স্বাস্থ্য

নভেম্বর ১৫, ২০১৫, ১:১৬ পূর্বাহ্ন

স্বাচিপের কমিটি গঠন নিয়ে ফের অনিশ্চয়তা

নিজস্ব প্রতিবেদক

গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দুই বছর অন্তর সংগঠনে নতুন নেতৃত্ব আসার কথা থাকলে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) কমিটি গঠন নানা জটিলতায় আটকে ছিলো এক যুগেরও কিছু বেশি সময়। তারপরেও গত ১৩ নভেম্বর আশায় বুক বেধেছিলো সংগঠনটির নেতা-কমীরা। কিন্তু মাঝপথে সম্মেলন পণ্ড হয়ে যাওয়ায় স্বাচিপের কমিটি গঠন নিয়ে ফের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

স্বাচিপের সর্বশেষ সম্মেলন হয় ২০০৩ সালে। ওই সম্মেলনে গঠিত কমিটির একচেটিয়া আধিপত্যের কারনেই এতদিন সংগঠনটিতে নতুন নেতৃত্ব তৈরি হয়নি বলে অভিযোগ করেন স্বাচিপের একাধিক নেতা। এই দীর্ঘ সময় পরেও সংগঠনের নেতৃত্ব নির্বাচন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় মাঝপথে আটকে গেছে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ-স্বাচিপ।

গত শুক্রবার (১৩ নভেম্বর) সকালে ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত এই পেশাজীবী সংগঠনের জাতীয় সম্মেলনের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি ওই সময় নতুন নেতৃত্ব তৈরি করতে নিজেদের নির্বাচন করার পরামর্শ দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী। তারপরে স্বাভাবিকভাবেই চলতে থাকে সম্মেলন। কিন্তু বিকেল বেলা হঠাৎ দুই পক্ষের হাতাহাতিতে পণ্ড হয়ে যায় সম্মেলন।

সম্মেলনকে ঘিরে প্রায় ১০ হাজার চিকিৎসক সমবেত হয়েছিলেন রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। সকাল থেকেই ছিল ব্যাপক উচ্ছ্বাস ও উৎসাহ। সম্মেলন ঘিরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্যান্ডেলের পাশাপাশি ব্যাপক প্রস্তুতি ছিল ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন ঘিরে। একদিকে সাজানো ছিল সভামঞ্চ, অন্যদিকে ছিল ভোটের আয়োজন। দুপুর পর্যন্ত সব কিছুই ছিল ঠিকঠাক। কিন্তু দৃশ্যপট পাল্টে যায় দ্বিতীয় পর্বে। আনন্দ-উৎসবের পরিবর্তে সমবেত সবার মাঝেই ভর করে সংশয়। ভোটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচনের সম্ভাবনা ক্ষীণ হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত সৃষ্টি হয় চরম বিশৃঙ্খল অবস্থা। নতুন নেতৃত্ব নিয়ে কোন্দলের মুখে ভেঙে দেওয়া হয় ১২ বছর ক্ষমতায় থাকা কার্যনির্বাহী কমিটি। তাৎক্ষণিক কোনো নতুন কমিটি বা আহ্বায়ক কমিটিও গঠন না করেই মুলতবি হয়ে যায় সাধারণ সভা।

দুপুর ২টায় সাধারণ সভা শুরুর কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে স্বাচিপ সভাপতি ডা. রুহুল হককে না পেয়ে একজন সহসভাপতিকে সভাপতি করে সংগঠনের মহাসচিব ডা. ইকবাল আর্সলান সাধারণ সভার কার্যক্রম শুরু করেন। এ সময় পুরো মিলনায়তন ইকবাল আর্সলান সমর্থিত চিকিৎসকদের দখলে ছিল। তাঁরা প্রকাশ্যেই ইকবালের পক্ষে স্লোগান দিতে থাকেন। সভা শুরুর একপর্যায়ে শোক প্রস্তাব পাঠ করার সময় ইকবাল আর্সলানের প্রতিদ্বন্ধী নেতা বলে পরিচিত সাবেক সংসদ সদস্য ডা: মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন মঞ্চে এসে শোক প্রস্তাব পাঠ বন্ধ করে দিয়ে সভা বন্ধ রাখতে বলেন। এ সময় ইকবালের সমর্থকরা জালালের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকেন। সভার সভাপতিও মঞ্চ থেকে সরে যান।

এরপর ইকবাল সমর্থকরা মঞ্চে ওঠেন। পরে সাধারণ সভার স্থান পরিবর্তন করে মিলনায়তন থেকে সবাইকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্যান্ডেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কয়েক হাজার চিকিৎসকের উপস্থিতিতে স্বাচিপের সভাপতি ডা. রুহুল হকের সভাপতিত্বে সভা শুরু হয়। তবে কিছুক্ষণ পরই মহাসচিব ইকবাল আর্সলান সভা মুলতবির ঘোষণা দেন। একই সময় সভাপতি রুহুল হক স্বাচিপের কার্যনির্বাহী কমিটিও ভেঙে দেন। পরে নতুন কোনো কমিটি না করেই সভা শেষ হয়।

প্রধানমন্ত্রী সভামঞ্চ ত্যাগের পর দুপুরের বিরতিকালে স্বাচিপের সভাপতি অধ্যাপক ডা. রুহুল হক বলেছিলেন, ‘আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সরাসরি নির্দেশনা আশা করেছিলাম। কিন্তু তিনি চিকিৎসকদের ওপর সিদ্ধান্ত ছেড়ে দিয়ে গেছেন। এখন জানি না কী হয় না হয়।
ওই মহাসচিব ইকবাল আর্সনাল বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাদের ওপর দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। এখন ভোটাররাই তাঁদের ভোটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন করবেন।

এদিকে ১২ ধরে স্বাচিপের নেতৃত্ব আঁকড়ে থাকার জন্য সমানভাবে সভাপতি রুহুল হক ও মহাসচিব ইকবাল আর্সলানের বিরুদ্ধে সমালোচনা আছে। এ ক্ষেত্রে এ দুজন একই গ্রুপ চালাতেন বলে জানান স্বাচিপের একাধিক নেতারা। কিন্তু সম্মেলনে হঠাৎ করেই এ দুই নেতার মধ্যে বিরোধ প্রকাশ্য হয়ে পড়ে। এ ছাড়া একপর্যায়ে এত দিনের বিরোধপূর্ণ সম্পর্ক থাকা আরেক মহসচিব পদপ্রার্থী ডা. এম এ আজিজ আর ইকবাল আর্সলান এক মেরুতে মিলে যান। ইকবাল আর্সলানের সমর্থকদের মহাসচিব পদের জন্য এম এ আজিজের নামে স্লোগান দিতে দেখা যায়।

স্বাচিপের জালাল সমর্থকরা অভিযোগ করেন, নির্বাচনে জয়লাভ করতে পারবেন না বলেই ইকবাল আর্সেলান, ডা: আজিজ এবং আরেকজন মহাসচিব প্রার্থী ডা: উত্তম বড়–য়া বহিরাগতদের ঢুকিয়ে সভায় গোলযোগ সৃষ্টি করেছেন। তারা পূর্বের ন্যায় চক্রান্ত করে ক্ষমতা আগলে রাখতে চায়। অপরদিকে ইকবাল সমর্থকরা বিশৃঙ্খলার জন্য জালাল সমর্থকদের দায়ি করেন। তারা পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, নির্বাচন হলে জালাল মহিউদ্দিন হেরে যাবেন। তাই গোলযোগের পিছনে তার ইন্ধন রয়েছে।

তবে সাধারণ স্বাচিপ নেতাদের অভিমত, নেতাদের ক্ষমতার লোভে স্বাচিপ তার ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ নতুন নেতৃত্ব। সেটা নির্বাচনেই হোক আর সিলেকশনেই হোক। তবে গোলযোগ এড়াতে প্রধানমন্ত্রীর দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেন তারা। নইলে দেশের সর্বোচ্চ এই পেশাজীবি সংগঠন স্বাধীনতাবিরোধীদের আখরায় পরিনত হবে। তাই আপাতত নতুন নেতৃত্ব এই সংঙ্কট থেকে স্বাচিপকে রক্ষা করতে পারে।

স্বাচিপের শীর্ষ নেতারা পরবর্তী সভাপতি ও মহাসচিব মনোনীত করার গুরুদায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে ছেড়ে দিয়ে কাউন্সিল অধিবেশন মূলতবী ঘোষণা করে দেন। তবে কমিটি বিলুপ্ত হওয়ার পরে ৪৮ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে কোনো ঘোষণা আসেনি।

বিলুপ্ত কমিটির সভাপতি ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. আ ফ ম রুহুল হক এ বিষয়ে বলেন, তার কাছে কোনো খবর নেই। প্রধানমন্ত্রী তাদের কাউকে ডাকেননি কিংবা কোনো ঘোষণাও আসেনি।

এরআগে শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে গুঞ্জন ওঠে বিলুপ্ত কমিটির মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এম ইকবাল আর্সলান ও বিএমএর যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজই হচ্ছেন পরবর্তী সভাপতি ও মহাসচিব। তাদের অনুসারী চিকিৎসকদের অনেকে ফেসবুকসহ ও তারবার্তায় আগাম শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। কিন্তু কারও কাছে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই বলে তারা স্বীকার করেন।

একটি সূত্র বলছে, ইকবাল আর্সলানকে সভাপতি না দিয়ে অন্য কাউকে দিলে স্বাচিপের অনেকেই খুশি হবেন। কয়েকজন স্বাচিপ নেতার দাবি প্রধানমন্ত্রী এখনো কারও ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেননি। তিনি বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে খোঁজ খবর নিচ্ছেন। শেখ হাসিনা নতুন কাউকে দায়িত্ব দিয়ে চমকও দেখাতে পারেন বলে কেউ কেউ দাবি করেছেন।

কেউ কেউ বলছেন, নেত্রী কাউকে দায়িত্ব না দিয়ে অ্যাডহক কমিটি গঠন করে দিতে পারেন। ভোটার তালিকা সংশোধন করে সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে নির্দেশনা দিতে পারেন। কিন্তু এসব কথা অকেটাই অনুমাননির্ভর। তবে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় কার ভাগ্যের চাকা খুলে যায় সেটা দেখতেই এখন অপেক্ষার প্রহর গুনছেন স্বাচিপ নেতারা।