খোলা কলাম

অক্টোবর ৫, ২০১৫, ৫:০১ অপরাহ্ন

আইএস বলছে আছি, সরকার বলছে নেই

রাসেল পারভেজ

এক সপ্তাহের মধ্যে দেশে দুজন বিদেশি খুন হলেন। প্রথম হত্যাকাণ্ড ২৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর গুলশানে। ইতালির নাগরিক তাবেলা সিজারকে খুন করে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। কারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তা এখনো খুঁজে পায়নি দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা গোয়েন্দারা। তবে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) সিজারকে হত্যার দায় স্বীকার করে। এর প্রতিক্রিয়ায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, দেশে আইএস নেই।

সিজার হত্যাকাণ্ডের এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই আবার এক বিদেশি খুনের শিকার হলেন। জাপানের নাগরিক হোসি কুনিওকে শনিবার রংপুরে প্রকাশ্যে হত্যা করে পালিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। স্বাভাবিকভাবেই তোলাপাড় শুরু হয় সরকারের মধ্যে। উদ্বেগ জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত বিদেশি কূটনীতিকরা। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, দ্রুত ঘটনার তদন্ত করে হত্যাকারীদের গ্রেফতার দেখতে চায় তার। এসবের মধ্যেই শনিবার মধ্যরাতে রয়টার্সে এক খবর হয়- জাপানের কুনিওকে হত্যার দায় স্বীকার করেছে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস। কিন্তু দ্বিতীয়বারও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আইএসের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

এখানে যে বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো- সরকার বলছে দেশে আইএস নেই। কিন্তু আইএসই ঘোষণা দিচ্ছে তারা বাংলাদেশে আছে। দুজন বিদেশিকে হত্যা করে আমাদের দেশে তাদের শক্ত নেটওয়ার্কের ঘোষণা দিচ্ছে। আইএসের দাবি, তাদের বাংলাদেশ শাখার সদস্যা এই দুই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। আর সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, দেশে আইএস নেই। অথচ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আইএস সদস্য সন্দেহে কয়েকজনকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। যদি আইএস দেশে না-ই থাকে, তবে আইএস সদস্য সন্দেহে এসব লোকদের কেন গ্রেফতার করা হচ্ছে, তা বোধগম্য নয়।

এখন দেখা যাক, সরকার কোন পথে হাঁটছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, দেশকে অস্থিতিশীল ও বিদেশিদের কাছে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য এসব হত্যাকা- চালানো হচ্ছে। এ নিয়ে শনিবার বিবিসির সঙ্গে কথা বলেন তিনি। প্রশ্ন হলো- কারা দেশকে অস্থিতিশীল করতে চাইছে। তারা তো বায়বীয় নয়। হত্যাকা- যেহেতু ঘটে চলেছে, সেহেতু হত্যাকারীরা এদেশেরই কেউ না কেউ। তারা কারা? সরকারের কাছে এখনো কোনো তথ্য নেই। দেশবিরোধী ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ গুরুত্ব দিলেও সেই ষড়যন্ত্রের হোতারা এখনো ধরা ছোঁয়ার বাইরে। খুনের রহস্যের যেমন শেষ হচ্ছে না, তেমনি আইএস যে বাংলাদেশে আছে, তারও কোনো প্রমাণ মিলছে না। আবার জঙ্গিরা খুন করে তাদের অস্তিত্বের ঘোষণা দিচ্ছে। জঙ্গি-সন্ত্রাস-বিদেশিদের খুন নিয়ে অন্ধকারে আছে গোট দেশ।

এখানে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলের নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে বাংলাদেশ সফর স্থগিতের প্রসঙ্গটি এসেই যায়। সব কিছু ঠিকঠাক থাকার পরও হঠাৎ করে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া জানিয়ে দিল, বাংলাদেশে এতটাই নিরাপত্তার অভাব আছে, আপাতত তারা সফর স্থগিত করতে বাধ্য হচ্ছে। এরপরই ঘটে গেল তাবেলা হত্যাকাণ্ড এবার অস্ট্রেলিয়া জানাল, তাদের ফুটবল দলও বাংলাদেশ সফরে আসবে না। শুরু হলো বিদেশিদের উদ্বেগ জানানোর পালা। বাংলাদেশ সফর বিষয়ে ইউরোপ ও আমেরিকার কয়েকটি দেশ তাদের নাগরিকদের সতর্ক করেছে। এবার জাপানও তা করেছে। এতে যে বিষয়টি বহির্বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, তা হলো- বাংলাদেশে গেলে প্রাণ যাওয়ার সংশয় আছে। আর এর অর্থ হলো- বাংলাদেশে না যাওয়াই ভালো। এই অবস্থার উত্তরণ না হলে দেশের অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে।


যখন নিরাপত্তার অজুহাতে অস্ট্রেলিয়া সফর স্থগিত করল, তখন আমরা দেশটির ওপর চটেছি। ক্রিকেট নিয়ে এ দেশে কখনো এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি যে, তা উদাহরণ হিসেবে দেখিয়ে অস্ট্রেলিয়া আসবে না। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার সেই আশঙ্কা সত্যি হচ্ছে। এ থেকে আমাদের বুঝতে হবে- হয়তো কোনো গোপন সন্ত্রাসী তৎপরতা আগে থেকেই চলছিল, যা সরকার জানতে পারেনি। তা না হলে পরপর দুজন বিদেশি খুন হবেন কেন। অথবা সরকারের নিরাপত্তাবাহিনী এসব খুন রুখতে ব্যর্থ হবেই বা কেন। আমাদের কাছে এখনো কোনো উত্তর নেই। যার খেসারত আমাদের দিতে হচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকা জানিয়ে দিয়েছে, তাদের নারী ক্রিকেট দল বাংলাদেশে আসবে না। এরপর যদি অন্যরাও বলে, বাংলাদেশে কোনো ম্যাচ খেলতে আসবে না, তারা তখন ক্ষতিটা করা হবে- তা বোঝাই যায়।

যে অবস্থা তৈরি হচ্ছে, তাতে বাংলাদেশ কি পাকিস্তানের কাতারে যাচ্ছে। বিষয়টি ভাবার বিষয় এবং এর উত্তরও দেওয়া উচিত সরকারকে। জঙ্গি-সন্ত্রাসের অজুহাতে কেউ বাংলাদেশে আসতে অস্বীকৃতি জানালে এই লজ্জা সরকারের ঘাড়েই বর্তায়, নয় কি? আমাদের মনে রাখতে হবে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে জঙ্গিদের মাথা চাড়া দিয়ে ওঠার কথা। তখন বাংলা ভাই ও জেএমবির বিষয়ে উদাসীনতা দেখিয়েছিল সরকার। যার পরিণতি ভালো হয়নি। সেই জঙ্গিদের ছা-বাচ্চারা এখন বড় হয়েছে। তাদের বিষয়ে কতটা সতর্ক সরকার?

এই অবস্থায় সরকারের মন্ত্রীরা বিদেশিদের হত্যার জন্য বিরোধী বিএনপি-জামায়াতের দিকে আঙুল তুলতে শুরু করেছেন। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, যার দিকেই আঙুল তুলি না কেন, নিরাপত্তাহীনতার যে নজির তৈরি হচ্ছে, তা আগে বন্ধ করতে হবে। সরকারের বাইরে থাকা বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি সব সময় আওয়ামী লীগ সরকারকে ‘অনির্বাচিত’ বলে থাকে। তাদের রাজনৈতিক ইস্যুও এটি। আর সরকারের প্রচারে আছে ‘জঙ্গি ও সন্ত্রাসমুক্ত উন্নয়নমুখি দেশ’। সন্ত্রাস দমনে সরকার কঠোর অবস্থানে। কিন্তু এখন বিএনপির হাতে ইস্যু তৈরি হলো- বিদেশি হত্যা। বিরোধী দলগুলো বা সরকার কারো জন্যই বিদেশিদের হত্যা নিয়ে রাজনীতি করা ঠিক হবে না। এখন আমাদের নিশ্চিত করতে হবে দেশে জঙ্গিদের ঘাঁটি নেই। কাজে তার প্রমাণও দিতে হবে। আমরা বলব জঙ্গি নেই, আইএস, আল-কায়েদা নেই, অথচ তারাই আবার হত্যার দায় স্বীকার করবে তা চলবে না। আমরা জঙ্গিমুক্ত বাংলাদেশ চাই। শান্তিতে ঘুমাতে চাই, চলাফেরা করতে চাই। যেকোনো দেশের মানুষ আমাদের দেশে শতভাগ নিরাপদ- এই গ্যারান্টি চাই। সিজার-কুনিওর হত্যাকারীদের আটক করে বিচারের মাধ্যমে যত দ্রুত সম্ভব নিরাপদ বাংলাদেশের খবর দেওয়া হোক বিশ্ববাসীকে।

লেখক : সাংবাদিক ও সাংস্কৃতি কর্মী।


নিউজ পেজ২৪/ইএইচএম