খোলা কলাম

সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৫, ৮:৫৩ অপরাহ্ন

বেতন বৃদ্ধির ফল যা দাঁড়াতে পারে

এবনে গোলাম সামাদ

মুদ্রা বিনিময় মাধ্যম মাত্র। মুদ্রা নিজে কোনো সম্পদ নয়। কিন্তু মুদ্রাকে সম্পদ ভেবে আমরা করি ভুল। নৃতাত্ত্বিকরা বলতে পারেন না, কেন কী কারণে কোনো কিছু কোনো অঞ্চলে বিনিময় মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। যেমন, অ্যাডমিরালটি দ্বীপপুঞ্জে কুকুরের দাঁত দিয়ে একসময় কেনাবেচা হতো। নিউ হার্বেডিস দ্বীপে একসময় কেনাবেচা হয়েছে বিশেষ পাখির পালক দিয়ে। কুকুরের দাঁত ও পাখির পালককে কেন মানুষ মূল্যবান ভেবেছে এবং করেছে বিনিময় মাধ্যম, তার ব্যাখ্যা করা কঠিন। অত দূর অঞ্চলে না গিয়ে নিজেদের দেশের কথায় ধরি, বাংলাদেশে এক সময় দ্রব্য বিনিময় ঘটেছে কড়ির মাধ্যমে। কড়ি বঙ্গোপসাগরে হয় না। কড়ি কিনে আনতে হতো বিদেশ থেকে। আর তা দিয়ে এ দেশে হতো জিনিস কেনাবেচা। আমার মাতামহী প্রায় বড় চার হাঁড়ি কড়ি জমিয়ে মাটিতে পুঁতে রেখেছিলেন। যা আমাদের কারো কোনো কাজে লাগেনি; কড়ি বিনিময় মাধ্যম হিসেবে উঠে যাওয়ার ফলে। কড়ি দিয়ে কেনাবেচা ১৭০৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত কলকাতা বাজারে হতে পেরেছে। গ্রামে কড়ি দিয়ে কেনাবেচা তারপরও চলেছে। তারপর উঠে গিয়েছে এর ব্যবহার। কোনো কিছুকে মূল্যবান ভাবা এবং তাকে বিনিময় মাধ্যম করা অনেক ক্ষেত্রেই হলো মানসিক ব্যাপার। মানুষ হীরাকে মূল্যবান ভাবে যদিও হীরা মানুষের তেমন কোনো কাজে লাগে না। আমদের মুদ্রার নাম টাকা। টাকা শব্দের উদ্ভব সম্ভবত হতে পেরেছে ‘তনখা’ শব্দ থেকে। দিল্লির সুলতান ইলতুতমিশ একরকম রৌপ্যমুদ্রার প্রচলন করেন, যাকে তখনকার উত্তর ভারতে বলা হতো তনখা। তনখা শব্দটির উদ্ভব হয়েছে ফারসি ‘তনখোআহ্’ শব্দ থেকে। তনখোআহ্ বলতে বোঝায় বেতন। সম্রাট শেরশাহ শূর রুপা দিয়ে তৈরী যে মুদ্রার প্রচলন করেন, তার নাম ছিল রুপাইয়া। যা থেকে অনেক পরে ইংরেজি শব্দ রুপির (Rupee) উদ্ভব হয়েছে। রুপি এখন ভারতীয় মুদ্রার নাম। রাষ্ট্রের সাথে মুদ্রার যোগাযোগ বহু দিনের। রাজারা বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন মুদ্রার প্রচলন করেছেন দ্রব্য বিনিময়ের জন্য। রাজ কর্মচারী ও সেনাবাহিনীকে বেতন প্রদানের জন্য। রাজ কর্মচারী ও সেনাবাহিনী মুদ্রার মাধ্যমে বেতন নিয়েছেন, কেননা তারা মুদ্রার মাধ্যমে ক্রয় করতে পেরেছেন তাদের প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী। রাজারা নিজ নিজ মুদ্রার প্রচলন করে বাড়িয়েছেন তাদের মর্যাদা। নতুন রাজারা ঘটিয়েছেন পুরনো রাজাদের মুদ্রার বিলুপ্তি। বাংলাদেশের একাধিক সুলতান তাদের মুদ্রিত মুদ্রায় যেমন উৎকীর্ণ করেছেন তাদের নিজের নাম, তেমনি আবার উৎকীর্ণ করেছেন বাগদাদের খলিফার নাম। কেননা তারা নিজেদের দাবি করতেন বাগদাদের খলিফার দ্বারা ক্ষমতাপ্রাপ্ত। সুলতান কথাটার অর্থ ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি। বাংলাদেশ ছিল বাগদাদ থেকে অনেক দূরে। কিন্তু বাংলাদেশের সুলতানেরা মনে করতেন, তারা হলেন মুসলিম খেলাফতেরই অংশ। মুঘল সম্রাটেরা কোনো খলিফার অস্তিত্ব স্বীকার করেননি। তারা নিজ নিজ নামে মুদ্রা মুদ্রিত করেছেন। রাষ্ট্র আর মুদ্রার ইতিহাস একে অপরের সাথে গ্রথিত। ইতিহাস লিখতে গিয়ে তাই মুদ্রার খোঁজ নেয়া হয়।

আমি কখনো অর্থনীতির ছাত্র ছিলাম না। তবে কিছু অর্থনীতি ছাত্রজীবনে আমাকে পড়তে হয়েছিল সহকারী বিষয় হিসেবে। এ সময় আমার পরিচয় হয় বিখ্যাত মার্কিন অর্থনীতিবিদ আরভিংফিসার (১৮৬৭-১৯৪৭)-এর দেয়া একটি সমীকরণের সাথে। যা হলো এ রকম :
P = MV/T এখানে P মানে হলো দ্রব্যমূল্য (Price)। M মানে হলো বাজারে মুদ্রার (Money) মোট পরিমাণ। V মানে হলো মুদ্রার গতিবেগ। অর্থাৎ হাতবদলের মাত্রা। আর T বলতে বোঝায় একটা দেশের উৎপাদিত দ্রব্যের মোট (Total) পরিমাণকে। ওপরের সমীকরণটি সত্য হলে বলতে হবে যে, একটা দেশে যদি টাকার সরবরাহ বাড়ে, তবে দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাবে। কেননা V ও T চট করে বাড়ে না। এই সমীকরণটির কথা আমার মনে পড়ছে। কেননা বাংলাদেশে ২১ লাখ সরকারি কর্মচারীর বেতন বৃদ্ধি করা হলো। আর এর জন্য চলতি অর্থবছরে (২০১৫-১৬) প্রয়োজন হবে অতিরিক্ত প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। এই টাকা সরবরাহ করতে যেয়ে সরকারকে করতে হবে ঘাটতি ব্যয় (Deficit financing)। যার সহজ অর্থ হলো সরকারকে ছাপাতে হবে বাড়তি টাকা। এতে যেমন বাড়বে অর্থের সরবরাহ। আর সেই সাথে ঘটবে অনিবার্যভাবে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি। দ্রব্যমূল্য এতটাই বাড়তে পারে যে, তা চলে যেতে পারে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। কেননা বেতন বৃদ্ধির ফলে বাড়তি টাকা যেয়ে পড়বে সরকারি চাকুরেদের হাতে; দেশের সর্বস্তরের মানুষের হাতে নয়। অনেকে বলছেন, দেশে মুদ্রা সরবরাহ বাড়াতে হবে না। কেননা বিশ্বে জ্বালানি তেলের দাম কমেছে। যা কিনতে বাংলাদেশের প্রয়োজন হতো অনেক টাকা, এখন সেই টাকা আর লাগবে না। টাকা বাঁচবে। যা দিয়ে দেয়া যাবে সরকারি কর্মচারীদের বাড়তি বেতন। এটা কত দূর সত্য তা আমি জানি না। এই বিষয়ে কোনো তথ্য আমার হাতে নেই। তবে একটি কথা বিবেচনা করতে হবে। তা হলো মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়াতে পারে যে, তেলের উৎপাদন যাবে কমে। ফলে তেলের মূল্য আবার হঠাৎ করে অনেক বেড়ে যেতে পারে। তখন কি সরকারি চাকুরেদের বেতন আবার কমিয়ে দেয়া যাবে? বেতন একবার বাড়ালে এ দেশে তা আর কমানো যায় না। আমরা জানি, ঘাটতি ব্যয় হলো পরোক্ষ কর। আর পরোক্ষ করের বোঝা গিয়ে পড়ে একটা দেশের দরিদ্র জনসাধারণের ওপর। কেননা পরোক্ষ কর আয়ের ওপর ধার্য হয় না। ধার্য হয় দ্রব্য বিক্রয়ের ওপর। যাদের বেতন বাড়ে না, বাড়ে না অন্য কোনো উপায়ে আয়, তাদের জীবনে নেমে আসে আরো অধিক আর্থিক অনটন। অর্থনীতির এটাই অমোঘ নিয়ম। দরিদ্র বলতে বোঝায়, যাদের মুদ্রা আয়ের প্রায় শতকরা ৭৭ ভাগ চলে যায় খাদ্য কিনতে। খাদ্যের দাম বৃদ্ধি ঘটলে তাদের পেটে টান না পড়েই পারে না। তাদের জীবনে বাড়ে অনাহারের সমস্যা।
শিক্ষকেরা ধর্মঘট করছেন তাদের বেতন বৃদ্ধির দাবিতে। কিন্তু তারাও বলছেন না, তাদের বাড়তি বেতন দেয়ার জন্য যে অর্থের প্রয়োজন হবে তা আসবে কোন খাত থেকে। তাদের বাড়তি বেতন দিতে গিয়েও সরকারকে করতে হবে ঘাটতি ব্যয়। আর বাড়বে দ্রব্যমূল্য। শিক্ষকেরা বলছেন, তারা যদি বাড়তি বেতন পান তবে অনেক শান্ত মনে ছাত্র পড়াতে পারবেন। যা তারা এখন পারছেন না। কিন্তু আমাদের দেশে শিক্ষাঙ্গন অশান্ত হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক কারণে। যেটা দূর না করতে পারলে শিক্ষাঙ্গন শান্ত হবে না। সৃষ্ট হবে না পড়াশোনার প্রকৃত পরিবেশ। ছাত্র-শিক্ষকেরা ভাগ হয়ে পড়েছেন নানা মতে, নানা পথে ও নানা দলে। আগে শিক্ষাঙ্গনে বিবাদ বাধতে দেখা যেত প্রগতিশীল ছাত্র-শিক্ষকদের সাথে প্রতিক্রিয়াশীল বলে পরিচিত ছাত্র-শিক্ষকদের। কিন্তু এখন মারদাঙ্গা হতে দেখা যাচ্ছে একদল প্রগতিশীলের সাথে আর একদল প্রগতিশীলের, যা আগে ছিল না। বিলাতের ইতিহাস পড়তে যেয়ে জেনেছিলাম, বিলাতের কবি শেলি ১৮১১ সালে একটি পুস্তিকা লিখে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বিলি করেছিলেন। পুস্তিকাটির বিষয় ছিল নাস্তিকতার প্রয়োজনীয়তা। শেলিকে এই পুস্তিকার জন্য অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়র সাথে আস্তিকতা নাস্তিকতা কোনো সমস্যার বিষয় ছিল না। কিন্তু সেটা এখন সমস্যার বিষয় হয়ে উঠতে চাচ্ছে। কেননা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক কেবল যে নাস্তিকতার পক্ষ গ্রহণ করছেন না তা নয়, সেই সাথে অংশ নিচ্ছেন ইসলামবিরোধী প্রচারণায়, যা আঘাত করছে এ দেশের বেশির ভাগ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে। এসব সমস্যার কোনো সমাধান বেতন বৃদ্ধি করে হবে বলে আমার মনে হচ্ছে না। বেতন দিয়ে শিক্ষকের মর্যাদা নিরূপিত হতে পারে না। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, বিশ্ববিখ্যাত বৈজ্ঞানিক আইনস্টাইন যা বেতন পেতেন, তা কোনো এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফুটবল ট্রেনারের বেতন থেকে ছিল কম। দেশের সবচেয়ে পুরনো বিশ্ববিদ্যালয় হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে একসময় চাকরি করেছেন সত্যেন বসু, পি মহেশ্বরী ও কৃষ্ণান-এর মতো বিশ্বখ্যাত বৈজ্ঞানিকেরা। আমি জানি না, এদের তুল্য কোনো বৈজ্ঞানিক এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করছেন কি না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একসময়ের ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন রমেশচন্দ্র মজুমদার। তিনি ছিলেন একজন প্রথম শ্রেণীর ইতিহাসবিদ। তিনি কেবল ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে খ্যাত ছিলেন না, ছিলেন ইতিহাসবিদ হিসেবে সারা ভারতখ্যাত। তারা কখনো বেতন বৃদ্ধির আন্দোলন করেননি। কিন্তু এখন সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা করছেন বেতন বৃদ্ধির আন্দোলন। কিন্তু বেতন বাড়লে দ্রব্যমূল্যও বাড়বে। যা দেশে সৃষ্টি করতে পারে চরম আর্থিক বিপর্যয়।
মানুষ যেমন শিখে কাজ করে তেমনি আবার কাজ করেও শিখে (Learning by doing)। বিখ্যাত মার্কিন অর্থনীতিবিদ কেনিথ জে অ্যারো দেখিয়েছেন যে, একজন মার্কিন শ্রমিক তার কাজের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে যতই শেখে, ততই সে সমপরিমাণ কাঁচামাল দিয়ে অধিক পরিমাণে জিনিস তৈরি করতে পারে। ফলে উৎপাদনের ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান নীতির কার্যকারিতা দেখা যায়। অ্যারোর মতে, কলাকৌশলগত অগ্রগতির উৎস হলো অভিজ্ঞতা। এবং ভেতর থেকেই হয় এর উৎপত্তি। যাকে আমরা বলি জ্ঞান, তা হলো বিশেষভাবে আমাদের অভিজ্ঞতানির্ভর।
আমি একসময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভিদবিদ্যা পড়াতাম। আমি এ সময় লক্ষ করেছিলাম উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের উদ্যানে ছাত্ররা যে গাছ লাগায়, তার মধ্যে বেশির ভাগই বাঁচে না। কিন্তু মালীরা যেসব গাছ লাগায়, তার বেশির ভাগই বাঁচে। তাতে ফুল হয় ফল ধরে। আমার তাই মনে হয় উদ্ভিদবিদ্যায় শিক্ষিত ব্যক্তিদের চেয়ে মালীরাই রাখতে পারেন অধিক অবদান। তারাই বাড়িয়ে তুলতে পারেন এ দেশের উদ্ভিদসম্পদ। আমি বলছি না উচ্চশিক্ষার কোনো দাম নেই। কিন্তু আমাদের উচ্চশিক্ষা হয়ে উঠেছে খুবই কেতাবি (Theoretical)। যেটা বাঞ্ছনীয় নয়। বাংলাদেশ বিশ্বের চতুর্থ ধান উৎপাদনকারী দেশ। প্রথম ধান উৎপাদনকারী দেশ হলো মহাচীন। তারপর হলো ভারত। এরপর জাপান ও বাংলাদেশ। চীন বিরাট দেশ। সেখানে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি জমিতে ধানের আবাদ হয়। ভারতেও বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি জমিতে হয় ধানের আবাদ। জাপানে কৃষকেরা যে পরিমাণ খরচ করে ধান উৎপাদন করেন, বাংলাদেশের কৃষকদের পক্ষে তা সম্ভব হয় না। কিন্তু বাংলাদেশের কৃষকের কৃষিদক্ষতা এত বেশি ধান উৎপাদনের কারণ। আর এই দক্ষতার মূলে আছে তাদের কৃষিজীবনের অভিজ্ঞতা; কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পাওয়া জ্ঞান নয়। বাংলাদেশের কৃষক শিখে কাজ করেন না, তারা কাজ করেই শিখেন। লাভ করেন তাদের পূর্বপুরুষের কাছ থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতাকেও। আমরা দেখছি বর্তমানে কৃষকেরা পাচ্ছেন না তাদের উৎপাদিত ধানের দাম। এর জন্য বিশেষভাবে দায়ী আমাদের কৃষি বিপণনব্যবস্থা। কিন্তু কৃষকেরা এ দেশে এখনো সংগঠিত নন। তারা করতে পারছেন না কোনো আন্দোলন। আমাদের শিক্ষিত সমাজ তাদের কথা না ভেবে কেবলই ভাবছেন নিজেদের কথা। যেটাকে ধরতে হবে চরম স্বার্থসর্বস্বতা বলে। কেননা আমাদের অর্থনীতি এখনো হলো কৃষি অর্থনীতি। আর নিকট ভবিষ্যতেও তা তা-ই থাকবে। সব দেশের অর্থনীতি একভাবে এগোয় না। বিলাতে ঘটেছে শিল্প বিপ্লব। তারপরে তা ছড়িয়ে পড়েছে আরো অনেক দেশে। কিন্তু ডেনমার্কে ঘটেছে কৃষিবিপ্লব। আর তার ফলে সে হয়ে উঠতে পেরেছে বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ। বাংলাদেশ চেষ্টা করলে হতে পারে বিশ্বের অন্যতম খামারবাড়ি। বাংলাদেশ গড়তে পারে কৃষি কোম্পানি। যারা বিদেশে যেয়ে বাংলাদেশের কৃষক নিয়ে চাষাবাদ করে আয় করতে পারবেন যথেষ্ট কমিশন। কৃষকের জীবন কলকারখানার শ্রমিকের চেয়ে অনেক সুখকর। কিন্তু আমরা এসব নিয়ে ভাবছি না। আমাদের শিক্ষিত সমাজ কেবলই চাচ্ছেন সরকারি চাকরি। আর সরকারি চাকরিতে ঢুকলেই করতে শুরু করছেন বেতন বৃদ্ধির আন্দোলন। এতে দেশের আর্থিক উৎপাদন বাড়ছে না। আর্থিক উৎপাদন বলতে বিশেষভাবে বুঝতে হবে দ্রব্য উৎপাদনকে। দ্রব্য উৎপাদনকে না বাড়িয়ে অর্থের সরবরাহকে বাড়ালে দ্রব্যমূল্য বাড়তেই থাকবে। অর্থনীতির অমোঘ নিয়মে।
বর্তমান অবস্থায় কী করা উচিত আমি তা বলতে পারি না, তবে আমার মনে পড়ছে ৫৭ বছর আগের ফ্রান্সের কথা। ১৯৫৮ সালে ফরাসি দেশে ক্ষমতায় আসেন জেনারেল দ্য গোল (de Gaulle)। তিনি ক্ষমতায় এসে প্রথমেই যে কাজটি করেন, তা হলো মুদ্রাব্যবস্থার পরিবর্তন। তিনি প্রতি এক হাজার পুরনো ফরাসি মুদ্রার জায়গায় প্রবর্তন করেন একটি করে নতুন ফরাসি মুদ্রা। এভাবে নতুন মুদ্রা চালু করে বাজার থেকে তিনি সরিয়ে নিতে পারেন মুদ্রার পরিমাণ। ফরাসি দেশে শ্রমজীবী আর পেশাজীবীরা কথায় কথায় ধর্মঘট করে বাড়াতে চাইতেন তাদের মজুরি ও বেতন। ফলে ফরাসি বাজারে বেড়ে গিয়েছিল মুদ্রার সরবরাহ। দ্য গোল কঠোরহস্তে দমন করতে সক্ষম হন এই ধর্মঘটের মাত্রাকে। ফলে ফরাসি অর্থনীতি পায় নতুন জীবন। ফ্রান্স হয়ে ওঠে আবার ইউরোপের মধ্যে অন্যতম সচ্ছল দেশ। আমরা অনুরূপ কোনো নীতি গ্রহণ করে বাজার থেকে মুদ্রা সরবরাহ কমাতে পারি কি না সেটা ভাবা প্রয়োজন। তবে আমি অর্থনীতির বিশেষজ্ঞ নই। তাই এ ব্যাপারে চূড়ান্তভাবে কিছু বলার অধিকার রাখি না।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

নিউজ পেজ২৪/আরএস