল মণ্ডল কিছু বলতে পারে না, তারপর সে আর কী বলবে, শুধু কুতুবের বাপের কথাগুলো মনে আসে, মানুষটা ভালো ছিল, যুদ্ধের বছর মরে গেল, কারা যে মারলো বোঝা গেল না। তার ছেলে কুতুব, কুতুবই বটে, ওর বাপের সাথেই তো জয়নাল মণ্ডলের বাপ সেই সাতচল্লিশে দেশ ছেড়ে ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়ে এলো এ দেশে, সেই দেশের শোক বাপ ভুলেছিল ঠিকই কিন্তু এ দেশের মাটি হারানোর শোক তো ভোলার নয়।
এ দিকে জমি পুড়ছে, মানুষ মরছে আর পুড়ছে মানুষের বুক, এর মধ্যে জমি বিক্রি হচ্ছে, মানুষজন শহরমুখো, শহরের সুখ আর গ্রামের সুখ তো এক নয়, নিজের ভূমি হারানোর কষ্ট তো মানুষকে দগ্ধ করে, যন্ত্রণায় খাবলে খায়, অথচ মানুষ পারে না, নিজের কাছে পরাজিত হয়ে হয়তো একটা সময় মাথা নত করে দাঁড়ায়।
বউ মর্জিনা বজ্রকণ্ঠে জানায়, জান দেবো তো জমি দেবো না, পেটে পাথর বেঁধে থাকব তবুও জমিন হাতছাড়া করব না।
কুতুব লোকজন নিয়ে যেভাবে এসেছিল সেভাবেই ফিরে যায়, রাগে ওর চোখ দুটো জবাফুলের মতো জ্বলছে, তাতে অবশ্যই মর্জিনাদের কী আসে যায়।
কয়েক দিন যেতে না যেতেই এক সন্ধ্যায় সংবাদ আসে কুতুবকে কে বা কারা যেন হত্যা করে ধড়-মুণ্ডু আলাদা করে রেখে গেছে, গ্রামের লোকে সবাই গিয়ে ভিড় করে দাঁড়ায়, সত্যিই ঘটনা একটা, কারো মুখে কথা নেই, বোবা পাথর যেন, কিন্তু এমন একটা পৈশাচিক ঘটনা ঘটালো কে, কেউ অনুমান করতে পারল না, কাউকে সন্দেহ করতেও পারল না গ্রামবাসী। অনেকটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পরে থানার লোকেরা ভ্যান নিয়ে এসে খেজুরের পাতার পুরনো চাটাইয়ে জড়িয়ে ভালো করে বেঁধে ভ্যানে তুলল, গ্রামবাসী দেখল কিন্তু কেউই জানল না প্রকৃত ঘটনা আসলে কী, কার পাপে কে বলি হয়।
জয়নাল মণ্ডল ফিসফিসিয়ে জানায়, বৃষ্টি আসুক বা না আসুক সেটা বড় কথা নয়, কুতুব কিন্তু আর কারো বাড়ি আসবে না।
মজিব শেখ জানতে চাইলো, কী বলছো মণ্ডল কী বলছো...
জয়নাল মণ্ডল আজকাল শহরে যাচ্ছে দিন আনি দিন খাই মজুরের কাজ করতে, তাই তার সংসারে অভাবটা অত আর প্রকট নয়। কিন্তু জমি সে বিক্রি করবে না, আর কত দিন নদীতে পানি আসবে না, আর কত দিন খাড়িগুলো, বিল-হাওর পানিতে ভাসবে না মণ্ডল তা দেখতে চায়, সত্যিই মানুষ কি আর আগের মতো নেই? কেন মানুষ অমনভাবে বদলে গেল, জয়নাল মণ্ডলের কাছে ওসব কোনো প্রশ্ন নয়, তার কাছে শুধু একটাই প্রশ্ন, ফারাক্কার পানি কি তার জমিতে আসবে না, জমি কি সব বিক্রি হয়ে যাবে অদৃশ্য মানুষের কাছে।

নিউজ পেজ২৪/আরএস