শিল্প সাহিত্য

সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৫, ৯:২০ অপরাহ্ন

চিন্তার ঔজ্জ্বল্যে ভাস্কর: আবু হেনা মোস্তফা কামাল

ড. গুলশান আরা

আবু হেনা মোস্তফা কামাল কবিতা-পঙ্ক্তির মতো চমৎকার একটি নাম। নামের মতোই চমৎকার তাঁর সৃষ্টিকর্ম। আবেগপ্রবণ কবি আবু হেনা কবিতায় যেমন তেমনি সঙ্গীত রচনায় প্রকৃতি ও আপন অনুভবকে জড়িয়ে-মিশিয়ে একাকার করে দিয়েছেন। বাণীহীন ও উদ্দেশ্যহীন রচনা তাঁর নেই বললেই চলে। বক্তব্যের প্রবণতাই তাঁর কবিতার বৈশিষ্ট্য। চিন্তাহীন অনর্গল উচ্চারণ তা তাঁর কবিতা ও গদ্যের কোথাও নেই, বরং তাঁর গদ্য-পদ্য সমস্ত রচনায় পাওয়া যাবে চিন্তার ঔজ্জ্বল্য। এ কারণেই অনেকের লেখার সাথে তাঁর তুলনা করা যায় সামান্যই। আবদুল মান্নান সৈয়দের ভাষায় যদি বলি তাহলে বলতে হয়, ‘আবু হেনা মোস্তফা কামাল কবিতা ও গদ্য কখনোই বেশি লেখেননি, কিন্তু তাঁর যেকোনো রচনা সুচিন্তিত ও সুলিখিত। হয়তো তাঁর তিন দশকের অধিককালের সাহিত্যচর্চায় ছোটখাটো ছেদ ও বিরতিও পড়েছে, কিন্তু তাতে তার রচনায় শ্যাওলা ধরাতে দেয়নি কখনো। যেখানে তাঁর সমসাময়িক অনেকের লেখায় মরচে পড়ে গেছে বা সৃজনশীলতা নিঃশেষিত কিংবা পুনরাবৃত্তিমুখর- সেখানে আবু হেনা মোস্তফা কামালের রচনা এখনো আজকের এই আশ্বিনের রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনের মতোই প্রফুল্ল ও দীপ্যমান। এর কারণ মনে হয়, তার চিন্তা ও প্রেরণার অবিশ্রাম জাগৃতি ও উৎসারণ। ফলে লেখা যখন হয়নি, তখনো অন্তঃপরিগ্রহণের কাজ ভেতরে ভেতরে চলছে শিল্পী তার উন্মুখিতা সতত জীবন্ত ও জাগ্রত রেখেছেন। এ জন্যই তাঁর লেখায় কখনো জং ধরেনি, বরং পঞ্চাশেও দেখা গেছে স্বাভাবিক সুর পরিবর্তন।’
পঞ্চাশের দশক থেকে কবিতা লিখছেন আবু হেনা মোস্তফা কামাল। প্রেম ও নারী তাঁর কবিতার মূল ভূমি। বক্তব্যকে প্রাধান্য দিয়েও কবিতায় তিনি অপ্রতিরোধ্যভাবে রোমান্টিক। তবে তাঁর রোমান্টিকতা নিছক ভেসে যাওয়া নয়- তীর আছে, সীমানার শাসন আছে- থাকার আকুতি আছে।

আবু হেনার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ- ‘আপন যৌবন বৈরী’ (১৯৭৪), ‘যেহেতু জন্মান্ধ’ (১৯৮৪), ‘আক্রান্ত গজল’ (১৯৮৮)।
‘আক্রান্ত গজল’-এ তাঁর রোমান্টিকতা এমন একটা মাত্রায় উত্তীর্ণ হয়েছে, যা পূর্ববর্তী কাব্য দুটোতে তেমনভাবে ছিল না। এখানে তাঁর কবিতা আরো আত্মস্বভাবী আরো প্রগাঢ়বোধসম্পন্ন। শব্দ ব্যবহারে, ছন্দ প্রয়োগে কাব্যশরীরে তিনি সঞ্চার করেছেন ‘গদ্য গুণ’, যা তিরিশ-উত্তর কবিরা চেয়েছিলেন। উত্তর-তিরিশের এই সাধনায় সফল হয়েছেন আবু হেনা মোস্তফা কামাল।
প্রেম ও বিচ্ছেদের বিচিত্র অনুভব নতুন রঙের আভায় রূপায়িত হতে দেখা গেল এ কাব্যে। প্রেমই প্রধান অনুষঙ্গ- এসব আবেগের তীব্রতায়- কি বুদ্ধির তীক্ষ্ণতায়। সচেতনভাবে বুঝে শুনে পরিপূর্ণ আত্মপ্রত্যয়ে ব্যক্ত করেছেন নিজের বক্তব্য-

‘অথচ এখন ফেরা অসম্ভব; পেছনে শুধুই বিসর্জন
সম্মুখেও ধূ ধূ শূন্য, মধ্যপথে তুমি অনায়াসে
কী করে ফেরাবে মুখ, অরুন্ধতী, মেঘে মেঘে সহিংস ঘর্ষণ
আদিগন্ত অন্ধকারে সর্বনাশ হয়ে নেমে আসে।’
[আমার সীমিত সাধ্য]
এবং ‘প্রতি তুলনা’ কবিতায়-
‘আমি কি ভাগ্যের চেয়ে অবিশ্বস্ত সেই সুন্দরীকে
এখনো দেখিনি? যার সহজে ভঙ্গুর প্রতিশ্রুতি
ক্রমাগত নিয়ে যায় অনিবার্য পতনের দিকে,
প্রত্যেক চুম্বনে তার তীব্রতর হত্যার প্রস্তুতি।’
হত্যার প্রস্তুতি জেনেও প্রেমিকার রুদ্ধদ্বারে তিনি আঘাত করেন। ‘আহত সৈনিকের মতো’, ‘অবুঝ সন্তানের মতো’। ‘তবু এমন জীবনের উপেক্ষায় ফিরে যাবো/ এমন ভেবো না অরুন্ধতী’।
শুধু তীব্রতা নয়- বিষণ্নতা এমনকি অশ্রুসজলতাও রয়েছে কয়েকটি প্রেমের কবিতায়।
আবু হেনা মোস্তফা কামালের রচনাশৈলীর আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো- জীবনঘনিষ্ঠ ব্যঙ্গমিশ্রিত সরস কবিতা। কৌতুক ও উপহাস কবিতায় জড়িয়ে দিয়ে তিনি কবিতাকে করে তুলেছেন আরো হৃদয়ঘনিষ্ঠ, বাস্তববোধসম্পন্ন। আটাত্তর বছরের মাতামহীও পুরুষের প্রতি বীতস্পৃহ নন (বয়স ও মাতামহী)। এই গল্পে আমাদের ঠোঁটে তীর্যক হাসির ঢেউ তোলে। তাঁর জীবন দর্শন, জীবনবোধ সম্বন্ধে আমাদের ধারণা তীক্ষ্ণ হয়। চিন্তা-চেতনায় শিরদাঁড়া খাড়া করা কবিতা- তার মধ্যেও স্নিগ্ধ স্বচ্ছ সাবলীল সহজবোধ্যতা পাঠককে মুগ্ধ করে, তারা উপলব্ধি করেন আবু হেনা মূলত প্রকাশ্য দিবালোকের কবি- কুয়াশা কুহেলি আচ্ছন্ন করেনি তাঁর চেতনাকে।
এই সহজবোধ্য চেতনা আরো সমৃদ্ধ করেছে তার সঙ্গীতকে। প্রকৃতি ও পরিবেশকে আপন অনুভবে সাজিয়ে তুলেছেন সঙ্গীতেও। অত্যন্ত পরিচিত এবং জনপ্রিয় গানের মধ্যে-
‘আমি সাগরের নীল নয়নে মেখেছি;
তোমার কাজল কেশ ছড়ালে বনে
এই রাত এমন মধুর,
এই ঘন কুন্তল বন্যা
কে দিলো তোমায় বলো কন্যা
অধরে কে দিলো বলো জড়ায়ে
চৈতালী হাসির সুর॥’
আধুনিক জীবনের একাকিত্ব, হতাশা, নিঃসঙ্গতা চমৎকারভাবে ধরা পড়েছে তাঁর এ গানটিতে-
‘এ ঘর ও ঘর করে
সারাদিন যায় গো যদি
কিছুতেই কাটে না এই রাতের নদী।’
প্রখর মেধাসম্পন্ন এই সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব শুধু গান-কবিতাতেই নিজেকে ধরে রাখেননি। প্রবন্ধ ও গবেষণা গ্রন্থও রয়েছে তাঁর। ‘শিল্পীর রূপান্তর’ (১৯৭৫), ‘কথা ও কবিতা’ (১৯৮১) প্রভৃতি তাঁর প্রবন্ধসম্ভার। শিক্ষাবিদ, কবি ও লেখক হিসেবে জীবন অতিবাহিত করেন। তিনি যে সুবক্তা এবং কতটা যোগ্য বাক-রসিক উপস্থাপক ছিলেন তা যারা তাঁর টেলিভিশনে অনুষ্ঠান পরিচালনা দেখেছেন, তারা বলতে পারবেন? নজরুল ইসলামের অনুপ্রাস প্রয়োগ সম্বন্ধে তাঁর একটি মূল্যবান মন্তব্য এই যে- তিনি মনে করেন, নজরুল অনুপ্রাসের রাজা। নজরুলের মতো এত সফলভাবে আর কেউ অনুপ্রাস প্রয়োগ করতে পারেননি।

স্বীয় কীর্তির জন্য বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন আবু হেনা। পেয়েছেন- একুশে পদক, আলাওল পুরস্কার, সুহৃদ সাহিত্য স্বর্ণপদক, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ স্বর্ণপদক, সাদাত আলী আকন্দ স্মৃতি পুরস্কার।
ছাত্রজীবনের সর্বস্তরেই তিনি মেধার পরিচয় দিয়েছেন- বিএ (অনার্স) এবং এমএ-তে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়েছেন। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লাভ করেছেন পিএইচডি।

সিরাজগঞ্জের গোবিন্দা গ্রামে ১৯৩৬ সালে জন্মগ্রহণ করা আবু হেনা মোস্তফা কামাল হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন ঢাকায়। ২৩-৯-১৯৮৯ তারিখে তাঁর পরলোকযাত্রা। মৃত্যুর কি সাধ্য সে জীবনের মহিমাকে ম্লান করে দেয়? আবু হেনা ধরায় রেখে যান কর্মের সুকীর্তি- সাহিত্যের সোনালি ফসল।সুত্র: নয়াদিগন্ত

নিউজ পেজ২৪/আরএস