সাক্ষাৎকার

নভেম্বর ২০, ২০১৫, ৬:৩৭ অপরাহ্ন

‘খালেদা জিয়া দেশে ফিরলে সেটা হবে সুইসাইড’

নিউজপেজ ডেস্ক

মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামান ১৯৮৬ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসরে যান। ১৯৯১ সালে বিএনপি থেকে মনোনয়ন নিয়ে কিশোরগঞ্জ-২ থেকে সংসদ সদস্য নিবার্চিত হন। বিএনপিকে নিয়ে বিভিন্ন সময় কথা বলতে গিয়ে আলোচিত-সমালোচিত হয়েছেন তিনি। চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে রাজধানীর মহাখালীর ডিওএইচএস-এ তার বাসভবনে ১৭ নভেম্বর সকালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার দেশে ফেরা-না ফেরা নিয়ে খোলামেলা মন্তব্য করেন তিনি। সাক্ষাৎকার বলেন:

শনিবার খালেদা জিয়া দেশে ফিরবেন...
মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামান : বললাম তো, ২০১৯ সালের নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়ার দেশে ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই। কেন ফিরবেন? তিনি ফিরতে পারেন না। তিনি দেশে ফিরলে সেটা হবে সুইসাইড। উনি এলে তো সরকার উনাকে ওয়েলকাম জানাবে। উনি বাইরে থাকলে রাজনৈতিক ফায়দা বেশী হবে। দেশে এলে রাজনীতির ক্ষতি হবে। উনি এখন মুক্ত, ওখানে থেকে রাজনীতি করলে দেশের জন্য অনেক ভাল হবে।
২০১৬ সালের ৫ জানুয়ারির মধ্যে খালেদা জিয়াকে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশনা রয়েছে...
মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামান : জানুয়ারি কি একটাই আসবে? আর আসবে না? এটা ২০১৯ সালের পরে বলবেন। ২০২০ সালের ৫ জানুয়ারির আগে উনি (খালেদা জিয়া) দেশে ফিরবেন বলতে পারেন। এর আগে উনি আসবেন না। না এলে উনার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট জারি হবে, জেল হবে...

চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিটাকে কীভাবে দেখেন?
মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামান : আমরা বাংলাদেশে কী চাচ্ছিলাম? আমরা ২০ বছর ধরে বলে আসছি, একজন সাদ্দাম হোসেন, একজন ডিক্টেটর দরকার। এটা মানুষের চাহিদা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই পথে হাঁটছেন। বাংলাদেশের মানুষ ডিক্টেটর মেনে নেবে। আইয়ুব খানকে মেনে নিয়েছিল, ১২ বছর তো ছিলেন। জিয়াউর রহমান ডিক্টেটর ছিলেন, তার বিরোধিতা করেনি জনগণ। তিনি ভাল কাজ করেছেন বলে মানুষ মেনে নিয়েছে। এরশাদ ডিক্টেটর ছিলেন। ভাল কাজ করেননি, তার পরও নয় বছর থাকতে পেরেছেন। মানুষ ১/১১-কে মেনে নিয়েছে। এখন যদি বর্তমান সরকার ভাল কিছু করতে পারে— মানুষ মেনে নেবে। প্রধানমন্ত্রী সে সব ভেবেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আর বিরোধিতা তো একটা অংশ করবেই। কোন কালে, কোন দেশে বিরোধিতা হয়নি? তবে কোনোকিছুই চিরস্থায়ী নয়। এভাবে আরও ৫ বছর চালাতে পারলেই যথেষ্ট...

সম্প্রতি দু’জন বিদেশী নাগরিক ও পুলিশ হত্যার মতো ঘটনা ঘটেছে, এটাকে আপনি সঙ্কট মনে করেন কি?
মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামান : পরিবেশ ঘোলাটে করার জন্য এ ধরনের ঘটনা ঘটবে। যতই এ ধরনের ঘটনা ঘটবে, সরকার কড়াকড়ি পদক্ষেপ নেবে। সবকিছু সরকারের ফেভারে। কঠোর হওয়ার জন্য এ সব ঘটনা সরকারকে সুযোগ করে দিচ্ছে। সরকার কঠোর হচ্ছেও।

অক্টোবরে সাকা ও মুজাহিদের রায় হওয়ার কথা ছিল। অতীতে দেখা গেছে, সুপ্রীম কোর্টের রায়ের কপি দেওয়ার পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রায় কার্যকর করা হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে গত সেপ্টেম্বরে সাকা ও মুজাহিদের রায় কার্যকর করা হওয়ার কথা ছিল। এই রকম দু’জন লোককে ফাঁসি দিলে দেশে কিছু সমস্যা হবে। কিন্তু সরকার জানে তারা এটা এখন করবে না। তারা এটা করতে পারে ডিসেম্বরে এসে। ফলে ওই সময় (অক্টোবর) সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি ও নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি।
অন্যদিকে যারা ভেবেছিল রায় কার্যকর হবে, তারা তো প্রস্তুতি নিয়েই নিয়েছে। তারা ইংল্যান্ড ক্রিকেট টিমকে বলে দিচ্ছে, তোমরা তো উমুক দিন দেখেছ পাকিস্তানে ক্রিকেট খেলার সময় গণ্ডগোল হয়েছিল। ১ মার্চ ১৯৭১ সালে ক্রিকেট খেলা হয়েছিল ঢাকা স্টেডিয়ামে। ইয়াহিয়া খান ঘোষণা করেছিল, পার্লামেন্ট বাতিল, অধিবেশন বাতিল। সঙ্গে সঙ্গে ঢাকায় গণ্ডগোল শুরু হয়ে গেল। পেছনের খেলাগুলো দেখেন, ১/১১; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্টেডিয়ামে খেলা চলছিল, ওখানে মারামারি হয়। ওখানে তো কেউ প্ল্যান করে মারামারি করতে যায়নি। সুতরাং তারা (সাকা-মুজাহিদ অনুসারীরা) তো এখন বলতে পারবে না সাকা ও মুজাহিদের ফাঁসি দিলে মারামারি হবে...

তাহলে কি আপনি বলতে চাচ্ছেন যে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর সঙ্গে সাকা ও মুজাহিদের লোকজন জড়িত?
মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামান : আপনি কী মনে করেন? মুজাহিদ ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর যারা অনুসারী আছে, তারা কি বসে আছে? তারা তাদের বাঁচানোর জন্য যা কিছু করার দরকার, তা-ই কি করছে না?

আপনি কি তাহলে এ সব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তারা জড়িত এমনটা সন্দেহ করছেন?
মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামান : সন্দেহ করার তো কিছু নেই। তারাই তো বেনিফিশিয়ারি হবে। যদি দেশের আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে তাহলে ডাইরেক্ট বেনিফিশিয়ারি হবেন সাকা ও মুজাহিদ। সুতরাং এটা তারা করবেন। এটা তো সহজ অংক। কিন্তু অনেক জিনিস আপনি-আমি বলতে পারি, সাধারণ মানুষ বলতে পারেন। কিন্তু সরকার বলতে পারে না।

সরকার বিএনপি নেতাদের ধরছে কেন? কারণ হচ্ছে— কারা লিড দেবে, অর্ডারটা তো আমার কাছেই আসবে। অকারেন্সটা তো আমিই করব। আমার দল করবে, জামায়াত করবে। তাহলে সরকার যদি আমাদের আটকে রাখতে পারে, ঘটনাটা ঘটে যাওয়ার পর...। আজ ঢাকা শহরে সমস্ত এলাকায় সর্তকতা। না জানি এতক্ষণে কী রায় হচ্ছে? (আদালতে তখন মুজাহিদের রায় পড়া চলছিল) ...। আর বিএনপি ভুল পথে হাঁটছে, ফলে দায় বিএনপির ওপর পড়ছে ...।

কোনটাকে ভুল বলছেন?
মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামান : সাকা যদি আমার অর্গানাইজেশন হয়ে থাকে, তাহলে দায় তো আমার নিতেই হবে। নিশ্চয়ই সাকা একটি আসন-ই (সংসদীয় আসন) দিতে পারবেন। এর জন্য আমাকে এতগুলো লোকের বিরুদ্ধে আপস করতে হয়েছে। এর মূল্য কি দিতে হবে না বিএনপিকে?

সাকা ও জামায়াতকে বিএনপিতে নেওয়াটাই কি ভুল?
মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামান : এটা আজ বলে লাভ কী? যখন তাদের বিএনপি সঙ্গে নিয়েছে তখনই বলেছি। এ কথা ১৯৯১ সালে সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছি। জামায়াতকে বিএনপির সঙ্গে নেওয়া ঠিক হয়নি... বিএনপি ভুল পথে হেঁটেছে। তাদের না নিয়েই তো আমরা সরকার গঠন করেছিলাম। আমরা ক্ষমতায় যাওয়ার পর কেন তাদের নিলাম? ক্ষমতায় যাওয়ার পর তা আরও বাড়ানোর দরকার ছিল। জোটের ফলাফল কী হল? নিজামী-মুজাহিদ কখনো জিয়াউর রহমানকে হাইলাইট করে বক্তব্য দেয়নি। জিয়াউর রহমানের আর্দশ বাস্তবায়ন করেনি। জিয়াউর রহমানকে নিয়ে একটি কথা বলতেও শুনিনি। এখন ইনু-মেননরা তো শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা নিয়ে বক্তব্য দিচ্ছে। জাতীয় পার্টির নেতারাও তাদের দলের কথা বলছে না।
কিন্তু আমরা কেন ১/১১ ঠেকাতে পারলাম না? ১/১১’র ফলেই তো আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসছে। তারা তো আরেকটা ২/১১ হতে দেবে না। তারা জানে ২/১১ হলে কার পতন হবে। অন্য কেউ ক্ষমতায় আসবে। তাই তারা ২/১১ ঠেকাচ্ছে।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিএনপিকে এখন জনসভা করতে হবে, গ্রেফতার-গণগ্রেফতার হতে হবে, পথসভা করতে হবে। জনগণকে বোঝাতে হবে আমরা তোমাদের জন্য চেষ্টা করছি। ‘আগামীকাল সারা ঢাকা শহর অচল করে দেওয়া হবে’— এ কথা বললে তো সরকার আমাকে জনসভা করতে দেবে না। জনগণের সঙ্কট নিরসনে আলোচনা ও জনসভা করতে হবে।
আমার দৃষ্টিভঙ্গিতে মনে হচ্ছে, দল সঠিক পথে হাঁটছে না। একটি অংশ হয়তো জামায়াত ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে দলে নেওয়ার পক্ষে। আর কর্মসূচিগুলো ক্ষমতায় আসার জন্য বা ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট নয়। অনেকে মনে করেছে, আমি বাটপার। সুতরাং আমি আমার জায়গায় থেকেছি। আমি তো একা বিএনপিকে পরিবর্তন করতে পারব না। আমি আমার কথা বলেছি। যখন বিএনপির প্রয়োজন পড়েছে ততটুকু কন্ট্রিবিউট করেছি। পজেটিভ ওয়েতে। বাধা দেওয়ার জন্য নয়, সঠিক পথ বাতলে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। এই পথে আসতে হবে বলে দিইনি। অতীত চলে গেছে, সমালোচনা অনেক করতে পারব, লাভ নেই। ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হবে।

বিএনপির ভবিষ্যৎ কী?
বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনীতি অত্যন্ত পরিষ্কার। আবারও তারা ক্ষমতায় আসবে। শুধু জনগণকে সংগঠিত করতে পারলেই হবে। তাতে নেতৃত্ব ঠিক থাকবে, বিএনপি ঠিক থাকবে। তবে আগামী তিন বছর এভাবেই চালিয়ে যেতে হবে।
আগামী নির্বাচন আর ভোটবিহীন হবে না। কেউ না কেউ নির্বাচনে অংশ নেবেই। কেউ আসবে দায়িত্ব নিতে— তাদের ফিরিয়ে আনার জন্য। তবে আগামী নির্বাচনের আগে বিএনপি নেত্রীর দেশে ফিরে আসার কোনো প্রয়োজন নেই।

নিউজ পেজ২৪/আরএস