শিল্প সাহিত্য

জানুয়ারী ১৪, ২০১৬, ৬:৪০ অপরাহ্ন

হে বাঁশরী অসি হও তুমি : আহসান হাবীবের কবিতা

ড. ফজলুল হক

কবি-কথাশিল্পী-শিশুসাহিত্যিক-সাংবাদিক আহসান হাবীব বাংলা কবিতাচর্চা আর কবিতাযাপনে এক অনন্য পরিচর্যাকারী হিসেবে আজ প্রায় সব মহলে তর্কাতীতভাবে সমাদৃত। শিল্পকর্মে রুচিশীলতার লালনকর্তা-প্রশ্রয়দানকারী হিসেবেও তাঁর মর্যাদা ঈর্ষণীয়। লোভ আর অস্থিরতা-প্রবণতাকে তিনি শিল্পের প্রতিকূল শক্তি বলে জানতেন-মানতেন। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য চিন্তা আর ইতিহাসজ্ঞানকে তিনি শ্রদ্ধা করেছেন নির্বিকার চিত্তে। স্নায়ুবিভ্রান্তির সর্পিল দিনের যাত্রাপথে কবি হাবীব ইতিহাসের আলো দেখেছেন; দেখেছেন ইতিহাসের খেরোখাতার পাতায় পাতায় অনাগত বিস্তার আর বিকাশের আহ্বান। বিশ শতকের সমাজ আর রাষ্ট্রগতিকে তিনি অবলোকন করেছেন; অনুধাবন করেছেন। লিখেছেন : ‘বিংশ শতকী সভ্য দিন/শাণিত কৃপাণ শঙ্কাহীন/শস্যে হানবে শুন্যে েেত তার হবে স্বার্থের হীন জরিপ/নীল রক্তের অভিশাপে ঘেরা জাগে নিপিষ্ট রিক্ত দ্বীপ।’ ‘বৈপ্লবিক যুগে’ ভূমিজ-উৎপাদনবিমুখ যন্ত্রনির্ভর সভ্যতার কালো ধোঁয়া যে প্রকৃতপইে ঋণশোধের রাজনীতির ফল; উন্নয়নের আর পরিবর্তনের রাজনীতি যে এটা নয়- তা তিনি বুঝতে কালমাত্র বিলম্ব করেননি। প্রখর সমাজসচেতন-রাজনীতিমনস্ক-পরিবর্তনপ্রত্যাশী কবি আহসান হাবীবের কর্মপ্রয়াসে তাই অনিবার্যভাবে নির্মিতি লাভ করেছে রাষ্ট্রের-সমাজের বিচিত্র প্রবণতা আর মানবচরিত্রের বিবিধ গতিপথ। অবলোকন-অনুভব-অভিজ্ঞতা- এই তিনের সমষ্টি তাঁর সমূহ প্রকাশের ভার বহন করেছে শিল্পীজীবনের প্রেরণা-শ্রান্তি-অভিঘাত আর অপ্রতিরোধ্য অগ্রগমন-কাতরতায়। তিনি ভাবেন : ‘আছে সেই অনাগত দিন/হাতে আছে সেই সূর্য-পরিক্রমা স্বপ্ন রঙিন।’

এই স্বপ্নবাজ-আশাজাগানিয়া কবি আহসান হাবীব জন্মভূমিতে ভিনদেশী বণিক-শাসকদের দীর্ঘ দিনের শোষণ-অত্যাচার আর দেশবাসীর প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ইতিহাসের আলোকশলাকা আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন অভিজ্ঞ জীবনবাদীর অবস্থান থেকে। বিশ শতকের জাগরণ-পুনর্জাগরণের চেতনা যে আমাদের পরাধীনতার বিরান-গ্রাম থেকে অন্য সবুজ-গ্রামে স্থানান্তর করার সময়সেতু, তা তিনি উপলব্ধি করেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আর ভারত-বিভাগের প্রাক্কালে। রাষ্ট্রের অবমুক্তি আর মানুষের স্বস্তি প্রসঙ্গ তাই তাঁর কাব্যভাবনার উপাদান হয়েছে অনিবার্যভাবে। হাবীব লিখছেন : ‘দ্বারপ্রান্তে তোমাদের বন্দী আমি দুই শতকের,/আমার আত্মার তলে অগ্নিশিখা সাতান্ন সনের/আজো অনির্বাণ,/তবু কি পাহারা দেবে হাসিমুখে আমার জিন্দান?’ (সেতু-শতক) যুদ্ধ চলাকালে সাধারণ মানুষের দিনলিপি যে সাধারণ থাকে না- ব্যক্তিগত-পারিবারিক-সামাজিক জীবনে পারিপার্শ্বিকতার প্রবল চাপ পড়ে; অর্থনৈতিক প্রসঙ্গাদিতে নেমে আসে ভয়াবহ দুর্যোগ, তার বাস্তবতা আঁকতে গিয়ে কবি আহসান হাবীব লিখেছেন যুদ্ধ এবং যোদ্ধার পরিচয়-পঞ্জিকা। পরোভাবে যুদ্ধের প্রভাব পড়ে যাদের ওপর, তারাও যে যোদ্ধা-মর্যাদার দাবিদার সে বিষয়ে কবির বক্তব্য প্রাসঙ্গিক ও বিশ্বাস্য। তাঁর ভাষ্য :

‘মাসান্তের মাসোহারা অর্ধেক বিলিয়ে দেই
একটি বস্ত্রের বিনিময়ে,
কাগজ-কলম কেনা একেবারে ছেড়ে দিয়ে
খোকাদের যেতে দেই ব’য়ে।...
আবার আসবে সন্ধ্যা-
আবার প্রতীক্ষা আর আবার দেহের রক্ত
বিন্দু বিন্দু য়;
একি যুদ্ধ নয়!’ ( সৈনিক)

কবি জানেন, মানুষের আসা-যাওয়া যেমন সত্যি, তেমনি সত্যি প্রকৃতির নির্মলতা, ভূমিনির্ভরতার অকৃত্রিম বাস্তবতা। মানুষের এই সাময়িক বিভ্রমকে তিনি একটি ঐতিহাসিক পরিভ্রমণ-পথে দাঁড় করিয়ে প্রকৃত সমাজসত্য অনুভব করতে চেয়েছেন। পেছনে ফিরে তাকালে তিনি যেন দেখতে পান : ‘অনেক মানুষ ছিলো মরেছে অনেক।/সেই সাথে মরে গেছে তারো চেয়ে বেশি-/শতাব্দীর গ’ড়ে ওঠা এইসব গ্রাম।’ (একটি ঐতিহাসিক ভ্রমণ)

বাঁচবার প্রয়োজনে কোমলতা পরিহার করে কঠোর-কঠিন পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধানের পপাতী কবি আহসান। এই পৃথিবী আর তাতে বিচরণরত মানুষ যেন সত্যিই ‘শক্তের ভক্ত নরমের যম’, তাই তিনি সব নরমতাকে শক্তকে পরিণত হওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। কান্নার জলে প্লাবন বইয়ে দিতে চান তিনি সব শত্র“-আস্তানার দোরগোড়ায়। তিনি জানেন, মানেন- দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে সামনে অগ্রসর হওয়া-ভিন্ন কোনো পথ নেই। ইংরেজ শাসকদের এ দেশের মাটি থেকে বিতাড়িত করতে হলে প্রয়োজন সমবেত প্রতিরোধ, আর সে জন্যে তাঁর অনুরোধ :

‘হে বাঁশরী অসি হও তুমি!
কেননা দুর্গের দ্বারে হানা দিল হায়েনা নয়ন;
কেননা উদ্যত আজ শাণিত নখর বহু
শিবিরের উলঙ্গ আকাশে- ...
এবার বন্যার মত আঁখিজল আনুক বিদ্রোহ।
আসন্ন মৃত্যুর মুখে অগ্নিময় ঝলসি উঠুক,
বাঁচিবার পণ!’ (হে বাঁশরী অসি হও)

আধিপত্যবাদী রাজনীতি, অহঙ্কার প্রকাশের সংস্কৃতি আর আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতির কারণে গোটা পৃথিবীতে দখলবাজ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে আমেরিকা-ব্রিটেন। দরিদ্র আর আধাদরিদ্র দেশগুলো তাদের লোভীদৃষ্টির শিকারে পরিণত হয়েছে। কোনো কোনো দেশের তেল-গ্যাস-মেধা-নিম্নমূল্য শ্রমবাজার তাদের আকৃষ্ট করে নেশার মতো। খোলাবাজার অর্থনীতি আর আকাশনির্ভর সংস্কৃতির অন্তরালে তারা নির্মাণ করে চলেছে বদ্ধবাজার-পকেটনির্ভর রাজনীতি (পরিবারকেন্দ্রিক রাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র আর বাধ্যবৃত্তির শাসন-ব্যবস্থা)। কয়েকজন ব্যক্তি আর পরিবারের হাতে রাজনীতি জিম্মি থাকলে শোষণে-ভোগে বেশ সুবিধা- তা বুঝে গেছে ইংরেজ জাতি। তাই তারা বাহ্যত দূরে থেকেও কাছে থাকার মতোই শাসন-পরিচালনা করছে প্রায় পুরো নিকটপ্রাচ্য-মধ্যপ্রাচ্য। সারা পৃথিবীর বিচিত্র জাতিসত্তার বিনাশ-প্রচেষ্টার এই মহাযজ্ঞে আহসান হাবীব হতাশ হয়েছেন। দেশ-জাতির আপন আপন অস্তিত্ব আর পরিচয় অক্ষুণ্ণ রাখতে তিনি দৃঢ়-সংকল্প। তাঁর অভিব্যক্তি :

‘আমাকে বিশাল কোনো সমুদ্রের ঢেউ হতে বলো।
হতে পারি, যদি এই প্রতিশ্রুতি দিতে পারো-
সমুদ্রের ঢেউ/হারায় না সমুদ্রের গভীরে এবং
ফিরে আসে শৈশবের নদীর আশ্রয়ে।
সমুদ্রে বিলীন হতে চাই না। কেননা
সমুদ্র অনেক বড় আর বড় বেশি দম্ভ আছে বলে
তাকে ভয়;
সে আছে নদীকে গ্রাসের প্রমত্ত লোভে মত্ত হয়ে।’ (সমুদ্র অনেক বড়)

হাজার বছরের ইতিহাসের পরিক্রমায় আহসান হাবীব খুঁজে পেয়েছেন ইতিবাচকতার উদার আহ্বান। সব প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে এক এক করে অগণন মুহূর্ত পার হয়ে মানবসভ্যতা নির্মাণ করে চলেছে তার কাক্সিত দৃশ্যাবলি; হাবীব জানেন এ সত্য অনিবার্য-অনতিক্রম্য। মানবিক বিজ্ঞান আর পরিবর্তন-প্রবণতা সমাজগতি রূপান্তরে রাখে অবিস্মরণীয় সব অবদান। কবি লিখছেন : ‘বন্দরে নিঃশেষ রাত; এখন সকাল,/কান্তমুখে সকালের সূর্যের মহিমা।/এখন হৃদয়ে ডাক বসন্তের/স্তব্ধবাক পাখিরা মুখর।’ (ইতিহাস-বিন্যাসের পথে)

আহসান হাবীব তৎকালীন পূর্ববাংলা- বর্তমান বাংলাদেশের জাতিসত্তার কবি। তিনি বিভ্রান্তি-বিবরণের কবি; জীবনের আঁধার-আলোক তাঁর কবিতার বিষয়াবলি। সব প্রতিকূলতা আর পঙ্কিলতার স্তূপের আড়ালে তিনি সম্ভাবনার মঞ্চ তৈরি করতে আগ্রহী এবং আগ্রহ জাগাতে উৎসাহী। এ ভূখণ্ডের জাতীয় চেতনার প্রতি প্রগাঢ় বিশ্বস্ততা আর এ অঞ্চলের মানুষের অধিকার-মর্যাদা এবং স্বপ্নবিভোরতা বিবরণের কবি। তাঁর কবিতাশিল্পের মহিমা ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা, শিল্পের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা আর প্রজন্ম-প্রহরনিবিড়তা আমাদের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে আরো বহুকাল।

নিউজ পেজ২৪/আরএস