শিল্প সাহিত্য

অক্টোবর ১৯, ২০১৫, ৯:২৬ অপরাহ্ন

কবি ফররুখ আহমদ : প্রেরণার বাতিঘর

ড. সাইয়েদ মুজতবা আহমাদ খান

পৃথিবীর জনগোষ্ঠীর মধ্যে যেহেতু বিপুলসংখ্যক কবির আবির্ভাব ঘটেছে অতীতে যেমন বর্তমানেও অগণিত কবির পদভারে পৃথিবী মুখরিত। সুতরাং এই বিপুলসংখ্যক বুদ্ধিমান ও অতীব সচেতন জনগোষ্ঠীর জীবনে আদর্শবাদ কিংবা অনাদর্শবাদের ভূমিকা থাকা স্বাভাবিক। কবিতা তো অনেকেই লেখেন- কবি ও কবিতার দেশ এই শ্যামল-সুন্দর বাংলাদেশে। কিন্তু কতজনকে পাওয়া যাবে প্রকৃত কবি হিসেবে? আবার প্রকৃত কবি হয়েও কতজনকে পাওয়া যাবে প্রবৃত্তির দাস নন, বা শুধু নাম যশের কাঙাল নন? অর্থবিত্তের লোভে কবিতা চর্চা করেন না। শব্দ নিয়ে খেলা করেন না অহরহ। অদম্য স্পৃহা নিয়ে কবিতাঙ্গনকে মাতিয়ে তোলেন না দীর্ঘকালব্যাপী? এভাবে যাচাইবাছাই এবং পরখ করে দেখা মেলা ভার প্রকৃত কবিতার মানদণ্ডে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রকৃত কবির দেখা পাওয়াই যেখানে দুষ্কর-দুঃসাধ্য- সেখানে আদর্শবাদী, শুধু সত্য সুন্দরের জন্য, কেবল শাশ্বত সত্যের জন্য নিজের জীবন ও জীবিকাকে উৎসর্গ করে কাব্যচর্চায় নিয়োজিত কবি কর্মী পাওয়া দুর্লভ। কিন্তু কবি ও কবিতার ঊর্বর ভূমি সবুজ সুন্দর এ বাংলাদেশে এমন এক মহান কবির আমরা সাক্ষাৎ-সন্ধান পাই যিনি চল্লিশের দশকে আবির্ভূত হয়ে সবাইকেই অভিভূত করে দিয়েছিলেন তার সব দিক দিয়েই স্বতন্ত্র কবি সত্তার দ্বারা। যিনি সব অর্থে, শিল্পসম্মত, মান উত্তীর্ণ কবিতা রচনার মাধ্যমে সর্বমহলের সুদৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি মহা কবি, মহৎ কবি, মানবতার যথার্থ রূপকার, মানবতার প্রকৃত মুক্তি প্রত্যাশী কবি। কবি ফররুখ আহমদকে তাই এক বাক্যে সবাই স্বীকার করেছেন- তিনি বাংলা সাহিত্যের একজন শক্তিমান এবং কালোত্তীর্ণ মহান কবি। যার কবিতা পাঠকপ্রিয়তা পাবে যুগ যুগ ধরে। যার কবিতা কখনো হারিয়ে যাওয়ার নয়।
তিনি এ দেশের জনগণের ভাষায়, জনগণের বিশ্বাসের কথা তার কাব্যে লিপিবদ্ধ করেছেন অত্যন্ত শিল্পসম্মত ও কাব্য মাধুর্যের মাধ্যমে তাদের প্রাত্যহিক যাপিত জীবনযাপনের আলেখ্য নিপুণ কাব্য কৌশলে তুলে ধরেছেন তার কবি কর্মে।
এ দেশের জনগণ তার কবিতা পাঠে উজ্জীবিত হয়ে হৃদয়ের কথা কহিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। ফররুখ আহমদের কবিতা পড়ে পাঠক বিভ্রান্ত হন না। বরং সত্য সুন্দরের সাক্ষাৎ পেয়ে মানবজীবনকে ধন্য ও সার্থক করে তোলেন।
কবি ফররুখ আহমদ কলকাতায় এক সময় মানব মুক্তির আশ্বাসে ট্রেড ইউনিয়নে যোগ দিয়ে মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু অচিরেই ভুল তার ভেঙে যায়। যেখানে এক মানুষ তার নিজের সমস্যারই সমাধান করতে অক্ষম-ব্যর্থ- তিনি কোটি মানুষের সমস্যার সমাধান করবেন কিভাবে? এটি যে একেবারেই দুঃসাধ্য এবং অতীব অসম্ভব কর্ম। মানবজাতির দুঃখ-দুর্দশা, সঙ্কট ও সমস্যার সমাধান ও প্রতিবিধান মানুষেরই সৃষ্ট ও মানুষেরই বাতলানো পথে যে সম্ভব নয় ; তা তো পৃথিবী অনেকবার পরখ করে দেখেছে।
মুসলিম জাতির অতীতের গৌরব ও সৌরভকে মানবজীবনে ফিরিয়ে আনতে অনেক কবিই স্বপ্ন দেখেছেন, ছিটেফোঁটা কবিতাকর্মও করেছেন কেউ কেউ কবি র্ফরুখ আহমদ নিজের বাস্তবজীবনে তা বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন। প্রাত্যহিক যাপিত জীবনে তা প্রয়োগ করেছিলেন অত্যন্ত কঠোর ও নিষ্ঠার সাথেই।
কবিতায় স্বপ্ন প্রদর্শন নয়, গালভরা কড়চা-বুলি সর্বস্ব ছিলেন না তিনি ক্ষণিকের জন্যও। ঘাম ঝরিয়ে, মিথ্যে মেকী শক্তির বিরুদ্ধে লড়ে আদর্শবাদের যে পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতে হয়- তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিলেন কবি ফররুখ আহমদ। লোভ লিপ্সা এবং কুৎসিত স্বার্থপরতার কবর রচনা করে এগোতে হয়- এমনই ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি। লোভ-লালসার সর্বগ্রাসী আগ্রাসন কখনো তাকে কাবু করতে পারেনি। এখানেই অনন্য, এখানেই স্বতন্ত্র সত্তার অধিকারী পরিপূর্ণ এক মহৎ মানুষ তিনি। তিনি প্রকৃত মানবতার জয়গান করেছেন তার কাব্যে-সাহিত্যে। মানবতার মুক্তির স্বপ্ন দেখেছেন আমৃত্যু। এখানে কোনো ছেদ কিংবা বিরতি ছিল না। অবিশ্রান্ত গতিতে তার কাব্য সাধনা অব্যাহত ছিল।
কবি র্ফরুখ আহমদের মতো নির্লোভ, নিঃস্বার্থবাদী মানুষ, আপসহীন আদর্শবাদী কবি জগতে কমই জন্মগ্রহণ করেছেন। তার অসামান্য কাব্য প্রতিভাকে চেপে রাখার ব্যর্থ প্রয়াস প্রায়ই লক্ষণীয়। অথচ তার প্রতিভা ছিল আকাশচুম্বী- অভ্রভেদী। তার সমসাময়িকদের মধ্যে তিনি অসামান্য কবি প্রতিভার অধিকারী। সর্ব দিকেই ছিলেন প্রাগ্রসর। কবি র্ফরুখ আহমদকে এই যে অপছন্দ করা, তার প্রতিভাকে অবমূল্যায়নের যে সচেতন প্রয়াস- এটির একমাত্র কারণ তার আদর্শ চেতনা।
র্ফরুখ আহমদ যে ধাতুতে গড়া ছিলেন তাতে কোনো ফাঁক কিংবা ফাঁকি ছিল না। দ্বিধা-দ্বন্দ্বের তো প্রশ্নই ওঠে না। ফররুখ আহমদ এ ক্ষেত্রে মোটেই আপস করেননি। কলা কৈবল্যবাদী মহাজনেরা সংখ্যায় তেমন বেশি না হলেও হাঁক ডাক তো তাদের আকাশ ফাটানো। তাদের হাঁকডাক ও তোলপাড় কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা মাত্র!
ফররুখ আহমদ ছিলেন অফুরন্ত প্রেরণার প্রদীপ্ত এক বাতিঘর। সে বাতিঘরের আলোকমালাকে আচ্ছাদিত করতে চাইবেন, ঢেকে লুকিয়ে পেছনে ফেলতে প্রয়াস চালাবেন- ফররুখ আহমদ আরো শক্তিশালী হয়ে আবির্ভূত হবেন কালে কালে যুগে যুগে। সে নব নব উত্থানের অগ্রযাত্রাকে কেউ রুদ্ধ করতে সক্ষম হবেন না কোনোকালে! মেঘ দেখে তুই করিসনে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে।
কবি ফররুখ আহমদ প্রথমে দর্শন এবং পরে ইংরেজি সাহিত্যের একজন মেধাবী ছাত্র ছিলেন। ইংরেজি সাহিত্যের শীর্ষ কবিদের কবিতা তার প্রচুর মুখস্থ ছিল। ইংরেজি সাহিত্য ব্যাপকভাবে অধ্যয়ন করেছিলেন। এ সাহিত্যে লুকায়িত বস্তুবাদী জীবন দর্শন তথা গ্রিক-রোমান সভ্যতা ও সংস্কৃতির ওপর প্রতিষ্ঠিত ইহলৌকিকতাবাদকে তিনি আগাগোড়া জেনেছেন। আজীবন কবিতার পথে স্থির থেকে পরম সফলতার পরিচয় দিয়েছেন জীবন, কর্ম ও অনবদ্য সাধনায়।

নিউজ পেজ২৪/আরএস