খোলা কলাম

ডিসেম্বর ১৭, ২০১৫, ৯:১৩ অপরাহ্ন

ইসলামি সামরিক জোট ও নতুন আশাবাদ

মাসুমুর রহমান খলিলী

৩৪টি মুসলিম দেশের সমন্বয়ে সন্ত্রাসবিরোধী ইসলামি সামরিক জোট গঠন হতে পারে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, মিসরসহ মুসলিম বিশ্বের উল্লেখযোগ্য সব দেশ এতে যোগ দিয়েছে। ব্যতিক্রম হলো ইরান ও তার ঘনিষ্ট মিত্ররা। সংসদে প্রস্তাব পাস হওয়ার পর শিগগিরই এতে যোগ দিতে পারে ইন্দোনেশিয়া। জোটে যোগ দেয়া অন্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে- বাহরাইন, বেনিন, শাদ, ক্যামেরোস, আইভরি কোস্ট, জিবুতি, গ্যাবন, গিনি, জর্দান, কুয়েত, লেবানন, লিবিয়া, মালদ্বীপ, মালি, মরক্কো, মৌরিতানিয়া, নাইজার, ফিলিস্তিন, কাতার, সেনেগাল, সিওরালিয়ন, সোমালিয়া, সুদান, টোগো, তিউনিসিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইয়েমেন। ৪৭টি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের মধ্যে ইরান, ইরাক ও সিরিয়ার বাইরে শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ আজারবাইজান, সাবেক সোভিয়েত মধ্য এশীয় প্রজাতন্ত্র কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান, তাজাকিস্তান, কিরঘিজস্তান, তুর্কমেনিস্তান; ইবাদি মুসলিম সংখ্যাগুরু রাষ্ট্র ওমান, বুরকিনা ফাসো, আলজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রুনাই, কসভো ও আলবেনিয়া এই জোটে এখনো যোগ দেয়ার কথা জানায়নি। তবে এর মধ্যে ১০টি দেশ সমর্থন জানিয়েছে এই উদ্যোগের প্রতি। তারা এই সামরিক জোটে যোগ দিতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান আইএসসহ সব সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে লড়াই ছাড়াও কয়েকটি লক্ষ্য অর্জনে এই জোট কাজ করবে বলে উল্লেখ করেছেন। বিন সালমান বলেন, সিরিয়া ও ইরাকে সন্ত্রাসবিরোধী অপারেশনের ক্ষেত্রে অন্য প্রধান শক্তি ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাথে সমন্বয় করে আইনানুগভাবে অভিযান পরিচালনা করা হবে। শুধু আইসিল নয়; ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, মিসর ও আফগানিস্তানে যেকোনো সন্ত্রাসী তৎপরতার বিরুদ্ধে জোট কাজ করবে। সামরিক অভিযান স্থানীয় আইন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে সমন্বয় করে পরিচালনা করা হবে।
এই জোট গঠনের ঘোষণার সময় বলা হয়, ইসলাম দুর্নীতি এবং দুনিয়ায় ধ্বংসযজ্ঞ চালানোকে অনুমোদন করে না। সন্ত্রাস মানবিক মর্যাদা ও মানবাধিকারকে বিশেষত জীবনমান ও নিরাপত্তাকে মারাত্ম¡কভাবে বিঘিœত করে। মিসরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে এই জোটে যোগ দেয়ার জন্য মুসলিম বিশ্বের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদকে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে এই যৌথ সামরিক অপারেশনের কেন্দ্র হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে। সব ধরনের উপায়-উপকরণ ও সহায়তার মাধ্যমে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার লক্ষ্যের কথা ঘোষণা করা হয়েছে কোয়ালিশন গঠনের ব্যাপারে। এই কোয়ালিশনের মাধ্যমে বিভিন্ন মহাদেশের মুসলিম দেশগুলোকে একই মঞ্চে আনা হলেও এর আওতার বাইরে রয়ে গেছে শিয়াপ্রধান দেশ ইরান, ইরাক ও সিরিয়া। দক্ষিণ এশিয়ার দুই মুসলিম দেশ পাকিস্তান ও বাংলাদেশ এই জোটের সদস্য হয়েছে। বাংলাদেশ প্রস্তাব পাওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তাদের ইতিবাচক সিদ্ধান্তের কথা জানায়।
একসময় মিসর সন্ত্রাস দমনে আরব সেনাবাহিনী গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিল। সেই প্রস্তাবের পরিবর্তে মুসলিম বিশ্বের বৃহত্তর অংশগ্রহণের জন্য ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) মাধ্যমে এই উদ্যোগ নেয়ার বিষয়ে ভাবা হয়। কিন্তু ওআইসির গঠনতান্ত্রিক সীমাবদ্ধতার বিষয় বিবেচনায় এনে ভিন্ন একটি অবয়বে এই উদ্যোগ নেয়া হয়। শিয়া-সুন্নি নির্বিশেষে সব মুসলিম দেশকে এই বাহিনীতে অংশ নেয়ার আহ্বান জানানো হলেও ইরান ও তার মিত্ররা যে এতে সাড়া দেবে না তা আগে থেকে অনুমান করা গিয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যে আইএসের মতো কট্টরপন্থীদের হুমকি মোকাবেলার ব্যাপারে সুন্নি-শিয়া এবং পাশ্চাত্য দেশগুলোর অনেক ক্ষেত্রে একমত যেমন রয়েছে তেমনিভাবে কৌশলগত নানা ক্ষেত্রে দ্বিমতও রয়েছে।
ইরান শুধু আইএসই নয়, সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে লড়াইরত সব শক্তিকে সন্ত্রাসী মনে করে। অন্য দিকে সৌদি আরব ও তুরস্কসহ বেশির ভাগ রাষ্ট্র বাশার আল আসাদকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালানোর মাধ্যমে তিন লক্ষাধিক সিরীয় নাগরিকের মৃত্যুর জন্য দায়ী মনে করে। বৃহৎ শক্তির মধ্যে রাশিয়া ইরানের সমর্থনে সিরিয়ায় যে সামরিক হামলা চালাচ্ছে তার প্রধান লক্ষ্যে পরিণত করা হয়েছে সুন্নি শক্তিকে। এক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, রাশিয়া সিরিয়ায় এ পর্যন্ত যে বিমান হামলা চালিয়েছে তার মধ্যে মাত্র ৯ শতাংশ লক্ষ্যবস্তু ছিল আইএস। বাকি হামলা চালানো হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র এবং সৌদি আরব, কাতার ও তুরস্ক সমর্থিত মধ্যপন্থী বিদ্রোহী ও আন নুসরার মতো সংগঠন আর বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুর ওপর। তুরস্ক রাশিয়ার যে বিমানকে তার আকাশসীমা লঙ্ঘনের অভিযোগে ভূপাতিত করেছে সেটি মধ্যপন্থী তুর্কম্যানদের অবস্থানে অব্যাহতভাবে বোমা ফেলছিল। এই ঘটনার পরে সৃষ্ট উত্তেজনা এবং সঙ্কটের নতুন মাত্রা সুন্নি দেশগুলোর মধ্যে সামরিক কোয়ালিশন গঠনের উদ্যোগকে ত্বরান্বিত করে থাকতে পারে।
সিরিয়ার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যের সুন্নি মুসলিম শক্তিকে দুর্বল করার জন্য ইরানের রাশিয়াকে ব্যবহারের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠলে মধ্যপ্রাচ্য এমনকি এশিয়া ও আফ্রিকার নেতৃস্থানীয় সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো সম্মিলিত সামরিক শক্তি গঠনের ব্যাপারে সক্রিয় হয়ে ওঠে। ইরানের সাথে ছয় বিশ্বশক্তির পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষরের পর এবং রাশিয়া সিরিয়ায় সরাসরি ইরানের পক্ষে সামরিক ভূমিকা পালনের পর ক্ষমতার মধ্যে যে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হচ্ছিল বলে মনে হয় সেটি এখন আর থাকবে না।
অবশ্য মুসলিম দেশগুলোর সন্ত্রাসবিরোধী এই সামরিক কোয়ালিশন গঠনের পর সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ আসতে পারে। বিশেষত সন্ত্রাস নিয়ে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে যেমন সাধারণ একটি ঐকমত্য রয়েছে তেমনিভাবে মতের ব্যবধানও রয়েছে নানা ক্ষেত্রে। শিয়াবিরোধী সব অরাষ্ট্রিক শক্তিকে ইরান সন্ত্রাসী মনে করে। সুন্নি দলগুলোর মধ্যে এ ক্ষেত্রে একমাত্র ব্যতিক্রম হলো ফিলিস্তিনের হামাস। সেখানেও ইরান তার শিয়া মতের বিস্তার ঘটিয়ে নিজস্ব শক্তি তৈরির চেষ্টা করছে। অন্য দিকে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তেহরানের দৃষ্টিভঙ্গিতে সুন্নি দেশগুলোর মধ্যে উদার, মধ্য, কট্টর নির্বিশেষে সব ইসলামিস্টকে সন্ত্রাসী দল মনে করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। মিসর ও সংযুক্ত আরব আমিরাত মুসলিম ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী সংগঠন আখ্যা দিয়ে তাদের সব ধরনের তৎপরতা একসময় নিষিদ্ধ করে। সৌদিআরবও সে সময় একই ধরনের ঘোষণা দিলেও তা কার্যকর করেনি। নতুন সৌদি বাদশাহ সালমানের প্রশাসন এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একেবারে সরে এসেছে। অন্য দিকে বাংলাদেশের ইসলামি দল জামায়াতে ইসলামীকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ না করলেও দলটির সাথে প্রশাসনিক আচরণ করছে নিষিদ্ধ দলের মতোই। আবার তুরস্ক, কাতার, তিউনিসিয়া, মরক্কোসহ অনেক দেশ সন্ত্রাসের চক্র থেকে বের হয়ে আসতে মধ্যপন্থী ইসলামি দলগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া উচিত বলে মনে করে। তাদের ধারণা উদারপন্থী মধ্যপন্থী ইসলামি দলগুলোকে গণতান্ত্রিক স্পেস বা সুযোগ না দেয়ার কারণে কট্টরপন্থী আইএসের মতো দলের আবির্ভাব ঘটেছে।
সাধারণভাবে নানা দৃষ্টিভঙ্গির মুসলিম দেশগুলো অভিন্ন সামরিক জোট গঠনের ফলে সন্ত্রাসী দলের বাপারে একটি সাধারণ ঐকমত্য যেমন গড়ে উঠতে পারে তেমনিভাবে সন্ত্রাসী নাম দিয়ে বিশ্বের সুন্নি ইসলামি শক্তিকে নির্মূল বা কোণঠাসা করার উদ্যোগও থেমে যেতে পারে। এর পাশাপাশি উদার ও মধ্যপন্থী ইসলামি দেশগুলোর ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে সহনশীলতা ও মূলধারায় একীভূত করার ব্যাপারে ঐকমত্য তৈরি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সৌদি আরব, কাতার ও তুরস্কের মতো দেশ প্রধান ভূমিকা নিতে পারে।
সিরিয়ার পরিস্থিতিতে নতুন সামরিক কোয়ালিশনের সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে। দেশটির বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে লড়াইরত ৩৩টি দলকে নিয়ে ইতোমধ্যে রিয়াদে এক সম্মেলন আয়োজন করে অভিন্ন কমিটি গঠনে সম্মত করানো হয়েছে। সৌদি আরব তাদের তৎপরতা ও আলোচনার সমন্বয়ের জন্য রিয়াদে সদর দফতর করার অনুমতিও দিয়েছে। এই উদ্যোগ সিরিয়ার সঙ্কটের রাজনৈতিক সমাধানের ব্যাপারে যে আলোচনা ভিয়েনা সম্মেলনের মাধ্যমে অগ্রসর হচ্ছিল তাতে সুন্নি বিদ্রোহীদের অবস্থানকে মজবুত হতে সহায়তা করবে।
আইসিসের বিরুদ্ধে লড়াইকে নতুন কোয়ালিশন গঠনের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে যুদ্ধের ডঙ্কা যত জোরে বাজানো হচ্ছে ভেতরের অবস্থাটা সে রকম মনে হচ্ছে না। নতুন জোট গঠনে আইসিসকে নির্মূল বা নিশ্চিহ্ন করার চেয়ে ক্ষমতার ভারসাম্য আনা এবং সার্বিক সুন্নি শক্তিকে দুর্বল করার অবস্থা থেকে পরিস্থিতিকে ভিন্ন দিকে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য থাকতে পারে। যুদ্ধের আয়োজন যখন জোরালো থাকে তখন শান্তির সম্ভাবনাও তত বেশি জোরালো হয়ে দেখা দেয়। নতুন সামরিক জোট গঠনের ঘোষণা দেয়ার সময় সৌদি ডেপুটি প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানকে প্রশ্ন করা হয়েছিল সন্ত্রাসবিরোধী এ লড়াইয়ের সামরিক কৌশল কেমন হবে। জবাবে বিন সালমান বলেন, আমরা প্রথমে আইএসের কট্টর পন্থার বিরুদ্ধে জনমত গঠন এবং এর আদর্শিক ভিত্তি তৈরি করব। এরপর দ্বিতীয় পর্যায়ে আইএসের অর্থের উৎসগুলো বন্ধ করব। আর এরপর আমরা চূড়ান্তভাবে সামরিক অভিযানে নামার কৌশল গ্রহণ করব।
নতুন কোয়ালিশনের এই কৌশল থেকে বুঝা যাচ্ছে এখনই ইসলামি সামরিক জোট আইএসের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অভিযানে নেমে তাদের দুনিয়া থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে বিষয়টা সে রকম নয়। মধ্যপ্রাচ্যের নতুন উন্নয়নের পেছনের ভিন্ন বার্তা তথা সহনশীলতার সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলার কৌশলের আভাসই পাওয়া যায়।
আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, পাশ্চাত্য আইএসকে মোকাবেলার ক্ষেত্রে প্রায় একই রকম কৌশলই গ্রহণ করতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা যায়। এমনিতেই আইএসের উত্থান নিয়ে রয়েছে নানা রহস্য। এই শক্তিটি ইরাক ও সিরিয়ায় যখন জেঁকে বসে তখন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এর বিরুদ্ধে কোয়ালিশন গঠনের তোড়জোড় করে বলেন যে, তিনি মধ্যমেয়াদি কৌশল নিয়ে আইএসের মোকাবেলা করতে চান। এ জন্য ওবামা তিন বছরের একটি সময়ের কথা উল্লেখ করেন। এর মধ্যে আইএস তার দখল করা ভূখণ্ডে রাষ্ট্রিক কাঠামো প্রদানের ক্ষেত্রে অনেক দূর অগ্রসর হয়েছে। গতকাল প্রভাবশালী ব্রিটিশ দৈনিক ইন্ডিপেন্ডেন্ট 'Why it's time to grant Isis diplomatic recognition' শিরোনামে এক তাৎপর্যপূর্ণ সম্পাদকীয় নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। এই নিবন্ধে আইএসকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দিয়ে তাদের কট্টর পন্থা থেকে নমনীয় করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এতে রুশ বিপ্লবের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলা হয়েছে, ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পর বর্তমান আইএসের চেয়ে অনেক কট্টরভাবে সেখানে সহিংসতা ও নৃশংসতা চালানো হয়েছে। প্রতিবেশী ইউরোপীয় দেশগুলো এবং যুক্তরাষ্ট্র রুশ বিপ্লবকে স্বীকৃতি না দিয়ে কমিউনিজমের বিস্তারকে তাদের শক্তি দিয়ে মোকাবেলা করতে চেয়েছে। কিন্তু এতে ফল হয়েছে বিরূপ। পরে যখন তাদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং দেশটির সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে তখন তাদের কট্টর পন্থা অনেকখানি উপশম হয়েছে। আইএসের ফাঁস হওয়া এক দলিলেও দেখা যাচ্ছে, তারা দখল করা এলাকাকে রাষ্ট্রিক কাঠামো দেয়ার সুচারু পরিকল্পনা এবং তা কার্যকর করার পথে এগিয়ে যাচ্ছ্।ে এই অবস্থায় তাদের শক্তি দিয়ে মোকাবেলা করে সাম্যবাদী সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো নিশ্চিহ্ন করা যাবে না। অথবা এ জন্য মূল্য দিতে হবে অনেক বেশি। এই অবস্থায় আইএসকে রাষ্ট্রের কূটনৈতিক স্বীকৃতি দিয়ে কট্টর পন্থা থেকে তাদের সরিয়ে রাখা সম্ভব হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির প্রতি গভীর নজর রাখেন এমন একাধিক কূটনৈতিক সূত্র এবং পর্যবেক্ষক বলছেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আইএস নিয়ে চিন্তাভাবনার প্রতিফলন ইন্ডিপেন্ডেন্টের সম্পাদকীয় নিবন্ধে ফুটে উঠেছে। তারা এ অঞ্চলে যে মানচিত্র বিভাজন চেয়েছেন তার সাথেও এই স্বীকৃতি দানের ভাবনার সম্পর্ক রয়েছে।
আরেকটি তাৎপর্য নতুন ইসলামি সামরিক জোটের গঠনের মধ্যে অন্তর্নিহিত থাকতে পারে। এই জোট গঠনের পর প্রথম কাজ বলা হয়েছে কট্টর পন্থার ব্যাপারে মুসলিম দেশগুলোকে জনমতের প্রতিরোধ তৈরি এবং আদর্শিক অবস্থান মজবুত করা। আদর্শিক ক্ষেত্রে কট্টর পন্থার বিপরীতে ইসলামিক ধারণা লালন করে মূলত ব্রাদারহুড, আন নাহদা বা জামায়াত ঘরানার মধ্যপন্থী ইসলামি দলগুলো। এই দলগুলোর ওপর দমনাভিযান যত তীব্র হয়েছে ততই কট্টর পন্থা শক্তি অর্জন করেছে। আদর্শিকভাবে কট্টর পন্থার মোকাবেলা করতে হলে মধ্যপন্থী গণতান্ত্রিক ইসলামি দলগুলোকে স্বাভাবিকভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। এ জন্য যেসব দেশে ইসলামি দলগুলোর ওপর নির্মূল অভিযান চালানো হচ্ছে সেসব ক্ষেত্রে বর্তমান নীতি থেকে প্রস্থানের একটি উপায় নিয়ে ভাবা হতে পারে। তেমন ইঙ্গিত ও কৌশলের কিছুটা লক্ষণ মিসরসহ কয়েকটি দেশে দেখা যাচ্ছে।
রক্তক্ষয় বন্ধের আশাবাদী দৃশ্যপট বিবেচনা করা হলে এমন একটি অবস্থা কল্পনা করা যায় যে, আইএসকে স্বীকৃতি দিয়ে সঙ্ঘাতের পরিবর্তে সমঝোতা এবং তাদের কট্টর পন্থা পরিহারের শর্ত মেনে নেয়ার বিপরীতে স্বীকৃতি দেয়া হতে পারে। ইয়েমেন, লিবিয়া ও সিরিয়ায় যে যুদ্ধ-সঙ্ঘাত চলছে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হতে পারে। হয়তো এ কারণে প্যারিসে হামলার পর আইসিসের ওপর রাশিয়ার পাশাপাশি ফ্রান্সের অভিযানের বিষয়টি তাদের নির্মূল করা বা করতে পারার পর্যায়ে পৌঁছেনি। এমনকি রাশিয়ার বোমা হামলার লক্ষ্য যে আইসিস ছিল না সেটি প্রমাণ হতেও সময় লাগেনি। ইতোমধ্যে সৌদি বাদশাহ সালমান উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে শলাপরামর্শের এক সম্মেলন করেছেন ইয়েমেনের শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য। এ ব্যাপারে একটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে। এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের দুই প্রধান আঞ্চলিক শক্তি ইরান ও সৌদি আরবের সাথে অনানুষ্ঠানিক আলোচনার একটি চ্যানেল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এসব উন্নয়নের সাথে ভিয়েনায় বিশ্ব শক্তিগুলোর আলাপ আলোচনার একটি সম্পর্ক থাকতে পারে। এর সাথে সার্বিকভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে যে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে তাতে শান্তি প্রতিষ্ঠার আশাবাদ মোটেই দুরাশার কোনো বিষয় হবে না। এরই মধ্যে যে পরিমাণ রক্তক্ষয় মধ্যপ্রাচ্যে হয়েছে এবং শরণার্থী স্র্রোত বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশে নতুন সঙ্কট সৃষ্টি করছে তাতে শান্তিপূর্ণ সমাধানের বিষয় ভাবার বিকল্প নেই বিশ্বের সামনে।
mrkmmb@gmail.com

নিউজ পেজ২৪/আরএস