খোলা কলাম

সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৫, ২:৪৯ অপরাহ্ন

ভ্যাটের পর কি ভোট!

ডক্টর তুহিন মালিক

ছাত্রদের সর্বাত্দক ভ্যাটবিরোধী আন্দোলনের পর অনেকের মুখেই এখন দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন নিয়ে সমালোচনা করতে দেখা যাচ্ছে। কেউ বলছেন, ছাত্রদের মতো করে এমন শান্তিপূর্ণ অহিংস আন্দোলন করতে পারছে না বলেই বিরোধী দল কোনো সফলতা পাচ্ছে না। কেউ বা আবার ছাত্রদের আন্দোলনের ভিতরে ঢুকে বিএনপি-জামায়াতকে সরকার পতনের আন্দোলন করার বড় একটা সুযোগের হাতছাড়া হয়ে গেছে বলেও ভীষণ আফসোস করছেন। অবশ্য খালেদা জিয়ার আহ্বানে দলের শীর্ষনেতারা ছাত্রদের এ আন্দোলনে শরিক হওয়ার মতো কোনো 'দুঃসাহস' দেখাতেন কি না, তা নিয়েও আবার অনেকে সন্দেহ করছেন। ছাত্র আন্দোলন থেকে বিরোধী দলকে শিক্ষা নেওয়ার তত্ত্ব যারা আওড়াচ্ছেন তারা হয়তো ভুলে গেছেন বিরোধী মতাদর্শের প্রতি রাষ্ট্রের আচরণের কথা। গুম, খুন, পঙ্গুত্ব, ক্রসফায়ার, জেল-জুলুম আর মিথ্যা মামলা-হামলায় লাখ লাখ নেতা-কর্মী আজ ঘরছাড়া। ৭০-৮০ দিন পর্যন্ত রিমান্ডে নিয়ে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার এ মানুষগুলোর সঙ্গে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের এক নিক্তিতে তুলনা করা বোধহয় সঠিক হবে না। আসলে সরকার চেয়েছিল ছাত্র আন্দোলনে রাজনৈতিক বিভাজন ও সহিংসতা ছড়িয়ে দিতে পারলে আন্দোলন বহুধাবিভক্ত হয়ে শক্তিহীন হয়ে পড়বে। প্রয়োজনে হেফাজত দমনের মতো কৌশলের আশ্রয় নিয়ে এর দায়দায়িত্ব বিরোধী দল এবং এমনকি জঙ্গিগোষ্ঠীর ওপর বর্তানোর শেষ চেষ্টা চালানো। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত সরকারের এ ফাঁদে পা দেয়নি। প্রথম দিকে গুলি করলেও জনসম্পৃক্ততার কারণে পুলিশকে পর্যন্ত পিছু হটতে দেখা গেছে। র্যাব পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে ছাত্রদের এ আন্দোলনে তারা কোনো ধরনের অ্যাকশনে যাওয়ার বিপক্ষে। এমনকি বিক্ষোভরত ছাত্রদের রাস্তায় সেনা সদস্যদের ফুল দিয়ে অভিনন্দন দিতে দেখা গেছে। রাস্তা অবরোধের সময় পায়ে হাঁটা মানুষগুলোও হাসিমুখে সমর্থন দিয়েছে ছাত্রদের। বিনা বাধায় গায়ের জোরে দেশ চালিয়ে আসা সরকারের অসহায় এই শক্তিহীনতাকে দেশের মানুষ অনেক দিন পর বিস্মিত দৃষ্টিতেই দেখেছে। আসলে বিএনপি-জামায়াতের নেওয়া পরিপক্ব এ রাজনৈতিক প্রজ্ঞাটি তাদের মার খাওয়া নেতা-কর্মীদের কোমরের গিঁঠে শক্ত একটা বাঁধুনি দিতে পেরেছে।

দুই. ব্যাংকিং খাতে হাজার হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ আদায়ে কোনোরকম মনোযোগ না দিয়ে মাত্র ৫০ কোটি টাকার ভ্যাট আদায় করতে ছাত্রদের 'খোঁচা' দিয়ে বসলেন আমাদের অর্থমন্ত্রী। অথচ এই চার দিনের আন্দোলনে ক্ষতির কাফফারা দিতে হয়েছে জনগণকে। তাও আবার কয়েক হাজার কোটি টাকার বিনিময়ে। আর ভ্যাটবিরোধী আন্দোলনের হৈচৈর মাঝে তেল, বিদ্যুৎ, গ্যাস আর দ্রব্যমূল্যের ইস্যুটা ঠিকই হারিয়ে গেছে। এ কথাটি এরশাদ সরকারের স্বৈরশাসনের সময় মন্ত্রিত্বে থাকা আমাদের বর্তমান অর্থমন্ত্রী কিন্তু ঠিকই জানতেন। প্রথম দিকে সরকার ভেবেছিল বাকশালের রাজত্বে কে আছে প্রতিরোধ প্রতিবাদ করার? ভ্যাট আইন থেকে শুরু করে সংবিধান পর্যন্ত লঙ্ঘন করে তারা শিক্ষায় ভ্যাট বসিয়ে একেক সময় একেক কথা বলতে লাগল। প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে সংসদে বলানো হলো ভ্যাট দেবে কর্তৃপক্ষ, শিক্ষার্থী নয়। অথচ বিদ্যমান ভ্যাট আইনের কোথাও কর্তৃপক্ষের ভ্যাট পরিশোধের কোনো সুযোগই নেই। শেষ পর্যন্ত পানিটা ঘোলা করেই খেতে হলো তাদের।

তিন. শিক্ষা ক্ষেত্রে এই ঐতিহাসিক আন্দোলন চলাকালে দেশের বড় বড় জ্ঞানী মানুষের নীরবতা আমরা দেখেছি। স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রী এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান চলে গিয়েছিলেন বিদেশি ছাত্রদের শিক্ষাব্যবস্থা পরিদর্শনের গুরুত্বপূর্ণ বিদেশ সফরে। ভ্যাট প্রত্যাহারের রাতে টিভি টকশোতে কিছু মানুষের ভোটে পরাজয়ের মতো গোমড়া মুখগুলো আমরা দেখতে পেয়েছি। আন্দোলনে বাহবা দেওয়ার পাশাপাশি সরকারকে ঘি দেওয়ার লোকেরও কমতি ছিল না। আন্দোলনের প্ল্যাকার্ডের ভাষা নিয়ে তীব্র নিন্দা জ্ঞাপনকারীদেরও মাতামাতি চোখে পড়ার মতোই ছিল। কেউ কেউ তো আবার আন্দোলনের কোনো যুক্তিই খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তার পরও বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন, সুশীল সমাজ, শিক্ষাবিদ ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, কবি নির্মলেন্দু গুণ, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হানিফ সাহেব থেকে শুরু করে ছাত্রলীগের সেক্রেটারি পর্যন্ত শেষের দিন ছাত্রদের এ ন্যায্য আন্দোলনকে সমর্থন দিতে বাধ্য হন।

চার. শিক্ষার মতো মানুষের মৌলিক অধিকারের জোগান দিতে পারছে না আমাদের রাষ্ট্র। বাধ্য হয়েই শিক্ষার্থীরা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে পড়ালেখা করছে। ভ্যাটের বদলে সরকারের উচিত ছিল শিক্ষা ক্ষেত্রে ভর্তুকি দেওয়া। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া এ বিশাল শিক্ষার্থীকে মাত্রাতিরিক্ত টিউশন ফি থেকে রক্ষায় সরকারি ভর্তুকি কিছুটা হলেও বৈষম্য নিরসনে ভূমিকা রাখতে পারবে। ভ্যাট প্রত্যাহারের মাধ্যমে সরকার যদি 'শিক্ষায় ভ্যাট নয়'- এ নীতিকে স্বীকার করে নেয়, তাহলে অবিলম্বে সব ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে শিক্ষার ওপর চাপিয়ে দেওয়া অযৌক্তিক ভ্যাটকেও প্রত্যাহার করে নিতে হবে।

পাঁচ. ভ্যাট আন্দোলনের বিজয়ে বড় বার্তাটি হচ্ছে, এ দেশে গণমানুষের অধিকার আদায়ে ছাত্ররা কখনো বিফল হয়নি। গুলি করে যদি ছাত্রদের দমানো যেত তাহলে বাংলাদেশের জন্মই হতো না। প্রকৃত সত্য হচ্ছে, গণআস্থায় থাকা ইস্যু নিয়ে রাজপথের কার্যকর আন্দোলন যে কোনো স্বৈরতান্ত্রিক সিদ্ধান্তকে রুখে দিতে পারে। সাংগঠনিক দুর্বলতা, দলের মধ্যে অবিশ্বাস, ষড়যন্ত্র, দুর্নীতিবাজ নেতাদের প্রাধান্য, তলে তলে সরকারের সঙ্গে মিশে গিয়ে দলের বিরুদ্ধে কাজ করা, মেধাহীন নেতৃত্ব আর ক্ষমতায় এসে লুটপাটের স্বপ্নে বিভোর নেতাদের দিয়ে আর যা হোক রাজপথে সরকারের ভিত কাঁপানোর মতো বুকের পাটা দেখানো কখনই সম্ভবপর নয়। মানুষের ক্ষোভ থেকেই বিক্ষোভের জন্ম হয়। এ বিক্ষোভ দানা বেঁধে জন্ম হয় গণআন্দোলন। গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষ দেয়ালচাপা পড়ে আছে সত্য। কিন্তু গণতন্ত্র ও ভোট আর ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তারা হঠাৎ একদিন জেগে উঠবে। ভুললে চলবে না, এত বড় সূর্য কিন্তু কোনোরকম আওয়াজ না দিয়েই উঠে পড়ে। ভ্যাটের এ আন্দোলন তো একটা উপলক্ষ মাত্র। জনগণের ভোটের অধিকার অর্জনই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আসল লক্ষ্য।

লেখক : সুপ্রিমকোর্টের আইনজ্ঞ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ

ইমেইল : drtuhinmalik@hotmail.com

নিউজ পেজ২৪/আরএস