সাক্ষাৎকার

অগাস্ট ৬, ২০১৫, ৪:৪০ অপরাহ্ন

‘একজন লিয়াজোঁ অফিসার একটা দেশের প্রতিচ্ছবি’

নিউজপেজ ডেস্ক

দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেট দল বাংলাদেশ সফর করেছে ৩৫ দিন। এর আগে ভারতীয় ক্রিকেট দল সফর করেছে ১৮ দিন। এই দুই দলকে বাংলাদেশে আতিথেয়তা দিয়েছে হাসানুজ্জামান ঝড়ু। বিমান বাংলাদেশের ফ্লাইট সার্ভিস ডিপার্টমেন্টে কর্মরত আছেন তিনি। কিন্তু ভারত আর দক্ষিণ আফ্রিকা দল বাংলাদেশে এলেই লিয়াজোঁ অফিসার পদে নিয়োগ পান প্রাক্তন এই ক্রিকেটার।

খুলনা বিভাগের হয়ে ৩৯টি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলেছেন। নিজের নামের পাশে যুক্ত করেছেন চারটি সেঞ্চুরি। চট্টগ্রামের বিপক্ষে করেছিলেন একটি ডবল সেঞ্চুরিও। আর বিমান ও ওয়ারী ক্লাবের হয়ে ৪৪টি লিস্ট ‘এ’ ম্যাচ খেলেছেন প্রাক্তন ডানহাতি এই ব্যাটসম্যান।

সম্প্রতি দুই দলকে আতিথেয়তা দেওয়া এই লিয়াজোঁ অফিসার গত রোববার হোটেল সোনারগাঁওয়ে রাইজিংবিডির ক্রীড়া প্রতিবেদক ইয়াসিন হাসানের মুখোমুখি হন। প্রায় ঘণ্টাখানেকের আলাপচারিতায় বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন তিনি।

নিউজপেজ পাঠকদের জন্যে তা তুলে ধরা হল :


প্রশ্ন : লিয়াজোঁ অফিসার হয়ে উঠার গল্পটা বলুন?

হাসানুজ্জামান ঝড়ু : ২০১১ বিশ্বকাপে প্রথমবারের মত লিয়াজোঁ অফিসার পদে বিসিবি আমাকে নিয়োগ দেয়। সেবার আমাদের দেশে বিশ্বকাপ হয়েছিল। প্রত্যেকটি দলের জন্যে লিয়াজোঁ অফিসার নিয়োগ দেওয়ার গাইডলাইন আইসিসি দিয়ে দিয়েছিল। প্রথমেই আমাকে ভারতীয় ক্রিকেট দলের দায়িত্ব দিয়ে দেওয়া হয়। আর ভারত চলে যাওয়ার পর দক্ষিণ আফ্রিকা দলের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ভারত মাত্র দুদিনের জন্যে আসলেও দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে নয়দিন কাজ করি।



প্রশ্ন : বিমানে স্থায়ী চাকরির পাশাপাশি এটা করছেন? ওখানে কোনো সমস্যা হচ্ছে না?

হাসানুজ্জামান ঝড়ু : বিমানে তো অনেক দিন ধরে আছি। খেলোয়াড়ী জীবন থেকেই বিমানের সঙ্গে আমি জড়িত। বিমানের হয়ে খেলেছি অনেক বছর। লিয়াজোঁ অফিসার হিসেবে বিসিবি নিয়োগ দিলে আমি বিমান থেকে অবৈতনিক ছুটি গ্রহণ করি। বিমানও আমাকে এই কাজে আগ্রহ দেখায়। এজন্য বিমানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ দিতেই হবে। তারা আমাকে এই পদে কাজ করার সুযোগটি করে দিচ্ছে। আর বিমানে চাকরির সুবাদে আমি বিমানবন্দরে অনেক কিছু সহজেই ম্যানেজ করতে পারি। আমার ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে এই সুবিধা আমি পেয়ে থাকি। এবারের ভারতীয় দলের ৬৫টি লাগেজ ছিল। দক্ষিণ আফ্রিকার ৯৫টি। এগুলোর নিরাপত্তা দেওয়া, বিমানবন্দরে যত্ন করে হ্যান্ডেল করা জরুরি। ধরুন একটু অবহেলার কারণে যেকোনো একজন ক্রিকেটারের ক্রিকেটের কোনো একটা সরঞ্জামের ক্ষতি হয়ে গেল। তখন একটা বড় ঝামেলার সৃষ্টি হবে। ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে খুব সহজে এই কাজগুলো হয়ে যায়।

প্রশ্ন : একটু বলবেন, লিয়াজোঁ অফিসারের মূল দায়িত্ব কি?

হাসানুজ্জামান ঝড়ু : যেই দলের দায়িত্ব পাওয়া সেই দলকে আরামদায়ক সেবা দেওয়া। তারা কি চাচ্ছে সেটা পূরণ করা। তাদের ম্যাচ, তাদের অনুশীলন সব ঠিকঠাক আছে কিনা তা নিশ্চিত করা। তাদের খাওয়া-দাওয়া, আবাসন পরিপাটি আছে কিনা তা সঠিকভাবে খোঁজ করা। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে আমি একটা জিনিস বিশ্বাস করি, একজন লিয়াজোঁ অফিসার একটা দেশের প্রতিচ্ছ্ববি। লিয়াজোঁ অফিসার তার নিজের দেশকে যেভাবে অতিথিদের সামনে তুলে ধরবে অতিথি তাই বিশ্বাস করবে। আমাদের সংস্কৃতি, কৃষ্টি, সভ্যতা, ভদ্রতা, অতিথীপরায়ণ সবকিছু লিয়াজোঁ অফিসারের উপর নির্ভর করে। সে যদি কোনো অতিথির সঙ্গে খারাপ আচরণ করে তাহলে আমাদের সম্পর্কে একটা খারাপ ধারণা তৈরী হবে। আর ভালো কিছু পেলে আমাদেরকে সবার আগে কাছে টেনে নিবে।



প্রশ্ন : আপনার প্রথম অ্যাসাইনমেন্টেই ভারতীয় দলকে পেয়েছিলেন। প্রথম অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলুন?

হাসানুজ্জামান ঝড়ু : ভারতীয় দলের লিয়াজোঁ অফিসার সবচেয়ে কঠিন সময় পার করে। অন্যান্যদের সঙ্গে কথা বলে ও আমার অভিজ্ঞতা থেকে এটা মনে হয়েছে। ভারতের সঙ্গে কাজ করতে পারলে অন্যান্য দলের সঙ্গে কাজ করা আরও সহজ হয়ে যায়। হ্যাঁ শুরুর দিকে একটু কষ্ট হয়েছে। তবে আমার সাপোর্টিং হ্যান্ডগুলো যেমন লজিস্টিক, হোটেল ম্যানেজম্যান্ট, পরিবহণ ঠিকমত সাহায্য করায় আমার কাজে অনেক উপকার হয়েছে। এমনও দিন গেছে বিশ্বকাপের সময় ভারতের একসঙ্গে সাত-আটটা সমস্যা হয়েছিল। ওগুলো ঠিকমত করতে পেরেছি বলে এখন ভারতীয় দলের জন্যে সবার আগে আমাকেই নির্বাচন করা হয়।


প্রশ্ন : শুধু কি পেপার ওয়ার্ক করতে হয় নাকি বাড়তি পরিশ্রমও করতে হয়?

হাসানুজ্জামান ঝড়ু : এবারের একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি। এবার চট্টগ্রামে আমরা রেডিসন ব্লুতে ছিলাম। এটা নতুন হোটেল। আর আমার জন্যে নতুন। ক্রিকেটাররা পৌঁছার আগের ফ্লাইটে আমি সেখানে চলে যাই। কারণ ওই হোটেল সম্পর্কে আমি কিছু জানি না। আমার রুমে ব্যাগটি রেখে আমি হোটেল দেখতে চলে যাই। পুরো হোটেলটি ঘুরে দেখতে আমার এক ঘণ্টারও বেশি সময় লেগে যায়। আমি ঘুরে ঘুরে হোটেল সম্পর্কে জানি। কারণ ক্রিকেটাররা যদি আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করে আর আমি যদি জানাতে না পারি তাহলে খারাপ দেখা যায়। হেলথ ক্লাব ও সেলুন কখন খোলা থাকে, সুইমিং পুল কেমন এগুলোর খবর নেই। চারটি রেস্টুরেন্ট হোটেলে। কোন রেস্টুরেন্টে কি খাওয়া পাওয়া যায় সেগুলো গিয়ে গিয়ে খবর নিই।


প্রশ্ন : গণমাধ্যমকে কীভাবে হ্যান্ডেল করেন?

হাসানুজ্জামান ঝড়ু : এখন তো গণমাধ্যম পুরো অনলাইনমুখি। কখন দল দেশে পৌঁছাচ্ছে, কখন হোটেলে ঢুকছে, কখন স্টেডিয়ামে যাচ্ছে। এগুলো জানার জন্যে বারবার গণমাধ্যমকর্মীরা যোগাযোগ করে। এটা ওনাদের কাজ। আর আমার কাজ তাদেরকে সঠিক তথ্য প্রদান করা। ওনারা তো আর গল্প করার জন্যে যোগাযোগ করে না। আহামরি কোনো সমস্যা হয় না। যখন ফোনে তথ্য প্রদান করতে না পারি তখন এসএমএসে জানিয়ে দেই। আমি গণমাধ্যমের পার্টটিকে এভাবে দেখি, ‘ডবলএইচ’। এর মানে ‘হেল্প এন্ড হ্যান্ডেলিং’।



প্রশ্ন : বড় বড় দলগুলোকে কাছ থেকে দেখেন। তাদের কথাবার্তা, চালচলন এগুলো ভালোভাবেই পরখ করেন। ড্রেসিং রুমে থাকেন। যখন তারা খারাপ করে তখনকার পরিবেশটা সম্পর্কে একটু বলুন?

হাসানুজ্জামান ঝড়ু : এবারের কথাই বলি। ভারত বাংলাদেশের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ হেরে যাওয়ার পর পরাজয়টাকে তারা স্বাভাবিকভাবে নিয়েছে। তারা জানত যে বাংলাদেশ এরকম কোনো কিছু করতে পারবে। তবে এটা ঠিক মুস্তাফিজ যে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে এটা তাদের মাথায় ছিল না এবং কোনো ধারণাও করতে পারেনি। যখন ক্রিকেটাররা আউট হয়ে ড্রেসিং রুমে আসে তখন তাদের প্রত্যেকের মধ্যেই খানিকটা ক্ষোভ কাজ করে। কিন্তু সতীর্থদের অনুপ্রেরণায় সেটা ভুলে যায়। পরবর্তী ম্যাচ ভালো করার প্রেরণা খুঁজে পায়। ভারত এবার প্রথম ম্যাচ হারার পর টিম মিটিংয়ে বলেছিল, ‘এটা ক্রিকেটে হতেই পারে। এতেই শেষ না। পরবর্তী ম্যাচে অবশ্যই ঘুরে দাঁড়াবো।’ এগুলো সামনে ভালো করতে উৎসাহ দেয়।

প্রশ্ন : ভারতীয় দল নাকি প্রথম ম্যাচ হারের পর স্টেডিয়াম থেকে ডিনার না করেই বের হয়ে গিয়েছিল?

হাসানুজ্জামান ঝড়ু : ওগুলো ভুয়া কথা। আমাদের এখানে একটু পরপরই খাওয়া দেয়। ওয়ানডেতে চারবারের মত। পোস্ট ম্যাচ শেষের খাওয়া অনেকেই খায় আবার খায় না। সারাবাদিনই এটা-সেটা মুখে থাকে। এজন্য যে পুরো দল ডিনার না করেই চলে গেছে সেরকম কোনো কিছু হয়নি। বললাম না তারা পেশাদার ক্রিকেটার। কীভাবে কি করতে হয় সেগুলো সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা তাদের আছে।



প্রশ্ন : বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের সঙ্গে এ বিষয়গুলো কখনো শেয়ার করেছেন?

হাসানুজ্জামান ঝড়ু : হ্যাঁ। আমি যখন ওয়ালটন সেন্ট্রাল জোনের হয়ে অথবা খুলনা বিভাগের হয়ে কাজ করি তখন ড্রেসিং রুমের পরিবেশ কেমন থাকে সেটা শেয়ার করি। আমার কথায় যদি একটা-দুটা খেলোয়াড় অনুপ্রাণিত হয় তাহলে আমার নিজের কাছেই ভালো লাগবে। আমি মনে করি ড্রেসিং রুমের ফ্লেভার বিশাল একটা বার্তা পারফরম্যান্সের জন্যে। তারা খারাপ সময়ে কি করে, অফফর্মে থাকা একটা খেলোয়াড়ের সঙ্গে কি করে, কি কথা বলে, ফর্মে আছে এমন ক্রিকেটার কি করছে এগুলো আমি লোকাল ক্রিকেটারদের জানাই।



প্রশ্ন : শচীন টেন্ডুলকারকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল? ২০১১ বিশ্বকাপে খেলেছিল। আবার ২০১২তে এশিয়া কাপেও এসেছিল। একটু তাকে নিয়ে বলেন। কেমন দেখলেন।

হাসানুজ্জামান ঝড়ু : শচীন টেন্ডুলকারের কাছ থেকে শেখার কোনো শেষ নেই। যতটুকু তাকে দেখেছি, ওনি খুবই কম কথা বলেন। খুব ধর্মপরায়ণ, শৃঙ্খল। ক্রিকেট ছাড়া সে কিছু বুঝে না। মানুষের সঙ্গে তার চলাফেরা খুবই অমায়িক এবং যে কাউকে মুগ্ধ করবে। ওর কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। ওর ব্যক্তিত্ব আমাকে আকর্ষণ করত। ওর মতই দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক হাশিম আমলা। অসাধারণ এক মানুষ। এত বিনম্র ক্রিকেটার আমি আমার জীবনেও দেখিনি। সাধারণ মানুষের থেকেও আলাদা।



প্রশ্ন : এখন পর্যন্ত যেসব ক্রিকেটারদের সঙ্গে কাজ করেছেন তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কাকে আপনার মনে ধরেছে?

হাসানুজ্জামান ঝড়ু : দক্ষিণ আফ্রিকার প্রাক্তন অধিনায়ক গ্রায়েম স্মিথ। স্মিথ সেরা ক্রিকেটার। ২০১১ সালে যখন প্রথম তাকে দেখলাম তখনই মুগ্ধ হয়েছি। তার অধিনায়কত্ব, তার চলাফেরা, তার পারফর্ম সব কিছুই অন্যান্যদের থেকে আলাদা মনে হয়েছে। তার ড্রেস কোডও ভিন্ন। শুধু ক্রিকেটেই না দলের অন্যান্যদের সঙ্গে যেসব খেলা খেলতো সেগুলোতেও স্মিথ সবসময় শীর্ষে থাকত। ফুটবল, স্নুকার সবকিছুতেই এগিয়ে থাকে। সে যে একজন অধিনায়ক সেটা বোঝাই যায়।



প্রশ্ন : এবার ভারতকে আমরা হারানোর পর তাদের ড্রেসিং রুমের পরিবেশ কেমন ছিল? ওরা কি রেগে গিয়ে কোনো পাগলামি করেছিল?

হাসানুজ্জামান ঝড়ু : কি পাগলামি করবে (হা হা)। ওরা তো টপ দল। বাংলাদেশ সম্পর্কে পুরো ধারণা নিয়ে ওরা আমাদের এখানে খেলতে এসেছিল। এখন আমি দুই দলের সঙ্গে কাজ করছি। ওরা এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ দলকে নিয়ে নেতিবাচক কোনো চিন্তা করছে না। বাংলাদেশকে উচু পর্যায়ের দল হিসেবে গণ্য করছে। আর এবার ভারত হঠাৎ করে হেরে গেছে তা কিন্তু না। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সঙ্গে কিন্তু ওরা খেলেছে। আমাদের খেলার মান কি সে সম্পর্কে ওরা সেখানেই ধারণা পেয়েছে। ওরা প্রথম ম্যাচ হারের পর খানিকটা হতাশ হয়ে গিয়েছিল। কোনো কিছু ছুঁড়ে ফেলে রাগের বহিঃপ্রকাশ করা, খারাপ ভাষা ব্যবহার করা এরকম কোনো কিছু করেনি। ওরা ইতিবাচক দৃষ্টিতেই বাংলাদেশের জয়কে দেখেছিল।



প্রশ্ন : ক্রিকেটাররা যখন-তখন বায়না করে তা কীভাবে ব্যবস্থা করে দেন?

হাসানুজ্জামান ঝড়ু : ক্রিকেটারদের সঙ্গে সরাসরি লিয়াজোঁ অফিসারের যোগাযোগ হয় না। ওদের দলের ম্যানেজারের মাধ্যমে আমরা তাদের চাওয়া-পাওয়া সম্পর্কে জানতে পারি। ম্যানেজারের কাছ থেকে জানার পর আমরা সেই কাজটি শুরু করি। অনেক সময় ক্রিকেটাররাও আমাদেরকে সরাসরি এসে বলে। এটা সম্পর্কের উপর নির্ভর করে। সঙ্গে থাকতে থাকতে ক্রিকেটারের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো হয়ে যায়। বাইরের দেশের ক্রিকেটার যখন এখানে আসে তখন আমার কাছে সে একটা নবজাতক শিশুর মত। তার প্রত্যেকটি ইচ্ছা পূরণের দায়িত্ব আমার। হতে পারে সেটা মোবাইলের সিম কার্ড, হতে পারে হেলমেটের স্ক্রু ঠিক করা, প্যাড কালার করা, ব্যাটের গ্রিপ কিনে দেওয়া ইত্যাদি। এবারের একটা অভিজ্ঞতা, দক্ষিণ আফ্রিকার দল হঠ্যাৎ ‘ন্যান্ডোস’ এর খাওয়া খাবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়। ওদেরকে তো আর ওখানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব না। ন্যান্ডোসের ম্যানেজার মিরাজুল ইসলামকে ফোন দেওয়া মাত্র আমাকে ২৭ জনের খাবার পাঠিয়ে দিল। এটা শুধুমাত্র আমার ব্যক্তিগত সম্পর্কের খাতিরে হয়েছে। একজন লিয়াজোঁ অফিসারের এগুলো পূরণ করতে হয়। কারণ ওরা অতিথি।



প্রশ্ন : সব ক্রিকেটারদের ইচ্ছা বা আকাঙ্ক্ষা কী একই রকম থাকে? না ক্ষেত্র বিশেষে পরিবর্তন হয়?

হাসানুজ্জামান ঝড়ু : অনেক সময় একই থাকে। আবার অনেক সময় পরিবর্তনও হয়। যেমন- বিরাট কোহলির লাইফ স্ট্যান্ডার্ড পুরো ভারতীয় ক্রিকেট দলের অন্যান্য ক্রিকেটারদের থেকে আলাদা। তার খাবার মেন্যু, তার রুম, তার চলাচল স্বাভাবিকভাবেই আলাদা। ওর জন্য আলাদা করে নিরাপত্তা প্রোভাইড করতে হয়। আর এটা স্বাভাবিক। এবার দক্ষিণ আফ্রিকার এবি ও স্টেইনের ক্ষেত্রে তা হয়েছে। হয়তো তাদের সব চাওয়া-পাওয়া পূর্ণ করা সম্ভব হয় না। কিন্তু ম্যানেজ করে দিতে হয়।



প্রশ্ন : দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটারদের মধ্যে খেলাধুলার বাইরে বাড়তি কী খুঁজে পেলেন?

হাসানুজ্জামান ঝড়ু : ওদের পড়ার অনেক আগ্রহ বেশি। যেকোনো কিছু সামনে পেলেই পড়া শুরু করে দেয়। আমি বিমানে আছি বলে অনেক বর্তমান সময়ের সব ম্যাগাজিন আমার সংগ্রহে আছে। ঈদের সময় কি করবে? আমি আমার সব ম্যাগাজিন ওদেরকে দেই। শুধু স্পোর্টস ম্যাগাজিন না। আমাদের দেশের দুই-একটা পত্রিকার ম্যাগাজিনও নিয়েছে। প্যাডে দেখতাম বই পড়ছে। এগুলো তো ভালো। ভিন্ন ভিন্ন স্বাদ গ্রহণ করে জ্ঞানের পরিধি বাড়াচ্ছে। পড়ার বিকল্পতো কিছু নেই।





প্রশ্ন : কোনো মজার স্মৃতি এই মুহূর্তে মনে পড়ছে?

হাসানুজ্জামান ঝড়ু : ডেল স্টেইনের একটা ঘটনা মনে পড়ছে। ডেল স্টেইন শুধু টেস্ট খেলতে ঢাকায় এসেছিল। সে এবার মাথায় যে সাদা হেড ব্যান্ড পড়েছিল সেটা আমার কিনে দেওয়া। সে ভুল করে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে কালো হেড ব্যান্ড নিয়ে চলে এসেছিল। এখানে এসে মহাবিপদে। তখন চট্টগ্রামে ঈদ। কোনো দোকান খোলা নেই। কোথাও সাদা ব্যান্ড পাওয়া যাচ্ছিল না। চট্টগ্রামের অ্যাপোলো শপিং মলে জাতীয় দলের প্রাক্তন ক্রিকেটার আফতাব আহমেদের ভাই আরিফ আহমেদের একটা দোকান আছে স্পোর্টসের। তাকে অনুরোধ করে ঈদের দুদিন পর দোকান খুলিয়ে তার কাছ থেকে ইওনেক্স ব্র্যান্ডের সাদা হেড ব্যান্ড নিই। ওটাতে আবার লোগো ছিল। পরে ব্যান্ড উল্টিয়ে স্টেইন মাঠে নামে। দুই জোড়া ব্যান্ডের দাম নিয়েছিল ৭০০ টাকা। ব্যান্ড ম্যানেজ করে দেওয়ার পর টেস্টের প্রথম দিন ওটা বেঁধে মাঠে নামে। দ্বিতীয় দিন প্রথম সেশনের খেলা শেষে আমাকে ডেকে বললো ব্যান্ডটা ভালো না সুঁতা উঠে। ওটা নিয়ে মধ্যাহ্ন বিরতির সময় গবেষণা করলাম। কেঁচি দিয়ে কাটলাম কয়েকটা সুঁতা। পরে আবার দিলাম। বিরতির পর মাঠে নেমে আবার ওটা নিয়ে বোলিং করল। চা-বিরতির পর জিজ্ঞেস করলাম কি অবস্থা? বলবো ‘ইটস পারফেক্ট।’ ও নিজেই বললো, ‘আমি ঘামাচ্ছি তাই এটা চুপষে গেছে। এখন আর সুঁতা উঠছে না।’ পরে আমার সঙ্গে হ্যান্ডসেক করে বললো, ‘ইউ আর দ্যা হিরো।’



প্রশ্ন : এই পদে থেকে অনেক ক্রিকেটার, কর্মকর্তাদের সঙ্গে আপনার চলতে হয়। তাদের চাওয়া-পাওয়ার পূর্ণ হলে আপনি কতটুকু আনন্দিত হন। আবার সামান্য খুঁত থেকে গেলে কতটুকু কষ্ট হয়?

হাসানুজ্জামান ঝড়ু : বেশির ভাগ সময় ক্রিকেটারদের সঙ্গে থাকতে থাকতে একটা সম্পর্ক তৈরী হয়ে যায়। তখন বুঝে যাই আমার দ্বারা কোনটা সম্ভব। হ্যাঁ ভালো কাজ করে অনেক আনন্দ পাই। যার কারণে ভালো প্রস্তাবও পেয়ে থাকি। আর যদি কোনো ভুল হয় তারাও বুঝে নেয় যে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল হয়নি।



প্রশ্ন : এতো কাজ করেন। কখনো প্রশংসিত হয়েছেন?

হাসানুজ্জামান ঝড়ু : কতটুকু কাজ করি তা বলতে পারি না। তবে যতটুকু করার প্রয়োজন ততটুকুই করি। আমার সঙ্গে বিদেশি ক্রিকেটার কিংবা কর্মকর্তার সম্পর্ক ভালো হবে কীভাবে? আমি যদি তাদের প্রয়োজন মেটাতে না পারি তাহলে তো হবে না। এভাবেই তাদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালো হয়েছে। হ্যাঁ, প্রশংসিত হয়েছি। রবি শাস্ত্রী এবার বলেছিল, ‘জিম্বাবুয়েতে তোমার মত ম্যানেজার কোথায় খুঁজে পাবো?’ ধোনি আমাকে বলেছিল ভারতে যেতে। ওখানে ওদের সঙ্গে কাজ করার অফার দিয়েছিল ধোনি। রায়না বলেছিল, ভারতে গেলে যেন তার সঙ্গে দেখা করি। এগুলো ভালো লাগে শুনতে। এতটুকুই। দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটাররাও আমাকে খুব পছন্দ করেছে। ওদের কোচ আমাকে লিয়াজোঁ অফিসার হিসেবে ভারতে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল।



প্রশ্ন : কখনো খারাপ কিছুতে শুনতে হয়েছে?

হাসানুজ্জামান ঝড়ু : খারাপ কিছু বলতে আসলে এবারের কথাই বলি। ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার তারকা ক্রিকেটারদের অটোগ্রাফ পাওয়ার জন্য অনেকেই ব্যাট-বল দিয়েছিল। আমি যদি বলি পারবো না তাহলে মন খারাপ করে খারাপ কথা বলে। আসলে ওনারা তো বুঝবেন না কেন মানা করছি! এবার এগুলোর জন্য হিউজ প্রেসার ছিল। আর এবার এত অটোগ্রাফ দিয়েছে যে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট সংশ্লিষ্টরা মনে করেছে, অটোগ্রাফ দেওয়া ব্যাটগুলো মনে হয় বাইরে বিক্রি করে! তাই সিরিজের শেষ দিকে অটোগ্রাফ দেওয়া থেকে বিরত থাকেন তারা। তবে আমাদের এমওইউতে আছে প্রতিটি সিরিজে ক্রিকেটাররা ২৫টি ব্যাটে অটোগ্রাফ দিয়ে থাকেন।



প্রশ্ন : এই পদে আগ্রহীদের জন্য আপনার পরামর্শ কি থাকবে?

হাসানুজ্জামান ঝড়ু : সাধারণ টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলো যখন কোনো দেশে সফর করে তখন সেই দেশের প্রাক্তন ক্রিকেটারদের লিয়াজোঁ অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে প্রাক্তন ক্রিকেটারদেরকে একটু অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। যদি কেউ এই পদে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করে তাহলে তাকে প্রথমেই সৎ ও ইতিবাচক হতে হবে। সৎ বলতে বোঝালাম, সিরিজ চলাকালীন সময়ে প্রচুর অর্থের লেনদেন হয়। কারেন্সি এক্সচেঞ্জ হয়। এগুলো করতে হলে অবশ্যই সৎ থাকতে হবে। সরাসরি বলি, ‘লোভ’ সামলাতে হবে। ক্রিকেটারদের থেকে ব্যাট, ক্যাপ, জার্সি চাওয়া যাবে না। সেলফির লোভ সামলাতে হবে। কঠোর পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। এটা অনেক বড় একটা কাজ। আত্মবিশ্বাসী হতে হবে। কারণ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের সঙ্গে মিশতে হবে। বিনয়ী হতে হবে। সর্বস্তরের সকলের সঙ্গে ভালো যোগাযোগ বজায় রাখতে হবে। কাজের সমন্বয় থাকতে হবে। কারণ একটা সিরিজ চলাকালীন সময়ে আট-দশটা বিভাগ কাজ করে। সবগুলো বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখতে হবে।

নিউজ পেজ২৪/ইএইচএম