খোলা কলাম

অক্টোবর ৭, ২০১৫, ৮:৫৪ অপরাহ্ন

রাজনীতির অঙ্কটা পাল্টে যাচ্ছে

মাসুদ মজুমদার

নানা কারণে রাজনীতির গতানুগতিক ধারা ও অঙ্কটা পাল্টে যাচ্ছে। ‘গণতন্ত্র কম, উন্নয়ন বেশি’র নেতিবাচক উপসর্গগুলো এখন স্পষ্ট। হিংসা ও বিদ্বেষের রাজনীতি স্বদেশের সীমা অতিক্রম করে অল্প-বিস্তর বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশী কমিউনিটির ভেতর রাজনৈতিক সচেতনতা রয়েছে। এটি অন্য যেকোনো জাতির সাথে তুলনা করলে বেশি মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বিশেষত ইউরোপ-আমেরিকায় প্রবাসী বাংলাদেশীরা অতিমাত্রায় রাজনৈতিক সচেতনতা প্রদর্শন করেন। জেলাভিত্তিক অসংখ্য সমিতি রয়েছে লন্ডন ও নিউ ইয়র্ক শহরে। হালে কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার কয়েকটি শহরেও দেশজ দলান্ধ রাজনৈতিক চর্চা ও সমিতি করার প্রবণতা বেড়েছে।

সাধারণত ভাষা, ধর্ম ও নৃতাত্ত্বিকভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সব দেশে সঙ্ঘবদ্ধ থাকার মধ্যে নিজেদের কল্যাণ বিবেচনা করে। বাস্তবেও তাই। এটি শুধু ধর্মীয় ও নৃতাত্ত্বিক পরিচয় ধরে রাখার জন্য নয়, কমিউনিটির ভেতর বোঝাপড়ার মাধ্যমে এই ঐক্য গড়ে ওঠে নিজস্ব রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা অক্ষুণ্ন রাখার ভাবনা থেকেও। একটা মাত্রা পর্যন্ত এটি যেমন প্রয়োজনীয়, তেমনি ক্ষেত্রবিশেষে জরুরিও বটে। বাংলাদেশীরা দেশের দলান্ধ রাজনীতি ফেরি করতে গিয়ে সম্ভবত সীমা অতিক্রম করে ফেলেছে। আমাদের সমস্যাটা অসহনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে জাতীয় ঐক্য নষ্ট হওয়ার কারণে। অন্যান্য জাতি দেশের বাইরে স্বদেশের প্রতিনিধিত্ব করে। স্বজাতির প্রতিনিধিত্ব করে। ব্যতিক্রম ছাড়া বাংলাদেশীরা প্রতিনিধিত্ব করে দেশের কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলকে। আমাদের পুরো জাতি কার্যত এই মুহূর্তে রাজনৈতিকভাবে শুধু বিভাজিত নয়, এতটা বিভক্ত যে, প্রবাসে যিনি যে অবস্থানেই থাকুন তিনি হয় সরকার সমর্থক, নয়তো বিরোধী দল সমর্থক। কেউ বিএনপিপন্থী, কেউ আওয়ামী লীগপন্থী, কেউ জামায়াতপন্থী, কেউ বা অন্য কোনো দলের সমর্থক। সমর্থন পর্যন্ত থাকলে এটি কোনো সমস্যার কারণ হতো না। এ সমর্থন এখন দলবাজির চূূড়ান্ত পর্বে পৌঁছে গেছে। বিদেশীদের হাসানোর মতো কাণ্ডকীর্তি ঘটানো হচ্ছে। লজ্জায় খাবি খাচ্ছেন অনেক প্রবাসী। আমাদের দুর্ভাগ্য, যারা সরকার পরিচালনায় থাকেন তারাও দেশের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী না হয়ে দলের ব্যানারে থাকতে বেশি পছন্দ করেন। নিজেরাই বুঝিয়ে দেন, তারা দেশের সব মানুষের প্রধানমন্ত্রী কিংবা মন্ত্রী নন, দলের প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রী।
বাংলাদেশের বাস্তবতা হচ্ছে- যারা ঢাকায় থাকি তারা গ্রামে গিয়ে দেখি আমাদের নিজ নিজ গ্রামে ঢাকাকেন্দ্রিক সব দলের শাখা-প্রশাখা রয়েছে। রাজধানীতে যে রাজনৈতিক চাঞ্চল্য ও দলবাজি দেখি তারই প্রতিধ্বনি শুনি গ্রামেও। এখন এটি ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সব প্রান্ত ছুঁয়েছে। ঈদ লাগোয়া সময়টিতে লন্ডন ও নিউ ইয়র্ককেন্দ্রিক দেশজ রাজনীতির উত্তাপ ও চাঞ্চল্য অতীত যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। এর কারণ, রাজনৈতিক মেরুকরণের মাধ্যমে প্রবাসীরা দলবাজির চূড়ান্ত স্তরে রয়েছেন। তা ছাড়া প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলীয় জোটনেত্রী শেখ হাসিনা নিউ ইয়র্ক সফরে ছিলেন। লন্ডনে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তিনি কার্যত বিরোধী দলেরই নেতা। এ সুযোগে স্ব স্ব দলের ও জোটের পক্ষে শক্তি প্রদর্শনের সুযোগটা কোনো প্রবাসী হাতছাড়া করতে চাননি। এক নেত্রীর যাত্রাভঙ্গের জন্য অন্য জোটের ও দলের কর্মী-সমর্থকেরা এতটা মরিয়া হয়ে উঠলেন- যা দেখা যায়, হজম করা যায় না। দুই নেত্রী সংবর্ধনা পেয়েছেন। আবার প্রতিপক্ষের প্রতিবাদ প্রতিরোধও মোকাবেলা করেছেন। কোনো মন্ত্রী হয়েছেন অবরুদ্ধ, কেউ প্রতিবাদ প্রতিরোধের মুখোমুখিও হয়েছেন। কেউ কেউ ফুলের মালার পরিবর্তে পেয়েছেন ঘৃণার মালা। সমাবেশের স্থান পরিবর্তনের মতো লুকোচুরি সাধারণ ঘটনা। বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে অনেকেই রুট পাল্টিয়েছেন। এটি এখন বাড়াবাড়ির প্রান্ত অতিক্রম করেছে।
কার্যত বিরোধীদলীয় নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর ঈদকেন্দ্রিক বিদেশ সফর নানা গুজবের জন্ম দিয়েছে। কাকতালীয়ভাবে দু’নেত্রী এবারই একসাথে দেশের বাইরে পৃথক পৃথক দেশে ঈদ পালন করলেন। এ ছাড়া দুই দলেরই শীর্ষ ক’জন নেতাও প্রবাসে ছিলেন। সরকার দেশের রাজনীতিতে যে খরা ও বন্ধ্যত্ব সৃষ্টি করেছে, তার মোকাবেলায় প্রবাসের অনুকূল পরিবেশে বিরোধীদলীয় নেতারা স্বচ্ছন্দে মতবিনিময়ের সুযোগ নেবেন তাতে কোনো অস্বাভাবিকতা দেখি না। দলবাজির নোংরা খেলা ছাড়া আর যা-ই ঘটুক সব কিছু ইতিবাচক। তাতে লোকচক্ষুর আড়ালে দুই জোটের মধ্যে সৌজন্য বৈঠক হতেও পারে, না-ও হতে পারে। এ নিয়ে অতি উৎসাহ-অনুৎসাহ দেখানোর কিছু নেই। আবার তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায় রাজনীতির বরফ গলানোর উদ্যোগ নিলেও আমাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হবে না। এটা তো মানতেই হবে আমরা রাজনৈতিক খই ফুটাই, কিন্তু ষোলো আনা রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। আমাদের রাজনীতিতে নাক ঢোকায় ভারত। মাথা গলায় যুক্তরাষ্ট্র। আরো কিছু আন্তর্জাতিক ফোরাম, দাতা সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগী রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের সাথে লেপ্টে আছে। আমাদের রাজনীতি নিয়ে চীনের বক্তব্য রয়েছে। রাশিয়ার ভূমিকাও ক্ষুদ্র নয়। মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবও ফেলনা নয়। তাই ষোলো কোটি মানুষের দেশটা নিয়ে একক বাণিজ্য করার ও একরৈখিক হয়ে দীর্ঘ দিন মসনদে থাকার ও রাখার কোনো সুযোগ নেই। পক্ষপুষ্ট রাজনীতির জন্য এ ধরনের অদৃশ্য শক্তির জুয়া খেলা কখনো সুখকর হয় না।
সরকার রাজনৈতিক সমর্থন ও জনগণের ভোটের ম্যান্ডেট নিয়ে দেশ চালাচ্ছে না। সরকার পরিচালনায় লেজেগোবরে অবস্থা ও বৈধতার সঙ্কট তাদের তাড়িয়ে ফিরছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও এই সত্যটি মানে ও জানে। কয়টা ডিগ্রি, দু-চারটা পুরস্কার ও পদক গ্রহণ যোগ্যতার সূচক নয়। তাই সম্মানজনক যেকোনো একটি রাজনৈতিক সমঝোতার জন্য সরকারের বাহ্যিক অবস্থান যতটা অস্বচ্ছ হোক, ভেতরের তাগিদ অনেক বেশি। অবৈধতার হুল সহ্য করে পুলিশি রাষ্ট্র পরিচালনার ঝুঁকি মারাত্মক। এটা প্রধানমন্ত্রী সবচেয়ে বেশি বোঝেন। তাই তিনি বলেনও বেশি। মৃত্যুকে তিনি পরোয়া করেন না। জনসেবা তার ব্রত। বাবার মতো প্রাণ দিয়েও দেশের জন্য কিছু করবেন। তিনি ৪১ সালের মিশন বাস্তবায়ন করবেন- জনগণের সেবক, ক্ষমতালিপ্সু নন ইত্যাদি। এর মাধ্যমে তিনি নিজেকে ও বৈধতার বিষয়টি আড়াল করতে চাইলেও আড়াল থাকে না। দেশ যে ভালো চলছে না, সরকারের গ্রন্থিগুলো যে শিথিল হয়ে অনেক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়ে চলেছে, চার পাশে মোসাহেব ও চেনা মুখের ভিড় বাড়লেও ক্ষমতার দাবা খেলায় তিনি যে গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন, তার আক্রমণভাগে খেলার ধরনই সেটা প্রমাণ করে। বিরোধী দল ও মত বধ করার জন্য ক্ষমতার বলয় থেকে এত দিন যেসব বিষাক্ত তীর নিক্ষেপ করা হয়েছে- সেগুলো বুমেরাং হয়ে ফিরে আসতে শুরু করেছে। জঙ্গিবাদের জিগির- অস্ট্রেলিয়া আমলে নিয়েছে। যুক্তরাজ্য সতর্ক হয়েছে, কূটনীতিকপাড়ায় ইতালীয় নাগরিক হত্যা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যকে ব্যঙ্গই করল।
এটা ঠিক, সরকার অত্যন্ত ক্ষিপ্রতা ও নিষ্ঠুরতার সাথে বিরোধী জোটের বার্গেনিং ক্ষমতা প্রায় নিঃশেষ করে দিয়েছে। বিএনপি-জামায়াতকে অনেকটা ঘরে ঢুকিয়ে দিয়েছে। রাজনীতিকে মাঠ থেকে অন্দরে পাঠিয়ে দিয়েছে। তার ভক্তরা এর নাম দিয়েছেন ‘রাজনীতি কম, উন্নয়ন বেশি’। বাকশালকে বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের দর্শন বলে যারা তাকে ডুবিয়েছেন- সেই চাটার দল এখন শেখ হাসিনার চার পাশে। গণতন্ত্র বধ করে যারা দেশ চালানোর দায় নিয়েছেন তারা সবাই খেসারত দিয়েছেন। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশেও এই নজির কম নেই।
দমন-পীড়ন, জেল-জুলুম ও হামলা-মামলার কারণে বিরোধী দল ও জোটের বার্গেনিং সক্ষমতা কমেছে। আরো স্পষ্ট করে বলা যায়, এই মুহূর্তে বিরোধী দলের কোনো বার্গেনিং ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ নেই। অগণতান্ত্রিক আচরণ ও জবরদস্তির শাসনের কারণে শুধু বিরোধী দল ক্ষতিগ্রস্ত নয়, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে গণতন্ত্র, সরকার ও সরকারি দল। কারণ বিরোধী দলের রাজনৈতিক সমর্থন কমেনি। ক্ষেত্রবিশেষে জনসমর্থন বেড়েছে। মাথাগুনে জরিপ করার দরকার নেই। আমেরিকার কোনো সংস্থার জরিপ ভাড়া নেয়ারও প্রয়োজন নেই। জনগণের পাল্স বোঝার জন্য চোখ-কান খোলা রাখাই যথেষ্ট। জনগণ মনে করে, বিরোধী দল সক্ষমতা হারালেও যিনি কোনো দিন ক্ষমতা হারান না তিনি সব দেখছেন। দূরদর্শী ও বিচক্ষণ হলে এখন শেখ হাসিনা নিজের জন্য নিজেই সম্মানজনক সমাধানের ফর্মুলা বা সিদ্ধান্ত আরোপ করতে পারেন। কারণ রাজনীতির প্রতিপক্ষ রাজনীতি হলে ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়া ছাড়া মারাত্মক কোনো ঝুঁকি থাকে না। জনগণের সমর্থন রাজনীতিরই কোনো পক্ষ উপভোগ করে। অন্যথায় বিগড়ে থাকা জনমত এতটাই পরিবর্তনকামী হয়ে ওঠে, যেকোনো অগণতান্ত্রিক পরিবর্তনকেও স্বাগত জানাতে কার্পণ্য করে না। লন্ডন কিংবা নিউ ইয়র্কে কোনো সমঝোতামূলক রাজনৈতিক সন্ধি হলো কিংবা না-ই হলো- বিভক্ত জাতিকে হিংসা-বিদ্বেষের রাজনীতি থেকে মুক্তি দিতে হবে। নেতৃত্ব সেই পথে না হাঁটলে ক্ষমতা নিজ বৈশিষ্ট্যে এবার পার্শ্ব পরিবর্তন করবে। তাতে রাজনীতির অঙ্কটা পাল্টে যাবে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ব্যর্থতার গ্লানি এখন অসহনীয় হয়ে পড়েছে। কূটনীতিকপাড়ায় অস্থিরতার চেয়েও বড় সূচক হচ্ছে- ইউরোপের অনেক দেশ এখন বাংলাদেশ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেক দেশ ভিসা ইস্যুর কেন্দ্র বানিয়েছে দিল্লিকে। একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের জন্য এটা কতটা অসম্মানজনক ও লজ্জার তা বোঝার বোধটুকুও উন্নয়নের ডুগডুগিবাজরা ভুলে থাকতে চাচ্ছে।
কূটনীতিকপাড়ায় ইতালীয় নাগরিক হত্যা, উত্তরবঙ্গে জাপানি খুন, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটের ব্যাপারে রিজার্ভেশন, মন্ত্রীদের পরস্পর স্ববিরোধী বক্তব্য, জঙ্গি নিয়ে দু’ধরনের বক্তব্য উপস্থাপনের প্রেক্ষাপটে জাতির মনোজগতে নতুন করে চিত্ত চাঞ্চল্য শুরু হয়েছে। তার মধ্যে বিচারবহির্ভূত হত্যার আরেকটি ঘটনা ঘটল। ইউজিসির কর্মকর্তা হত্যার দায় বর্তাল র‌্যাবের ওপর। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে এমপি গুলি ছুড়ে আহত করল স্কুলছাত্রকে। কালিহাতীর ঘটনার রেশ না কাটতেই প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধ গ্রহণের রাজনীতি আবার ছড়িয়ে পড়ল। খুন হলেন পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যান, পাবনায় খুন হলেন পুলিশ কর্তকর্তা। একই জেলায় যাজক হত্যার মতো ঘটনাও ঘটতে যাচ্ছিল। প্রতিহিংসার রাজনীতি দিয়ে এটা মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। প্রতিহিংসার রাজনীতির আরো বিস্তৃতি ঘটালে সরকারকে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়াতে হতে পারে। তাতেও রাজনীতির ধরন-ধারণ পাল্টে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।
masud2151@gmail.com

নিউজ পেজ২৪/আরএস