খোলা কলাম

অগাস্ট ১৪, ২০১৫, ৫:১১ অপরাহ্ন

ব্লগার হত্যার জীবনচক্র

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিলয় হত্যার প্রাথমিক ধাক্কাটা সরকার কাটিয়ে উঠেছে। সাংবাদিক সম্মেলন, বিশিষ্টজনদের বক্তব্য সবই প্রায় এসে গেছে। অপরাধীকে সনাক্ত করা গেছে, পুলিশের সামনে পড়লে রক্ষা নেই এসব বক্তব্যও শেষ। এবার সময় সিদ্ধান্ত জানাবার। সবাই অপেক্ষা করে আছে, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র ধ্বজাধারী সরকার কোনদিকে হেলে। সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় মনে আঘাত পেতে পারে কিংবা তাদের সন্দেহের চোখে দেখা শুরু করতে পারে এমন কোনো বক্তব্য দেবে কি-না?

উত্তর আসতে শুরু করেছে। মনে হচ্ছে ‘ব্লগার’ প্রশ্নে আওয়ামী সরকার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। আগের দিন পুলিশের তরফ থেকে আসায় অনেকে ভেবেছিলেন, এটা পুলিশের সেই কর্তাব্যক্তিটির বক্তব্য। তবে মনে হয় এখন আর তেমন কোনো বিভ্রান্তি নেই। বিশেষ করে এখন, যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তরফ থেকেও বক্তব্য এসে গেল। ফর্মুলা পরিষ্কারÑ ‘না রাহেগা বাঁশ, না বাজেগি বাঁশুরি’। নাস্তিকপন্থি লেখাও থাকবে না, ব্লগার হত্যার দরকারও পড়বে না। আপাতত এই হচ্ছে সরকারি অবস্থান।

অন্য দলগুলোর অবস্থান নিয়ে তেমন কোনো ঔৎসুক্য কারোরই নেই। রাজনীতিতে জাতীয় পার্টি এমনিতেই তো দুধ-ভাত, তার বক্তব্য থাকলেই কি আর না থাকলেই কি। বিএনপির বক্তব্য যদিও জানা তারপরও মুখে বললে অনেকেই শুনত। তবে তাদেরও সমস্যা আছে।

মুখপাত্রের বেশ আকাল। আর যাও বা দু-একজন সাহস করে কিছু বলতে আসেন, তিনি আর ফিরতে পারেন না। বক্তা হয় গ্রেফতার হন আর নয়তো অফিসে রাত কাটাতে হয়। জামায়াত মুখে যাই বলুক, ধরে নেওয়া হবে, এই হত্যায় তাদের মৌন সমর্থন আছে। ফলে দেশের ব্লগার বাহিনীর একমাত্র আশা ছিল, আওয়ামীদের ঘিরে। সেই আশায় এখন বালি কিচকিচ করছে।সো?

হোয়াট ইস নেক্সট? ব্লগারবাহিনী কি থামবে? ধর্মবিদ্বেষী লেখালেখিতে কি বিরাম লাগবে? মনে হয় না। তবে আপাতত তারা মনোযোগ দেবে আওয়ামীদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য চাপ প্রয়োগ করতে। ব্লগ, ফেসবুকে যা কিছু লেখালেখি দেখলাম, তার বেশিরভাগই সে জাতীয়। ‘আওয়ামীরা ভুল করছে’ কিংবা ‘এভাবে হত্যা থামানো যাবে না’, ‘এই সমঝোতার পরিণতি হবে ভয়াবহ’। লেখাগুলো কি সরকারের নেতৃস্থানীয় কেউ পড়ছেন? হয়তো। তাতে পরিস্থিতির পরিবর্তন কি হবে? নিজের অবস্থান ছেড়ে কেউ কি নড়বে? সেটাই এ মুহূর্তের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। উত্তর স্পষ্টভাবে হয়ত পাওয়া যাবে না, তবে একটা আন্দাজ পাওয়া যাবে। তখন বোঝা যাবে। সামনের দিনগুলোতে তখন স্পষ্ট হয়ে উঠবে, কি হতে যাচ্ছে ধর্মবিদ্বেষী লেখালেখির ভবিষ্যৎ।

আগের হত্যাগুলোর ক্ষেত্রে যেহেতু, হত্যাকারী ধরার ক্ষেত্রে তেমন কিছু অগ্রগতি হয়নি, এবারও যে হবে না, তা সম্ভবত সবাই কমবেশি মেনে নিতে শুরু করেছেন। পুলিশও তাই, তাদের কেসের অগ্রগতি নিয়ে কথা না বলে, জ্ঞান বিতরণেই বেশি মনোযোগী হচ্ছেন।

ব্লগার বাহিনীও আগামী কিছুদিনে ‘অনুভূতি’সংক্রান্ত তাদের পুরনো কিছু যুক্তি আবার তুলে ধরবেন। উদাহরণ তুলে ধরবেন, কিভাবে একটি কথা বললেই, কারও না কারও অনুভূতিতে আঘাত লাগবেই। আসবে হিন্দু বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া প্রসঙ্গ। আসবে বৌদ্ধমন্দির জ্বালানোর কথা। আসবে ধর্মীয় নেতাদের কুকর্মের বর্ণনা। এরপর? আগেরবারের পরে যা ঘটেছিল, এবারও তাই হবে। স্মৃতিভ্রংশ।

মুমূর্ষু ‘গণজাগরণ’ মোটামুটি হাতে আকাশের চাঁদ পেয়েছে। শুরু হয়ে গেছে তিড়িংবিড়িং। একটা ‘আল্টিমেটাম’ও দিয়েছে। সম্প্রতি একটা সমাবেশও সেরেছে। কিছু হুমকিও জোগাড় করেছে। এখন চেষ্টা চলছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সঙ্গে এ হত্যাগুলোকে জড়ানোর। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ‘যুদ্ধাপরাধী’, ‘মুক্তিযুদ্ধ’, ‘চেতনা’ এত বেশি ব্যবহার করেছে যে, বিষয়গুলোর প্রতি জনগণের সহানুভূতির বারোটা বাজিয়েছে। বিভিন্ন দলের কাছে বিভিন্ন সময় বিক্রি হয়ে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা এতটাই নিচে নামিয়েছে যে, এখন ‘সত্য বাঘ এলেও’ কেউ আর ডাকে সাড়া দেয় না।

এ মুহূর্তে সরকারের সবচেয়ে বড় চাওয়া হচ্ছে, নতুন কোনো ঘটনা। দারুণ এক্সাইটিং, ‘হেড লাইন গ্র্যাবিং’ আর মুখরোচক কিছু। সরকারের দুর্নীতি নিয়েও হতে পারে, সফলতা নিয়েও হতে পারে।

দেশে কিংবা বিদেশে কোনো বাংলাদেশির কীর্তি। নারীঘটিত কেলেঙ্কারি কিংবা নৃশংস কোনো খুন। তবে অবশ্যই সেটা কোনো ব্লগারের না কিংবা ব্লগসংক্রান্ত কোনো ব্যক্তির না। শিরোনাম থেকে এই হত্যাটা সরে গেলে আপাতত কোনো ঝামেলা নেই। আবার সেই পুরনো নিয়মে চলতে থাকবে লেখালেখি। সেই পুরনো স্টাইলে হুমকি। এবং আবার একদিনৃ
পূর্ণাঙ্গ সমাধান কি? কিংবা আদৌ দুপক্ষকে খুশি করা কোনো সমাধান আসা সম্ভব কি-না?

‘আমরা লিখছি, তোমরাও পারলে লেখ’ ব্লগারদের এই যুক্তিতে কি উগ্রপন্থি গ্র“প সম্মত হবে? কিংবা ‘পৃথিবীতে বহু বিষয় আছে, এই একটা বিষয় ছাড়া বাকিগুলো নিয়ে লেখ, আমরা কিছু করব না’ এমন কোনো প্রস্তাব কি ব্লগারবাহিনী মেনে নেবে? আর সরকারের যে অবস্থান, ‘তুমিও লিখবা না’ আর ‘তুমিও কোপাবা না’ সেটাই বা কতটা ফলপ্রসূ হবে? আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশ সম্পর্কে যে ছবি যাচ্ছে তারই বা কি বিহীত হবে?


ব্লগারহত্যা ইস্যু কিভাবে শিরোনাম থেকে সরবে, এখনও বলা যাচ্ছে না। পনেরই আগস্ট আসছে। সেকারণে এমনিতে হয়তো সরে যাবে। আর শিরোনাম থেকে সরার সাথে সাথে চিৎকার চেঁচামেচিও থেমে যাবে। সমাবেশ, প্রতিবাদ, আল্টিমেটাম নিয়ে কথা বলার কেউ থাকবে না। সরকারকে দায়ী করে লেখালেখিগুলোও কমে আসবে। কিছু ব্লগার দেশ ছাড়ার চেষ্টা করবে। কেউ কেউ থেকে যাবে। একসময় সবকিছু আগের মতোই শুরু হবে। এবং তখন আবার একদিন ।


নিউজ পেজ২৪/ইএইচএম