খোলা কলাম

অগাস্ট ১৯, ২০১৫, ৮:৫৩ অপরাহ্ন

তিন মাহমুদের ভয়েই সন্ত্রস্ত সরকার!

ডক্টর তুহিন মালিক

এরা তিনজন। ভিন্ন ভিন্ন তিনজন মাহমুদ। একজন নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না। দ্বিতীয়জন আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। তৃতীয় ব্যক্তিটি হচ্ছেন ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সভাপতি শওকত মাহমুদ এবং সেই সাথে ‘আদর্শ ঢাকা আন্দোলন’ নামক ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনকেন্দ্রিক পেশাজীবী সংগঠনের মহাসচিব।
ডাকসুর ভিপি সাবেক মাহমুদুর রহমান মান্না আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। তিনি কখনো আওয়ামী লীগ থেকে বা তার পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন কি না কিংবা দল থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে কি না, কোনোটাই অদ্যাবধি কারো কাছে স্পষ্ট নয়। সাদামাটা সত্যবাদী সৎ এ মানুষটি আওয়ামী লীগের অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপের একজন সমালোচক ছিলেন। তবে নিজ দলের সমালোচনার ক্ষেত্রে বরাবরই নিয়ন্ত্রণ রেখাটিকে মেনেই পত্রিকায় কলাম ও টকশো করতেন। হঠাৎ করে নাগরিক ঐক্য নামের বিকল্প রাজনৈতিক প্লাটফর্ম তৈরি করে ঢাকা সিটি করপোরেশনের উত্তরের মেয়র হিসেবে প্রচারণা চালান। ব্যস, এতেই যেন অন্তরাত্মা কেঁপে গেল ক্ষমতাসীনদের! দলের লোক দলের বিরুদ্ধে পাকা পাকা কথা বলবে কেন? সরকার ভীত হয়ে গেল, যেন মান্নার নাগরিক ঐক্যের মতো সংগঠন দিয়েই সরকারের পতন ঘটে যাচ্ছে! মান্নার একটি টেলিফোন আলাপচারিতাকে বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়ে সোজা জেলে ঢুকানো হলো তাকে। রাজক্রোধ যে কতটুকু নির্মম, তা হয়তো মান্না ভাই জেলজীবনে সাধারণ কয়েদিদের মতো চিকিৎসাবঞ্চিত হয়ে হাড়ে হাড়েই টের পাচ্ছেন।

দ্বিতীয় মাহমুদ হচ্ছেন সাম্প্রতিক সময়ে দেশের একজন অকুতোভয় বীরপুরুষ আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। বিএনপি আমলে জ্বালানি উপদেষ্টা থাকলেও একজন সৎ মেধাবী নিষ্ঠাবান মানুষ হিসেবে তার সর্বজনবিদিত সুনাম রয়েছে। সাংবাদিক না হয়েও তার সত্য-বলিষ্ঠ লেখনী শক্তি ও সাহসী সংবাদ দিয়ে রাতারাতি তিনি সংবাদজগতের অনেকটা মিথেই পরিণত হয়ে যান। তার সততা ও বলিষ্ঠতায় ভীত হয়ে তার বিরুদ্ধে প্রচণ্ড দমননীতি চলতে থাকে। এখানেও অবস্থাটা যেন এমন, আমার দেশ পত্রিকা দিয়েই বোধহয় সরকারের পতন হয়ে যাচ্ছে! দেশপ্রেম ও ঈমানি শক্তিতে বলীয়ান এ মানুষটিই আজ সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার। দুদকের মামলায় তার বিরুদ্ধে কোনো একটা অভিযোগই প্রমাণ করা গেল না আদালতে। অথচ নোটিশ গ্রহণ না করার তুচ্ছ অভিযোগে তিন বছরের জেল দেয়া হলো। সাথে বোনাস হিসেবে আদালত অবমাননার ছয় মাসের শাস্তি তো আছেই।
তৃতীয় মাহমুদ হচ্ছেন ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সভাপতি শওকত মাহমুদ। তিনি আবার বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা। তার অপরাধ সেখানে নয়। অপরাধ হচ্ছে, ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের অনিয়ম নিয়ে কেন তিনি সংবাদ সম্মেলন করবেন? সরকার এ ক্ষেত্রেও মনে করেছে ‘আদর্শ ঢাকা আন্দোলন’ নামের পেশাজীবীদের এ সংগঠনটি যদি সংবাদ সম্মেলন করে সিটি নির্বাচনের সব অনিয়ম প্রকাশ করে দেয়, এবং এটা বিদেশীরা জেনে গেলে যদি মধ্যবর্তী নির্বাচনের জন্য চাপ সৃষ্টি করে, আর তাতে যদি সরকারের ক্ষমতা হারাতে হয়? সেই সাথে এখন আরেকটি মোক্ষম সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যুদ্ধাহত সাংবাদিক প্রবীর সিকদারের ঘটনার ওপর মলম হিসেবে সরকারবিরোধী আরেক সাংবাদিক নেতাকে জেলে ঢুকাতে পারা! সরকারের হাতে মামলার তো আর অভাব নেই। বাস পোড়ানো আর পেট্রলবোমা মারার অপরাধ তো এখন শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, চিকিৎসকসহ এম কে আনোয়ারের মতো ৮৪ বছরের নেতারাই করছেন!

তিন মাহমুদের কারণেই যদি গদি হারানোর এত ভয় থাকে, তবে সাধারণ মানুষ সত্যি সত্যিই যেদিন জেগে উঠবে সেদিন কী করবেন? নিরীহ সমালোচকদের ওপর আর অনর্থক নির্যাতন না করে বরং সমালোচকদের গঠনমূলক পরামর্শগুলোকে আমলে নিয়ে নিজেদের ভুলত্র“টি শুধরে নিন। সহস্র চাটুকারের চেয়ে একজন তিক্ত সমালোচক অধিক বেশি কল্যাণকর। আসলেই যারা দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী, চোর, কালো টাকার মালিক- এসব রাজনীতিবিদকে দলমত নির্বিশেষে দমন করুন। কিন্তু ক্ষমতায় থাকার লোভে দুষ্টদের লোক দেখানো বিচারের নামে সমঝোতা করে ছাড় দিচ্ছেন, আর অন্য দিকে শিষ্টদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালাচ্ছেন কেন?
লেখক : সুপ্রিম কোর্টের আইনজ্ঞ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ
drtuhinmalik@hotmail.com

নিউজ পেজ২৪/আরএস