খোলা কলাম

ডিসেম্বর ১০, ২০১৫, ১০:১৭ অপরাহ্ন

ফেসবুক ব্যাটাই চোর

ডক্টর তুহিন মালিক

এক. এক লোক আটতলা বিল্ডিংয়ে কাজ করছে। এমন সময় দৌড়ে এসে একজন খবর দিলো- ‘আবুল, তোমার মেয়ে জরিনা মারা গেছে।’ লোকটা চিৎকার করে দুঃখ সইতে না পেরে আটতলা থেকে লাফ দিলো। পাঁচতলা পর্যন্ত পৌঁছে তার মনে পড়ল, আরে আমার তো জরিনা নামে কোনো মেয়েই নেই। তিনতলা পর্যন্ত পৌঁছে তার মনে পড়ল, আরে আমি তো বিয়েই করিনি। মাটিতে পড়ার ঠিক আগমুহূর্তে তার মনে পড়ল, হায় আমার নাম তো আবুলই না। আমাদের জাতির অবস্থাও সে রকমই বলে মনে হচ্ছে ইদানীং। কারণ, দেশে জনগণের জানমালের কোনোই নিরাপত্তা নেই, এই অভিযোগে সব দোষ ফেসবুকের ঘাড়ে চাপিয়ে দিব্যি বন্ধ করে দিলাম জনপ্রিয় এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমটিকে। অথচ জাতীয় নিরাপত্তার কথা বলুন কিংবা অনৈতিকতা, অশ্লীলতা, উসকানিমূলক প্রপাগান্ডা বা যৌন হয়রানির কথাই বলুন, ফেসবুক কি আসলেই এগুলোর জন্য একা দায়ী? আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা, নীতিনৈতিকতা, রাজনৈতিক শিষ্টাচার, সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ কিংবা ভিনদেশীয় নগ্ন সংস্কৃতি কি এগুলোর জন্য দায়ী নয়? অথচ হাজার হাজার অশ্লীল পর্নো সাইট আর শত শত ধর্মবিদ্বেষী ব্লগ বন্ধ না করে আমরা ফেসবুক বন্ধ করলাম কেন? আর এগুলোর প্রধান বাহন ভারতীয় সিরিয়াল ও হিন্দি চ্যানেলগুলো বন্ধ না করে শুধু ফেসবুক বন্ধ করলেই কি এসবের দায় মেটানো যাবে? যেভাবে সরকার একতরফাভাবে ফেসবুকের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে চাইছে, তাতে বুঝতে অসুবিধা হয় যে, ফেসবুক কি জুকারবার্গের, না বাংলাদেশ সরকারের? সন্ত্রাসী হামলা ঠেকাতে ফেসবুক বন্ধ করা কি জুতা আবিষ্কারতত্ত্বের পুনরাবৃত্তি নয়? আসলে বেগম খালেদা জিয়া ক’দিন আগে লন্ডনে আয়োজিত সমাবেশে আহ্বান রেখেছিলেন, সরকারের দমনপীড়নের বিরুদ্ধে জনমত সংগঠন ও তথ্য বিতরণে ফেসবুকসহ সোশ্যাল মিডিয়াকে কাজে লাগাতে। ব্যস, তাতেই এক মাসের মধ্যে আমরা বন্ধ করে দিলাম সব সোশ্যাল মিডিয়াকে। এ দিকে সরকার বহুমুখী যুক্তি উপস্থাপন করে দেখাচ্ছে যে, মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ফেসবুক বন্ধ করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। বিশ্বের কিছু অগণতান্ত্রিক শাসকদের ফেসবুক বন্ধের উদাহরণও টানছে তারা। অথচ সব কিছুতেই ভারতীয় উদাহরণ টানা এসব লোক চলতি বছরের ২৪ মার্চ ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের ফেসবুকে বাকস্বাধীনতা রক্ষাকল্পে ঐতিহাসিক রায়ের কথা একবারো বলেন না। ভারতে ফেসবুক বন্ধ তো দূরের কথা, ফেসবুকের ওপর সেন্সর আরোপ করে আনা আইনকে সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক বলে রায় দিয়েছেন ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট। তা ছাড়া ফেসবুকের স্ট্যাটাস, কমেন্ট, লাইকসহ কোনো পোস্টের জন্য কাউকে গ্রেফতার বা হয়রানি করা যাবে না বলেও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ে।

দুই. ফেসবুকের মতো সারা বিশ্বে জনপ্রিয় এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমটির অপব্যবহার রোধকল্পে কোনো কার্যকরি পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হচ্ছি? এত মন্ত্রণালয়, এত মন্ত্রী, আর পুরো দেশকে ডিজিটাল ঘোষণা করেও কেন আমরা সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না? তথ্যপ্রযুক্তির চরম উৎকর্ষতার যুগে আমরা শুধুই শিখেছি সব কিছু বন্ধ করে দিতে। ক্ষমতা পেলেই আমরা এটা বন্ধ, সেটা বন্ধ, ওকে মারো, ওকে কাটো ফর্মুলায় চলে যাই। অথচ এগুলো যদি বন্ধই করতে হয়, তবে দেশে মন্ত্রীদের কাজ বা দায়িত্ব কী? আসলে প্রযুক্তি বন্ধ করে নয়, বরং প্রযুক্তি দিয়েই প্রযুক্তির অপরাধ রোধ করতে হবে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তার কথা বলে ফেসবুক, ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপ বন্ধ করে দেবেন, অঘোষিতভাবে ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে দেবেন; আর বগুড়ায় শিয়া মসজিদে হামলা বন্ধ করতে পারবেন না কেন? কান্তজির মন্দিরের রাসমেলায় বোমা হামলাই বা ঠেকাতে পারলেন না কেন? সরকার কি একবারও ভেবে দেখে না যে, এগুলো বন্ধ করে তারা নিজেদের ‘ডিজিটাল সরকারের’ চরিত্রকেই হরণ করছে সবচেয়ে বেশি। প্রতিদিন রাস্তায় সড়ক দুর্ঘটনায় কত মানুষ মারা যাচ্ছে, তাই বলে কি সব যানবাহন বন্ধ করে দিতে হবে? রাজনীতিবিদেরা এ দেশে সমানে দুর্নীতি করে আসছে বলে কি রাজনীতিই বন্ধ করে দেবেন? প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে কি পরীক্ষা নেয়াই বন্ধ করে দেবেন? মন্ত্রীরা বলছেন, বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহার করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হয়, তাই ফেসবুক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু টুইন টাওয়ার ধ্বংস করা হয়েছিল উড়োজাহাজ ব্যবহার করে, তাই বলে কি আমেরিকা উড়োজাহাজ বন্ধ করে দিয়েছে? আসলে একে একে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়াকে পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এবং কঠিন কঠিন আইন করে আর শাস্তি দিয়েও যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না, তখন ঠুনকো নিরাপত্তার অজুহাত তুলে এগুলোকে বন্ধই করে দেয়া হলো। মানুষের কাছে সত্য ঘটনাগুলো পৌঁছানোর একমাত্র মাধ্যম হিসেবে যখন ফেসবুক টিকে রইল, তখন ফেসবুককে ধরে বলা হলো- ‘এই কেষ্ট ব্যাটাই চোর’।

তিন. গত ১৮ নভেম্বর যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত দু’জন প্রভাবশালী নেতার ফাঁসি ঘোষণার পর নাশকতার সতর্কতা হিসেবে ফেসবুকসহ ভাইবার ও হোয়াটসঅ্যাপ বন্ধ করে দেয়া হয়। তখন কোনো রকম বিন্দুমাত্র নিরাপত্তার হুমকির মোকাবেলাও করতে হয়নি সরকারকে। জনগণের মনে এভাবে ভীতি সৃষ্টি করে এই যে বন্ধ করে দেয়া হলো ফেসবুক, সেটা আর খোলার কোনো খবরই নেই। মন্ত্রীরা বলে বেড়াচ্ছেন, দেশে কোনো জঙ্গির অস্তিত্ব নেই। তাহলে ফেসবুক বন্ধ করলেন কেন? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, আমেরিকার চেয়েও নাকি বাংলাদেশ অনেক বেশি নিরাপদ। তাহলে তো আমেরিকাতে আমাদের আগেই ফেসবুক বন্ধ করা উচিত ছিল! সম্প্রতি ফ্রান্সে ভয়াবহ রক্তপাত ঘটেছে। কই, ফ্রান্স তো ফেসবুক বন্ধ করেনি; বরং তারা তাদের দক্ষতা, প্রযুক্তি ও মেধা দিয়ে সুদূর ব্রাসেলসে পালিয়ে থাকা প্যারিস হামলার মূল নায়ককে চারজন সঙ্গীসহ নির্মূল করেছে। তাহলে প্রশ্ন জাগে, প্রযুক্তি অপরাধ রোধে আমাদের বাহিনীগুলো কি এত দিনে কোনোই সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি?

চার. আইসিটি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, সবুজ সঙ্কেত পেলেই ফেসবুক খুলে দেয়া হবে। এক কোটি ৭০ লাখ ফেসবুক ব্যবহারকারী ২২ দিন ধরে ট্রাফিক সিগন্যালের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, কবে সবুজ সঙ্কেত দেখতে পাবে! আসলে এই সবুজ সঙ্কেতটি কোথা থেকে আসবে? ফেসবুক আসলে কোন মন্ত্রণালয়ের অধীন? স্বরাষ্ট্র; পররাষ্ট্র; তথ্য, ডাক ও টেলিযোগাযোগ নাকি তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রণালয়? অথচ সবাই তো দেখি ফেসবুক নিয়েই অস্থির। দেশের সব মন্ত্রী দলবেঁধে বৈঠক করলেন ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সাথে। ফেসবুকের দক্ষিণ এশিয়ার দু’জন স্টাফের বিপরীতে হাইপাওয়ারের বৈঠক করলেন আমাদের তিনজন মন্ত্রী, জেনারেল পদমর্যাদার পুলিশ কর্মকর্তা, ডজন দুয়েক সিভিল, পুলিশ ও আর্মি অফিসার! ফেসবুকের এই দু’জন স্টাফ এ দেশের হাইপ্রফাইল ব্যক্তিবর্গের কাউন্টার পার্ট হতে পেরে নিশ্চয়ই নিজেদের সৌভাগ্যবানই মনে করছেন। ফেসবুক কর্তৃপক্ষের কাছে বাংলাদেশ সরকার তিনটি জিনিস চেয়েছে- ১. বাংলাদেশে ফেসবুকের অ্যাডমিন বসাতে হবে, ২. ফেসবুক পোস্ট ফিল্টার করার সুযোগ অর্থাৎ কোনটা বাংলাদেশে দেখানো যাবে তা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ থাকতে হবে এবং ৩. নিরাপত্তা বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করতে হবে। তা ছাড়া ফেসবুকের সাথে বৈঠকে আমাদের দেশের সাম্প্রদায়িক বা ধর্মীয় উসকানির বিষয় তুলে ধরা হয়। আমাদের সংস্কৃতির অবস্থানকে স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরা হয় তাদের সামনে। ফটোশপের মাধ্যমে বিকৃত ছবি প্রকাশ করার ঘটনায় তরুণীর আত্মহত্যার কথাও তাদের জানানো হয়। যেসব ফেসবুক পেজ থেকে অপরাধ চালানো হয় সেগুলো বন্ধ করা, আইপি ঠিকানা, পাসওয়ার্ডসহ নানা প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহের অনুরোধও জানানো হয়। কিন্তু বিপরীতে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ বলেছে, তাদের কোম্পানির নীতিমালা ও যুক্তরাষ্ট্রের আইনের বাইরে তারা যেতে পারবে না। এ জন্য বাংলাদেশকে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে আবেদন করতে হবে। বাংলাদেশ চাইলে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমেও সরকারিভাবে আবেদন করতে পারে। আসলে জুকারবার্গ নিজেও বাকস্বাধীনতার দেশের মানুষ। খোদ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপের দেশগুলোও জুকারবার্গের কাছ থেকে এটা আদায় করতে পারেনি। কেননা ফেসবুকের পলিসির সাথে এটা পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। এটা করলে ফেসবুকের বিরুদ্ধে গোপনীয়তা ভঙ্গের অভিযোগে মিলিয়ন-বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণের মামলার ঝুঁকিতে তারা পড়ে যাবে।

পাঁচ. তবে ফেসবুকে সাম্প্রদায়িক বা ধর্মীয় উসকানি, দেশের সম্মানিত ব্যাক্তিদের বিরুদ্ধে কটূক্তি, ফটোশপের মাধ্যমে বিকৃত ছবি প্রকাশ, অনৈতিকতা, অশ্লীলতা, মিথ্যা প্রপাগান্ডা বা যৌন হয়রানি নিরসনকল্পে একটা নিয়ন্ত্রণ বলয় তৈরি করতেই হবে। এভাবে লাগামহীনভাবে ব্যক্তিচরিত্র হানি ও অশ্লীল প্রপাগান্ডা রোধ করা না গেলে সামাজিক এ যোগাযোগ মাধ্যমটি তখন আর সামাজিকই থাকবে না। তা ছাড়া ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য ফেসবুক নিষিদ্ধ করে তাদের পড়ার টেবিলে বসাতে হবে। ভারত সরকার তাদের দেশে সার্ভার বসিয়ে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ফেসবুকের সাথে চুক্তি করেছে। গত সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী মোদি যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে ফেসবুক সদর দফতর পরিদর্শন করেছেন। এক মাস পর ফেসবুক প্রধান মার্ক জুকারবার্গ ভারত সফর করে গেলেন। তবে ফেসবুকের সাথে ভারত সরকারের এই চুক্তিকে চ্যালেঞ্জ করে দিল্লি হাইকোর্টে মামলা করেছেন ক্ষমতাসীন বিজেপির সাবেক নেতা কে এন গোবিন্দাচার্য্য। মামলার অভিযোগ হচ্ছে, এই চুক্তিতে ভারতীয় নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ভারত সরকার ব্যর্থ হয়েছে। তা ছাড়া ওয়েবসাইটে আপলোড করা কনটেন্টের মেধাস্বত্ব অধিকার অবাধে ফেসবুক কর্তৃপক্ষকে কোনোরকম লাইসেন্স ছাড়াই দিয়ে দেয়া হয়েছে। এতে বিদেশী কোম্পানি এ নিয়ে ব্যবসা করবে আর ভারত সরকার কোনো বিনিময় ছাড়াই তাদের সবচেয়ে বড় এজেন্টে পরিণত হবে বলে অভিযোগ আনা হয়। দিল্লি হাইকোর্ট মামলাটি আমলে নিয়ে দ্রুত কেন্দ্রীয় সরকারকে চুক্তির কপি আদালতে জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে মামলাটি এখনো বিচারে নিষ্পত্তি হয়নি।

ছয়. মিথ্যা প্রপাগান্ডা সৃষ্টি করে মানুষকে হেয়প্রতিপন্ন করা থেকে রাষ্ট্রীয় একটা সুরক্ষা প্রত্যেকের জন্য নিশ্চিত করতে হবে। আমার ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজে কয়েক বছর ধরে অসংখবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও আমাদের জাতীয় নেতাদের নিয়ে কটূক্তি বন্ধ করতে পারিনি। এ জন্য হাজারো বন্ধুকে আনফ্রেন্ড ও ব্লকও করতে হয়েছে। আমার বিরুদ্ধে একাধিকবার তাবলিগ ও ইজতেমা নিয়ে মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে মামলা পর্যন্ত করা হয়েছে। অথচ আমি তখন দেশেই নেই। একুশে টিভির টকশোতে নাকি আমি এ কথা বলেছি বলে প্রচারণা চালিয়ে আমার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। অথচ ঘটনার ছয় মাস আগ থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় বছর ধরে আমি একুশে টিভির টকশোতে যাইনি। গত বছর লন্ডনে এক সেমিনারে আমার এক বক্তব্যের ভিডিও ফুটেজকে বিকৃত করে আমার বিরুদ্ধে একাধিক রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা করা হয়। কিন্তু এই ভিডিও ফুটেজটি ফেসবুক ও ইউটিউব ছাড়া লন্ডন বা বাংলাদেশের কোনো মিডিয়াতেই প্রকাশ করা হয়নি। অথচ যারা এটা বিকৃত করে ফেসবুক বা ইউটিউবে ছাড়ল, তাদের ধরার কোনো পদক্ষেপই নেয়া হলো না। এ নিয়ে আমি অসংখ্যবার ফেসবুক স্ট্যাটাসে এই মিথ্যা প্রপাগান্ডার বিরুদ্ধে সবাইকে সতর্ক করেও এই মিথ্যা প্রপাগান্ডা রোধ করতে পারিনি। বাধ্য হয়েই আমাকে তখন জাতীয় দৈনিকে লাখ টাকা খরচ করে বিজ্ঞাপন দিয়ে এই মিথ্যা প্রচারণার জবাব দিতে হয়।

সাত. একসময় দেশে রেডিও বাংলাদেশ আর বিটিভি ছাড়া ইলেকট্রনিক মিডিয়া বলতে আর কিছুই ছিল না। এখন ফেসবুকের বদৌলতে শিশু রাজিবের হত্যার প্রমাণ দেখা যায়। সদূর সৌদি আরব থেকে হত্যাকারীকে ফেসবুকের কল্যাণে শনাক্ত করে ধরে আনা সম্ভব হয়। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণেই এখনো আমরা ভালোকে ভালো আর খারাপকে খারাপ বলার একটা প্লাটফর্ম খুঁজে পাচ্ছি। অথচ গত ২০১৩ সালে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (সংশোধন) আইনে ন্যূনতম সাত বছর ও সর্বোচ্চ ১৪ বছর কারাদণ্ডের বিধান রাখলেও এ আইন শুধু ক্ষমতাসীনের রাজনৈতিক হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার যন্ত্রে রূপ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গান করার অপরাধে এক তরুণকে জরিমানাসহ সাত বছরের সশ্্রম কারাদণ্ড দিয়েছে সাইবার অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। অথচ শুরু থেকেই এই বির্তকিত আইনের ৫৭ ধারা নিয়ে গণমাধ্যম ও সুশীলসমাজের প্রবল আপত্তি রয়েছে। কারণ, এটা সংবিধানে প্রদত্ত জনগণের মৌলিক অধিকার ও বাকস্বাধীনতার সাথে সাংঘর্ষিক একটা কালো আইন। এটাকে চ্যালেঞ্জ করে করা রিট মামলায় ২০১০ সালের ২৬ জুলাই হাইকোর্ট সরকারের বিরুদ্ধে রুল জারি করেছেন। যদিও সরকার এখন পর্যন্ত হাইকোর্টের এই রুলের জবাব দেয়ার প্রয়োজনও মনে করেনি। তবে এ আইনে অহরহ যে কাউকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে ঠিকই।
আট. এ দিকে বিকল্প পথে ফেসবুক ব্যবহার করে সরকারের সমালোচনা করার অভিযোগে গত সপ্তাহে তিনজনকে গ্রেফতার করা হলো। ফেসবুক ব্যবহার করাকে ফৌজদারি অপরাধ গণ্য করে কোনো আইন করা হয়নি। তাই কেউ যদি ফেসবুক ব্যবহার করেই থাকে, তবে তার জেল হবে কেন? বিকল্প পথে ফেসবুকে যাওয়া যদি অপরাধ হয়, তবে বর্তমান সরকার তো বিকল্প পথে গিয়েই ক্ষমতায় টিকে আছে। আর সরকারের সমালোচনা করাই বা কেন দণ্ডনীয় অপরাধ হতে যাবে? সত্য কথা হচ্ছে, যারা মানুষকে দণ্ডের ভয় দেখাচ্ছেন, তারাই আবার প্রতিনিয়ত ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েই যাচ্ছেন। সরকারের মন্ত্রী, এমপি, মেয়র, আমলা, সাংবাদিক, সুশীলÑ কে নেই ফেসবুকে? সবাই হরেক রকমের প্রক্সি সার্ভার ব্যবহার করে বিকল্প পথেই ফেসবুক চালাচ্ছেন। প্রতিদিনই হুড়হুড় করে বাড়ছে এদের সংখ্যা। আসলে সরকারি সার্কুলার আর পরোয়ানা দিয়ে কি প্রযুক্তিকে আটকে রাখা সম্ভব হবে ২০১৫ সালের প্রযুক্তির এই বিশ্বে? আচ্ছা, ফেসবুক না হয় অপরাধী, কিন্তু তাই বলে ভাইবার ও হোয়াটসঅ্যাপ খুলছেন না কেন?
নয়. রাজনীতি করলে সমালোচিত হবেনই। এটা সারা বিশ্বেই সর্বত্র হচ্ছে। সব সময়ই হয়েছে, এখনো হচ্ছে। জনগণ রাজনীতিবিদের খুঁটিনাটি সব কিছুই খেয়াল রাখে। সেগুলো নিয়ে কথাও বলে, সমালোচনাও করে। কেউ বা প্রশংসা করে, কেউ আবার সমালোচনা করে। গণতান্ত্রিক বিশ্বে নেতারা কেউ কেউ আবার এটাকে উপভোগও করে। আমাদের দেশে সাধারণত রাজনীতিক নেতাদের ব্যক্তিজীবন নেই বললেই চলে। এলাকার হাজার হাজার মানুষের পদচারণায় স্থানীয় এমপিদের সদর আঙিনা মুখরিত থাকে। তাদের অন্দরমহল পর্যন্ত লোকারণ্য থাকে গভীর রাত পর্যন্ত। এ নিয়ে নেতারা জনসম্মুখে তা বলতে গর্ববোধও করেন। কিন্তু এভাবে সরকারের সমালোচকদের জেলে ঢুকিয়ে দেয়ার দণ্ডাদেশ জনমানুষের মনে চরম ভীতি ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। তা-ও আবার এই অপরাধে চরম গুরুদণ্ড প্রদান! এখন অবস্থা এমন যে, একটা চড়ও মারলাম না, কিন্তু ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দেয়ার অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে দেয়া হলো! গত বছর সেপ্টেম্বরে বিশ্বজুড়ে পত্রিকার পাতায় ছাপা হলো হোয়াইট হাউজের সামনে ওবামার ব্যঙ্গচিত্র হাতে নিয়ে বিক্ষোভের ছবিগুলো। এ রকম ব্যঙ্গাত্মক ছবি, কার্টুন প্রদর্শন বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের একটা প্রধান উপকরণও বটে। তবে ব্যক্তিগত শালীনতা ভঙ্গ, অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ সমালোচনা কোনোভাবেই গণতন্ত্রের সাথে মানানসই হতে পারে না। নৈতিকতার স্বার্থেও এগুলো কখনো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আমাদের সংবিধানও ৩৯(২) অনুচ্ছেদে স্পষ্টতই বলে দিয়েছে যে, আইনের দ্বারা যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। তবে এ রকম আইনি বাধানিষেধও স্বেচ্ছাচারীমূলক হতে পারবে না বলে সংবিধান প্রটেকশন দিয়েছে। যে আইনই আমরা করি না কেন তা অবশ্যই যুক্তিসঙ্গত হতে হবে। আবার সমালোচকদেরও অবশ্যই একটা নির্দিষ্ট সীমারেখা মেনে চলতে হবে। এ দেশে আইনের আশ্রয় ও প্রতিকার লাভের সাংবিধানিক ও আইনি অধিকার সবার রয়েছে। অধিকার শুধু নেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্ম অবমাননার বিচার চাইবার। এক দিকে সুদূর অস্ট্রেলিয়ায় বসে একজন শিক্ষক যখন প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ফেসবুকে কটূক্তি করলে বিদ্যুৎগতিতে তার শাস্তি হয়, অন্য দিকে মহান আল্লাহ ও মহানবী সা:-কে নিয়ে অশ্লীল ব্লগের কোনো বিচার হয় না এই দেশে। আসলে মানুষের চিন্তার স্বাধীনতাকে এভাবে রুখতে যাওয়া বড়ই বিপজ্জনক। অথচ সরকার ফেসবুক বন্ধ করেই জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দিতে চাইছে। ম্যানহোলের ঢাকনা বন্ধ না করে ফেসবুক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। পা-কে জুতার মাপে কাটার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

লেখক : সুপ্রিম কোর্টের আইনজ্ঞ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ

drtuhinmalik@hotmail.com

নিউজপেজ/ইএইচএম