শিল্প সাহিত্য

অগাস্ট ৬, ২০১৫, ৪:৪৬ অপরাহ্ন

ঠাকুরবাড়ির গান || শাকুর মজিদ

নিজস্ব প্রতিবেদক

ছোটবেলায় আমি একটি মাত্র গান গাইতে জানতাম। তাও একা না, স্কুলের সব ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে। ক্লাস শুরুর আগে এসেম্বলির জন্য লাইন ধরে দাঁড়িয়ে গাইতে হতো এই গান- আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।

একটু বড়ো হয়ে জানি এটা আমাদের জাতীয় সঙ্গীত। এটা লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তাঁর একটি কবিতাও আমরা পড়েছি- আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে, বৈশাখ মাঠে তার হাঁটু জল থাকে।
আমার মনে হতো, আমাদের বাড়ির কাছের লুলা গাঙ নিয়ে বোধহয় লেখা এ কবিতা। পরে শুনি, না, ওটা বোলপুরের ময়ূরাক্ষী নদী নিয়ে লেখা, বোলপুরে রবীন্দ্রনাথের আরেক বাড়ির পাশের নদী। তিনি যখন তাঁর নদীর কথা লিখেন তখন এটা আমার নদীও হয়ে যায়, তাঁর মনের কথা আমার মনের, তাঁর গান আমার গান।

সত্তর দশকের গোড়ার দিকে আমি কলেরগান দেখি আমাদের নানা বাড়িতে। ওটা তিনি কলকাতা থেকে এনেছিলেন অনেক আগে। একটা হাতল টেনে এনে অনেকক্ষণ ঘুরিয়ে ওটা চালানো হতো, বড়ো প্লেটের মতো কালো রঙের একটা চাকতি ঢুকিয়ে এর ভেতর থেকে গান বেরুতো। সব নাকী সুরের গান। খুব একটা পছন্দ ছিলো না আমার। কিন্তু আমার নানাকে দেখতাম মাথা নাচাচ্ছেন গানের সঙ্গে সঙ্গে। কিছু ছিলো বাংলা গান, কিছু উর্দু-হিন্দির মতো গজল টাইপের। এই ছিলো আমার গানের সঙ্গে প্রথম পরিচয়।
এর কিছুদিন পর আমাদের বাড়িতে রেডিও আসে। দেখি রেডিওর ভেতর থেকে কথা বের হয়, গানও। ভক্তিমূলক, পল্লীগীতি, ভাওয়াইয়া, আধুনিক, ছায়াছবির গান, রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুল গীতি, হাসন রাজার গান এসব। আমার ভালো লাগতো ছায়াছবির গান। একটি মাত্র রবীন্দ্রসঙ্গীত তখন বার বার রেডিওতে বাজতো; ঘোষণার শুরুতেই আমি বুঝে যেতাম এখন এই গান হবে। বলা হতো- এখন প্রচারিত হবে একটি রবীন্দ্রসঙ্গীত। শিল্পী কাদেরী কিবরিয়া। গানটি হলো- আমার সকল দুঃখের প্রদীপ জ্বেলে দিবস গেলে করব নিবেদন , আমার ব্যথার পূজা হয় নি সমাপন ।
এই গান দিয়ে আমার রবীন্দ্রনাথের গানের সঙ্গে পরিচয়।

সত্তরের দশকের মাঝামাঝি আমাদের বাড়িতে একটা টু-ইন-ওয়ান আসে। সঙ্গে আসে কিছু হিন্দি সিনেমার ক্যাসেট। এক সময় আমি অনেকগুলো বাংলা গানের ক্যাসেট জোগাড় করি। চন্দন পালঙ্কে শুয়ে, জলে ভাসা পদ্ম আমি, আশা ছিলো ভালোবাসা ছিলো, ও নদীরে, কী আশায় বাঁধি খেলা ঘর, কফি হাউজের সেই আড্ডাটা এসব গান শুনি। এগুলো মিক্সড অ্যালবাম। বিভিন্ন শিল্পীর গাওয়া নির্বাচিত আধুনিক গান। শুনি এসব ইন্ডিয়ান শিল্পী, কলকাতার। তখন আমার কাছে পরিচিত হয়, কিশোর কুমার, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, লতা মুঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে এদের নাম। অনেক পরে জানতে পারি এদের মধ্যে লতা মুঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে বাঙালি নন, কিন্তু বাংলা গানও গেয়েছেন।

জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের বাবা দেবেন্দ্রনাথ ব্রাহ্ম ধর্মের প্রবক্তা ছিলেন। তার সাধনার আসরে ব্রহ্মসঙ্গীত গাওয়া হতে থাকে। এগুলো বেশি গাইতেন রবীন্দ্রনাথের ১২ বছরের বড়ো নতুনদা জ্যোতিরীন্দ্রনাথ ঠাকুর । তিনি নিজেই গান লিখে সুর করে গাইতে থাকেন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ শৈশবে বিষ্ণুপদ চক্রবর্তীর কাছে সঙ্গীত বিষয়ে তালিম নেন। তিনি পিয়ানো, ভায়োলিন, হারমোনিয়াম ও সেতার বাজানোয় দক্ষ ছিলেন। সাহিত্য ও সঙ্গীতে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সঙ্গী ছিলেন অক্ষয়চন্দ্র চৌধুরী। পরে রবীন্দ্রনাথ তাদের সাথে যোগ দেন।

এই ঘর, এই পালঙ্ক রবিস্মৃতি ধন্য। এখানেই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কবিগুরু

রবীন্দ্রনাথের এই নতুনদার হাত দিয়েই ঠাকুর বাড়িতে সঙ্গীতের বিপ্লব ঘটে। তিনি যতোটা না লিখতেন ও গাইতেন, তার চেয়ে বেশি সুর দিতেন ও বাজাতেন। প্রথম দিকে রবীন্দ্রনাথের গানগুলোতে সুর দিতেন তিনি। তার ‘মায়ের খেলা’নৃত্যনাট্যে ২০টি গানেই সুর দেন জ্যোতিরিন্দ্রিনাথ। তাঁর আকারমাত্রিক পদ্ধতি বাংলা গানের জন্য একমাত্র প্রচলিত স্বরলিপি। তিনিই সর্বপ্রথম ১৮৬৭ সালের ৫ জানুয়ারি জোড়াসাঁকো মঞ্চে রামনারায়ণ তর্করত্ন রচিত নব-নাটক-এর অভিনয় উপলক্ষে বাংলা রঙ্গমঞ্চে দেশিবিদেশি সুর সমন্বয়ে অর্কেস্ট্রা সৃষ্টি করেন। বাংলা গানের আধুনিকীকরণে বিদেশি সুর ও বাদ্যযন্ত্রের প্রয়োজন সম্মত সংযোজন তখন থেকেই শুরু হয়।
জ্যোতিঠাকুরের জ্যোতি ম্লান হতে লাগলো যখন এ বাড়িতেই তার চেয়ে ১২ বছরের ছোট ভাইটি রবির কিরণ ছড়াতে এলো। বড়োদের ধারা অনুসরণ করে তিনি বাঁধতে লাগলেন ছন্দ ও সুর। তেরো বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন ‘গগনের থালে রবি চন্দ্র দীপক জ্বলে’- সেই থেকে শুরু।

ধীরে ধীরে ঠাকুরবাড়ির এই গুণী কিশোরটির খবর ছড়িয়ে পড়তে থাকে। স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন সে অর্থে রবীন্দ্রনাথের প্রথম প্রমোটার। তিনি নিয়মিত জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে আসা যাওয়া করতেন এবং সেখানে রবীন্দ্রনাথের গান শিখে এসে নানা পারিবারিক অনুষ্ঠানে, ব্রহ্মসমাজের উৎসবে, এমনকি দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়িতে রামকৃষ্ণ পরমহংসের সামনেও সেগুলো গেয়ে শোনাতেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গান লিখেছেন ১,৯১৫টি। ধ্রুপদি ভারতীয় সঙ্গীত, বাংলা লোকসঙ্গীত ও ইউরোপীয় সঙ্গীতের ধারা তিনটিকে আত্মস্থ করে তিনি একটি স্বকীয় সুরশৈলীর জন্ম দেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর বহু কবিতা গানে রূপান্তরিত করেছিলেন।
রবীন্দ্র গানের চারটে পর্যায় ছিলো। প্রথম ভাগে তাঁর নতুনদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্ট গীতের অনুসরণে গান রচনা শুরু করেছিলেন। দ্বিতীয় পর্যায়ে, অর্থাৎ যখন তিনি শিলাইদহে ছিলেন, সে সময়ে পল্লীগীতি ও কীর্তনের অনুসরণে রবীন্দ্রনাথ নিজস্ব সুরে গান রচনা শুরু করেন। এ পর্বের রবীন্দ্র সঙ্গীতে ঊনবিংশ শতাব্দীর বিশিষ্ট সঙ্গীতস্রষ্টা মধুকান, রামনিধি গুপ্ত, শ্রীধর কথক প্রমুখের প্রভাবও সুস্পষ্ট ছিলো। এ সময় থেকেই তিনি স্ব-রচিত কবিতায় সুর দিয়ে গান রচনাও শুরু করেছিলেন।

ঠাকুরবাড়ির উঠানে আলো ছায়ার খেলা

১৯০১ সালে শান্তিনিকেতনে বসবাস শুরু করার পর থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত রচনার তৃতীয় পর্বের সূচনা ঘটে। এ সময় রবীন্দ্রনাথ বাউল গানের সুর ও ভাব তাঁর নিজের গানে অঙ্গীভূত করেন। কুষ্টিয়ার শিলাইদহে থাকার সময় তিনি লালনের যে-সকল গান শুনেছিলেন সে-সবের প্রভাবে ঐরকমের কিছু গান লিখেন, তাঁর সুরটাও এ অঞ্চল থেকে নেয়া। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর রবীন্দ্রনাথের গান রচনার চতুর্থ পর্বের সূচনা হয়। কবির এই সময়কার গানের বৈশিষ্ট্য ছিল নতুন নতুন ঠাটের প্রয়োগ এবং বিচিত্র ও দুরূহ সুরসৃষ্টি। তাঁর রচিত সকল গান সংকলিত হয়েছে ‘গীতবিতান’ গ্রন্থে। এই গ্রন্থের ‘পূজা’, ‘প্রেম’, ‘প্রকৃতি’, ‘স্বদেশ’, ‘আনুষ্ঠানিক’ ও ‘বিচিত্র’ পর্যায়ে মোট দেড় হাজার গান সংকলিত হয়। পরে গীতিনাট্য, নৃত্যনাট্য, নাটক, কাব্যগ্রন্থ ও অন্যান্য সংকলন গ্রন্থ থেকে বহু গান এই বইতে সংকলিত হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তির পর তাঁর নানাদেশে যাওয়ার আমন্ত্রণ আসে এবং সেসকল দেশে গিয়ে তাদের সুরও তিনি গ্রহণ করেন। তাঁর গীতিনাট্যগুলোতেও সে প্রভাব দেখা যায়।

ইউরোপীয় অপেরার আদর্শে ‘বাল্মীকি-প্রতিভা’, ‘কালমৃগয়া’ গীতিনাট্য এবং ‘চিত্রাঙ্গদা’, ‘চণ্ডালিকা’, ও ‘শ্যামা’ সম্পূর্ণ গানের আকারে লেখা। রবীন্দ্রনাথের সময়েও শিক্ষিত পরিবারের মেয়েরা নাচে আসতো না। তিনি এ সময় গানের সঙ্গে ভদ্র মেয়েদের নাচের আয়োজন করেন তাঁর গীতি-নৃত্য-নাট্যগুলোতে। মৃত্যুর কয়েক দিন আগে ১৯৪১ সালে কবি তাঁর জীবনের শেষ জন্মদিন উপলক্ষে রচনা লিখেছিলেন, ‘হে নুতন দেখা দিক আর-বার।’ এটাই ছিলো রবীন্দ্রনাথের লেখা শেষ গান।

২০১৪ সালে কলকাতার ধর্মতলার এক সিডির দোকানে বিগত ১০০ বছর ধরে গাওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীত-এর একটি দুর্লভ সংকলন কিনে আনি। ১৯০৭ সালেই সম্ভবত গ্রামোফোন কোম্পানি রবীন্দ্রনাথের লেখা গান নিয়ে লং প্লে বের করে। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, পঙ্কজ মল্লিক থেকে শুরু করে আজকের অদিতী মোহসিন পর্যন্ত দীর্ঘ তালিকা। কে নেই সেখানে!
কলকাতাকেন্দ্রিক উল্লেখযোগ্য রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পীরা হলেন পঙ্কজকুমার মল্লিক, কুন্দনলাল সায়গল, দেবব্রত বিশ্বাস, কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র, সাগর সেন, চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়, সুমিত্রা সেন, রুমাগুহ প্রমুখ। তবে একালের বিশিষ্ট শিল্পীদের মধ্যে প্রমিতা মল্লিক, স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত, শ্রাবণী সেন, ইন্দ্রাণী সেন, শ্রীকান্ত আচার্যের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

আমার ভালো লাগে কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়, সাগর সেন, আর দেবব্রত বিশ্বাসের গান। ১৯৯৫ সালে আমি যখন একটা সিডি প্লেয়ার কিনি তখন ৭০০ টাকায় প্রথম যে সিডি কিনি তা ছিলো কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের।
রবীন্দ্রনাথের বাড়ি থেকে চুরি করে আম পাড়তে গিয়ে ধরা পড়লেন শিশু অণিমা। বাবা পিতা সত্যচরণ মুখোপাধ্যায় ছিলেন বিশ্বভারতী গ্রন্থাগারের কর্মী ও মা অনিলা দেবী শান্তিনিকেতনের আশ্রমজননী। ১৯৩৫ সালে রবীন্দ্রনাথ তাঁর অণিমা নামটি পরিবর্তন করে ‘কনিকা’ রাখেন। তখন অণিমার বয়স ১১, রবীন্দ্রনাথের ৭৪। রবীন্দ্রনাথের মনে ধরে যায় এ কিশোরী কণ্ঠ, তাঁকে গান শেখানোর জন্য বড়ো ওস্তাদ শান্তিময় ঘোষকে লাগিয়ে দেন। নাম পরিবর্তন করে সঙ্গে ডাকনাম জুড়ে দেন। তিনি ডাকতেন ‘মোহর’ নামে। পরে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর এই মোহর নামটি বিস্তারিত করে বলেছিলেন আকবরী মোহর।

রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর দু’বছর পর ১৯৪৩ সালে বিশ্বভারতীর সঙ্গীত ভবনে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিক্ষিকা হিসাবে যোগদান করেন কনিকা। পরবর্তীকালে বিশ্বভারতীর এমিরিটাস অধ্যাপকও হন তিনি। ১৯৮৪ সালে সঙ্গীত ভবনের অধ্যক্ষের পদ থেকে অবসর নেন কনিকা। শেষজীবন কাটে শান্তিনিকেতনে। দীর্ঘ রোগভোগের পর কলকাতাতেই তাঁর জীবনাবসান হয়। পরে শান্তিনিকেতনের আশ্রমিক শ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
এখনো কেউ যদি আমাকে বলে, আমার প্রিয় রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী কে, আমি বলি কনিকার নাম। ২০১২ সালে রবীন্দ্র সদনের পাশে একাডেমি অফ ফাইন আর্টস মিলনায়তনের উল্টো দিকে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়েলের পাশের উদ্যানের পাশে একটা সাইনবোর্ড দেখি- লেখা মোহর কুঞ্জ। কনিকার একটা পোর্ট্রেট টাঙ্গানো আছে। গান বাজছে ল্যাম্প পোস্টের সঙ্গের সাউন্ড সিস্টেম থেকে। কনিকাকে ভুলতে দেয়নি কলকাতার মানুষেরা। রবীন্দ্র সদনের সবচেয়ে কাছের বাগানটিতে তাকে জিইয়ে রাখা হয়েছে।

ঠাকুরবাড়িতে কবিগুরুর মূর্তির পাশে লেখক

রবীন্দ্র সঙ্গীতের আরেকজন শিল্পী ছিলেন আমার খুব প্রিয় । তিনি দেবব্রত বিশ্বাস। কিন্তু শুনেছি, তাঁর গান নাকি বিশ্বভারতী অনুমোদন দেয়নি। আমার ধারণা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ যদি তাঁর গান শুনতেন, খুশিই হতেন। যেমন হয়েছিলো নজরুলের ক্ষেত্রে।
রবীন্দ্র সঙ্গীতের বিষয়ে বিশ্বভারতীর খবরদারির বিষয়টি শেষ হয়ে যায় ২০০১ সালে। এরপর থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে নানা রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে। রবীন্দ্রনাথের আমলেও কেবল মাত্র নতুনদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ বা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের সুর করা গানকেই রবীন্দ্রসঙ্গীত বলা হতো। এমনকি রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকে কেউ সুর করে গান বানালে সেটা রবীন্দ্রসঙ্গীত হতো না। এখন এটা প্রায় উন্মুক্তই হয়ে গেছে। রবীন্দ্রনাথের গানের কথা নিয়ে যে কেউই সুর করে গাইতে পারছেন। মূল সুরের সঙ্গে অনেক বেশি ব্যঞ্জনা সহযোগে হচ্ছে সেসব গান এবং আমার বেশ ভালোই লাগে শুনতে। মূল সুরের গান শুনে আমি যেমন আদিকালের গন্ধটা পাই, নতুন সুরের পাগলা হাওয়ার সাথে উ লা লাও আমার ভালো লাগে।

কপাল খারাপ দেবব্রতের। ১৯৬৪ সালে দেবব্রত বিশ্বাসের গাওয়া ‘মেঘ বলেছে, যাব যাব’ ও ‘এসেছিলে তবু আসো নাই’ গান দুটি প্রকাশের অনুমতি দিতে বিশ্বভারতী সঙ্গীত সমিতি অস্বীকার করে। ১৯৬৯ সালেও তাঁর আরো দুটি গানের অনুমতিও তারা দেয়নি। দেবব্রত বিশ্বাসের বিরুদ্ধে গানে অতিনাটকীয়তা, অতিরিক্ত বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার ইত্যাদির অভিযোগ এনেছিল বিশ্বভারতী। বিরক্ত হয়ে দেবব্রত বিশ্বাস স্থির করেন, তিনি আর রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করবেন না।

আমি মনে করি, রবীন্দ্রনাথ যে পরিমাণ আধুনিক ছিলেন, দই-বড়া-পিঠা-পুলির সঙ্গে কেক প্যাস্ট্রি যে পরিমাণ পছন্দ করতেন আর দেশ বিদেশ ঘুরে যেখানে যে সুর ও যন্ত্র পেতেন সেগুলো যেভাবে নিয়ে আসতেন, তিনি এ আর রহমানকে পেলে তাঁকে দিয়েই তাঁর গানের যন্ত্রানুষঙ্গ করতেন।

বাংলা চলচ্চিত্রে রবীন্দ্র সঙ্গীতের প্রয়োগ শুরু হয় ১৯৩৭ সালে, সবাক বাংলা চলচ্চিত্র আগমনের ৫ বছরের মাথায়। নিউ থিয়েটার্স প্রাইভেট লিমিটেড প্রযোজিত ও প্রমথেশ বড়ুয়া পরিচালিত ‘মুক্তি’ চলচ্চিত্রে প্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীত ব্যবহার করা হয়। ১৯৩৭-৩৮ সালের দিকে কলকাতার প্রায় সমস্ত বাংলা সিনেমায় নজরুল আর রবীন্দ্রনাথের গান ব্যবহার হতো। এরপর সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, গৌতম ঘোষ, ঋতুপর্ণ ঘোষ প্রমুখ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরিচালকগণ তাঁদের ছবিতে সার্থকভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রয়োগ করেছেন।

পরবর্তীকালে কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, দেবব্রত বিশ্বাস, সুবিনয় রায়, চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়, সাগর সেন, ঋতু গুহ, গীতা ঘটক প্রমুখ শিল্পীরা রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। তাঁদের অনুপ্রেরণায় লতা মুঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, কিশোর কুমার প্রমুখ বিশিষ্ট বলিউড-শিল্পীরাও রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়েছিলেন। বাংলা আধুনিক ও চলচ্চিত্রের গানসহ অন্যান্য ধারার সঙ্গীত শিল্পীরাও রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়েছেন। পূর্ব পাকিস্তানের স্বৈরশাসনের প্রতিবাদে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ওয়াহিদুল হক, কলিম শরাফি, সনজীদা খাতুন প্রমুখ শিল্পীরা বাংলাদেশে রবীন্দ্রসঙ্গীত বিশেষ জনপ্রিয় করে তোলেন।

বাংলাদেশে সিনেমার গানে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রথম ব্যবহার করেন জহীর রায়হান ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছবিতে। গানটি ছিলো- আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি । তখন বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের গান গাওয়া নিষেধ করা হয়েছিলো। পরে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে এ গানটিই জাতীয় সঙ্গীত হয়। অনেক চলচ্চিত্রে তাঁর গান শুধু ব্যবহারই হয়নি, তাঁর গানের পঙ্ক্তি দিয়ে সিনেমার নামও রাখা হয়েছে।

আলাদাভাবে বাংলা গান আমার কানে লাগিয়েছিলেন প্রথমে কিশোর কুমার। তিনি যদিও বাঙালি কিন্তু কলকাতার নন। আভাষ কুমার গঙ্গোপাধ্যায় ছিল তাঁর নাম। জন্ম হয়েছিল মধ্য প্রদেশে ১৯২৯ সালে। সেখান থেকে বড় ভাই অশোক কুমারের হাত ধরে বোম্বে (মুম্বাই) চলে যান সিনেমায় অভিনয় করার জন্য। করেনও অনেকগুলো হাসির সিনেমা। কিন্তু বড় সাফল্য আসে তার গানে। ১৯৬৯ সালে শক্তি সামন্তের ‘আরাধনা’ ছবিটি মুক্তি পেলে তার ভাগ্য বদলে যায়। পরবর্তীতে সে-সকল গানই আবার তিনি তার মাতৃভাষা বাংলায় গান। সেই গানগুলো গাইবার সময় এক ধরনের গলা কাঁপানী ছিলো, সেটা তন্ময় হয়ে শুনতাম। এক সময় তাঁর গাওয়া একটা রবীন্দ্র সঙ্গীতের ক্যাসেটও আমার সংগ্রহে ছিলো। আশির দশকের গোড়ার দিকে তার পুত্র অমিত কুমারের গানও আমরা শুনি। ঠিক একই সময় বাপ্পী লাহিড়ী আসেন তার ‘সোনার আখর’ নিয়ে। কিশোর কুমারের মতো গলা হলে শিল্পীরা নিজের নাম পর্যন্ত পাল্টাতে সময় নেন না। দুই বাংলায় এমন দুজনকে চিনি আমি। একজন বাংলাদেশের এন্ড্রু কিশোর, অপরজন কলকাতার কুমার শানু। দুজনই অত্যন্ত ভালো গায়ক। তাঁরা ছোটবেলা থেকেই কিশোর কুমারকে আইডল মনে করে গান গেয়েছেন। হয়েছেনও বড় শিল্পী। শুধু মাঝখানে নামটা যুক্ত হয়েছে কিশোর কুমার থেকে।

কলকাতাবাসী ধরে রেখেছেন কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতি

এক সময় নিধু বাবুর হাত ধরে যে বাংলা আধুনিক গানের সূচনা হয়েছিলো, তাঁর বিকাশ ঘটতে শুরু করলো জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি। এই ঠাকুরবাড়ির গানই এক সময় হয়ে যায় বাঙালির গান। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের গলা থেকে রবীন্দ্রনাথের গলায় যখন এ গানগুলো গেলো বাঙালি পেলো নতুন সুরের ধারা। সে পথ ধরে রচিত হয়েছিল আধুনিক গীতশৈলীর রূপকার পঞ্চগীতিকবিদের যুগ। এ ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একটি স্তম্ভস্বরূপ। সঙ্গীতের বিভিন্ন ধারার প্রয়োগে এবং নিত্যনতুন সাঙ্গীতিক রূপ উদ্ভাবনে তাঁর প্রজ্ঞা বাংলার সঙ্গীতজগৎ-এ ভাস্বর হয়ে আছে। তিনি ধ্রুপদের চারটি তুক- স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী ও আভোগ বেশির ভাগ গানে ব্যবহার করেছেন, যা পরবর্তীকালে আধুনিক গানের গঠনধারায় প্রযুক্ত হয়। আর এ যুক্তির পেছনে ছিলো রবীন্দ্রনাথের বাউল ভ্রমণ। কুষ্টিয়া থেকে শান্তিনিকেতনে চলে আসার পর ধ্রুপদ, খেয়াল, টপ্পার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলো বাউল, কীর্তন প্রভৃতি ধারার অনুষঙ্গ। এবং আজকের যুগের কালিকাদের মতো আধুনিক বাউল শিল্পীদের হাতে পড়ে এটা পাচ্ছে নতুন ব্যঞ্জনা।

বিশ্বভারতীর খবরদারী উঠে যাবার পর কিন্তু রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে নানা রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা হচ্ছে। ফোকের সঙ্গে যেমন ফিউশন যুক্ত হয়েছে, রবীন্দ্রনাথের গানকেও নানা ঢঙে গাওয়া হচ্ছে, একে আরো প্রাণবন্ত করার চেষ্টায়। রবীন্দ্রনাথ গত হয়েছেন প্রায় চুয়াত্তর বছর আগে। কিন্তু আজকের এক আধুনিক গানের শিল্পীও যখন মার্গ সঙ্গীত ও দেশী সঙ্গীতের মিলনে এক অপূর্ব সঙ্গীত তৈরি করেন, তখন শ্মশানঘাট থেকে বার বার রবীন্দ্রনাথই উঠে আসেন।

ছবি : লেখক



নিউজ পেজ২৪/ইএইচএম