লাইফ স্টাইল

সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১৫, ১১:২৯ পূর্বাহ্ন

ঈদের একাল সেকাল

ইমরান হক,বিশেষ প্রতিনিধি

আমরা সবাই জানি ঈদ মানেই আনন্দ। আনন্দের ঢেউয়ে অনেকেই ভুলে যায় ঈদ মানে এবাদতও। বছরে যে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ রাতে মানুষের মোনাজাত কবুল হয় তার মধ্যে রয়েছে দুই ঈদের দুই রাত। ঈদ এলে আমরা এতো বেশি আনন্দে মেতে উঠি যে, ভুলে বসি এ রাতে দোয়া কবুল হয়। এ রাতের এবাদতের সওয়াবও অনেক বেশি।

আজকাল ঈদে আনন্দ করার উপকরণ হিসেবে যেসব প্রোগ্রাম রাখা হয় তা অনেকটা অন্যান্য পার্বনের অনুষ্ঠানগুলোকে অনুসরণ করেই করা হয়। তাই দুঃখ হয় যখন পাশের বাড়ির হৈ-হল্লা আর হাই ভলিউমে বিদেশী গানের কর্কশ আওয়াজে নামাযের সূরায় বা রাকাতে ভুল হয়ে যায়। দুঃখ হয় এ ভেবে যে এটা কি আমাদের মুসলিমদের সংস্কৃতি!

ছোট বেলার ঈদ দেখেছি সম্পূর্ণ অন্যরকম। সে সময় নির্মল ঈদ আনন্দ ছিল। সে সব দিনগুলোর কথা ভাবলে দীর্ঘশ্বাস বড় হয়ে বেরোই।

ঈদের দু একদিন আগেই শুরু হতো শহর থেকে গ্রামে ফেরার পালা। চাচা-চাচী, ভাই-ভাবীরা বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে স্বপরিবারে আসতেন গ্রামে। শুরু হত চাঁদ দেখার হৈ চৈ। সুচিকন চাঁদ লুকোচুরি খেলতো পশ্চিম আকাশে। একজন দেখতে পেলেই চিৎকার করে ‘আল্লাহ আকবর’ বলে আঙ্গুলে সবাইকে দেখিয়ে খুশিতে হাততালি দিতো। এমনি প্রতিটি বাড়ি থেকেই হাত তালি আর ‘আল্লাহ আকবর’ শোনা যেত। আমাদের বাড়ির সামনে ছিল ধু ধু খোলা মাঠ, প্রসস্ত খোলা আকাশ। সবার আগে আমাদের বাড়ি থেকেই তাই ‘আল্লাহ আকবার’ আওয়াজ উঠত।

ঈদের চাঁদ দেখার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে যেত। আব্বার ছোটখাটো জিনিস বহন করতে গিয়েও আমি আছাড় খেয়ে পড়তাম আমার তিন বছরের বড়বোন শব্দ করে হেসে উঠতো। বড় ভাই ধমকে বলতেন তুই তো সব খানে আছাড় খাস- কদু! আমি লজ্জা পেয়ে কান্না করে উঠতাম। এগুলো যে কতো আদরের ছিল, আজো আমি সে আদর অনুভব করি। আজো সে কথা মনে পড়লেই চোখের পাতা ভিজে ওঠে। আর তক্ষুনি হৃদয় থেকে আওয়াজ আসে ‘রাব্বীর হামহুমা কামা রাব্বাইয়ানী ছগীরা’।

ঈদে আমাদের বাড়িতে মানুষ গমগম করতো। আব্বা বাড়িতে সবচাইতে বয়োজেষ্ট্য হওয়ার কারণে সবাই আসতো আব্বার সঙ্গে দেখা করার জন্য। এ কারণে সেদিন সকালেই আম্মা পিঠা বানিয়ে রাখতেন।

সকালে উঠে সারি বেধে পুকুরে নেমে গোসল করতো সবাই। শুধু আব্বাই গোসলখানায় গোসল করতেন। আব্বা পুকুরে নেমে কোনোদিন গোসল করেননি। তিনি পানিতে ডুব দিতেন না। সাঁতারও কাটতেন না। যত গরম মৌসুমই হোক আব্বা সবসময় হালকা গরম পানি দিয়ে গোসল করতেন। এরপর সুগন্ধি লাগিয়ে নতুন পোশাক পরে আল্লাহু আকবর বলে বড় রাস্তায় উঠতেন। তারপর পেছনে বেল বাজাতে বাজাতে আব্দুর রহমান এগিয়ে যেত। ছেলেটি বডিগার্ডের মতো সবসময় আব্বার সঙ্গে থাকতো। তখন দেখা যেতো নতুন পোশাক পরে আমাদের বাড়ি থেকে ও অন্যান্য সব বাড়ি থেকে দলে দলে লোক ঈদগার দিকে যেত।

এখানে একটা কথা রয়ে গেছে আমরা ভোরে ঘুম থেকে উঠেই দেখতাম আমাদের উঠোন ভর্তি মানুষ। দলে দলে মহিলারা এসে বসে আছে। বর্হিবাড়িতে ভিড় করছে পুরুষ মানুষরা। আব্বা ঘরের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে সবাইকে টাকা পয়সা দিয়ে বিদায় করতেন এরপর বাইরের কাচারী ঘরে গিয়ে পুরুষ মানুষদের টাকা পয়সা দিতেন। এই মানুষগুলো অনেকেই আবার ছোট ছোট বাটি নিয়ে ঈদগা গিয়ে হাজির হতো। সবাই খুশি হয়ে যে যা পারতো তাদের হাতে দিতো।

ঈদের নামাযের পর আব্বা ছোট রাস্তা ধরে বাড়ির অপর পাশ দিয়ে ঢুকতেন। সঙ্গে থাকতো অনেক মানুষ। আম্মা আগেই খাবার তৈরি রাখতেন। হালকা সেমাই, পায়েশ, ভূনা খিচুড়ী, দিয়ে হতো ঈদের সকালের আপ্যায়ন। এরপর দুপুরে হতো পোলাও, কোর্মা, জর্দা এসব।

সব ঝামেলা শেষে শুরু হত আমাদের সাজগোজ। সবাই নতুন কাপড় পরতাম আমাদের কাজের মানুষরাও নতুন কাপড় পরে ঈদের সেমাই খেতো। প্রসাধনীর কেনোটাই বাদ যেতোনা। আমরা হাতের বানানো কাজল ব্যবহার করতাম। সরসের তেলে সলতে চুরিদা সলতের এক মাথায় আগুন দিয়ে তার ওপর কাজলদানী ধরে রাখতাম। চোখে সেই কাজলই ছোটবেলায় ব্যবহার করেছি। সেই কাজল পেন্সিলের মাথা লাগিয়ে তা দিয়ে কপালে টিপ পরতাম। একবার কপালে লাল রংয়ের টিপ লাগাতে সেজোভাই আমাদের দু বোনকে ডেকে বললেন- লাল টিপ কোনো লাগিয়েছো ‘তোমরাকি বসন্ত বাবুর বাড়ির বৌ’।

আম্মা বুঝিয়ে বললেন লাল টিপ কপালে দিতে নেই। মানুষকে আল্লাহ বানিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা মানুষের কপাল বানিয়েছেন তাকে সাজদাহ করার জন্য। এই কপাল তার জন্যই খালি থাকবে। এরপর আমরা আর লাল টিপ কোনোদিনই পরিনি। আনেকটা লম্বা সময় পেরিয়ে এসেছি আজ এতো বছর পর পুরোনো দিনের সেই আনন্দের কথা মনে পড়ে যেখানে আনন্দে শরীক হতাম মা-বাবা-ভাই-বোন-চাচা-মামার, বাড়ির ছোটোবড়ো সব মানুষদের।

অনেকেই চলে গেছেন দুনিয়া থেকে আল্লাহর মেহমান হয়ে। অনেকেই আছেন দেশের বাইরে আমি নিজেও এখন দেশের মাটি থেকে দেশের মানুষ থেকে বহু দুরে। কিন্তু আমার দেশ আমার দেশের মানুষ আমার হৃদয়ের সবখানি অবশ্যই জুড়ে আছে। চোখ বন্ধ করলেই যেনো স্মৃতিতে সব দেখতে পাই। আমার দেশের মানুষের কথা সব সময় ভাবি। আমার সুখের মুহুর্তে তাদের দুঃখের কথা ভাবি, তাদের মধ্যে কিছু অসহায়-অর্থহীন দুঃস্থ মানুষের কথা ভাবি- ভাবি তাদের ঈদ কেমন হয়। তারা কি নতুন কাপড় কিনে ঈদের দিনে পরতে পেরেছে। তাদের ঘরে কি চাল সেমাই চিনি আছে, আমি অনেক দুরে তাদের জন্য দোয়া করি।

আল্লাহ তায়ালার কাছে মিনতি জানাই- হে আল্লাহ ! তুমি আমাদের দেশের মানুষের পাশে থেকো, তাদের সব ধরনের সমস্যা দুর করে দাও। তাদের মনের সব নেক আশা পুরণ করো। হে রহমানুর রাহীম ঈদের দিনে তাদের আনন্দ করার তওফীক দাও।

পঞ্চাশ বছর আগের ঈদের সাথে আজকের ঈদের কোনো তুলনা করা যায়না। সেই ঈদেও পবিত্রতা এখন ধরা ছোঁয়ার বাইরে এখন ঈদকে নিয়ে চলে ব্যবসা। ঈদের দিনে চলে নানা রকম অন্যায় ও নীতিবিরোধী আনুষ্ঠানিকতা। ঈদ এখন আর নির্মল আনন্দে মোড়ানো নেই। নাচানাচি আর হিন্দি গানের কানফাটা চীৎকারে ভেসে গেছে সব কিছু। রয়ে গেছে শুধুমাত্র আনন্দের ঈদ। এবাদতের ঈদ নয়, গুনাহ থেকে মাফ চেয়ে আল্লাহ তায়ালার কাছে নাজাত চেয়ে তার সন্তুষ্টি চেয়ে মোনাজাতের ঈদ নয়। শুধুমাত্র হৈ চৈ আনন্দের ঈদ দেখতে পাই!

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে ঈদের সঠিক মর্যাদা বোঝার ক্ষমতা দাও। ঈদের রাতকে যথাযথ কাজে লাগিয়ে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি হাসিল করার সামর্থ দাও। দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতা অর্জন করার তওফীক দান করো। আমীন! ছুম্মা আমীন!!

নিউজ পেজ২৪/ইএইচএম