সাক্ষাৎকার

সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৫, ১১:৪৭ পূর্বাহ্ন

শুধু ভ্যাট নয়, রুখতে হবে শিক্ষার বাণিজ্যকীকরণও

ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান

দেশের সব ইস্যুকে ছাপিয়ে এখন ‘টক অব দ্যা কাউন্টি’ হলো শিক্ষায় ভ্যাট আরোপের বিষয়টি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফির ওপর আরোপিত মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আরোপ করেছে সরকার। এটা আবার ১ কিংবা ২% নয়, একসাথে ৭.৫%। এরফলে গেল তিনদিন থেকে বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ‘ভ্যাট নয়, গুলি কর’ এমন প্ল্যাকার্ড বুকে ঝুলিয়ে এবং স্লোগানে রাজপথে আন্দোলন করছে।

এরই মধ্যে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানতে পারলাম বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে পুলিশের উপস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের উপর দফায় দফায় হামলা করেছে সরকার দলীয় ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ। আন্দোলন থেকে সরে যেতে শিক্ষার্থীদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে, তথ্যে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে, কিন্তু এরপরও তাদের আন্দোলন দমাতে পারেনি। নতুন করে শিক্ষার্থীরা ঘোষণা করেছে ‘ভ্যাট প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত ক্যাম্পাসে লাগাতার ধর্মঘট’ চলবে। তবে যেখানে শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি আদায়ে ছাত্রলীগের একাত্মতা পোষণ করার কথা সেখানে তারা রাতের আঁধারে পুলিশ পাহারায় হামলা করছে। এক্ষেত্রে সরকার ও ছাত্রলীগের এমন নোংড়া আচরণের নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের নেই।

শিক্ষার ওপর এই সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট আরোপের বিরোধিতা শুধু শিক্ষার্থীরাই করছেন না, শিক্ষাবিদসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষের একই ধরনের মনোভাব। এক্ষেত্রে আমাদের অনেকের ধারনা- বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মানেই এখানে বিত্তবানদের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করে। কিন্তু বর্তমানে এর শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসছে। কেননা, প্রতিবছর যে হারে ১০/১২ লাখ ছেলেমেয়ে এইচএসসি পাশ করছে সেহারে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আসন নেই। ফলে তাদের জন্য উচ্চশিক্ষায় ভ্যাট দেয়া সম্ভব হবে না। উন্নয়নশীল কিংবা উন্নত কোন দেশেই শিক্ষায় ভ্যাট নেই। কিন্তু আমাদের সরকার শিক্ষাকে অধিকার বললেও কার্যত: তা পণ্যে পরিণত করছে। সরকার অন্যান্য পণ্যের ন্যায় এবার শিক্ষাকেও পণ্যের কাতারে নামিয়ে একইভাবে ভ্যাট আরোপ করেছে। এতে দরিদ্র-মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণ যে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে এতে অন্তত: আমার কোন সন্দেহ নেই।

আর শিক্ষার্থীরা যখন ভ্যাট নিয়ে আন্দোলনে নেমেছে সরকার এনিয়ে খেলছে লুকোচুরি খেলা। সরকার প্রধান, অর্থমন্ত্রী ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কর্তৃপক্ষের বক্তব্য থেকে তা সহেজই বুঝা যাচ্ছে। তারা বলছে ভ্যাট শিক্ষার্থীদের দিতে হবে না, তবে ভ্যাট দেবে কে সেটাও পরিষ্কার করেনি।
বৃহস্পতিবার বিকেলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এবং রাতে জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জোর গলায় বলে দিয়েছেন, টিউশন ফির ওপর আরোপিত ৭.৫ শতাংশ ভ্যাট দেবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ওই দিনই সংসদে সরকারের অনুগত বিরোধী দলীয় নেত্রী ও বহুরূপী রওশন এরশাদ ভ্যাটের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করলে প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে কথা বলেন। বক্তব্যটি মনোযোগসহকারেই শুনছিলাম। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে ভ্যাটের পক্ষে জোরালোভাবে যুক্তি দিতে গিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহীতা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করে অনেক কথাই বলেছেন।

তিনি বলেন, এই যে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, ধানমণ্ডিতে এক বিল্ডিংয়ে কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয়, গুলশানে এক ছাদের নিচে কয়েকটি। বড় বড় নাম, গাল ভরা বুলি। এদের কোনো একাউন্টিবিলিটি নেই। ভ্যাট তো শিক্ষার্থীদের দিতে হবে না। এটা দেবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এটা তারা মেনেও নিয়েছেন। ফলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী যেসব প্রশ্ন তুলেছেন ওইসব বিষয়ে আমরাও তার সাথে সম্পূর্ণ একমত। তবে এক্ষেত্রে আমাদের বক্তব্য হলো- এই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহীতা নিশ্চত করার দায়িত্ব কার, সেটা কি জনগণের না সরকারের? নিশ্চয় সরকারের। আর এ ক্ষেত্রে সরকার যদি তাদের জবাবদিহীতা নিশ্চিত না করতে পারে এর মাশুল কি সাধারণ জনগণ তথা শিক্ষার্থীদের দিতে হবে? বিষয়গুলো বেশ বিবেচনার দাবি রাখে।