জানুয়ারী ২৭, ২০১৬, ১০:০০ পূর্বাহ্ন

ফার্মগেট দখল করে কুতুববাগ পীরের ওরশ

নিউজ পেজ ডেস্ক

ঢাকা: রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র ফার্মগেটে আনোয়ারা উদ্যান ও এর পাশের রাস্তা, ফুটপাত, সড়কদ্বীপ দখল করে ওরশের আয়োজন করেছে কুতুববাগ দরবার শরিফ। এ ক্ষেত্রে সরকারের কোনো অনুমোদনের তোয়াক্কা করেননি এ দরবার শরিফের পীর সৈয়দ জাকির শাহ।

এ উদ্যানে আগামী বৃহস্পতি ও শুক্রবার কুতুববাগ দরবার শরিফের ওরশ ও বিশ্ব জাকের ইজতেমা অনুষ্ঠিত হবে। এ উপলক্ষে দু’সপ্তাহ ধরে উদ্যানে প্যান্ডেলসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণকাজ চলছে। এ জন্য উদ্যানের বিভিন্ন স্থান খোঁড়া হয়েছে তাতে করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গাছপালা। এদিকে মানিক মিয়া এ্যাভিনিউতে একটি রাস্তা দখল করে ওরশের পশু রাখা হয়েছে।

এমনিতে নগরবাসীর একটু মুক্ত বাতাস নিতে খোলা জায়গার অভাব, তার ওপর এভাবে পার্ক দখল করে ওরশ করায় স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। অবশ্য তাদের অনেকেই নাম প্রকাশ করতে ভয় পান।

ইন্দিরা রোডের এক বাসিন্দা বলেন, ‘আনোয়ারা উদ্যান ও এর আশপাশের এলাকা দখল করে প্রতি বছর ওরশ হচ্ছে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে এ এলাকাটি কুতুববাগ দরবার শরিফের। পার্কটিকে তারা নষ্ট করে ফেলছে। দেখার যেন কেউ নেই।’

স্থানীয়রা জানান, কুতুববাগ দরবার শরিফের সঙ্গে অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত রয়েছেন। তাই দরবারের লোকজন সরকারি স্থাপনা ব্যবহারে অনুমোদনের তোয়াক্কা করেন না। পার্ক, রাস্তা দখল করে বছরের পর বছর অনুষ্ঠান করলেও কোনো ব্যবস্থাও নেওয়া হয় না এদের বিরুদ্ধে।

জাতীয় প্রেস ক্লাবে সোমবার (২৫ জানুয়ারি) কুতুববাগ দরবারের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে ২৮ ও ২৯ জানুয়ারি ওরশ পালনের কথা জানানো হয়।

সোমবার বিকেলে গিয়ে দেখা গেছে, আনোয়ারা উদ্যানের পুরোটায় ওরশের প্রস্তুতি চলছে। চারপাশ ঢেউটিন দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে। সারা উদ্যানে গর্ত করে বাঁশ পুঁতে তার ওপর টাঙানো হয়েছে নীল-সাদা কাপড়ের বিশাল শামিয়ানা। উদ্যানের পশ্চিম পাশে তৈরি করা হয়েছে মঞ্চ। মঞ্চের পেছনের অংশে দেখা গেল মাটি খুঁড়ে চুলা বসানোর কাজ করছেন কয়েকজন। এ অংশটিও কাপড় দিয়ে ঘেরা।

ঝলমলে বিকেলেও উদ্যানে শামিয়ানার নিচে আলো-আঁধারীর খেলা। সেখানে কনক্রিটের বেঞ্চে বসে ছিলেন ফার্মগেটে একটি প্রতিষ্ঠানে কোচিং করা স্নাতকের শিক্ষার্থী শেখ মহিউদ্দীন। তিনি বলেন, ‘ক্লান্ত হয়ে পার্কে এসে খোলা আকাশের নিচে একটু বসবও সে অবস্থাও নেই। এ পার্ক নিজস্ব সম্পত্তির মতো ব্যবহার করছেন একজন পীর। পার্কে ওরশ করার বিষয়টি সরকার কীভাবে মেনে নেয় বুঝি না।’

পার্কের মাঝামাঝি স্থানে প্রবেশপথে কাপড়ের বিশাল গেট বানানো হয়েছে। এমন আরেকটি গেট কুতুববাগ দরবার শরিফের সামনেও (৩৪ ইন্দিরা রোড) স্থাপন করা হয়েছে। পার্কের পুরো পূর্বপাশজুড়ে (ফার্মগেট ওভারপাসের দিকে) উঁচু তোরণ নির্মাণ করা হয়েছে। সংসদ ভবনের দিকে বঙ্গবন্ধু স্কয়ারটিও সুউচ্চ তোরণে ঢাকা।

বঙ্গবন্ধু স্কয়ারের পূর্বপাশের রাস্তার এক পাশ একেবারে বন্ধ করে ওরশের গরু, ছাগল ও মহিষের ক্যাম্প বানানো হয়েছে।

এবাবে ওরশ আয়োজনের বিষয়ে সরকারের কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়েছে কি না— জানতে চাইলে কুতুববাগ দরকার শরিফের প্রধান খাদেম মির্জা মাহবুব বাচ্চু বলেন, ‘আমরা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়রের কাছ থেকে অনুমোদন নিয়েছি।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম সোমবার বলেন, ‘পার্কটি মূলক গণপূর্ত অধিদফতরের; তবে ফুটপাত, সড়কদ্বীপ আমাদের। সেখানে তোরণসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের জন্য আমাদের কাছ থেকে কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়নি। আপনি আরও বিস্তারিত জানতে প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে পারেন।’

প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা বিপন কুমার সাহা বলেন, ‘এখনো তাদের (কুতুববাগ দরবার) কোনো অনুমোদন দেওয়া হয়নি। এটা নিয়ে আমরা খুব ঝামেলায় আছি। মেয়র মহোদয় এ বিষয়ে ধরেছেন, কোনো অনুমোদন নেই তাদের। বলেছি বিশাল তোরণগুলো তিন ভাগের এক ভাগ করে করতে। মানিক মিয়া এ্যাভিনিউতে রাস্তার মধ্যে তোরণ করেছে, আমরা সরিয়ে ফেলতে বলেছি। রাস্তা আটকে গরু রেখেছে আমরা এটাও উঠিয়ে ফেলতে বলেছি। তারা বলছে পুলিশ নাকি তাদের পারমিশন দিয়েছে।’

‘আমরা লোক পাঠিয়ে তাদের বলছি, মেয়র মহোদয়ের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছি। আর পার্কে ওরশের অনুমোদনের প্রশ্নই আসে না। এ পার্কের মালিক হলো গণপূর্ত অধিদফতর’ বলেন বিপন কুমার।

গণপূর্ত অধিদফতরে যোগাযোগ করা হলে সেখান থেকে জানানো হয় আনোয়ারা উদ্যানে ওরশ করার জন্য কেউ কোনো অনুমোদন নেয়নি। উদ্যানের মালিক গণপূর্ত অধিদফতর, সিটি করপোরেশন থেকে কীভাবে অনুমোদন নিলেন— জানতে চাইলে দরবার শরিফের প্রধান খাদেম বলেন, ‘আমাদের অনুমোদন নেওয়াই থাকে, প্রতিবছরই আমরা ওরশ করি। ওরশের ডেটটা তো ফিক্সড।’

মির্জা মাহবুব বাচ্চু বলেন, ‘ওখানে (উদ্যানে) মানুষের বিনোদনের কিছু নেই, একটা ফুলগাছ নেই, একটা ভালো বেঞ্চ নেই, লাইট নেই। বরং আমরাই এটা ঝাড়া-মুছা করে প্রতিবছর পরিষ্কার করে থাকি।’

দু’সপ্তাহ আগে থেকে উদ্যানে ওরশ আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ওরশ শেষে ৩০ জানুয়ানি থেকে আবার ভাঙা শুরু হবে। আড়াই শ’, তিন শ’ মণ শুধু দড়িই লেগেছে এগুলো বাঁধতে। বাঁশের হিসাব তো আপনাকে দিলামই না। দরবারে আসেন কথা বলি।’-দ্য রিপোর্ট২৪ ডটকম