শিল্প সাহিত্য

অক্টোবর ৯, ২০১৫, ৪:১০ অপরাহ্ন

বিপন্ন মানুষের কণ্ঠস্বর

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

এ বছর যিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন সুয়েতলানা আলেক্সিয়েভিচ, আমার কাছে তিনি এক বিস্ময়; যদিও পশ্চিমের পাঠকরা হয়তো তার সম্পর্কে জ্ঞাত। তার কোনো বই আমি পড়িনি; এবং ঢাকার কোনো গ্রন্থাকার অথবা বইয়ের দোকানে তার কোনো বই আছে কি-না, সে সম্পর্কে আমার ঘোরতর সন্দেহ। তার নামটি কয়েক দিন থেকে সম্ভাব্য বিচারিক তালিকায় দেখে ইন্টারনেটে তার সম্পর্কে কিছুটা জানার চেষ্টা করেছি। যেটুকু জেনেছি, তার সঙ্গে সুইডিশ একাডেমির সংক্ষিপ্ত মূল্যায়নের একটি সাযুজ্য খুঁজে পেয়েছি। সুইডিশ একাডেমির স্থায়ী সদস্য জানালেন, আলেক্সিয়েভিচ বহু ভাষা তার

কণ্ঠে ধারণ করেন এবং তার লেখা আমাদের সময়ের সংকল্প এবং সাহসের প্রতিনিধিত্ব করে।

ইন্টারনেটে তার লেখার কিছু কিছু অংশ পড়েছি। তার সম্পর্কে সমালোচকদের মূল্যায়নটিও জেনেছি। আমার যেমন মনে হয়েছে, তিনি তার প্রতিবেদনমূলক লেখালেখিতে মানবসৃষ্ট দুর্ভোগ ও বিপর্যয়ের শিকার মানুষকে নিয়ে সংবেদী চিন্তাভাবনা করেছেন। যেমন : আফগানিস্তানের যুদ্ধ এবং চেরনোবিলের পরমাণু কেন্দ্রের বিপর্যয় অথবা আরও আগের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নির্মম শিকার নারী ও শিশুদের দুঃখ-কষ্টের বর্ণনা তার নিজস্ব ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন। তার ভাষায় তিনি যে সাহিত্যশ্রেণী চর্চা করেছেন তা হচ্ছে, প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব কণ্ঠস্বরকে তার নিজস্ব পরিপ্রেক্ষিতে স্থাপন করে পরিবেশন করা। সে জন্য বহু মানুষের কণ্ঠস্বর একত্র হয়ে আলেক্সিয়েভিচের লেখায় সার্বিক কণ্ঠস্বরটি রচনা করে। এই কণ্ঠস্বরটি মৌলিকভাবেই মানবিক। তিনি যুদ্ধবিরোধী, নিপীড়নবিরোধী, মানবতার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী এবং তার দৃষ্টি বিপন্ন মানুষের দিকে। সেই অর্থে নোবেল সাহিত্য পুরস্কার এবার একজন মানবতাবাদী সাহিত্যকর্মীর হাতে গেল। তিনি সাংবাদিক; কিন্তু একই সঙ্গে বিপন্ন মানুষের দুরবস্থার চিত্রকর।

আমি আশা করেছিলাম, আমার দীর্ঘদিনের প্রিয় লেখক মিলান কুন্ডেরা অথবা স্বল্পদিনের প্রিয় লেখক হারুকি মুরাকামি অথবা সিরিয়ান আধুনিকতাবাদী কবি আদুনিস এবার পুরস্কার পাবেন। তারা না পাওয়ায় কিছুটা হতাশ হয়েছি। কিন্তু আলেক্সিয়েভিচ পুরস্কারটি পাওয়ায় আনন্দিত হয়েছি। দুটো কারণে। প্রথমত, প্রতিষ্ঠানের বাইরে থেকে প্রতিষ্ঠানবিরোধী লেখালেখি করেও একজন সাহিত্যিক বিশ্বে সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার পেলেন। আর দ্বিতীয়ত, একজন প্রকৃত মানবপ্রেমীর সঙ্গে আমাদের নতুন পরিচয়ের পথ উন্মুক্ত হলো। এখন আমার কাজ হবে আলেক্সিয়েভিচের লেখাগুলো সংগ্রহ করে পড়া।
এইমাত্র তার একটি সাক্ষাৎকারে পড়লাম, মানবের ইতিহাস হচ্ছে হন্তারকের সঙ্গে তার শিকারের নিরন্তর কথোপকথন। ফলে তার পক্ষে হন্তারকের শিকারদের পক্ষাবলম্বন, অর্থাৎ নির্যাতিতদের পক্ষ অবলম্বন করাই স্বাভাবিক।
সুয়েতলানা আলেক্সিয়েভিচকে আমার অভিনন্দন।

নিউজ পেজ২৪/আরএস