আন্তর্জাতিক

জানুয়ারী ১৮, ২০১৬, ৮:২১ অপরাহ্ন

আবার নিষেধাজ্ঞা: সত্যিই কী ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র বিপদের কারণ?

সিরাজুল ইসলাম, তেহরান থেকে

আবারো খোঁড়া যুক্তিতে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে আমেরিকা। পরমাণু ইস্যুতে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের একদিন পরই আমরিকা নতুন করে অত্যন্ত ন্যাক্কারজনকভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করল। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক’ -এমন খোঁড়া অজুহাতে এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

তাহলে প্রশ্ন আসে- বিশ্বে আমেরিকা, রাশিয়া ও চীনের মতো শক্তির হাতে যেসব ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে সেগুলো কী কোনো বিপদের কারণ নয়? ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে কেন প্রশ্ন তোলা হবে না? এসব দেশের কাছে কী ধরনের ভয়ংকর ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে তা একটু দেখে নেয়া দরকার। তবে সে আলোচনায় যাওয়ার আগে প্রাসঙ্গিক আরো কিছু আলোচনা শেষ করতে চাই।

যে ভিত্তিহীন দাবিতে নিষেধাজ্ঞা:

মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্পের কারণে তেহরানের ওপর এ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, পাঁচজন ইরানি নাগরিক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ও চীন-কেন্দ্রিক একটি ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ককে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, তৃতীয় দেশের মাধ্যমে এসব কোম্পানি কৌশলে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির জন্য স্পর্শকাতর উপাদান বেচাকেনার সঙ্গে জড়িত রয়েছে এবং পাঁচ ইরানি নাগরিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির উপাদান কেনার কাজ করতেন। নতুন নিষেধাজ্ঞার কারণে এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান মার্কিন ব্যাংকিং সিস্টেম ব্যবহার করতে পারবে না।

আসলে আমেরিকা এ নিষেধাজ্ঞা গত ডিসেম্বর মাসেই আরোপ করতে চেয়েছিল।কিন্তু সে সময় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে পরমাণু চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিত। সম্ভবত সে কারণে দেরি করেছে মার্কিন প্রশাসন। তবে এ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আমেরিকা প্রকৃতপক্ষে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটা অসম্মানজনক পরিবেশ তৈরি করেছে। ভাবতেই অবাক লাগছে যে, পরমাণু চুক্তি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আজ যে দেশটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হলো,কাল সেই দেশেরে ওপর আবার নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে। কতটা আত্মসম্মানবোধহীন হলে এ কাজ করা সম্ভব!

আমেরিকার অন্যতম সহকারী অর্থমন্ত্রী অ্যাডাম জে এসজুবিন দাবি করেছেন, “ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং সে কারণে ইরানকে লক্ষ্য করে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ অব্যাহত থাকবে।” আমেরিকা আরো বলেছে, সম্প্রতি ইরান যে ইমাদ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করেছে তা পরমাণু ওয়ারহেড বহন করতে সক্ষম।

উল্লেখ করা দরকার যে, গত ১১ অক্টোবর ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি প্রথমবারের মতো ইমাদ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায়। গাইডেড এ ক্ষেপণাস্ত্র অত্যন্ত সুনিপূণভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম এবং আঘাত হানার আগ পর্যন্ত এ ক্ষেপণাস্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

তবে ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন দেহকান সে সময় বলেছিলেন, ইমাদ ক্ষেপণাস্ত্র হচ্ছে একটি প্রচলিত যুদ্ধাস্ত্র এবং এর পরীক্ষা কোনো আন্তর্জাতিক আইনেই নিষিদ্ধ নয়। তিনি আরো জানিয়েছিলেন, তার দেশের কোনো ক্ষেপণাস্ত্রই পরমাণু ওয়ারহেড বহনের জন্য তৈরি করা হয়নি; কারণ পরমাণু অস্ত্র উৎপাদন, সংরক্ষণ ও ব্যবহারকে হারাম (ধর্মীয় দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ) মনে করে তেহরান।

ইরানি সূত্র থেকে ইমাদের পাল্লা সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় নি।তবে ইসরাইল পর্যন্ত এ ক্ষেপণাস্ত্র পৌঁছাতে পারবে বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে। উল্লেখ করার মতো বিষয় হচ্ছে- ইরান সবসময় বলে আসছে ক্ষেপণাস্ত্রসহ তার সমস্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতান্তই আত্মরক্ষার উদ্দেশে; কাউকে আগ বাড়িয়ে আক্রমণ করার জন্য নয়।

ওবামার বক্তব্য:

ইরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, তেহরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নতুন নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের কিছুক্ষণ পর প্রেসিডেন্ট ওবামা হোয়াইট হাউজ থেকে টেলিভিশনে দেয়া ভাষণে এ কথা বলেছেন। তিনি আরো বলেন, “নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের বিষয়ে আমরা নজরদারি করব।”

বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক ক্ষেপণাস্ত্র:

সারা বিশ্বে যেসব দেশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে এগিয়ে তার মধ্যে আমেরিকার অবস্থান রয়েছে। তবে সেটিই শেষ কথা নয়। নানা তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে যে, রাশিয়ার হাতে রয়েছে সবচেয়ে ভারী ও বড় ক্ষেপণাস্ত্র যা ১৬,০০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। এর গতিও ঘণ্টায় সবচেয়ে বেশি। প্রতি সেকেন্ডে ৭.৯ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে পারে। সে হিসাবে ঘণ্টায় এ ক্ষেপণাস্ত্র ২৮,৪৪০ কিলোমিটর পথ পাড়ি দিতে সক্ষম। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও গতিসম্পন্ন এই ক্ষেপণাস্ত্রের নাম R-36m..

এরপর রয়েছে চীনের Dong Feng 5A যার পাল্লা ১৩,০০০ কিলোমিটার। এরপর রয়েছে রাশিয়ার R-29RMU Sineva ক্ষেপণাস্ত্র যার পাল্লা ১১,৫৪৭ কিলোমিটার। আমেরিকার হাতে রয়েছে সর্বোচ্চ ১১,৩০০ কিলোমিটার পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র যার নাম UGM-133 Trident USA.এ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতি ঘণ্টায় ২০,৯২১ কিলোমিটার গতিতে লক্ষ্যবস্তুর দিকে এগিয়ে যেতে পারে। এর পরে রয়েছে চীনের Dong Feng-31A ক্ষেপণাস্ত্র যার পাল্লা ১১,২০০ কিলোমিটার। রাশিয়ার RT-2UTT kh Topol-M ক্ষেপণাস্ত্রও বিশ্বের শীর্ষ পর্যায়ের অন্যতম ক্ষেপণাস্ত্র যা ১১,০০০ কিলোমিটার দূরে আঘাত হানতে পারে। মার্কিন Minute-3 ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ১০,০০০ কিলোমিটার। ক্ষেপণাস্ত্রেরএলিট ক্লাবে রয়েছে ফ্রান্সও। M51ICBM হচ্ছে ফ্রান্সের সবচেয়ে মারাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র যার পাল্লা ১০,০০০ কিলোমিটার। এরপর রয়েছে রাশিয়ার UR-1000N এবং RSM 56 Bulava ক্ষেপণাস্ত্র। এ দুটি ক্ষেপণাস্ত্রেরই পাল্লা ১০,০০০ কিলোমিটার।

লক্ষ্যণীয় যে, বিশ্বের এই সব ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র যার ধ্বংস ক্ষমতা অনেকটা কল্পনাতীত,তার মধ্যে ইরানের একটি ক্ষেপণাস্ত্রের নামও নেই। অথচ কথিত বিপজ্জনক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির অজুহাতে সেই ইরানের ওপর অত্যন্ত লজ্জাকর পরিবেশ তৈরি করে নিষেধাজ্ঞা দিল আমেরিকা।

কতটা যৌক্তিক মার্কিন দাবি:

ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা যে অজুহাত তুলেছে তার মূলত দুটি দিক রয়েছে। একটি হচ্ছে খোদ ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করেছে। অন্যটি হচ্ছে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরমাণু ওয়ারহেড বহনে সক্ষম।

আসলে এটি এক ধরনের হাস্যকর ও বাহুল্য যুক্তি। কারণ ইরানের পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে তা শতভাবে নিশ্চিত হওয়ার পরই কেবল আমেরিকা ও ছয় জাতিগোষ্ঠী তেহরানের সঙ্গে চুক্তি করেছে। তাহলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রে পরমাণু ওয়ারহেড বসাবে কোথা থেকে?

আবার ইরান যাতে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে না পারে সে জন্য প্রয়োজনীয় সব রকমের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পরেই চুক্তি করা হয়েছে। তাহলে ইরানের পরমাণু অস্ত্র বা ওয়ারহেড বানানোর সুযোগও তো নেই। তারপরও ইরান কোথা থেকে পরমাণু অস্ত্র বা ওয়ারহেড বসাবে ক্ষেপণাস্ত্রের মাথায়? পরমাণু চুক্তি হওয়ার আগে এবং পরে দফায় দফায় পরিদর্শন করা হয়েছে ইরানের পরমাণু স্থাপনা; কোথায় কী হচ্ছে তা বার বার দেখেছে। তারপর সর্বশেষ চুক্তি বাস্তবায়নের দিন অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার দিন আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা বা আইএইএ চূড়ান্ত রিপোর্ট দিয়েছে যে, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি কখনো কোনো সামরিক দিকে মোড় নেয় নি;বরং সম্পূর্ণভাবে শান্তিপূর্ণ পথে পরিচালিত হচ্ছে। তার একদিন পর আমেরিকা ইরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।

মজার বিষয় হচ্ছে- যখন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেয়া হয়েছে তার কিছুক্ষণ পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ভাষণে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছে তা প্রশংসনীয় এবং এ চুক্তির ফলে ইরান আর পরমাণু বোমায় হাত রাখতে পারবে না। তাহলে সেই ইরানকে কী করে পরমাণু ওয়ারহেড বহনে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির অভিযোগে দায়ী করা হয়?

সর্বোপরি কথা হচ্ছে- ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী সবসময় বলে আসছেন, ইরান কখনো পরমাণু অস্ত্র বানাবে না।তিনি চূড়ান্তভাবে পরমাণু অস্ত্র তৈরি, রাখা ও ব্যবহারকে সম্পূর্ণ হারাম বলে ফতোয়া দিয়েছেন। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার এই ফতোয়ার কতটা গুরুত্ব ওবামা নিজে না বুঝলে কোনো ধর্মীয় নেতার সাহায্য নিতে পারেন; তিনি সেই ধর্মীয় নেতার কাছে জানতে চাইতে পারেন- ইরানের সর্বোচ্চ নেতার ফতোয়ার গুরুত্ব কতটা এবং ইসলামে ‘হারাম’শব্দের অর্থ কী?

যিনি ইসলাম মানেন না বা বোঝেন না তার কাছে হারাম একটা কথার কথা,কিন্তু যিনি ইসলামের একান্ত অনুসারী তার কাছে হারাম অনেক বড় কিছু। সব জায়গায় রাজনীতি খুঁজে লাভ নেই মি বারাক ওবামা। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা সবসময় বলেন, আমেরিকাকে বিশ্বাস করা যায় না। পরমাণু চুক্তি বাস্তবায়নের একদিনের মাথায় নতুন নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সে বক্তব্য আমেরিকা নিজেই প্রমাণ করে দিল।

আমেরিকার নিজের খবর কী?

যে আমেরিকা কথায় কথায় ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সেই আমেরিকা কতটা নিরাপদ সারা বিশ্বের জন্য? কে সারা বিশ্বকে অশান্তির কুণ্ডলীতে পরিণত করেছে; ইরান নাকি আমেরিকা? ইরান কোন দেশের ওপর সামরিক আগ্রাসন চালিয়েছে? কোন দেশে বেসামরিক লোকজন হত্যা করেছে? কোন দেশে ঘাঁটি বানিয়ে সেনা মোতায়েন করেছে? আমরা জানি- জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরের ওপর অ্যাটম বোমা ফেলে আমেরিকা শহর দুটিকে মুহূর্তে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিল এবং লাখ লাখ নিরপরাধ মানুষ হতাহত হয়েছিল।কিন্তু ইরান কোন দেশের ওপর পরমাণু বোমা হামলা চালিয়েছে?

আমেরিকার হাতে যত হাজার পরমাণু বোমা আছে তার একটি কী ইরানের হাতে আছে? আমেরিকার হাতে যেসব পরমাণু বোমার মজুদ রয়েছে তা দিয়ে যতবার পৃথিবী ধ্বংস করা যায়,ইরানের হাতে কী সেই ধরনের বিধ্বংসী অস্ত্র আছে? আমরা এও জানি, আমেরিকা গত ৩০ বছরে ১৪টি মুসলিম দেশের ওপর হামলা চালিয়েছে,কিন্তু ইরান কোন দেশের ওপর হামলা চালিয়েছে? আমেরিকার কারণে বিশ্বে প্রতি বছর যে পরিমাণে মারণাস্ত্র কেনাবেচা হচ্ছে ইরানের জন্য কী তা হচ্ছে? আমেরিকা যেমন বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি করে ইরান কী তা করছে?

আমেরিকা যেমন নানা কায়দা-কৌশলে ও ষড়যন্ত্র করে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সন্ত্রাসী সৃষ্টি করে গোলযোগ, অস্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে,ইরান কী তার ধারকাছেও আছে? তাহলে কোন যুক্তিতে আমেরিকা ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে? যুক্ত এখানে নেই, আছে শক্তি। গায়ের জোরে সবকিছুই করা সম্ভব হচ্ছে তার পক্ষে।তবে তা কতদিন চলবে সেটা দেখার বিষয়।

এক মাঘে শীত যায় না- এটি শুধু কথার কথা নয়; বাস্তবতা। নিশ্চয় এ কথা বলার সুযোগ রয়েছে যে, বিভিন্ন দেশের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে, মুসলিম বিশ্বের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে আমেরিকা নিজেই অশান্তি সৃষ্টিকারী হিসেবে সারা বিশ্বে পরিচিত। অথচ দাবি করে- তারাই নাকি শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী। হাস্যকর দাবির একটা সীমা থাকা উচিত।

নিষেধাজ্ঞার নেপথ্যে:

ইরানের সঙ্গে পরমাণু ইস্যুতে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ছয় জাতিগোষ্ঠীর যখন আলোচনা চলছিল এবং একটা সমাধানের পথ বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়েছিল তখন বার বার তার বিরোধিতা করেছে ইহুদিবাদী ইসরাইল। অথচ ইসরাইলের নিজের কাছে রয়েছে ২০০ থেকে ৪০০ পরমাণু অস্ত্র। মধ্যপ্রাচ্যে একমাত্র পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী তারা।

এই ইসরাইলের যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আরো বছর দুয়েক আগে কয়েক মাস সময় বেধে দিয়ে বলেছিলেন- ইরান এ সময়ের মধ্যে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করে ফেলবে। কিন্তু আজ পর্যন্ত ইরান তা করে নি;বরং আইএইএ বলেছে ইরান কখনো সামরিক দিকে পরমাণু কর্মসূচি পরিচালনা করে নি। নেতানিয়াহুর কথা যে মিথ্যা তা কারো বুঝতে বাকি নেই।

এরপর এখন যখন পরমাণু চুক্তি সই হয়েছে তখন ইসরাইল বার বার বলছে, এতে তারা নিরাপত্তাহীনতায় পড়ল। সেই কথা আমলে নিয়ে ওবামার সরকার ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা চাপালো। এতে ইরানের যে সমস্যা হয় হোক কিন্তু ইসরাইলকে সন্তুষ্ট রাখতে হবে। যেন তার কাছে দাসখত দিয়ে ওবামার ক্ষমতায় আসা।

পরমাণু চুক্তির আগে নেতানিয়াহু বলেছিলেন, চুক্তির পর ইরান আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রি করবে আর সেই অর্থ দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র বানাবে। ইরানের সে ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইলের অস্তিত্ব বিনাশ করবে। অতএব তিনি শান্তিতে চুক্তি বাস্তবায়ন হতে দেবেন না। ইরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে নেতানিয়াহুর বিজয় হলো কিনা সেও এক বড় প্রশ্ন।

ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আরেকটি কারণ হতে পারে মার্কিন নির্বাচন। আসন্ন নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের প্রার্থীতা প্রত্যাশী ডোনাল্ড ট্রাম্প নাকি সব প্রার্থীর চেয়ে দৌড়ে এগিয়ে। এদিকে, ক্ষমতাসীন ডেমোক্র্যাট দলের সম্ভাব্য প্রার্থীতা প্রত্যাশী হিলারি ক্লিনটন। নির্বাচনে এ দুজনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলে হিলারির হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি বলে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে ইরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দিয়ে ইসরাইল তথা ইহুদি লবিকে খুশি করে ডেমোক্র্যাট দলের নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার একটা চেষ্টা হয়ে থাকতে পারে।

আরেকটা কারণ থাকতে পারে; সেটি হচ্ছে বারাক ওবামা মেয়াদ শেষ করে জাতিসংঘ মহাসচিব হতে চান। সে জায়গায়ও ইসরাইল তথা ইহুদি লবির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে। এ বিষয়টি মাথায় রেখে প্রেসিডেন্ট ওবামা ইরানকে বলির পাঠা বানিয়ে নিজের আখের গোছাতে চান কিনা সে সন্দেহও বোধকরি একেবারে অবাস্তব নয়।

কী করবে ইরান?

ইরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর সম্ভবত প্রথমেই প্রশ্ন আসছে- পরমাণু চুক্তি টিকে থাকবে তো? তাহলে ইরান কী আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রি করতে পারবে না? আটকে থাকা অর্থ ফেরত আনতে পারবে না? পরমাণু চুক্তি সই ও নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার পর বিশ্বে যে শান্তির সুবাতাস বয়ে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল তা কী বন্ধ হয়ে যাবে? সর্বোপরি ইরান কী তার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বাতিল করে দেবে? নাকি পরমাণু আলোচনার মতো দীর্ঘ আলোচনা করবে?

এসব প্রশ্নের কিছু জবাব হয়ত এখনই দেয়া সম্ভব। যেমন পরমাণু চুক্তি টিকে থাকবে; যতক্ষণ না আমেরিকা এ চুক্তি লঙ্ঘন করছে ততক্ষণ পর্যন্ত ইরান তা লঙ্ঘন করবে না। দ্বিতীয়ত,ইরান আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রি করতে পারবে এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং সিস্টেমে যুক্ত হতে পারবে; শুধু মার্কিন ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যুক্ত হতে পারবে না। সে কারণে আটকে থাকা অর্থ ফেরত পেতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

এছাড়া, অনেকে মনে করলেও ইরান মনে করে না যে, পরমাণু চুক্তির মাধ্যমে আমেরিকার সঙ্গে তেহরানের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। বড়জোর একটি ইস্যুর আপাতত মীমাংসা মনে করে ইরান। শান্তি অশান্তি সবই আমেরিকা ও তাদের সাঙ্গপাঙ্গদের ভূমিকার ওপর নির্ভর করছে; ইরানের ওপর নয়। ইরান কখনো আগ বাড়িয়ে অশান্তি সৃষ্টি করতে যায় নি; সম্ভবত যাবেও না।

পরিশেষে যে কথাটি জোর দিয়ে বলা যায় তা হলো- ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে ইরান কোনো রকম আমেরিকার সঙ্গে আলোচনায় বসবে না। আগেই দেশটি বলে রেখেছে, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি হচ্ছে ইরানের জন্য রেডলাইন; তা ক্রস করবে না। সে ক্ষেত্রে সামগ্রিক শান্তি ও কল্যাণ নির্ভর করছে আমেরিকার আচরণের ওপর; ইরানের ওপর নয়। আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শান্তি ও নিরাপত্তা নির্ভর করছে যুক্তির ওপর; শাক্তির ওপর নয়। পথ চলতে বার বার ইরানকে এভাবে ল্যাং মারারও কোনো অর্থ হয় না।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, রেডিও তেহরান

নিউজ পেজ২৪/আরএস