খোলা কলাম

অগাস্ট ৩১, ২০১৫, ৭:৫২ অপরাহ্ন

কেবলই আনুষ্ঠানিকতার ছলনা

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

১৫ আগস্ট ছিল ‘জাতীয় শোক দিবস’। গোটা আগস্ট মাস ধরে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে সারাদেশে দিবসটি পালন করা হয়েছে। এবার ছিল সবকিছুরই বেশ বড় করে আয়োজন। এমন হওয়াটা ছিল খুবই স্বাভাবিক। কারণ, এ বছরটি ছিল বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ৪০তম বার্ষিকী। এটিই প্রত্যাশিত ছিল যে এবারের ‘জাতীয় শোক দিবস’ পালন করা হবে অধিকতর ভাবগাম্ভীর্যের পরিবেশে, বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদনে আরো একাগ্রতায় এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শগত উত্তরাধিকার বহনের কর্তব্য অনুধাবনের গভীরতর প্রয়াসে। সে চেষ্টা যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়নি এমনটি নয়। তা মানুষের মনকে স্পর্শ করেছে। কিন্তু সেই শুভ প্রয়াসকে ছাপিয়ে বড় করে দৃশ্যমান হয়েছে ‘শোকের’ বদলে ‘উত্সবের’ আবহ। শুধু তাই নয়, শোকের মাস জুড়ে লাখ লাখ ফেস্টুন-ব্যানার-হোর্ডিংয়ে শোভা পেয়েছে আত্ম-প্রদর্শনের কুিসত চিত্র। নানা জায়গায় চলেছে জবরদস্তিমূলক চাঁদাবাজি। চলেছে ব্যক্তিগত আধিপত্য প্রমাণের মরিয়া প্রয়াস। এসব নিয়ে ঘটে গেছে গোলাগুলি, সংঘর্ষ ও তার পরিণতিতে হত্যার ঘটনা। যাচ্ছেতাই সব ব্যাপার। শোকের দিনে এ ধরনের উন্মত্ত বেহায়াপনা ও হানাহানির সব ঘটনা মানুষের নিন্দাই শুধু কুড়ায়নি, তা সচেতন ব্যক্তিমাত্রকেই ব্যথিত করেছে। আমার মনে প্রশ্ন জেগেছে জাতীয় শোক দিবস নিয়ে এবং বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এসব হচ্ছেটা কি? আমরা কি ৪০ বছর পরে ‘বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় হননের’ প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করছি? কথাটি হয়তো একটু বেশি শক্ত হয়ে গেল। কিন্তু মনের দুঃখ প্রকাশ না করে পারলাম না।

এবারের ১৫ আগস্টেও ৩২ নম্বরের বাড়িটি অভিমুখে মিছিলের স্রোত প্রবাহিত হয়েছিল। অন্যবারের চেয়ে এবার তা একটু বেশিই ছিল। ভাবনায় একথা উদয় হলো যে, যদি ১৯৭৫ সালে আজকের মিছিলকারীদের সংখ্যার এক সহস্রাংশকেই বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ মিছিলে সাথে পেতাম তাহলে হয়তো ইতিহাস ভিন্নভাবে রচিত হতো।

৩২ নম্বরের বাড়িতে মিছিলের স্রোতধারার ঘটনা নতুন নয়। শুরু হয়েছিল ঊনসত্তর-সত্তরে, চলেছে বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তর পর্যন্ত। কিন্তু ৩২ নম্বর অভিমুখে একটি মিছিল ছিল অনন্য, তাত্পর্যপূর্ণ। সেই মিছিলের স্মৃতি জীবন্ত হয়ে আছে আমার চিত্তে। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড ও প্রতিবিপ্লবী রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর দেশে বিরাজ করছিল এক ভয়ার্ত বিভীষিকাময় পরিবেশ। বঙ্গবন্ধুর নিজ দলে চলছিল চরম বিভ্রান্তি ও আত্মসমর্পণের পাঁয়তারা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। ক্লাস চালু হওয়ার ২ সপ্তাহের মাথায়, ৪ নভেম্বর তারিখে সুদীর্ঘ এক নীরব মিছিলকে নেতৃত্ব দিয়ে ঢাকার রাজপথ পরিক্রম শেষে সকাল ১১/১২টার দিকে আমি উপস্থিত হয়েছিলাম এই বাড়ির গেইটের সামনে। বেশ কিছুদিন ধরে নিবিড় প্রস্তুতি শেষে পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী সেদিন সকাল ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় জমা হয়ে মিছিল শুরুর আগে সমবেত সহস্রাধিক ছাত্র-জনতার সামনে আমি বক্তৃতা করে মিছিল নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলাম ৩২ নম্বর রোডের এই বাড়ি অভিমুখে। নীলক্ষেতে ফাঁড়ির সামনে পুলিশের ব্যারিকেড অতিক্রম করে দৃপ্তপদে এগিয়ে নিয়েছিলাম শোক মিছিলটি। ৩২ নম্বরের বাসার গেইটে পৌঁছে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেছিলাম সকলের পক্ষে। একজন অচেনা মওলানা সাহেব মোনাজাত করেছিলেন। ফেরার সময় মিছিলটি আর নীরব থাকেনি। আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে রাজপথে শ্লোগান উঠেছিল ‘মুজিব হত্যার বিচার চাই’। ঢাকার রাজপথে এটাই ছিল এই শ্লোগান ধ্বনিত হওয়ার প্রথম ঘটনা।

বঙ্গবন্ধুকে সেদিন (১৫ আগস্ট, ১৯৭৫) সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল। হত্যা করা হয়েছিল কর্নেল জামিলকে। নিহত হয়েছিলেন ৩২ নম্বর বাড়িতে অবস্থানকারী আরো বেশ কয়েকজন। নিষ্পাপ রাসেল, বেগম মুজিব, শেখ নাসের, কামাল, জামাল ও তাদের সদ্য পরিণয়ে আবদ্ধ নববধূ সুলতানা ও রোজী— কাউকেই রেহাই দেয়নি ঘাতকরা। একই সময়ে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছিল শেখ ফজলুল হক মনি এবং আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের বাড়িতে। হত্যা করা হয়েছিল সে দু’টি বাড়ির মানুষদেরকে। কামানের গোলায় নিহত হয়েছিল মোহাম্মদপুরের কয়েকজন সাধারণ নাগরিক। ১৫ আগস্টের বিভীষিকাময় সেদিনের এই হত্যাকাণ্ড, জুলিয়াস সিজার ও নবাব সিরাজউদ্দৌলার হত্যাকাণ্ড, ব্রিটিশ কর্তৃক দিল্লির সম্রাট বাহাদুর শাহ’র সন্তানদের হত্যা ও বর্বর নিগ্রহ এবং কারবালার হত্যাকাণ্ডের ট্র্যাজেডিকে স্মরণ করিয়ে দেয়। শোকের মাতমে ডুকরে উঠে বুক। যত বড় অপরাধ করেছিল জুডাস, ব্রুটাস, এজিদ, মীরজাফর, এদের মতোই অপরাধ করেছিল ১৫ আগস্টের খুনিরা।

১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড ছিল মানবিকতা, নৈতিকতা ও সামাজিক মানদণ্ডের নিরিখে একটি ভয়ঙ্কর অপরাধ। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডটি একই সাথে ছিল একটি ‘দেশদ্রোহিতামূলক রাজনৈতিক অপরাধের ঘটনা।’ এটা যে একটি রাজনৈতিক অপরাধমূলক ঘটনা ছিল তা প্রথমত এজন্য যে, সেদিন দেশের রাষ্ট্রপতি, মুক্তিযুদ্ধের মহান নেতা, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ‘জাতির জনক’ বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছিল। সংবিধান লঙ্ঘন করে প্রয়াত রাষ্ট্রপতির আসনে সেদিন স্বঘোষিতভাবে নিজেকে অধিষ্ঠিত করেছিল খুনি মোশতাক। সামরিক আইন জারি, কারফিউ ও ভয়ার্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের সুযোগ রুদ্ধ করা হয়েছিল। মোশতাকের যোগসাজশে বঙ্গভবনে বসে ক্ষমতার প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করেছিল মোশতাকের ‘সূর্যসন্তান’ খুনি মেজরের দল।

১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড একটি ‘রাজনৈতিক অপরাধের’ ঘটনা ছিল এই কারণেও যে, এই ঘটনার সাথে আগে-পরে সংশ্লিষ্ট ছিল কিছু বিদেশি শক্তি। এসব দেশের মধ্যে কোনো কোনো দেশ খুবই রহস্যজনকভাবে হত্যাকাণ্ডের খবর প্রায় সাথে সাথেই প্রচার করেছিল, বাংলাদেশকে ‘ইসলামিক প্রজাতন্ত্র’ বলে আখ্যায়িত করা শুরু করেছিল এবং চার বছর বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে অস্বীকার করলেও, এই হত্যাকাণ্ডের পর পরই রাতারাতি স্বীকৃতি দিয়ে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিল। মুক্তিযুদ্ধ চলার সময় থেকে শুরু করেই এরা ছিল পাকিস্তান ও হানাদার বাহিনীর প্রত্যক্ষ সমর্থক ও স্বাধীন বাংলাদেশ ও মুক্তিসংগ্রামের বিরোধী। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ক্ষেত্রে এসব দেশই ছিল ভূ-রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষ বেনিফিশিয়ারি। ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির সম্পৃক্ততার তথ্য প্রমাণসমেত অনেক দলিলপত্র ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। এসব ঘটনা পরিষ্কারভাবে প্রমাণ করে যে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সাথে স্পষ্টভাবেই যুক্ত ছিল আন্তর্জাতিক রাজনীতির নানা ষড়যন্ত্রমূলক শক্তি ও উপাদান।

তৃতীয়ত এবং এক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রধান যে কথাটি বলতে হয় তা হলো, ১৫ আগস্টের বর্বর হত্যাকাণ্ডের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চরিত্র ও মর্মবাণী উল্টোপথে ঘুরিয়ে দেয়া হয়েছিল। আঘাত হানা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল অর্জনগুলোর ওপর। পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভৌগোলিক-রাজনৈতিক কাঠামো থেকে বের হয়ে এসে একই চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যের একটি পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য দেশবাসী ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ করেনি। মুক্তিযুদ্ধ একটি ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ প্রয়াস ছিল না। পাকিস্তানকে দ্বি-খণ্ডিত করে তার পূর্বাংশের ‘বাঙ্গলাস্তান’ নামের একটি দ্বিতীয় পাকিস্তান কায়েম করার জন্য মুক্তিযুদ্ধ হয়নি। আমাদের মহান এই মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি ‘জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম’। সেটা ছিল কয়েক যুগ ধরে পরিচালিত জনগণের সার্বিক সংগ্রামী অভিযাত্রার শীর্ষবিন্দু। সেটা ছিল একটি ‘জনযুদ্ধ’। পাকিস্তানি মতাদর্শ, সামাজিক-অর্থনৈতিক নীতি ও রাজনৈতিক চরিত্রকে নেতিকরণ (Negate) করেই নতুন নীতি-আদর্শ-বৈশিষ্ট্য-ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশ। এবং এই সামগ্রিক গণসংগ্রামের সবটুকু নির্যাস ও নবপ্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের চরিত্র-ভিত্তি মূর্তরূপ পেয়েছিল ’৭২-এর সংবিধানে। বিশেষত গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্র—তথা সেই সংবিধানে বর্ণিত ৪ রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে।

বঙ্গবন্ধুর সাথে সাথে ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিল ’৭২-এর সংবিধানে বর্ণিত রাষ্ট্রের সেই মূল ভিত্তি। মুক্তিযুদ্ধের নেতাকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে একই সাথে হনন করা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ধারা। সামরিক ফরমানের দ্বারা প্রথমে মোশতাক ও পরবর্তীতে সামরিক শাসক জিয়া এবং এরশাদ বদলে দিয়েছিল ’৭২-এর সংবিধানের মৌল চরিত্র ও ভিত্তি। সংবিধান থেকে বাদ দেয়া হয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের নীতি। পাকিস্তানপন্থীরা ’৭২-এর সংবিধানের ৪ নীতি মানতো না। তারা ছিল ‘রাজাকার’। যারা দুই নীতি রেখে দুই নীতি বাদ দিয়ে রাষ্ট্র চালিয়েছে তারা তাই ‘হাফ-রাজাকার’ (অঙ্কের হিসাবেও সেটাই হয়)। তিরিশ লাখ শহীদের রক্ত ও বহু যুগের গণসংগ্রামের ফসল, মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ধারাকে যে সংবিধানের মাধ্যমে ’৭২ সালে মূর্ত রূপ দেয়া হয়েছিল, তাকে উল্টে দিয়ে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িক ও শোষণ-লুটপাটের নীতি ও ধারা।

১৫ আগস্টের ঘটনার শিকার (Casualty) ছিল দ্বি-বিধ। প্রথমত- বঙ্গবন্ধু তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাথে থাকা কিছু মানুষ। দ্বিতীয় শিকার (Casualty) ছিল রাষ্ট্রের চরিত্র, সংবিধান ও সংবিধানে বর্ণিত চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি। রাষ্ট্রের চরিত্রকে হত্যা করার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়েই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছিল। এই রাজনৈতিক অপরাধকে অপরিবর্তনীয় (Irreversible) করার জন্যই পরবর্তীতে জেলখানায় চার নেতাকে হত্যা করা হয়েছিল। ১৫ আগস্টে আমরা মুক্তিযুদ্ধের নেতাকে হারিয়েছি। সাথে সাথে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ধারা, তথা চার নীতিসহ ’৭২-এর সংবিধানকেও হারিয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের ও মুক্তিসেনানীদের দেশ হয়েও আমরা এই দুই সম্পদকে রক্ষা করতে পারিনি। এমন সর্বাত্মকভাবে সে সম্পদ ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিল যে, আজও তা পরিপূর্ণরূপে পুনরুদ্ধার করা যায়নি। এটিই ইতিহাসের ট্র্যাজেডি। এটিই জাতির সবচেয়ে কলঙ্ক।

উপরোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে একথা তাই বলা যায় যে, জাতির ও ইতিহাসের এই দ্বি-বিধ কলঙ্কমোচনের জন্য যেসব কাজ সম্পন্ন হওয়া উচিত সেগুলো হলোঃ

দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য কূটনৈতিক, আন্তঃরাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা জোরদার করা। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাইরেও দণ্ডপ্রাপ্তদের অপরাধের চরিত্র ও মাত্রা সম্পর্কে, আইনের শাসন ও মানবাধিকারের মর্যাদা রক্ষার্থে কেন তাদের দণ্ড কার্যকর করা উচিত এবং কেন তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো উচিত-এসব বিষয়ে বিশ্ব জনমত গড়ে তোলার কাজে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা। খুনিদের দণ্ড কার্যকর করার জন্য পলাতক আসামিদের খুঁজে বের করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবিতে দেশে-বিদেশে (বিশেষত যেসব দেশে তারা লুকিয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা যায়) নাগরিক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রচেষ্টায় সহায়তা প্রদান করা।

১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য নায়ক ও পর্দার অন্তরালের ষড়যন্ত্রকারী দেশি-বিদেশি শক্তিকে চিহ্নিত করার জন্য উদ্যোগ নেয়া। বাংলাদেশের বিভিন্ন গোয়েন্দা দফতরে এ বিষয়ে যত গোপন অথবা অতি-গোপন নথিপত্র আছে তা উন্মুক্ত করে দেয়া। বিভিন্ন দেশে বিশেষত আমেরিকা, পাকিস্তান, ভারতে সেসব দেশের গোয়েন্দা বিভাগের হাতে ১৫ আগস্ট সংক্রান্ত যত তথ্য আছে তার সবকিছু বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করার জন্য সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রসমূহকে অনুরোধ করা। সেসব দেশের জনগণকে এ বিষয়ে নিজ নিজ দেশের সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য আহ্বান জানানো।

নেপথ্যের দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের স্বরূপ উদ্ঘাটনের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে ’১৫ আগস্টের ঘটনাবলীর তথ্য অনুসন্ধান বিষয়ক একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা।

৪ রাষ্ট্রীয় মূলনীতিসহ ’৭২ সালের সংবিধানের মূল ভিত্তি পূর্ণাঙ্গরূপে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও বিচারের রায় বাস্তবায়নের পথে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাওয়া। জেল হত্যার বিচার সম্পন্ন করা। উদীচী-ছায়ানট-সিপিবি জনসভা-আওয়ামী লীগ সমাবেশ প্রভৃতি বোমা হত্যাকাণ্ডের এবং অন্যান্য হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন করা।

এ প্রসঙ্গে আরেকটি কথাও বলা প্রয়োজন। এসব জরুরি কাজের মাঝে সবচেয়ে বড় করে যে কথাটি মনে রাখতে হবে তা হলো, বিদ্রোহী কবি নজরুলের ভাষায়—

‘..ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ

চায় শুধু ভাত, একটু নুন..’

জনগণের ইহলৌকিক ও চলমান মূর্ত সমস্যা ও সংকটগুলো নিরসনের কাজকে অগ্রাধিকার দিয়ে সফল করতে না পারলে দেশের শত্রুরা আবার আঘাত হানার সুযোগ নিবে। সেজন্য তারা তাদের ষড়যন্ত্র পাকিয়ে তুলছে। কিন্তু জাতীয় শোক দিবস পালনের কর্মকাণ্ডের মাঝে তার বিরুদ্ধে আশ্বস্ত হওয়ার মতো মতাদর্শগত-চেতনাগত, দৃঢ়তা ও নৈতিকতার কোনো প্রচেষ্টার কোনো লক্ষণ দেখা গেছে কি? বিপদ এখানেই। জাতীয় শোক দিবস পরিণত হয়েছিল অনেকটা ‘তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি’-এর মতো ব্যাপারে।

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি

E-mail : selimcpb@yahoo.com

নিউজ পেজ২৪/আরএস