লাইফ স্টাইল

অগাস্ট ২, ২০১৫, ৫:৪৯ অপরাহ্ন

‘হিরা চাই না, মানিক্য চাই না, চাইছি তোমার বন্ধুত্ব’

নিউজপেজ ডেস্ক

বন্ধুর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে জর্জ হার্ভার্ট বলেছেন, ‘একজন বন্ধু হলো সর্বোৎকৃষ্ট আয়না।’ তার মানে, এই আয়নাতে প্রতিমুহূর্তে সে নিজেকে দেখবে। শুধু বাহ্যিক অবয়বকে নয়, ভেতরটাকেও। বন্ধুত্বটা হওয়া চাই হাত আর চোখের সম্পর্কের মতো। হাতে ব্যথা লাগলে চোখে জল আসে। আর চোখে যদি জল ঝরে, তবে হাত এগিয়ে যায় তা মুছে দিতে।



বন্ধু শব্দের মাঝে মিশে আছে নির্ভরতা আর বিশ্বাস। বন্ধু আর বন্ধন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। বন্ধুত্ব মানেই যেন হৃদয়ের সবটুকু আবেগ নিংড়ে, ভালোবাসা দিয়ে মন খুলে জমানো কথা বলা। বন্ধুর জন্য গেয়ে ওঠা- হাল ছেড়ো না বন্ধু বরং কণ্ঠ ছাড়ো জোরে, দেখা হবে তোমার-আমার অন্যদিনের ভোরে। বিশ্ব বন্ধু দিবস আজ।



প্রতি বছর আগস্টের প্রথম রোববার দুনিয়াজুড়ে পালিত হয় দিবসটি। নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে আজ বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে বিশ্ব বন্ধু দিবস। শুভেচ্ছা আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে নিত্যনতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হওয়ায় কার্ডের প্রচলন হারিয়ে যেতে বসেছে। তারপরেও বন্ধু দিবসের কার্ড তুলে দেবেন বন্ধুর হাতে বন্ধু। পাশাপাশি ফুল, চকোলেট, অন্যান্য উপহারসামগ্রী দেবেন কেউ কেউ। সামাজিক ওয়েবসাইট ফেসবুক, টুইটার, মোবাইল ফোনে চলছে শুভেচ্ছা আদান-প্রদান।



১৯৩৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে দিবসটি পালনের প্রথা চালু হয়। ইতিহাস মতে, ১৯৩৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকার এক ব্যক্তিকে হত্যা করে। দিনটি ছিল আগস্টের প্রথম শনিবার। হত্যার প্রতিবাদে পরের দিন ওই ব্যক্তির এক বন্ধু আত্মহত্যা করেন। সে সময় বিষয়টি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। এরপর থেকে জীবনের নানা ক্ষেত্রে বন্ধুত্বের অবদান আর তাদের প্রতি সম্মান জানানোর লক্ষ্যে আমেরিকান কংগ্রেস ১৯৩৫ সালে আগস্ট মাসের প্রথম রোববারকে আন্তর্জাতিক বন্ধু দিবস ঘোষণা করে। সেই থেকে আগস্ট মাসের প্রথম রোববার বন্ধু দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।



বন্ধুত্ব নিয়ে বিশ্বজুড়ে ছড়ানো আছে অনেক কথা-কাহিনী। অসাধারণ বাগ্মিতার জন্য সুপরিচিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ষোড়শ প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের মতে, `একজন ব্যক্তির জীবনের ভালো দিকটা গড়ে ওঠে তার বন্ধুত্ব দিয়ে।` অনুভূতির যত রঙিন জানালা আছে তার মধ্যে বন্ধুত্বের জায়গাটি সবচেয়ে উজ্জ্বল ও স্নিগ্ধ। বন্ধুকে পাশে রেখে চলা যায় সীমাহীন পথ।



বন্ধু বয়স ও শ্রেণি মানে না। বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে পারে, মায়ের সঙ্গে, বাবার সঙ্গে, ভাইয়ের সঙ্গে, বোনের সঙ্গে। সহপাঠী হোক, হোক সমবয়সী। কোনো তফাৎ সেই বন্ধুত্বের গভীরতায় যদি কোনো খাদ না থাকে। জীবনে প্রথম বন্ধু গড়ে ওঠার স্মৃতি থাকে অমলিন। সময়ের প্রয়োজনে কোনো বন্ধু দূরে সরে যেতে পারে কিন্তু মনের দূরত্ব কখনই তৈরি হয় না। বন্ধুর সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্তই অমূল্য। স্কুল শুরুর দিনে যে ছেলেটি বা মেয়েটি আপনারা পাশে বসেছিল তাকে কী ভোলা যায় সহজে?



যাদের বন্ধু নেই তারা বিষণœতায় ভোগে, একাকিত্ব তাকে গ্রাস করে নেয়। এই জীবন থেকে পালিয়ে ফিরতে অনেকেই নানান পথ খোঁজে। কিন্তু যে পথটি আপনার জন্য অপেক্ষা করছে এটা শুধু জানে আপনার কাছের বন্ধুটিই। তাকেই বলেই দেখুন একবার আপনার বিষণœতার কথা, একাকিত্বের কথা। বন্ধুটিই আপনাকে ঘর থেকে টেনে বের করে নিয়ে যাবে খোলা মাঠে। সবুজ ঘাস সেখানে। ছন্দহীন জীবনে ছন্দ, নিরানন্দ জীবনে আনন্দের জোয়ার যোগ করতে বন্ধুর জুড়ি নেই।



বন্ধুত্বকে কোনো পরিমাপক যন্ত্র দিয়ে মাপা যায় না। মাপার দরকারও নেই। কিন্তু ভালো বন্ধু খুঁজে পাওয়া খুব সহজ নয়। সবাই ভালো বন্ধু হতেও পারে না। বন্ধু যেহেতু আপনার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ, তাই বন্ধু নির্বাচনে একটু সচেতন হতে হয়। বন্ধুত্বে হাত বাড়ানো অন্যায় নয়। তবে ভুল মানুষকে না বুঝেই বন্ধু বানিয়ে ফেলা ঠিক না। বন্ধু নির্বাচনের আগে কয়েকটি মানবিক গুণ তার মধ্যে খুঁজে নেওয়া উচিত। সৎ ও সত্যবাদী মানুষ ভালো বন্ধু হতে পারে।



রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘বন্ধুত্ব বলিতে তিনটি পদার্থ বুঝায়। দুই জন ব্যক্তি ও একটি জগৎ। অর্থাৎ দুই জনে সহযোগী হইয়া জগতের কাজ সম্পন্ন করা। আর, প্রেম, বলিলে দুই জন ব্যক্তি মাত্র বুঝায়, আর জগৎ নাই। দুই জনেই দুই জনের জগৎ।’ বন্ধুকে অনেকে প্রেমের সঙ্গে অথবা ভালোবাসার সঙ্গে এক করে ফেলেন। বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘ইহা ছাড়া আর একটা কথা আছে প্রেম মন্দির ও বন্ধুত্ব বাসস্থান। মন্দির হইতে যখন দেবতা চলিয়া যায় তখন সে আর বাসস্থানের কাজে লাগিতে পারে না, কিন্তু বাসস্থানে দেবতা প্রতিষ্ঠা করা যায়।’



বাস্তবিক অর্থে, একেক বন্ধু আমাদের মধ্যে একেকটা দুনিয়ার প্রতিফলন ঘটায়। বন্ধু এমন একজন মানুষ যার কাছে মনের কথা খুলে বলা যায় অবলীলায়। এ কারণে বাবা-মা তার সন্তানের কাছে ভালো বন্ধু হয়ে উঠতে পারে। এটি খুবই জরুরি। অভিভাবক যখন বন্ধু হয়ে ওঠে তখন মানসিক বিপর্যয় ঘটলে অভিভাবক যেন সবার আগে এগিয়ে আসতে পারেন।



অনেক শিক্ষক তার শিক্ষার্থীর কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন বন্ধুসুলভ আচরণ ও শিক্ষাপদ্ধতি অনুসরণ করে। শিক্ষার্থীদের কাছেও তখন শিক্ষাগ্রহণ হয়ে ওঠে আকর্ষণীয় ও আনন্দময়। জীবনে চলার পথে অনেক রকমের বন্ধুর দেখা মিলবে। ভুল মানুষকে এড়িয়ে চলুন। নইলে জীবনে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি হয়। বন্ধুকে সঙ্গী করে জীবনের অমূল্য সময়টুকু করে তুলুন রঙিন।

অনেকে বলে থাকেন, এই বন্ধু দিবস কি শুধুই এক দিনের জন্য বন্ধুকে স্মরণ করা, কাছে পাওয়া? এর মাঝেই কি বন্ধুত্ব সীমাবদ্ধ? এর উত্তরে বলা যায়, বন্ধু দিবস হচ্ছে বন্ধুকে বিশেষভাবে স্মরণ করার জন্য। এই বিশেষ সম্পর্ককে সম্মান প্রদর্শনের জন্য। বন্ধুর সঙ্গে দিনটি উপভোগ করার জন্য।

নিউজ পেজ২৪/ইএইচএম