শিল্প সাহিত্য

জানুয়ারী ১৯, ২০১৬, ৮:৩৪ অপরাহ্ন

কাজী কাদের নওয়াজ কাব্যজীবন

মুসাফির নজরুল

কাদের নওয়াজ অনবরত লিখেছিলেন। তিনি বাংলা, ইংরেজি, আরবি, ফারসি, উর্দু, সংস্কৃতি প্রভৃতি ভাষার পণ্ডিত ছিলেন। তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল প্রখর। তাঁর প্রায় দশ হাজারের মতো কবিতা তৎকালীন সময়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। এর মধ্যে ‘মাসিক মোহাম্মদী’, ‘মাসিক শিশুসাথী’, ‘মাসিক মাহেনও’ ‘মাসিক খেলাঘর’, ‘মাসিক নবারুণ’, ‘মাসিক সবুজ পাতা’, ‘বিকাশ’, ‘ভারতবর্ষ’, ‘বসুমতি’, ‘শুকতারা’, ‘পাঠশালা’, ‘রামধনু’, ‘শীশমহল’, ‘মৌচাক’, ‘প্রবাসী’, ‘সপ্তডিঙ্গা’, ‘আলাপনী’, ‘দৈনিক আজাদ’, ‘দৈনিক সংবাদ’, ‘রংমশাল’, ‘পাকিস্তানী খবর’, ‘পাক জমহুরিয়াত’, ‘পাকসমাচার’, ‘মাসিক কৃষিকথা’, ‘ধলেশ্বরী’, ‘শিশু সওগাত’, ‘গণদাবী’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ হলো : ‘মরাল’ (কাব্য-১৩৪১), ‘নীল কুমুদী’ (কাব্য-১৯৬০), ‘দুটি পাখি দুটি তীরে’ (উপন্যাস-১৩৭৩), ‘উতলা সন্ধ্যা’, ‘দস্যু লাল মোহন’ (গোয়েন্দা কাহিনী), ‘দাদুর বৈঠক’ (স্মৃতিচারণমূলক গল্প কাহিনী-১৮৪৭) প্রভৃতি। ‘ওস্তাদের কদর’ (শিক্ষাগুরুর মর্যাদা), ‘মা’, ‘প্রায়শ্চিত্ত’, ‘চাঁদদিঘি’, ‘হারানো টুপি’, ইত্যাদি তাঁর বিখ্যাত কবিতা।
কবি কাজী কাদের নওয়াজের কবিতায় মাতৃভক্তি, গুরুজনের প্রতি শ্রদ্ধা, শিশুদের প্রতি অকৃত্রিম স্নেহ, দেশপ্রেম ও প্রকৃতি নিঃসর্গের প্রতি ভালোবাসা সাবলীলভাবে ফুটে উঠেছে। ছাত্রজীবনে ‘শিশুসাথী’ পত্রিকার প্রকাশিত তাঁর ‘মা’ কবিতায় মায়ের প্রতি গভীর ভক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি ‘মা’ কবিতায় লিখেছেন :
“মা কথাটি ছোট্ট অতি, কিন্তু জেনো ভাই,
ইহার চেয়ে নাম যে মধুর তিন ভুবনে নাই।
সত্য ন্যায়ের ধর্ম থাকুক, মাথার পরে আজি,
অন্তরে ‘মা’ থাকুক মম, ঝরুক স্নেহরাজি।”
তাঁর এ কবিতা পড়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভূয়সী প্রশংসা করে লিখেছিলেন, ‘কবিতা লেখার স্বাভাবিক শক্তি তোমার আছে। ... তুমি কাব্য সাধনার ধারাতেই জন্মভূমির মঙ্গল করছ।’
কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘মরাল’ বহুল সমাদৃত গ্রন্থ। এ গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাইপো কালজয়ী চিত্রকর অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর দীর্ঘ ভূমিকা লিখেছেন। বৃহদাকার এ গ্রন্থটি তিনি উৎসর্গ করেছিলেন ‘রাজা বাহাদুর মণিলাল সিংহ রায়’র নামে। কিন্তু বইটি প্রকাশিত হওয়ার আগেই তিনি মারা যান। সে কথা কবি গ্রন্থের শুরুতেই বেদনাবিধুর কণ্ঠে স্বীকার করেছেন। এ বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল মওলানা আকরম খাঁর আজাদ মোহাম্মদী গ্রুপের প্রেস থেকে।
কাদের নওয়াজ রবীন্দ্র-নজরুল যুগের একজন কবি হয়েও ভাব-ভাষা ও ছন্দের জাদুতে বাংলা কাব্য সাহিত্যে স্বতন্ত্র স্থান অধিকার করতে সক্ষম হয়েছেন। কাব্যসাহিত্যে তাঁর ব্যাপক পদচারণা ত্রিশের দশকে। এ সময় ‘কল্লোল গোষ্ঠী’র লেখকেরা রবীন্দ্রবলয় থেকে বেরিয়ে এসে একটি স্বতন্ত্র সাহিত্যধারা সৃষ্টির মানসে দেদীপ্যমান। তাঁরা ইউরোপীয় ভাবধারার প্রভাব বাংলা সাহিত্যে এনে একটি স্বতন্ত্র সাহিত্য ধারার সৃষ্টি করলেন। জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, অমিয় চক্রবর্তী, প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রমুখ কবি সার্থকভাবে বাংলা কবিতায় এক নবতর আবহ সৃষ্টি করলেন। ঠিক এ সময়কালেই কাজী কাদের নওয়াজ সগৌরবে নিজেকে বাংলা কবিতায় সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন।
কাজী কাদের নওয়াজের ‘হারানো টুপি’ কবিতা প্রকাশের পর সে সময়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তাঁর এ কবিতা পড়ে ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। তিনি তাঁর ‘হারানো টুপি’ কবিতায় লিখেছেন :
“টুপি আমার হারিয়ে গেছে
হারিয়ে গেছে ভাইরে
বিহনে তার এ জীবনে
কতই ব্যথা পাইরে ;”
কবি একজন আদর্শবান ও অনুকরণীয় শিক্ষক ছিলেন। তিনি শিক্ষাকেই জীবনে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। দিয়েছেন শিক্ষাগুরুর সম্মান। এ কারণে তিনি মুঘল হেরেমের বিভিন্ন চরিত্রাঙ্কনের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন শিক্ষকের সম্মান ও মর্যাদার কথা। ওস্তাদের কদর কবিতায় তারই প্রতিফলন ঘটেছে :
“বাদশা আলমগীর
কুমারে তাঁহার পড়াইত এক মৌলভী দিল্লির।
উচ্ছ্বাস ভরে শিক্ষক তবে দাঁড়ায়ে সগৌরবে,
কুর্ণিশ করি বাদশাহর তরে কহেন উচ্চরবে-
‘আজ হতে চির উন্নত হল শিক্ষাগুরুর শির
সত্যই তুমি মহান উদার বাদশাহ আলমগীর।’’
কাদের নওয়াজ প্রেম ও প্রকৃতির কবি। তাঁর বিভিন্ন কবিতায় প্রকৃতি প্রেম ফুটে উঠেছে। তিনি ‘পল্লী দুলাল’ কবিতায় প্রকৃতির স্পর্শ অনুভব করেছেন এভাবে :
“পল্লী দুলাল আমরা থাকি পল্লীঘেরা গ্রামের কোণে
নৃত্য করি মলয় সনে বেড়াই ছুটে চাঁপার বনে।
কদম ফুলে শিউরে ওঠে, দীঘির জলে কমল কলি
আমরা দেখে হর্ষে মাতি ধাই সেখানে গুঞ্জে অলি।
কবির দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘নীল কুমুদী’ কাব্যে চটুল ভাষারীতি ব্যবহৃত হয়েছে। কবি এ কাব্যের অধিকাংশ কবিতায় পল্লী বাংলার শ্যামল প্রকৃতির অন্তরালে রূপকের মাধ্যমে ব্যক্তি হৃদয়ের স্মৃতি-বিস্মৃতি, হৃদয় বেদনা ও হৃদয়ানুভূতি মন্থন করেছেন।
বাংলা, ইংরেজি, উর্দু, হিন্দি, আরবি, ফারসি ভাষার সুপণ্ডিত কবি কাজী কাদের নওয়াজ জীবদ্দশায় বহু পণ্ডিত মণীষীর সাহচর্য লাভ করেছিলেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে প্রথিতযশা কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিদের সাথে পত্রালাপ করতেন। তাঁদের মধ্যে মওলানা আকরম খাঁ, কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কবি বন্দে আলী মিয়া, আবুল মনসুর আহমদ, কবি আহসান হাবীব, কবি জসীমউদ্দীন, আবুল ফজল, সৈয়দ আলী আহসান, আবদার রশীদ, মজিবর রহমান খান, ডক্টর আশরাফ সিদ্দিকী, মুফাখখারুল ইসলাম, ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক প্রমুখ। তিনি রবীন্দ্রনাথ-নজরুল থেকে শুরু করে শেলী, কীটস্, বায়রন, ইকবাল, রুমী, ওমর খৈয়াম প্রমুখের কবিতা আয়ত্ত করেছিলেন। বিভিন্ন সাহিত্য আড্ডায় এসব কবির কবিতা তিনি অনর্গল পাঠ করে শ্রোতাদের মুগ্ধ করতেন।
কাদের নওয়াজ সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘তমঘা-ই-ইমতিয়াজ’ পদক ছাড়াও ১৯৬৩ সালে শিশুসাহিত্যে ‘বাংলা একাডেমী পুরস্কার’, মাদার বকস্ পুরস্কার, ১৯৬৬ সালে রাষ্ট্রীয় ‘প্রেসিডেন্ট পুরস্কার’ লাভ করেন। ১৯৮৩ সালের ৩ জানুয়ারি যশোর সদর হাসপাতালে এ মহৎ কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

নিউজ পেজ২৪/আরএস