খোলা কলাম

অগাস্ট ২০, ২০১৫, ৮:২৮ অপরাহ্ন

মূল্যবোধের অবক্ষয় ও সরকারি দলের অপকর্মের প্রতিযোগিতা

ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম

মহান আল্লাহ তা’য়ালার অগণিত সৃষ্টির মধ্যে মানুষকে সর্বাধিক মর্যাদা দিয়েছেন। মানুষকে আখ্যায়িত করা হয়েছে আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে। আল্লাহ বলেন : ‘তিনি সে মহান সত্তা যিনি মানবজাতির কল্যাণে পৃথিবীর সবকিছু সৃষ্টি করেছেন।’ মহানবী (সা) বিদায় হজের ভাষণে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করে বলেন: ‘তোমাদের এই পবিত্র শহরে এই পবিত্র মাসে আজকের এই দিনটি যেমন পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ তেমনি তোমাদের পরস্পরের রক্ত, তোমাদের পরস্পরের ধন-সম্পদ এবং পরস্পরের মান-সম্মানও পবিত্র এবং মর্যাদাপূর্ণ।’ মানুষের ধন-সম্পদ, রক্ত ও মান-সম্মানের নিশ্চয়তা দিয়ে বিদায় হজের ভাষণে তিনি যে ঘোষণা করেছেন, বস্তুত মানবজাতি ছাড়া কোন সৃষ্টি সম্পর্কে এরকম কথা বলা হয়নি।

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন: ‘যে ব্যক্তি হত্যা বা সন্ত্রাস ব্যতীত কোন নিরপরাধ লোককে হত্যা করে, সে যেন পৃথিবীর সকল মানুষকে হত্যা করল। আর যে ব্যক্তি এমন নিরপরাধ মানুষকে বাঁচাল সে যেন সকল মানুষকে বাঁচাল। এর দ্বারা একজন মানুষের মর্যাদা তার জীবন ও সম্মানের প্রতি ইসলাম কতটুকু গুরুত্ব প্রদান করেছে, তা সহজেই অনুমেয়। পৃথিবীর অন্য ধর্ম বা আইনে এত বড় নিশ্চয়তা দিয়েছে বলে নজির নেই।

মানুষকে আল্লাহ তায়ালা একদিকে কর্মের স্বাধীনতা দিয়েছেন অন্যদিকে পরীক্ষার জন্য তার দেহে দিয়েছেন দুটি সত্তা, ১) Humanity (মানবতাবোধ) ২) Animality (পশুত্ব)। Humanity যখন Animality এর উপরে বিজয়ী হয় তখনই মানুষ নামক আসল ব্যক্তিটি মানুষের চোখে পরিগ্রহ হয়। তার কাছে মানবতাবোধ ও কল্যাণ ছাড়া কিছুই আশা করা যায় না। Animality বা পশুত্ব যখনই Humanity বা মানবতাবোধের উপরে বিজয়ী হয় তখন মানুষের দেহ নামক খোলসটি হয়ে পড়ে অন্তঃসারশূণ্য, হারিয়ে ফেলে তার মনুষ্যত্ব। আজকের সমাজে যেনো সে পশুত্বেরই জয়জয়কার। মানবতা যেন ডুকরে কাঁদছে।

মহাগ্রন্থ আল কুরআনে বলা হয়েছে “আর এটি একটি অকাট্য সত্য যে, বহু জিন ও মানুষ এমন আছে যাদেরকে আমি জাহান্নামের জন্যই সৃষ্টি করেছি। তাদের হৃদয় আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা উপলব্ধি করে না। তাদের চোখ আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা দেখে না। তাদের কান আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা শোনে না। তারা পশুর মত বরং তাদের চাইতেও অধম। তারা চরম গাফলতির মধ্যে হারিয়ে গেছে।” (সূরা: আরাফ-১৭৯)

জাতীয় জীবনে আজ সামাজিক মূল্যবোধ সম্পূর্ণ ভূলুণ্ঠিত। মনে হ্েচ্ছ যার যত ক্ষতি করার ক্ষমতা তার প্রভা-প্রতিপত্তি তত বেশি। আজ এমন এমন জঘন্য অপরাধ সংঘঠিত হচ্ছে যা পশু থেকে আরো নিম্নপর্যায়ে আমাদের মর্যাদাকে নামিয়ে দিয়েছে। হার মানাচ্ছে আইয়্যামে জাহিলিয়াতকেও। অথচ সমাজে কেউই অপরাধী হিসেবে জন্মগ্রহণ করে না। সমাজই তাদের অপরাধী করে তোলে। সামাজিক ব্যবস্থাই এর জন্য দায়ী। ব্যক্তি ও সমাজের ঠিক লক্ষ্যে পরিচালনার দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। কিন্তু সে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আজ ব্যর্থ।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকেCharles Booth, ÔLife and Labour of the People of London শীর্ষক যে গ্রন্থ রচনা করেন তাতে অপরাধ সম্পর্কে বিশদ আলোচনা স্থান পায়। শিল্পায়নের ফলে প্রগতির সাথে সাথে যে নতুন ধরনের সামাজিক সমস্যা বিশেষ করে অপরাধ সৃষ্টি হয় সে সম্পর্কে Booth অবগত ছিলেন। তিনি এসব সামাজিক সমস্যা দূরীকরণের জন্য সমস্যার গভীরে প্রবেশ করে অপরাধ সম্পর্কে বিজ্ঞানভিত্তিক পন্থায় তথ্যাবলি সংগ্রহ করেন।

আমেরিকবাসীরা মনে করত যে, অপরাধ, পাপাচার, দারিদ্র এবং নীতিবর্জিত কাজ সবই মূলত একইভাবে সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে দোষণীয়। কিন্তু তারা অপরাধ নির্মূলের জন্য বিশেষ কোন পন্থা গ্রহণ করতে পারেনি। কারণ এটি মূল্যবোধ বিকাশ ছাড়া কি সম্ভব?

অপরাধ এবং অপরাধীর আচরণ সমাজের মানুষকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। তাই যুগ যুগ ধরেই অপরাধ তথা অপরাধী সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা করতে দেখা যায়। হোমারের কাব্যে প্রতিফলিত হয়েছে অপরাধের কাহিনী। শেক্সফিয়ারের হেমলেট, মার্চেন্ট অব ভেনিসের শায়লক এবং এনটোনীও কাহিনী মূলত অপরাধ এবং মানবীয় আচরণের এক বিশেষ চিত্র। অপরাধ সম্পর্কে কাব্য, প্রবন্ধ, নাটক, উপন্যাস, চলচ্চিত্র ইত্যাদি তৈরি হয়েছে। কিন্তু অপরাধের কোনই কুলকিনারা করা যাচ্ছে না।

আজকের সময়ে জীবন, সম্পত্তি এবং স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অপরাধী এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। রাষ্ট্রকে নাগরিকের জীবন, সম্পত্তি এবং স্বাধীনতা রক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এটি নাগরিকের প্রতি কারো করুণা নয় বরং দায়িত্ব। কেউ নাগরিক অধিকার ক্ষুণœ করলে রাষ্টই আইনের প্রয়োগ করে অপরাধীকে চিহ্নিত করে তার শাস্তি বিধান করে সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত করবে। কিন্তু বর্তমানে দেশের নাগরিক, রাষ্ট্রের নিকট আশ্রয় তো দূরের কথা বরং নিগৃহীত হচ্ছে। বাংলাদেশ এখন সেই নিপীড়ক রাষ্ট্রের নাম। যেখানে মানবাধিকার ভূলুন্ঠিত। আইনের শাসন বিরোধী মতের জন্য এক, শাসক গোষ্ঠীর জন্য ভিন্ন।

গায়েব ইযিজিওফোর মৌলিক অধিকারের সংজ্ঞা এভাবে দিয়েছেন, “মানবীয় অথবা মৌলিক অধিকার হল সেইসব অধিকারের আধুনিক নাম যাকে ঐতিহ্যগতভাবে অধিকার বলা হয় এবং তার সংজ্ঞা এই হতে পারে যে, সেইসব নৈতিক অধিকার যা প্রত্যেক ব্যক্তি প্রতিটি স্থানে এবং সার্বক্ষণিকভাবে এই কারণে পেয়ে থাকে যে, সে অন্যান্য সকল সৃষ্টির তুলনায় বোধশক্তি সম্পন্ন ও নৈতিক গুণাবলীর অধিকারী হওয়ায় উত্তম ও উন্নত। ন্যায়বিচারকে পদদলিত করা ব্যতিরেকে কোন ব্যক্তিকে এসব অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় না”

রাষ্ট্র নাগরিককে শাসন করবে। কিন্তু এই কাজটি করবার জন্য তার সমর্থন প্রয়োজন। সে সমর্থন যদি না থাকে তাহলে মানুষকে শাসন করার নৈতিক শক্তি সে সরকারের থাকে না। ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে এই সরকার সে নৈতিক শক্তি হারিয়েছে। তাই নাগরিক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিতদের আর মানতে চাচ্ছে না। কারণ জোর করে মানুষকে বেশীদিন শাসন করা যায় না। এই অবৈধ সরকারের শাসন যতদীর্ঘায়িত হচ্ছে। অপরাধ তত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

৭২-৭৪ এর মত হঠাৎ করেই যেন প্রতিদিন আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অপরাধ। ”রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে চুরি, ডাকাতি, খুন, ছিনতাই, ধর্ষণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। তুচ্ছ ব্যাপার নিয়েও ঘটছে খুনের ঘটনা। ঘরে বাইরে কোথাও নিরাপত্তা নেই। মায়ের পেটেও ঘাতকের বুলেটের নির্মম আঘাতে শিকার নবজাতক। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিঙ্ক রোডে যাত্রীভর্তি চলন্ত বাস থামিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এক ব্যবসায়ীকে। নোয়াখালীতে এক সঙ্গে তিন ভাইকে গলা কেটে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। গোপালগঞ্জে এক যুবককে হত্যার পর তার চোখ উপড়ে ফেলা হয়। ঈদের আগে সিলেটে চোর সন্দেহে পিটিয়ে রাজন নামে এক কিশোর হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় হয়েছে। তার রেশ কাটতে না কাটতেই খুলনায় আরেক কিশোর নৃশংসভাবে খুন হয়েছে। খুনের পাশাপাশি একই সঙ্গে বেড়ে গেছে ধর্ষণ-গণধর্ষণের ঘটনা।

গত কয়েক দিনে খোদ রাজধানীতেই কয়েকজন কর্মজীবী তরুণী ও কলেজছাত্রী গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ঢাকার বাইরে হরহামেশাই ঘটছে এমন ঘটনা। চুরি-ডাকাতিও বেড়েছে আগের চাইতে অনেক বেশি। বেড়েছে ছিনতাইয়ের ঘটনাও। রাজধানীতে একটি মোটরসাইকেল ছিনতাই করে পালিয়ে যাওয়ার সময় ছিনতাইকারীরা এক পুলিশ কনস্টেবলকে চাপা দিতেও দ্বিধা করেনি। সাধারণ মানুষের মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার প্রবণতাও বেড়ে গেছে। নৃশংসভাবে হত্যা করা হচ্ছে ছোট্ট শিশুদেরও। মঙ্গলবারও রাজধানীতে সুটকেসের ভেতর থেকে এক শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক এক সংস্থার তথ্য মতে, শীর্ষ ১০ অপহরণের দেশ হিসেবে বাংলাদেশের নামও রয়েছে।

আইন-শৃঙ্খলা অবনতির কারণেই সমাজে অপরাধ বেড়ে যায়। বেপরোয়া হয়ে ওঠে অপরাধীরা। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা গোয়েন্দা নজরদারিতে ব্যর্থ হচ্ছে। কারণ পুলিশ এবং আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন রাজনৈতিক বিরোধী মত দমনেই ব্যস্ত। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশ জড়িয়ে পড়ছে অপরাধে। একটি অংশ হিমশিম খাচ্ছে ভিআইপি পাহারা নিয়ে। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন নিজেদেরকে সরকারের ভাবতে শুরু করেছে। এ কারণে খুন-ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলো বাড়ছে বেশি। হাত বাড়ালেই মিলছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। সন্ত্রাসী থেকে শুরু করে দলীয় ক্যাডারদের হাতে হাতে শোভা পাচ্ছে আগ্নেয়াস্ত্র। তুচ্ছ ঘটনার জেরে একে অপরের দিকে অস্ত্র তাক করতে কুণ্ঠাবোধ করছে না। শীর্ষ সন্ত্রাসীরাই শুধু নয়, পাড়ার ছিঁচকে সন্ত্রাসীর হাতেও রয়েছে অস্ত্র।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ এর জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত প্রথম ৬ মাসে সারা দেশে ২ হাজার ৮০ জন খুন হয়েছেন। এই হিসেবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২ থেকে ১৩ জন খুন হচ্ছেন। তবে প্রকৃত খুনের সংখ্যা আরও বেশি। অপহরণের শিকার হয়েছেন ৪ শতাধিক ব্যক্তি। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও দস্যুতার ঘটনা ঘটেছে ৫ হাজার ৩২৫টি। এ ছাড়া প্রথম ছয় মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় সারা দেশে ১০ হাজারেরও বেশি মামলা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা অধিকার বলছে, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে সারা দেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় মারা গেছে ১৫৩ জন। এ ছাড়া আহত হয়েছেন অন্তত সাড়ে ৪ হাজারেরও বেশি মানুষ। মানুষের মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার প্রবণতাও বেড়ে গেছে আগের চাইতে অনেক বেশি। অধিকার বলছে, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৭৭ জন গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন।

বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের হিসাবে দেখা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত ৭ মাসে দেশে মোট ৩ হাজার ৬৩টি হত্যাকা- ঘটেছে। জানুয়ারি থেকে জুলাই মাসে দেশে ১১১ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া একই সময় রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৫৩ জন নিহত ও ৪ হাজার ৫৭৮ জন আহত হয়েছেন। যৌতুক সহিংসতায় ১১০, ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩৬৬ জন। এ ছাড়া গণপিটুনিতে নিহতের সংখ্যা ৭৭ জন।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের হিসাব অনুযায়ী, জুলাই মাসে ৩৬৮ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জানুয়ারি থেকে জুন মাসে আইনশৃংখলা বাহিনীর হেফাজতে ১০১ জন মারা যাওয়ার ঘটনা রেকর্ড করেছে। এ সময় ৬৬০টি রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৩২ জন নিহত ও ৩ হাজার ৮৯২ জন আহত হয়েছেন।

“সাড়ে তিন বছরে দেশে ৯৬৮টি শিশুকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। ২০১৪ সালে শিশুহত্যার হার আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৬১ শতাংশ বেশি ছিল। এ বছর হত্যার পাশাপাশি নৃশংসতাও বেড়েছে। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের পরিসংখ্যানে এ তথ্য উঠে এসেছে।

বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে ২৬৭টি সংগঠনের মোর্চা শিশু অধিকার ফোরামের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ২০১২ সালে ২০৯, ২০১৩ সালে ২১৮, ২০১৪ সালে ৩৫০ জন শিশুকে হত্যা করা হয়। চলতি বছরের সাত মাসেই সংখ্যাটি দাঁড়িয়েছে ১৯১ জনে।

বর্তমানে শিশুহত্যার প্রক্রিয়া বীভৎস থেকে বীভৎসতর হচ্ছে। এ ধরনের নৃশংস ঘটনার শিকার হচ্ছে মূলত দরিদ্র পরিবারের শিশুরা। নির্যাতনকারীরা হচ্ছে প্রভাবশালী। ঘটনা ঘটছে, মামলা হচ্ছে কিন্তু বিচার যে শেষ হচ্ছে, তার কোনো নজির দেখা যাচ্ছে না।

বীভৎসতার মাত্রা: সিলেটে নির্যাতন করে হত্যা করা শিশু শেখ মো. সামিউল আলম ওরফে রাজনের (১৪) শরীরে ৬৪টি আঘাতের চিহ্ন ছিল বলে ময়নাতদন্তের প্রাথমিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। সবজি বিক্রেতা এই কিশোরকে চোর অভিযোগে গত মাসে পেটানোর সময় ভিডিওচিত্র ধারণ করে নির্যাতনকারীরাই। নির্যাতনের একপর্যায়ে মৃত্যু হয় সামিউলের। এ ঘটনার পর এক মাসের ব্যবধানে ঘটে গেছে আরও একাধিক নৃশংস এমন হত্যা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা থেকে সুটকেসের ভেতর থাকা একটি ছেলেশিশুর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তার বুকে ও কপালে ছ্যাঁকার দাগ ছিল। পিঠে ছিল পাঁচ ইঞ্চির মতো গভীর জখম। থুতনিতেও জখমের চিহ্ন ছিল। শিশুটির বয়স আনুমানিক নয় বছর। ১৯ আগস্ট পর্যন্ত শিশুর লাশটি ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গেই পড়ে ছিল।

খুলনায় নির্যাতনের শিকার হওয়া ১২ বছর বয়সী রাকিব গ্যারেজ পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। এ কারণে আগের গ্যারেজ মালিক ও তার সহযোগী রাকিবকে ধরে মোটর সাইকেলের চাকায় হাওয়া দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত কমপ্রেসর মেশিনের নল ঢুকিয়ে দেয় তার মলদ্বার দিয়ে। এরপর চালু করে দেওয়া হয় কমপ্রেসর। নল দিয়ে পেটে বাতাস ঢুকে শিশুটির দেহ ফুলে প্রায় বড়দের মতো হয়ে যায়। ছিঁড়ে যায় নাড়িভুঁড়ি, ফেটে যায় ফুসফুসও। মৃত্যু হয় রাকিবের।

বরগুনায় রবিউল আউয়াল নামে ১১ বছরের এক শিশুকে চোখে আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। মাছ চুরির ‘অপবাদে’ স্থানীয় এক ব্যক্তি এই বীভৎস কায়দায় তাকে হত্যা করেছে বলে আদালতে জবানবন্দিও দিয়েছে।

আর মাগুরায় ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষের সময় মা ও তাঁর পেটের শিশু গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা তো দেশজুড়েই আলোচিত।

শিশুদের ওপর বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের মধ্যে হত্যার পরেই ধর্ষণের পরিসংখ্যান নিয়ে সংশ্লিষ্টরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর ৬৩ জন শিশু যৌন হয়রানি এবং ৩২২ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়।

সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে প্রতিনিয়ত শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে বলে মনে করেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের অধ্যাপক তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, সামাজিক ন্যায়বিচারহীনতা এবং ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের শক্তি ও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে দুর্বৃত্তপরায়ণ ও পশু প্রবৃত্তির লোকের প্রাধান্য থাকায় এ ধরনের অমানবিক ঘটনাগুলো ঘটছে। বড়দের পাশাপাশি শিশুদের মনেও তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

আজকের জীববিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, মানসিক রোগতত্ত্ব এবং সমাজবিজ্ঞানের পঠন পাঠন গবেষণা যতই উন্নত হতে থাকে ততই অপরাধ এবং অপরাধী সম্পর্কে বিজ্ঞানভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির উন্মেষ ঘটাতে থাকে। মানবীয় প্রেষণা ((Motivation)) ও মনোভাব (Attitude) সম্পর্কে যতই জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে ততই অপরাধী সম্পর্কে গবেষণার পদ্ধতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত হচ্ছে। তাছাড়া সভ্যতার ক্রমবিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ে অপরাধ সম্পর্কিত ধারণায়ও পরিবর্তন এসেছে।

দ্বাদশ এবং ত্রয়োদশ শতকে ইউরোপীয় সমাজে রাষ্ট্র এবং ধর্মের বিরুদ্ধে যে কোন কাজকেই কেবলমাত্র অপরাধ হিসেবে আখ্যা দেয়া হতো। আর তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রদ্রোহী আচরণ ছিল অন্যতম অপরাধমূলক কাজ কিন্তু “হত্যাকে” তখনও অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। তখনকার সমাজে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করতে এক বিশেষ প্রথার (ordeal) আশ্রয় নেয়া হত যে ক্ষেত্রে আগুন, পানি ইত্যাদি দ্বারা অভিযুক্তকে এক কঠোর পরীক্ষার সম্মুখীন করার কথা জানা যায়। এ প্রথায় অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধ করেছে কিনা তা নির্ণয়ের জন্য অপরাধীকে হয়ত জ্বলন্ত আগুন স্পর্শ করতে নির্দেশ দেয়া হত। এ ক্ষেত্রে এ বিশ্বাস পোষণ করা হত যে, অভিযুক্ত ব্যক্তিটি যদি নির্দোষ হয়ে থাকে তবে আগুনের স্পর্শে তার হাত পুড়বে না।

দশম শতকের পূর্বেকার সমাজে অপরাধ এবং টর্ট (Tort) এর মধ্যে কোন পার্থক্য নির্দেশ করা হত না। অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে তাকে (অপরাধকে) মনে করা হলো ব্যক্তির সমাজ তথা আইন বিরোধী কাজ। আর এক্ষেত্রে ব্যক্তি তার অপরাধের জন্য নিজেই দায়ী। অদ্যাবধি অপরাধ সম্পর্কে এ ধারণাই বর্তমান রয়েছে।

কিন্তু আপরাধীদের চিহ্নিত করতে দলিল হাজির করেছে আজকের মিডিয়া। তাছাড়া ফিঙ্গার/ডিএনএ টেস্ট সহ আধুনিক নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা। অপরাধীকে ধরতে ব্যবহার হচ্ছে অনেক প্রযুক্তির। কিন্তু সরকার এই সবের সফল ব্যবহার অথবা অতিরঞ্জিত করছে বিরোধী মত দমনে। বর্তমানে আমাদের দেশে অপরাধ আর অপরাধী নির্ণয় করার জন্য নতুন নিয়ম চালু করলো আওয়ামীলীগ। তাহলো, নিজ দলের হলে তার জন্য সাত খুন সবই মাফ। তাহলে আইন কোনো কি ব্যক্তি বা বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থে প্রণীত হয়েছে? প্রণীত হতে হবে সব শ্রেণীর নাগরিকের কল্যাণের জন্য। আইনের শাসন ও মানবিক মূলবোধ হবে প্রতিষ্ঠিত সমাজের সবস্তরে। আইন, প্রশাসন ও বিচার বিভাগ সবার জন্য নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে। কিন্তু তা যেন আজ কেতাবেই লেখা আছে।

বর্তমানে তরুণ ও কিশোরদের অপরাধ প্রবণতা ক্ষীপ্রগতিতে অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আজকের কিশোর-তরুণরাই দেশের ভবিষ্যৎ। যারা আগামীতে আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক-প্রশাসনিক এবং ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে নেতৃত্ব দিবে। তারাই সবচেয়ে বিপদগামী হয় তা হলে আগামী দিনের নেতৃত্ব ও জাতির মেরুদ-ের প্রকৃতি কি হবে তা সহজেই অনুমেয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইন্টারনেট ও ফেসবুকের অপব্যবহার, পর্নোগ্রাফি, তরুণ ও বেকার যুবকদের নানা ধরনের হতাশা, বিকৃত যৌনাচার, ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশাসন না মানাসহ নানাবিধ কারণে অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়েও অনেক ঘটনা ঘটছে। এসব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা থাকায় দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিতে পারে না পুলিশ। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন ইন্টারনেটে পর্নো সাইটগুলো শুধু যুবক তরুণ নয়, কিশোর এবং শিশুরাও দেখছে। সামাজিক এই অবক্ষয় দূর করতে প্রয়োজন মানবিকতার বিকাশ ও পাশবিক রোধে আতœ নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া। এটি কেবল ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে সম্ভব।

তাই বিখ্যাত মনীষী Sir Stanely Hull এর মতে, ‘If you teach your children three জ’ং : Reading, Writing and Arithmetic and leave the fourth ‘জ’Religion, then you will get a fifth ‘জ’: Rascality.’ অর্থাৎ ‘যদি আপনি আপনার শিশুকে শুধু তিনটি ‘জ’ (Reading, Writing, Arithmetic) তথা পঠন, লিখন ও গণিতই শেখান কিন্তু চতুর্থ ‘জ’ (Religion) তথা ধর্ম না শেখান তাহলে এর মাধ্যমে আপনি একটি পঞ্চম ‘জ’ (Rascality) তথা নিরেট অপদার্থই পাবেন।

এ ব্যাপারে বার্ট্রান্ড রাসেলের একটি উক্তি উল্লেখযোগ্য: ‘তথ্য ও তত্ত্বভিত্তিক জ্ঞান (Informative knowledge) যদি বৃদ্ধি পায়, কিন্তু নৈতিক মানভিত্তিক জ্ঞান ও প্রজ্ঞা (Wisdom) যদি সে অনুপাতে বৃদ্ধি না পায় তাহলে সে জ্ঞান শুধু দুঃখকে বাড়িয়ে দেয়।’

মহানবী (সা) বলেছেন, ‘মানুষের প্রতি আল্লাহর শ্রেষ্ঠ দান হল উত্তম আখলাক।’ যার চরিত্র ভাল, ব্যবহার সুন্দর সে সবার প্রিয়। নবী করীম (সা) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি আমার নিকট সর্বাধিক প্রিয় যার চরিত্র বা আখলাক সর্বোৎকৃষ্ট।’ আড়াই হাজার বছর আগে গ্রিক দার্শনিক প্লে¬টো, অ্যারিস্টটল তাদের দর্শন চিন্তায়ও সত্যিকারের সৎ ও নিষ্ঠাবান নাগরিক তৈরি করতে নৈতিকতার প্রয়োজন বলেছেন।

আলবার্ট সিজার তার Teaching of Reference of or Life গ্রন্থে শিক্ষা সংক্রান্ত আলোচনা রাখতে গিয়ে বলেছেন, “ÒThree kinds of progress are significant. These are progress in knowledge and technology, progress in socialization of man and progress in spirituality. The last one is the most important.” তার ভাষায় ‘আধ্যাত্মিকতার বিকাশই হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমাদেরকে আত্মার বিকাশ, আধ্যাত্মিকতার উন্নতি সাধন, মানসিক পরিশুদ্ধতা অর্জনে ব্রত হতে হবে। ধর্মীয় সেই নৈতিক শিক্ষা মানুষকে মনুষ্যত্ব দান করে, মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে, চরম সভ্যতায় উন্নীত করে, পরম আলোকে পৌঁছে দেয়, কল্যাণ দান করে ইহকালীন ও পরকালীন।

ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম

নিউজ পেজ২৪/আরএস