শিল্প সাহিত্য

জানুয়ারী ৭, ২০১৬, ৬:৫৫ অপরাহ্ন

‘পাখি সব করে রব’

আনোয়ার বারী পিন্টু- জাবি, সাভার থেকে ফিরে-

ঢাকার অদূরে অবস্থিত বাংলাদেশের অন্যতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে রয়েছে পাখিদের গভীর মিতালী।

দেশী বিদেশী নানান জাতের বর্ণের পাখিদের এক অভায়রণ্য জাবির এই ক্যাম্পাস। সাভার বাজার বাসষ্ট্যান্ড থেকে মাত্র ২-৩ কিলো দূরে মায়াবী প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে উঠেছে জাবি ক্যাম্পাস।

সুবিশাল পরিসরে বন বনানীর ভিতর আকাঁ বাঁকা রাস্তা, খন্ড খন্ড জলরাশি আবার এরই মাঝে শিক্ষার্থীদের জন্য তৈরী চমৎকার নকশার ভবন।

সাথে যোগ হয়েছে সরালী, নীলকন্ঠ, কোকিল, টিয়া, মাছরাঙ্গা, পানকৌড়ির মতো বাহারী নামের পাখি। বিমুগ্ধ এক পরিবেশ।


বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী খোশনে রওশন শেলী’র সহযোগিতায় ও সহকর্মী মাহমুদুল হাসান জনিকে সাথে নিয়ে জাবি’র প্রান্তিক গেইট দিয়ে প্রবেশ করেই দেখলাম শিক্ষার্থীদের প্রাণের উচ্ছাস ছড়িয়ে পড়েছে গোটা ক্যাম্পাসে।

এখানকার শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, পাখিদের মধ্যে সরালী, কাঠঠোকরা, ছোট বসন্ত বাউরী, হুদহুদ, নীলকণ্ঠ, মাছরাঙার, সুইচোরা, চাতক, কুম্বা, কানাকুয়া, পানকৌড়ি, শামুকডাহা, হাড়িচাচা, ফটিকজল, হলদে পাখি, ফিঙ্গে, লাটোরা, গুদহুকা, সাতসাইলি, কাঠকসাই, বাবুই প্রভৃতি সারা বছরই দেখতে পাওয়া যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের গবেষণায় জানা গেছে, বিগত কয়েক বছর ধরে সারাদেশের তুলনায় ক্যাম্পাসে পাখি প্রজাতির সংখ্যা বেড়েছে। বর্তমানে পাখি প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ১৫০-এ এসে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় পাখিদের মাঝে প্রায় ৭০ প্রজাতির পাখি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বংশবৃদ্ধি করে। জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও আবাসিক জনসাধারণের পরিবেশ বিষয়ক সচেতনতা, পাখিসহ অন্যান্য প্রাণি প্রজাতির প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব, অকারণে পাখিদের আবাসস্থল বিনষ্ট না করা প্রভৃতি কারণে ক্যাম্পাস পরিবেশ বিভিন্ন পাখি ও প্রাণি প্রজাতির অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।

এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের জনসচেতনতামূলক তৎপরতায় গত ২০ বছর ধরে এখানে পাখি প্রজাতি তো কমেইনি বরং এ সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা ।

বিশ্ববিদ্যালয়ে শীতকাল এলেই অতিথি পাখি দেখার জন্য ঢাকা এবং আশপাশের অঞ্চলগুলো থেকে দর্শনার্থীরা এসে ভিড় জমায়। প্রশাসনিক ভবনের বিপরীতে লেকের পাড়ে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন এলাকার পাশের জলাশয়ে পরিজায়ী পাখির মাঝে হাঁস বা জলে চরা পাখিদের তুলনায় গাছে চরা পরিজায়ীর সংখ্যা বেশি।

শীতকালে ক্যাম্পাসে লেজা হাঁস, নীলপাখা হাঁস, বালি হাঁস, সাখতা, হাঁস, কাদাখোচা প্রভৃতি জলে চরা পাখি ক্যাম্পাসের প্রধান দুটো জলাশয় দখল করে। ধূসর ফিঙ্গে, লালবুক চটক, নীলকণ্ঠ, মাছমুরলি বা অসত্রে, কেস্ট্রেল বা বাজপাখি আশ্রয় নেয় ক্যাম্পাসের অসংখ্য ছোট-বড় গাছ, বাঁশঝাড় এবং ছোট ঝোপ জঙ্গলে। আর মেঠো কাঠঠোকরা, বনছাহা, বাটান, জিরিয়া, খয়েরি ঈগল, মেঠোচিল পাখি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ প্রতি বছরই জলচেরা অতিথি বা পরিজায়ী পাখিদের শুমারি করে। শুমারির গণনা অনুযায়ী ক্যাম্পাসে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার অতিথি পাখি আসে। তবে শীতের তীব্রতা এবং জলাশয়ের পরিবেশের ওপর পাখির সংখ্যা বছর প্রতি ওঠানামা করে।

এছাড়া অনেক পাখি বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী বিএলআরআই’র লেকে গিয়ে আশ্রয় নেয়। তবে ক্যাম্পাসে যেসব অতিথি পাখি আসে তাদের অধিকাংশই স্থানীয় পরিজায়ী। স্থানীয় পরিজায়ীরা সিলেট ও সুনামগঞ্জের হাকালুকি বা হাটল হাওর, কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, ভোলা, সন্দীপ উপকূলীয় এলাকা থেকে আসে। আর সাইবেরিয়ান অঞ্চল থেকে দুই একটি এখানে আসে। বিপন্ন এমন কিছু পাখি প্রজাতিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বসবাস করতে দেখা যায়। মাত্র তিন বছর আগে দামা বা পেইন ব্যাকড ব্রাশ নামের একটি পাখি বাংলাদেশে নতুন রেকর্ড হয়েছে। এর আগে দেশের কোথাও এই প্রজাতিটি দেখা যায়নি বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত প্রকাশ করেন। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় পাখি মেলা। সাধারণত প্রতিবছর যখন সবচেয়ে বেশি অতিথি পাখি আসে, তখন পাখি মেলা অনুষ্ঠিত হয়।

মূলত পাখি মেলার উদ্দেশ্য পাখি দেখা হলেও এর নেপথ্যে রয়েছে পাখিদের প্রতি সচেতনতা বৃদ্ধি, পাখির প্রতি মানুষের ভালোবাসা সৃষ্টি করা এবং প্রকৃতির এই নিপুণ সৌন্দর্যকে টিকিয়ে রাখার জন্য এক ধরনের গণআন্দোলন তৈরি করা। পাখি মেলায় দর্শনার্থীরা টেলিস্কোপের মাধ্যমে পাখি দেখতে পারেন, অংশগ্রহণ করতে পারেন পাখি বিষয়ক কুইজ বা ছবি আঁকা প্রতিযোগিতায়। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পাখি মেলা আয়োজনের প্রাণিবিদ্যা বিভাগকে সহযোগিতা করে। ক্যাম্পাসে পাখি প্রজাতির সংখ্যা এবং তাদের বর্তমান অবস্থায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

অতিথি পাখিদের জন্যও বর্তমানে জলাশয়ের পরিবেশ বন্ধুভাবাপন্ন বলে তারা মন্তব্য করেন। এছাড়া বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পাখিপ্রেমীরাও ক্যাম্পাসে পাখিদের খুনসুটির মজা উপভোগ করে থাকেন। খুব ভোর হলেই শিক্ষার্থীরা দল বেধে পাখি দেখতে ভিড় করে। বাহারী পাখি দেখেই তাদের প্রতিদিকার রুটিন শুরু হয়।

দেশ বিদেশের পাখিদের আড্ডাস্থল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে পাখি আর নানান ফুলের কানন দেখে যে কারোরই মনে পড়ে যাবে সুকান্ত ভট্রাচার্যের সেই বিখ্যাত গান- পাখি সব করে রব রাত্রি পোহাইলো, কাননে কুসুম কলি সকালে ফুটিল।

নিউজ পেজ২৪/ইএইচএম